সময় বাঁচানোর ১২ টি কার্যকরী উপায়

সময় বাঁচানোর ১২ টি কার্যকরী উপায়
5 (100%) 3 votes

সময় অনেক মূল্যবান। অন্তহীন যাত্রাপথে নিরন্তর বয়ে চলেছে সময়। সে চলার বিরতি নেই, নেই পিছুটান। প্রত্যেক মানুষের জীবন সময়ের শৃঙ্খলে বাঁধা। সময়ের মহাসমুদ্রে মানুষ মাত্রই জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বেয়ে যায় তার ছোট্ট জীবনের ভেলা। অনন্ত প্রবাহিত সময় ধারা থেকে যে খণ্ড সময়টুকু মানুষ তার জীবন রচনার জন্যে পায় তা এত দুর্লভ। এত মূল্যবান যে মানুষকে চিরকাল হাহাকার করতে হয়- ‘নাই যে সময়, নাই নাই’। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে সে হাহাকার করে- ‘জীবন এত ছোট কেন?’ তাই জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত মানুষের জীবনে মহামূল্যবান। কবি হেমচন্দ্রের ভাষায়-

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

দিন যায় ক্ষণ যায় সময় কাহারো নয়
বেগে ধায়, নাহি রহে স্থির।

তাই জীবনের মূল্যবান প্রতিটি মুহূর্ত ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারলেই জীবন সফল হয়, সুন্দর হয়, সার্থক হয়, জীবনের মূল্যবান সময় হাতে পেয়েও মানুষ তাকে কাজে লাগায় না। সময়কে অবহেলা করে, আলস্য সময়ের অপচয় করে। সময়কে চোখে দেখা যায় না বলে মানুষ ভুল করে। অলস হয়ে, কর্মবিমুখ হয়ে বসে থাকে বলে তাদের জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। ফলে জীবনে তাদের ব্যর্থতার জ্বালা সইতে হয়। কারণ, যে সময়টুকু চলে যায় তা আর কখনো ফিরে আসে না।

সময়

সময় বাঁচানোর কৌশল

কথিত আছে, “সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়”। অর্থাৎ সময়মত কাজ না করতে পারলে সেই কাজ করতে আরো অনেক বেশি সময় লেগে যায়। অনেকে সময়মতো কাজ না করার জন্য সময়কেই দায়ী করেন। দিনটি যদি আরো বড় হতো কিংবা দিনটি যদি ২৪ ঘণ্টা না হয়ে ৪৮ ঘণ্টা হতো তবে অনেক ভালো হতো। সময় নিয়ে আক্ষেপের শেষ নেই। দিনকে পরিবর্তন করার ক্ষমতা আপনার নেই, তবে সময়কে আরো দক্ষতার সাথে ব্যবহার করার ক্ষমতা আপনার আছে। আর এই দক্ষতা দিয়ে আপনি বাঁচিয়ে ফেলতে পারেন আপনার সময়টুকু। আপনার কাজগুলো দক্ষতার সাথে করতে সাহায্য করবে এই কৌশল গুলো। এই কৌশল গুলো মেনে চলুন আর বাঁচান সময়।

১। সহজ কাজ গুলো আগে করুন – প্রথমে যে কাজ গুলো করতে সময় কম লাগে সেগুলো আগে শেষ করে ফেলুন। তারপর একে একে বড় কাজগুলো করা শুরু করুন। একটি সময় একটি কাজ করুন। “একজন মানুষের মস্তিষ্ক একই সময়ে সাত ধরণের তথ্য রাখতে পারে” এমনটি মনে করেন মনস্তত্ত্ববিদরা। “আপনি যখন অন্য কোনো কাজ শুরু করেন তখন আগের কাজের তথ্য মস্তিষ্ক মুছে ফেলে। আর এটি আপনার সময় নষ্ট করে দেয়। তাই একসাথে দুইটি কাজ করা থেকে বিরত থাকুন”। এতে আপনার সময়টুকু বাঁচবে তার সাথে সাথে কাজও দক্ষতার সাথে করা সম্ভব হবে।

২। কঠিন কাজের সময় বিরতি নিন – কঠিন ও সময় সাপেক্ষ কাজ করার সময় কিছুটা বিরতি নিয়ে তারপর আবার কাজ শুরু করুন। কাজের মাঝে ২ মিনিটের বিরতি কাজকে দ্রুত করতে সাহায্য করে। “কাজের বিরতির সময় আপনার মস্তিষ্ক কাজের তথ্যগুলো সাজিয়ে ফেলে, যা আপনার কাজকে আরও সহজ করে তোলে”।

৩। সিদ্ধান্ত কম নিন – যেকোন সিদ্ধান্ত অনেকখানি সময় নষ্ট করে। ছোট খাটো সিদ্ধান্ত নেওয়া ছেড়ে দিন। আপনি জানেন কি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা মাত্র দুটি রঙের স্যুট পড়েন? এতে তার সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক খানি কমে যায়। এমনকি তিনি মাত্র তিন ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পছন্দ করেন। একমত, ভিন্নমত এবং আলোচনা। “ খুব বেশী পছন্দ আপনাকে পঙ্গু করে দিবে” এমন ধারণা দিয়েছেন Sheena Iyengar, a Columbia University business professor।

৪। ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগান – যেকোনো কিছুর সাফল্যের পিছনে রয়েছে ইচ্ছাশক্তি। ইচ্ছাশক্তিই পারে দক্ষভাবে কাজ সম্পূর্ণ করতে। ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটির মনস্তত্ত্ববিদ রয় বোমিস্টার কিছু মানুষকে সাধারণ কিছু কাজ ইচ্ছাশক্তি দিয়ে করার জন্য বলেন এবং তিনি দেখেন তারা আগের চেয়ে আরো বেশি দক্ষতার সাথে কাজগুলো করতে পারছেন। জটিল কাজগুলো সম্পূর্ণ করার ক্ষেত্রে নিজের ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগান। দিনের কঠিন সিদ্ধান্ত গুলো সকালে নেওয়ার চেষ্টা করুন। এই সময় আপনি সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবেন।

৫। ক্যালেন্ডার ব্যবহার করুন – গুরুত্বপূর্ণ দিন, কাজ বা কোন তথ্য ক্যালেন্ডারে মার্ক করে রাখুন। এতে আপনি দুটি সুবিধা পাবেন এক আপনি কোন কিছু ভুলে যাবেন না আর দুই আপনার নিত্যদিনের কাজের তালিকা সহজে তৈরি করে নিতে পারবেন। আপনার অফিসের ডেস্কে একটি টেবিল ক্যালেন্ডার ব্যবহার করতে পারেন।

৬। সাজ সরঞ্জাম – কোথাও বেরোনোর আগে তৈরি হতে গিয়ে দেখলেন ময়েশ্চার আছে তো টোনার নেই, কমপ্যাক্ট আছে তো কনসিলার নেই৷ মহাসমস্যা। এক দিকে সময় কম, তার মধ্যে যদি টোনার,চিরুনি খুঁজতে খুঁজতে সময় চলে যায় তাহলে বাকি কাজ করবেন কখন? তার চেয়ে বরং রোজ যেসব সাজ সরঞ্জামের প্রয়োজন হয় সেগুলি একসঙ্গে সাজিয়ে রাখুন৷ এক জায়গায় সব থাকলে রোজ এগুলো খোঁজার জন্য সময়টুকু অপচয় করতে হবে না৷

৭। আলমারি সাজানো – আলমারি সাঁজানোর সময় যদিও সময় একটু বেশি ব্যয় হবে। কিন্তু একবার সাজানো হয়ে গেলে আর কোনো সমস্যা নেই ৷ সাজ সরঞ্জামের ক্ষেত্রে যে সমস্যাটা হয়, ঠিক সেই সমস্যা হয় জামা কাপড়ের স্তুপ থেকে এক জোড়া মোজা খোঁজার ক্ষেত্রে ৷ তার চেয়ে বরং ছুটির দিন দেখে গুছিয়ে নিন আলমারি৷ আরেকটা ব্যাপার সব সময় মাথায় রাখবেন৷ শপিং করার ক্ষেত্রে এক ধাঁচের জামা কাপড় কখনও কিনবেন না৷ কারণ পার্টি আর অফিস মিটিং-এ একরকম জামা পরা যায় না৷ আগে থেকে সব ধরনের জামা কাপড় থাকলে আবার অর্ডার করে অপেক্ষা করতে হবে না৷

৮। সংবাদ জেনে নিন – আজকাল সকলেই ছুটছে ৷ ফলে বারান্দায় বসে সংবাদপত্র পড়ার সময় কারও হাতে নেই ৷ তাই কাজের ফাঁকে ই-পেপারে চোখ বুলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করুন ৷ কিংবা আপনি যে সংবাদপত্রের নিয়মিত পাঠক তার মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করে পুশ নোটিফিকেশন অন করে নিন ৷ কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটলে সেই খবরের নোটিফিকেশন পেয়ে যাবেন। আরো একটি ভালো উপায় অফিস যাওয়ার পথে কিংবা কাজের ফাঁকে সময় পেলেই এফএম শুনে নেওয়া। এতেও অনেকটা সময় বাঁচে। আবার প্রয়োজনীয় অনেক খবর জেনে নেওয়া যায়।

৯। আগে থেকে কিনে রাখুন – কোনো জিনিস ব্যবহার করতে গিয়ে দেখলেন সেটা শেষ। কী করবেন? আবার দোকানে গিয়ে সেটা কিনে ব্যবহার করে তারপর অফিস যাবেন? ব্যাপারটা অত্যন্ত জটিল নয় কি? তার চেয়ে বরং কেনাকাটা করার সময় নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসগুলি দুটো করে কিনুন৷ এতে হঠাৎ কোনো জিনিস শেষ হয়ে গেলে অসুবিধায় পড়তে হবে না৷ হাতের কাছে পাবেন সহজেই।

১০। ইন্টারনেটে দক্ষতা – গুগল আমাদের অনেক সময় বাঁচিয়ে দিয়েছে। একটি তথ্য বা প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য এখন আর ফোন করতে হয় না। গুগলে সার্চ দিলে সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়। কিন্তু এই গুগল পরিচালনায় আরো বেশি দক্ষ হতে হবে আপনাকে, তবেই আপনি আপনার কাজগুলো আর দ্রুত এবং দক্ষতার সাথে করতে পারবেন। কাজের সময় ফোন, ইমেইল, ফেসবুক বন্ধ রাখুন। এইগুলো আপনার সময় নষ্টই করবে, আর কিছু নয়।

১১। পছন্দে সীমাবদ্ধতা আনুন – আপনি আপনার চাকরির ধরণ পরিবর্তন করতে পারবেন না কিংবা ঘরের কাজ কমিয়ে ফেলতে পারবেন না। তাই পছন্দের সীমাবদ্ধতা নিয়ে আসুন। খুব বেশি অপশন আপনাকে বিভ্রান্ত করবে, এর বেশি কিছু নয়।

১২। আগের রাতে কাজের প্রস্তুতি নিয়ে রাখুন – পরের দিনের কাজের কিছু প্রস্তুতি আগের রাতে করে রাখুন। এতে করে আপনার সময় বাঁচার পাশাপাশি কাজের দক্ষতাও বৃদ্ধি পাবে। একটি সুন্দর দিন শুরু করার জন্য রাতের ঘুম অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যদি কাজ কিছুটা করে রাখেন তবে রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবেন। তবে হ্যাঁ ঘুমের মধ্যে মস্তিষ্ক সমস্যার সমধান করে থাকে। তাই ঘুমাতে যাওয়া আগে পরের দিনে কাজের সমস্যার কিছুটা চিন্তা করে রাখেন, দেখবেন দারুন একটা সমাধান পেয়ে গেছেন ঘুমের মধ্যে।

সময়ের মূল্য বুঝবেন যেভাবে

মানব জীবনে সময় অনেক গুরত্বপূর্ণ। আপনার জীবনে সময়ের মূল্য বুঝতে চান? তাহলে নিচের লেখাটি আপনাকে সাহায্য করবে অনেকটা।

▪আপনি এক বছর সময়ের মূল্য বুঝতে চান? তবে সেই ছেলে বা মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করুন যে বছরের ফাইনাল পরীক্ষাতে পাশ করতে পারেনি। উত্তর পেয়ে যাবেন আশা করি।

▪এক মাস সময়ের মূল্য বুঝতে চান? একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটিকে জিজ্ঞেস করুন যে এখনো তার বেতন পায় নি।

▪আপনি এক সপ্তাহ সময়ের মূল্য বুঝতে চান? জিজ্ঞেস করুন সেই টগবগে তরুণকে যে গত সপ্তাহে প্রাত্যহিক সব কাজ থেকে বিরত থেকে বন্দি ছিলো হাসপাতালের কোনও এক বেডে।

▪এক দিনের মূল্য বুঝতে চান? কোনও রোজদার ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করুন।

▪এক ঘণ্টার মূল্য বুঝতে চান? তবে জিজ্ঞেস করুন সেই ব্যক্তিকে যে তার প্রিয়জনের অপেক্ষাতে ছিল।

▪এক মিনিটের মূল্য বুঝতে চান? তবে কথা বলুন সেই মানুষটির সাথে যে এক মিনিটের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ট্রেন মিস করেছে।

▪আপনি এক সেকেন্ড সময়ের মূল্য বুঝতে চান? জিজ্ঞেস করুন সেই মানুষটিকে যে এইমাত্র মারাত্মক কোনও দুর্ঘটনার হাত থেকে মুক্তি পেলো।

গতকালে যা হয়ে গেছে তা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। আগামীকাল কি হবে তা আপনার বা আমার উভয়ের অজানা। কিন্তু বর্তমান? বর্তমান আপনার কাছে। আপনার হাতের মুঠোয়। এই সময়টার সদ্ব্যবহার করুন। জীবন পাল্টে যেতে বাধ্য!

276 total views, 2 views today

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে
  • 7
    Shares

About আফরিন নীলা

ভালোবাসা আসলে কী জিনিস? ভালোবাসার সত্যিকারের সংজ্ঞা কী? ভালোবাসার আসলে কোনো সংজ্ঞা নেই ।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন