সাদা স্রাব কী, কেন হয় এবং প্রতিকারের উপায়

সাদা স্রাব কী, কেন হয় এবং প্রতিকারের উপায়
5 (100%) 4 votes

সাদা স্রাব বা লিউকোরিয়াকে বাংলায় শ্বেতপ্রদর বলা হয়। মাসিক হওয়ার রাস্তা দিয়ে যে সাদা স্রাব নিঃস্বরণ হয় তাই শ্বেতপ্রদর। আসলে এটা কোনো রোগ নয়, উপসর্গ মাত্র। মেয়েদের জীবনে কোনো না কোনো সময় এই লিউকোরিয়া বা সাদা স্রাব সমস্যা হতে পারে। রস শ্লেষ্মা অথবা পুঁজযুক্ত সাদা স্রাব নিঃস্বরণ হয় বলেই এটাকে লিউকোরিয়া (Leukorrhea) বলা হয়। সাধারণত প্রতিটি নারীরই ভ্যাজাইনাল ডিসচার্জ রয়েছে। এটা শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। একে শুদ্ধ বাংলায় সাদাস্রাব বলে থাকি। সাধারণত কিছু গ্রন্থি ও জরায়ু থেকে এই ডিসচার্জটি আসে। এটা সাধারণত কোনো ক্ষতি করে না। কাপড়চোপড়ও নষ্ট করে না। তবে অতিরিক্ত ভ্যাজাইনাল ডিসচার্জ যখন হয়, তখন একে আমরা লিউকোরিয়া বলি। ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া দিয়ে সংক্রমিত হয়ে এটি হতে পারে। জরায়ুমুখের ক্যানসার, পলিপ ইত্যাদির কারণেও অনেক সময় এটি হয়ে থাকে।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

সাদা স্রাব

সাদা স্রাব হওয়ার কারণ কি

সাদা স্রাব হওয়ার কারণ আসলে দুটি
১.ফিজিওলজিক্যাল বা সহজাত শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন।
২.প্যাথলজিক্যাল বা রোগজনিত কারণ।
ফিজিওলজিক্যাল লিউকোরিয়া

জন্মগ্রহণের পর মায়ের কাছ থেকে প্রাপ্ত ইস্ট্রোজেন হরমোনের প্রভাবে বা ডিম্বাশয় হতে ডিম্বাণু নিঃস্বরণের সময় সাদা স্রাব হতে পারে। ভিটামিন, প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, আয়রণ ইত্যাদির অভাবের কারণেও সাদা স্রাব বা লিউকোরিয়া হতে পারে। এছাড়া প্যাথলজিক্যাল বা যেসব রোগের কারণে সাদা স্রাব সমস্যা হতে পারে সেগুলো হলো –

রুগ্ন স্বাস্থ্য
অপুষ্টি
রক্তশুণ্যতা
যক্ষ্মা, পেটের অসুখ
দীর্ঘকালীন কিডনি রোগ
অসুখী দাম্পত্য জীবন
মানসিক অসুস্থতা
জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি অবলম্ব্বন
এন্টিবায়োটিকের ব্যাপক ব্যবহার
ডিম্ব্বাশয়ের নিঃস্বরণ অভাব ইত্যাদি

জীবাণুঘটিত সাদা স্রাব এবং তার লক্ষণ

খুবই কমন যেসব জীবাণু দ্বারা সাদা স্রাব হয় সেগুলোর মধ্যে ট্রাইকোমোনাস ভ্যাজাইনালিস ক্যানডিডা এলবিকানস, গনোরিয়ার জীবাণু নাইসেরিয়া গনোরি গাডিনিরিলা ভ্যালাইনালিস অন্যতম। এসব জীবাণু দ্বারা সাদা স্রাব হলে যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে সেগুলো হলো – প্রচুর যোনি স্রাব সাদা বা অন্যান্য রংয়ের নিঃস্বরণ, স্রাবের বিশ্রী গন্ধ, অনেক সময় মাছের আশটে গন্ধের মতো সঙ্গে চুলকানি থাকতে পারে। সেই সঙ্গে তলপেট, পিঠ ও মাজায় ব্যথা থাকতে পারে। আর ট্রাইকোমোনাস জীবাণু দ্বারা সংঘটিত সাদা স্রাব থেকে যেসব লক্ষণ দেখা যায় তা হলো – যোনিপথে হলুদাভ স্রাব ও প্রচুর সবুজাভ ক্ষরণ এবং কখনো বেশি পরিমাণ সাদা বা ক্রিম রঙের হতে পারে। আর ক্যানডিডা জীবাণু দ্বারা সংঘটিত লিউকোরিয়া হতে সামান্য চুলকানি অথবা প্রচণ্ড চুলকানি থাকে। সাদা দইয়ের মতো ছাকড়া ছাকড়া স্রাব দেখা দেয়।

জরায়ু থেকে নির্গত সাদা স্রাব কি পবিত্র

জরায়ু থেকে নির্গত সাদা স্রাব পবিত্র। তবে এটি বের হলে ওজু ভাঙ্গবে কিনা এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। জমহুর আলেমের মতে, এটি ওজু ভঙ্গকারী। যদি কারো ক্ষেত্রে এটি লাগাতর ভাবে বের হতে থাকে তবে তার ক্ষেত্রে ‘প্রস্রাবে অসংযম’ রোগীর বিধান প্রযোজ্য হবে। এমন নারী প্রতি ওয়াক্তের নামাযের জন্য নতুন করে ওজু করবেন এবং এক ওজু দিয়ে ফরজ বা নফল যত রাকাত নামায পড়তে চান পড়ে নিবেন, কুরআন শরিফ স্পর্শ করতে পারবেন। এ সময় স্রাব নির্গত হতে থাকলেও কোন অসুবিধা নেই। আর এ স্রাব যদি লাগাতর ভাবে নির্গত না হয় তাহলে আপনি সরাসরি কুরআন স্পর্শ না করে মোজা বা এ জাতীয় কোন কিছু ব্যবহার করে কুরআন পড়তে পারেন।

গর্ভাবস্থায় সাদা স্রাব নির্গত হওয়া কি স্বাভাবিক

গর্ভাবস্থায় সাদা স্রাব নির্গত হওয়া খুবই স্বাভাবিক। অন্য সময়ের তুলনায় গর্ভাবস্থায় এর পরিমাণও বেশী থাকে কারণ গর্ভাবস্থায় এস্ট্রজেন হরমোন এর পরিমান বেড়ে যায় এবং যোনীর আশপাশে এসময় রক্ত প্রবাহ বৃদ্ধি পায়। **গর্ভবতী** নারীর জরায়ুমুখ (Cervix) এবং যোনীর দেয়াল নরম হয়ে যায়। তাই এ সময় স্রাবের নির্গত হওয়ার পরিমান বেড়ে যায় যাতে যোনী থেকে কোন সংক্রমণ উপরের দিকে জরায়ুতে পৌছাতে না পারে। প্রসবের সময় যত এগিয়ে আসে স্রাবের পরিমান তত বাড়তে থাকে। এর কারণ হোল প্রসবের সময় যত এগিয়ে আসে বাচ্চার মাথা তত বেশী জরায়ুমুখের উপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। এর ফলে স্রাব আরও বেশী পরিমানে নির্গত হয়। গর্ভাবস্থার শেষের দিকে স্রাবের পরিমান এতটাই বেড়ে যেতে পারে যে তা প্রস্রাবের মত মনে হতে পারে। শেষ এক বা দু শপ্তাহ আগে স্রাবের সাথে ঘন শ্লেষ্মা বা রক্তের রেখা দেখে যেতে পারে। এর নাম “শো” (show)। এটা হয় যখন জরায়ুতে যে শ্লেষ্মাগুলো জরায়ুমুখ সীল করে রাখে (মিউকাস প্লাগ) তা স্রাবের সাথে বেড়িয়ে আসে। এটা মায়ের শরীরের প্রসবের জন্য তৈরি হওয়ার লক্ষন। যদিও গর্ভাবস্থায় সাদা স্রাব নির্গত হওয়া স্বাভাবিক তারপরও সবার উচিত এর দিকে নজর রাখা এবং কোন পরিবর্তন দেখা গেলেই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া।

সাদা স্রাব নির্গত হওয়া কখন ঝুঁকির কারন

নির্গত হওয়া সাদা স্রাব যদি সবুজ বর্ণের হয়, গন্ধযুক্ত হয় বা গর্ভবতী মায়ের যদি ব্যাথা অনুভুত হয় বা কোন কারণে তা অস্বাভাবিক মনে হয় তবে তা ইনফেকশন বা অন্য কোন সমস্যার লক্ষন হতে পারে।
যদি ভাল্ভা বা যোনিমুখ ফুলে যায় বা গন্ধবিহীন লিউকোরিয়া নির্গত হয় যার ফলে প্রস্রাবের সময় ও সহবাস করার সময় ব্যাথা হয়, চুলকানি বা জ্বলুনি হয় তবে তা  ইস্ট ইনফেকশনের লক্ষন হতে পারে।
যদি মেছো গন্ধযুক্ত, পাতলা, সাদা বা ধুসর বর্ণের স্রাব নির্গত হয় যা শারীরিক মিলনের পরে বেশী বোঝা যায় ( স্রাব যখন বীর্যের সাথে মিশে যায়) তবে তা ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস বা যৌনাঙ্গের ইনফেকশনের লক্ষন হতে পারে। এই সমস্ত লক্ষনগুলো দেখা দিলে দেরী না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সাথে আলোচনা করুন।

সাদা স্রাব কমানোর কিছু ঘরোয়া সমাধান

১। পেয়ারা- এক লিটার জলে কয়েকটা পেয়ারা পাতা ফুটিয়ে জল অর্ধেক করে নিন। ছেঁকে নিন। এই জল দিনে দু’বার খেলে শুধু লিউকোরিয়া নয়, অনেক ইনফেকশনও কমে যাবে।

২। আমলকী- তিন গ্রাম আমলকী গুঁড়োর সঙ্গে ছয় গ্রাম মধু এক সঙ্গে মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করে নিন। অথবা ২০ গ্রাম আমলকী রসের সঙ্গে আধ চা চামচ মধু মিশিয়ে নিন। টানা এক মাস দিনে দু’বার করে এই মিশ্রণ খেলে উপকার পাবেন।

৩। মেথি- এক চামচ মেথি জলে ভিজিয়ে সারা রাত রেখে দিন। সকালে জল ছেঁকে এর মধ্যে আধ চামচ মধু মিশিয়ে খেয়ে নিন। সাদা স্রাব সমস্যায় মেথির ব্যবহার অনেক পুরাতন।

৪। বেদানা- রস করেই খান বা চিবিয়ে খান সাদা স্রাব সমস্যা কমাতে বেদানা দারুণ উপকারী। শুধু ফল নয়। বেদানা পাতাও উপকারী। ৩০টা বেদানা পাতার সঙ্গে গোটা গোলমরিচ মিশিয়ে জলে মেশান। ছেঁকে নিন। টানা তিন সপ্তাহ সকালে এই জল খেলে উপকার পাবেন।

৫। আদা গুঁড়ো- দুই চা চামচ শুকনো আদা গুঁড়ো ২৫০ মিলি জলে ফুটিয়ে নিন। যত ক্ষণ না জল ঘন হয়ে অর্ধেক হয়ে যায়। টানা তিন সপ্তাহ আদা জল খেলে উপকার পাবেন। আদা মহিলাদের অনেক রোগের কাজ করে কিন্তু তার জন্য আপনাকে অবশ্যই আদা খাওয়ার নিয়ম জানতে হবে।

৬। তুলসি- মধু ও তুলসি পাতার রস এক সঙ্গে মিশিয়ে রোজ সকাল-বিকেল টানা দু’সপ্তাহ খান। এক চা চামচ তুলসি পাতার রস, জিরে গুঁড়ো দুধে মিশিয়ে তিন সপ্তাহ ধরে খান। মিছরির সঙ্গে তুলসি পাতার রস খেলেও সাদাস্রাব সমস্যায় উপকার পাবেন।

৭। ঢেঁড়স- এক লিটার জলের মধ্যে ২০০ গ্রাম ঢেঁড়স সেদ্ধ করুন। জল ঘন হয়ে অর্ধেক হয়ে আসবে। টানা এক সপ্তাহ দিনে দুই থেকে তিন বার এই জল খান।

৮। ভাতের ফ্যান- ভাতের ফ্যান নিয়মিত খেলেও কমে যায় সাদা স্রাব। ফ্যান ভাত খেতে পারেন রোজ। তবে এতে কিন্তু ওজন বাড়ে।

৯। কলা- রোজ সকালে এক কাপের দুধের মধ্যে এক চমচ মধু মিশিয়ে খান। সঙ্গে একটা কলা। কাঁচকলা সেদ্ধ বা যে কোনও রান্নায় কাঁচকলা দিয়ে খেলেও উপকার পাবেন। দুটো পাকা কলার সঙ্গে তিন টেবিল চামচ মধুর মিশ্রণ বানিয়ে নিন। এই মিশ্রণ দিনে দুই থেকে তিন বার খেলেও কমবে সাদা স্রাব সমস্যা।

954 total views, 2 views today

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন