স্বপ্নদোষ কি? কেন হয় এবং প্রতিরোধের উপায়

স্বপ্নদোষ কি? কেন হয় এবং প্রতিরোধের উপায়
5 (100%) 11 votes

স্বপ্নদোষ মানব জীবনের একটি স্বাভাবিক বিষয়। স্বপ্নদোষ হল ঘুমন্ত অবস্থায় স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে অর্থাৎ কোন সক্রিয় যৌন কর্মকান্ড ব্যতিত স্বয়ংক্রিয় ভাবে রাগমোচন বা বীর্যপাত ঘটা। স্বপ্নদোষ হলে পুরুষ বা ছেলেদের ক্ষেত্রে বীর্যপাত ঘটে এবং মহিলা বা মেয়েদের ক্ষেত্রে শুধু রাগমোচন বা সিক্ততা বা উভয় ঘটে থাকে। সাধারনত ১৫-২৫ বছর বয়সীদের প্রায়ই স্বপ্নদোষ হয়ে থাকে। স্বপ্নদোষ বয়ঃসন্ধি বা উঠতি তারুণ্যে সবচেয়ে বেশী ঘটে থাকে, তবে কোন কোন ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধিকাল পার হবার অনেক পরেও এটি ঘটতে পারে। মহিলাদের ক্ষেত্রে ও এ সমস্যা হতে পারে। যৌন উত্তেজনা বা চরম পুলক লাভের মত স্বপ্নও হতে পারে। আমাদের দেশে প্রায় ৮৫ শতাংশ লোক এই সমস্যায় ভোগেন। মহিলাদের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে প্রায় ৪০ শতাংশ মহিলা এ সমস্যার সম্মূখীন হয়েছেন। তবে ৮৫ শতাংশ মহিলা ২১ বছর বয়সে স্বপ্নদোষের শিকার হয়। অনেকেই ১৩ বছরে এ সমস্যায় পড়েন। ইসলাম ধর্ম মতে স্বপ্নদোষ অতি সাধারণ ও স্বাভাবিক ঘটনা বলে প্রতীয়মান হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে স্বপ্নদোষ কোন গুনাহ বা পাপ নয়। এছাড়া স্বপ্নদোষের ফলে সাওম ভঙ্গ হয় না। স্বপ্নদোষ হলে গোসল করে পবিত্রতা অর্জনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

স্বপ্নদোষ

স্বপ্নদোষ কেনো হয়

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

পিউবার্টি ফেজ অর্থাৎ বয়ঃসন্ধি কালের প্রাথমিক সময় গুলোতে ছেলেদের শরীরে নানা ধরণের পরিবর্তন আসে। মুখে এবং শরীরের অন্যান্য অংশে লোম গজায়। এ সময় শরীরের বিভিন্ন পৌরুষতন্ত্রের সঠিক ভাবে বৃদ্ধি এবং নিউট্রিশন ব্যালান্সের জন্য ছেলেদের শরীর বেশি বেশি পরিমাণে টেস্টোস্টেরন হরমোন তৈরি করতে থাকে যা মাঝে মাঝে ঘুমের মধ্যে র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট স্টেজে এসে ছেলেদের ইরেকশন ঘটায়। এই ইরেকশনের কারনে ছেলেরা ঘুমের মধ্যে বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে সেক্সুয়াল ইন্টিমেসির স্বপ্ন দেখে এবং এক পর্যায়ে পুরুষাঙ্গ দিয়ে সিমেন (যা বাংলায় বীর্য বলে পরিচিত) রিলিজ হয়। অনেক সময় ইরেকশন ছাড়াও স্বপ্নদোষ হতে পারে। শুধু যে টিনএজ বয়সের ছেলেরাই ওয়েট ড্রিম দেখে তা নয়, প্রাপ্তবয়স্ক যেকোনো পুরুষেরই এই অভিজ্ঞতা হতে পারে। স্বপ্নদোষের কারনে ট্রাউজার কিংবা বিছানার চাদর ভেজানোর পর অনেকের নাও মনে থাকতে পারে। কারো কারো স্বপ্নের মধ্যে স্পার্ম রিলিজ হবার সময় ঘুম ভেঙ্গে যায়, আবার কারো ঘুম নাও ভাঙ্গতে পারে। স্বপ্নদোষের অভিজ্ঞতা একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। কেউ সপ্তাহে দুই তিনবার দেখতে পারে, কেউ মাসে একবার দেখতে পারে, আবার কেউ বছরে চার/পাঁচবার এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে পারে। অবিবাহিত পুরুষদের তুলনায় বিবাহিত পুরুষরা ওয়েট ড্রিম খুব একটা দেখেনা বললেই চলে। কারন টা আর কিছু নয়, বিবাহিত পুরুষদের প্রায় নিয়মিতই সিমেন রিলিজ হয় ফলে টেস্টোস্টেরনের ব্যালান্স ঠিক থাকে। যে সকল পুরুষেরা রেগুলার **হস্তমৈথুন** করে, তাদের ক্ষেত্রেও সেইম ব্যাপার টি ঘটে। এছাড়া আরো কিছু অনিশ্চিত কারণ থাকতে পারে যেমন –

▪স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত যৌন বিষয়ক চিন্তা করা
▪ নীল ছবি বা পর্ণগ্রাফিতে আসক্ত হওয়া
▪যৌন উদ্দীপক বই বা বাংলা চটি পড়া
▪শয়নকালের পূর্বে যৌন বিষয়ক চিন্তা করা বা দেখা

অতিরিক্ত স্বপ্নদোষ কি যৌন স্বাস্থের জন্য হুমকি

বয়োসন্ধিক্ষণের পরে শরীরে আর সব উপাদানের মতোই নিয়মিত বীর্যরস তৈরি হয়। স্বাভাবিক ভাবেই যৌনানুভূতি প্রবল হতে শুরু করে। কিন্তু সামাজিক আর ধর্মীয় অনুশাসন তো ছেলে মেয়েদের অবাধ যৌন মিলন অনুমোদন করে না। তাহলে কোথায় যাবে বীর্যথলি বা অণ্ডকোষে জমা হওয়া বীর্যকণা গুলো? নিশ্চয় সেগুলো এমনি এমনি শরীর থেকে লোপাট হয়ে যাবে না। তবে অতিরিক্ত স্বপ্নদোষ হলে অবশ্যই শরীরে প্রভাব পড়বে। যেহেতু বীর্য তৈরি হয় অন্ডকোষে, তাই বেশি স্বপ্নদোষের ফলে, অণ্ডকোষে বীর্যরস তৈরিতে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। বাড়তি বীর্য তৈরির চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে পারে অণ্ডেকোষ। ফলে অণ্ডথলিতে ব্যথা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তাছাড়া মস্তিষ্কে বীর্য তৈরির হরমোনের ঘাটতিও দেখা দিতে পারে। সেক্ষেত্রে মস্তিষ্কের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। ফলে মাথাব্যথা সহ মস্তিষ্কের নানা সাময়িক ত্রুটি দেখা দিতে পারে। তাছাড়া অতিরিক্ত স্বপ্নদোষের ফলে যৌনাঙ্গে ব্যথা ও আংশিক বিকৃতি ঘটতে পারে। স্বপ্নদোষ বিষয়ক কোনো সমস্যা যদি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে তখন অবহেলা না করে একজন যৌনরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিলেই খুব সহজ্যে রোগমুক্ত হওয়া যায়। তবে ভুল করেও কেউ কবিরাজ, হকারের পাল্লায় পড়বেন না। তারা প্রথমে আপনার মগজ ধোলায় করবে। তারপর কোনো রকম ফার্মাসি জ্ঞানহীন লোকের হাতে বানানো পচা শিকড় বাকল কিংবা ভায়াগ্রা জাতীয় ট্যাবলেট খাইয়ে আপনার কিডনিটাকে চিরতরে বিকল করার ব্যবস্থা করবে। স্বপ্নদোষের হওয়ার সাথে যৌন উত্তেজক কোনো স্বপ্নের সম্পর্ক থাকতে পারে অথবা নাও থাকতে পারে। আবার অনেক সময় পুরুষদের লিঙ্গ উত্থান ছাড়াই স্বপ্নদোষ ঘটে যেতে পারে। যদিও স্বপ্নদোষ হওয়াটা স্বাভাবিক ঘটনা কিন্তু এটি যখন অতিরিক্ত পরিমানে হতে থাকে তখন কিন্তু রোগেরই পূর্বাভাস দেয়।

অতিরিক্ত স্বপ্নদোষ সমস্যার সমাধান

বয়ঃসন্ধিকালে কারো কারো স্বপ্নদোষ নাও হতে পারে,এতে এটা প্রমাণ করে না যে তার সমস্যা আছে। আবার নিয়মিত হস্থমৈথুনের প্রভাবে স্বপ্নদোষের পরিমাণ হ্রাস পায়। স্বপ্নদোষের সাথে সবসময় স্বপ্ন দেখার সম্পর্ক নাও থাকতে পারে। যেহেতু স্বাভাবিক নিয়মিত স্বপ্নদোষ কোন সমস্যা নয়, তাই এর কোন চিকিৎসা নেই। তবে অস্বাভাবিক বা অতিরিক্ত স্বপ্নদোষের ব্যাপারে চিকিৎসকগণ বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে থাকেন। অনেক লোক একে বড় যৌনরোগ ভাবেন এবং কিছু চিকিৎসক এই সুযোগ নিয়ে ভুল চিকিৎসা দিয়ে বিপত্তি ডেকে আনেন। আর অতিরিক্ত স্বপ্নদোষের কারনে পুরুষের নানা প্রকার শারীরিক এবং মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। অতিরিক্ত স্বপ্নদোষ সমস্যায় যা করবেন –

ঘুমাতে যাবার আগে –  ঘুমানোর আগে প্রস্রাব করে নিন। যদিও এটি স্বপ্নদোষের চিকিৎসা নয়  তবে এটি স্বপ্নদোষের চাপ কমাতে শরীরকে সাহায্য করে। ঘুমাতে যাবার আগে এককাপ ঋষি পাতার (Sage Leaves – google এ সার্চ করে দেখতে পারেন। হয়তো আপনার অঞ্চলে এটি ভিন্ন নামে পরিচিত)  চা পান করলে অতিরিক্ত হস্তমৈথুন জনিত স্বপ্নদোষ থেকে মুক্তি পেতে পারেন। ঘুমানোর আগে অতিরিক্ত পানি পান করবেন না। যদি সামান্য পরিমান প্রস্রাবের লক্ষনও থাকে বিছানায় যাবার আগে প্রস্রাব করে নিন। রাতের খাবার খাওয়ার পরপরই ঘুমাতে যাবেন না। কিছুক্ষন হাটাহাটি করুন। প্রতিদিন সামান্য করে হলেও পুদিনা পাতা অথবা মিছরী খাবার অভ্যাস করুন। এছাড়া আরো যা খাবেন –

▪সকাল বেলা এক ছটাক ধনিয়া ভালোভাবে কচলে এক গ্লাস পানিতে ভিজিয়ে রাতে ঘুমানোর আগে উক্ত পানি ছেকে ২ চামচ চিনি দিয়ে শরবতের মতো বানিয়ে পান করবে। এতে অতিরিক্ত স্বপ্নদোষ হতে মুক্তি পাওয়া যাবে। আধা তোলা ধনিয়ার গুড়ো ২ চামচ মধুসহ সকালে নিয়মিত সেবন করলে কাজে দেবে।

▪রাতে শয়ন কালে লিঙ্গে অলিভ অয়েল তেল মালিশ করে শয়ন করলে উপকার পাবেন।

▪চার আনা পরিমাণ অশ্বগন্ধা চূর্ণ করে রাতে ঘুমের কিছুক্ষণ আগে দুধে মিশিয়ে সেবন করলে কাজ হবে।

▪প্রত্যেক দিন ভোর বেলা কৈতরগম কিংবা ইসব গুলের ভূষির সাথে কালোজিরা মিশিয়ে এক গ্লাস সরবত বানিয়ে নিয়মিত সেবন করলে উপকার পাবেন।

অতিরিক্ত স্বপ্নদোষ সমস্যায় শরীয়ত সম্মত তদবীর

অনেক সময় শয়তানের প্ররোচনায় স্বপ্নদোষ হয়। স্বপ্নদোষ হলে গোসল করা ফরজ হয়। তাই স্বপ্নদোষ হলে ফরজ গোসল করতে হবে। স্বপ্নদোষ যেন না হয় এর জন্য করণীয় –

▪ঘুমানোর আগে ওযু করে পবিত্র হয়ে ঘুমাতে হবে। ওযু করলে শয়তান দূরে থাকে। এতে করে স্বপ্নদোষ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।

▪ঘুমাতে যাওয়ার আগে ‘আল্লাহুম্মা বিসমিকা আমুতু আহইয়া – অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনার নামে মৃত্যুবরণ করছি এবং আপনার নামেই পুর্নজীবিত হই। (বুখারী, হা/৬৩১২)’ পড়ে ঘুমাবেন।

▪দুই হাতের তালু একত্রে করে এর মধ্যে সুরা ইখলাস, ফালাক ও নাস তিনবার করে পাঠ করে ফু দিবেন।

▪আয়াতুল কুরসী পাঠ করাবেন। আয়াতুল কুরসী পাঠ করলে আল্লাহ তায়ালা একজন ফেরেশতা নিয়োগ করে দেন বান্দার উপকারে। এতে করে শয়তান কোনো ক্ষতি করতে পারে না।

▪ডান কাতে শুয়ে ও ডান হাত গালের নিচে দিয়ে নিচের দোয়াটি পড়বেন – ‘আল্লাহুম্মা কিনি’ইআযা- বাকা ইয়াওমা তাবআসু ইবাদাকা অর্থাৎ হে আল্লাহ! যেদিন আপনি আপনার বান্দাগণকে পুর্নজীবিত করবেন সে দিনের (পরকালীন) আযাব হতে আমাকে বাঁচান।’ তিনবার পড়তে হবে ।

▪সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত (২৮৫ ও ২৮৬) পাঠ করবেন । বুখারী ও মুসলিমে আছে, যে ব্যক্তি এই দুই আয়াত পাঠ করবে, তার জন্য এই আয়াত দুটোই যথেষ্ট হবে। মানে বিপদাপদ ও শয়তানের অনিষ্ঠ থেকে রক্ষা পাবে । (বুখারী,হা/৫০০৯ ও মুসলিম,হা/৮০৭)

379 total views, 1 views today

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে

About ইমন

আমি মহা মানব নই, আমি একজন সাধারণ মানুষ। তাই আমার এপিটাফ হবে আমার মতই সাধারণ, কালের গর্ভে এটিও হারিয়ে যাবে, যেমনটা হারায় একজন সাধারণ মানুষ।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন