লেবুর উপকারিতা পুষ্টিগুন এবং ব্যবহার

লেবুর উপকারিতা পুষ্টিগুন এবং ব্যবহার
5 (100%) 4 votes

লেবুর উপকারিতা বলে শেষ করা যাবেনা। রোগ বালাই দূরীকরণ এবং শরীরের সার্বিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে লেবুর উপকারিতা অনেক। যেকোনো খাবারের সাথে লেবু অনেকের অনেক প্রিয়। আবার আচার তৈরি করেও অনেকে খেয়ে থাকে। ছোট একটা ফল কিন্তু এর উপকারিতা প্রচুর আর পুষ্টিগুণেও ভরপুর। লেবু খেলেই প্রায় ৮৮% ভিটামিন সি চাহিদা পুরন করা সম্ভব। প্রাকৃতিক প্রিজারভেটিভস সাইট্রিক এসিড শরীরকে বিভিন্ন রোগ জীবানুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করে গড়ে তোলে। পৃথিবীব্যাপী লেবুর কদর রয়েছে নানা রকম খাদ্য, শ্যাম্পু, সাবানসহ প্রসাধনী সামগ্রীত তৈরিতেও লেবুর উপকারিতা অনেক। লেবুর অনেক জাত রয়েছে যেমন কাগজী লেবু, এলাচি লেবু, শরবতি লেবু, জামির লেবু, বারি লেবু-১,২,৩ ইত্যাদি।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

লেবুর উপকারিতা

লেবু থেকে পাওয়া পুষ্টিগুন

লেবুর উপকারিতা অনেক কারণ লেবু ভিটামিনে ভরপুর। যেমন ভিটামিন B₁,B₂,B₃,B₅,Fe, K, Zn, কার্বহাইড্রেট ভ্যাট, প্রোটিন, ভিটামিন সি, রিবোফ্লোবিন, কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, মিনারেল, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং ফসফরাস সমৃদ্ধ। এতে কোন সম্পৃক্ত চর্বি ও কোলেস্টেরল নেই, খুব কম মাত্রার ক্যালোরী আছে, লেবুর প্রধান আকর্ষন ভিটামিন সি। এই ভিটামিন সি একটি গুরুত্ব পূর্ন উপাদান যা আপনার শরীরকে সক্ষম রাখতে সাহায্য করে। ১০০ গ্রাম লেবুর রসের পুষ্টি উপাদান হলো – শক্তি ৪৮ কিলো ক্যালরি কার্বোহাইড্রেট ৯.৩২ গ্রাম,প্রোটিন ১.১০ গ্রাম,কোলেষ্টেরল ০০ গ্রাম,মোট আশ ২.৮০ গ্রাম,ফোলিয়েট ১১ মাইক্রো গ্রাম,নিয়ামিন ১৫ মাইক্রো গ্রাম রেটিনল সমতুল্য,প্যানথোটিক এসিড ১৯০ মাইক্রো গ্রাম,পাইরিডক্সিন ০৪০ মাইক্রো গ্রাম,ক্যালসিয়াম ০৫ মিঃগ্রাঃ,লৌহ ০.৭ মিঃগ্রাঃ

লেবুর উপকারিতা

অনেককেই বলতে শোনা যায়, যে তরকারি খেতে সুস্বাদু হয় না, সেটাতে একটু লেবু মিশিয়ে নিলে তার স্বাদ যেন কয়েক গুণে বেড়ে যায়। লেবু যে স্বাদবর্ধক সে বিষয়ে কারো সন্দেহ নেই। এমনকি লেবু পছন্দ করেন না এমন মানুষ ও নেই বললেই চলে। চটপটি, ফুচকা, হালিম, শরবত, ছোলা, চিকেন বিরিয়ানি এসব মুখরোচক খাবারে একটু লেবুর রস ছড়িয়ে না দিলে ব্যাপারটা যেন ঠিক জমে না! স্বাদ বাড়ানোর পাশাপাশি এটি বিভিন্ন ভাবে আমাদের শরীরের উপকার করে থাকে। লেবুর উপকারিতা এতোই বেশি যে তা এক পোস্টে ছোট করে বর্ণনা করা সম্ভব নয়। চলুন, লেবুর উপকারিতা সম্পর্কে কিছু জেনে আসি।

কিডনির পাথর – সাধারণত কিডনির পাথর ছোট থাকে এবং মূত্রের সাথে বের হয়ে যায়। কিন্তু এই পাথর বড় হয়ে গেলে আমাদের মুত্রথলিতে জমা হয় এবং প্রচুর ব্যথার সৃষ্টি করে। কিডনিতে পাথর হওয়া থেকে বাঁচতে লেবুর উপকারিতা অপরিসীম। লেবুর রস আমাদের শরীরকে রিহাইড্রেট করে এবং কিডনির পাথর তৈরি হতে বাধা দেয়।

লিভার সুস্থ রাখে – লেবুর পানি লিভারে থাকা পরিপাকসংক্রান্ত এনজাইম গুলোকে সক্রিয় করে তোলে। ফলে খাদ্য হজম প্রক্রিয়া ঠিকমত কাজ করে। কোষ্ঠকাঠিন্য ও হজম সংক্রান্ত সমস্যা থেকে রক্ষা পেতে লেবুর উপকারিতা অনস্বীকার্য। লেবু রক্তের অক্সিজেন পরিবহনের মাত্রাও বাড়িয়ে দেয়।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা – লেবুর মধ্যে থাকে সাইট্রাস বায়োফ্ল্যাভোনয়েড, ভিটামিন সি এবং ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস যা আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

ওজন কমায় – ওজন নিয়ন্ত্রণে লেবুর উপকারিতা অনেক। সকালে উঠে কুসুম গরম পানিতে লেবু ও মধু মিশিয়ে খেলে শরীরের অতিরিক্ত মেদ কমে যায়। প্রতি বেলা খাবারের আগে এবং ঘুমাতে যাওয়ার আগে লেবু পানি পান করলে রিউম্যাটিজম থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

মুখের ক্ষত দূর করে – নিয়মিত লেবু পানি খেলে বা লেবু পানি দিয়ে কুলি করলে স্কার্ভি, মাড়ির সমস্যা এবং মুখের ক্ষত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

নিঃশ্বাসে আনে তরতাজা ভাব – লেবুর রস নিঃশ্বাসে সতেজতা আনা ছাড়াও, এভাবে গরম পানির সাথে লেবুর রস পানে দাঁতের ব্যথা এবং জিঞ্জিভাইটিসের উপশম হয়। তবে এটা পানের পরপরই দাঁত ব্রাশ করবেন না, কারণ সাইট্রিক এসিড দাঁতের এনামেল ক্ষয় করে ফেলে। আগে দাঁত ব্রাশ করে তারপর এটা পান করা ভালো। আর লেবুপানি পান করার পর বিশুদ্ধ পানি খেতে পারেন এক গ্লাস।

শরীরে তরলের পরিমাণ ঠিক রাখে – রাতে ঘুমানোর সময়ে যে পানি খরচ হয় সেটা পূরণ হয়ে যায় সকাল সকাল এই এক গ্লাস লেবু পানি পানের মাধ্যমে।

ক্যান্সার – গবেষণায় পাওয়া গেছে লেবুর ভেতরে এমন অনেক উপাদান আছে যা শরীরে টিউমার তৈরি হতে বাধা সৃষ্টি করে। ক্যান্সার প্রতিরোধে লেবুর উপকারিতা সীমাহীন।

রক্তচাপ এবং দুশ্চিন্তা কমায় – লেবু পানি শরীরে এক ধরনের শান্তির সৃষ্টি করে। ফলে এটা আপনাকে দুশ্চিন্তা, হতাশা এবং আশংকা থেকে মুক্ত রাখে। লেবুর উপকারিতা শুধু শরীরে সজিবতা আনায়নেই সীমাবদ্ধ নয়, আপনার রক্তচাপও নিয়ন্ত্রণেও লেবু কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।

পি এইচ (PH) এর মাত্রা ঠিক রাখে – এক গ্লাস লেবুর পানি আপনার শরীরে অম্ল ও ক্ষারের মাত্রা বজায় রাখে। আপনার শরীরের পি এইচ-এর মাত্রা ঠিক রাখতে লেবুর উপকারিতা অনেক। ফলে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা আমাদের থেকে দূরে থাকে।

ডিটক্সিফিকেশন – আমাদের শরীরের বিভিন্ন বিষাক্ত পদার্থ মূত্রের সাথে বের করে দিতে লেবুর উপকারিতা অনেক। ফলে আমাদের শরীর বিভিন্ন মারাত্মক রোগ, যেমনঃ ক্যান্সার, চোখ নষ্ট ইত্যাদির হাত থেকে বেঁচে যায়।

রুপচর্চায় লেবুর উপকারিতা

▪মুখের শ্রী বৃদ্ধি করার জন্য এক টুকরো লেবুর রসের সাথে দুই চামচ দুধ মিশিয়ে তুলার সাহায্যে মুখে প্রলেপ লাগান। ১৫ – ২০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলু্ন।

▪মুখের ব্রন এবং ব্রনের দাগ সারানোর জন্য লেবুর রস ত্বকে মাখা একান্ত দরকার। তৈলাক্ত ত্বকে ব্রনের প্রকোপ বেশি দেখা যায়। লেবু কিংবা গাজরের রস অল্প একটু চিনির সাথে মিশিয়ে খেলে এর হাত থেকে সহজেই রেহাই পাওয়া যায়।

▪আধা চা চামচ লেবুর রস, এক চা চামচ মধুর সাথে মিশিয়ে মুখে ও গলায় লাগান। ১৫ মিনিট পর ঠান্ডা পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলুন। এটি আপনার ত্বকে আদ্রতা আনবে। মেক আপ করার আগে মুখে এই রূপটানটি লাগালে মুখ উজ্জল হবে। রুপচর্চা টিপস হিসাবে এটি দারুণ কার্যকারী।

▪মুখের বলিরেখার দাগ আপনার সাজ নষ্ট করে দেয়। ১০ গ্রাম লেবুর রস এবং ১০ গ্রাম টমেটোর রস একত্রে মিশিয়ে বলিরেখার উপর লাগিয়ে ৫ মিনিট পর রেখে ধুয়ে নিন। বলিরেখা দূর করতে লেবুর উপকারিতা অনস্বীকার্য

▪পাকা কলা, লেবুর রস ও মধু মিশিয়ে ২০ – ২৫ মিনিট লাগিয়ে রাখলে উপকার পাওয়া যায়। আবার লেবুর রসের সঙ্গে দুধ ও চন্দনের গুড়া দিয়ে পেস্ট করে পোড়া জায়গায় ম্যাসেজ করলে উপকার পাওয়া যায়।

▪লেবুর রস ও শসার রস সমপরিমাণে মিশিয়ে নিন। ব্যাস তৈরী হয়ে গেল অ্যান্টিজেন্ট লোশন। এটি ত্বকে লাগিয়ে দেখুন। কয়েক দিনের মধ্যেই ত্বকের তেলতেলে ভাব কমে যাবে।

▪হাতের কনুই, হাঁটু, পায়ের গোড়ালি এসব জায়গায় বেশি ময়লা জমে। এ নিয়ে অনেকেরই দুঃশ্চিন্তার শেষ নেই। আধা টুকরো লেবু নিয়ে এই জায়গাগুলোতে ভাল করে ঘষে নিলে ময়লা উঠে গিয়ে ঝকঝকে হয়ে উঠে।

লেবুর খোসার নানা উপকারিতা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লেবুর খোসার মধ্যে রয়েছে নিউট্রিয়েন্টস, যা স্বাস্থ্যের পক্ষে খুবই উপকারী। এ ছাড়াও লেবুর খোসার মধ্যে এমন কিছু উপাদান রয়েছে, যা শরীরে রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা রয়েছে। নিত্যদিনের কাজে লেবুর উপকারিতা অনস্বীকার্য। কিন্তু কী ভাবে ব্যবহার করবেন লেবুর খোসা? প্রথমে একটি লেবুকে ধুয়ে ফ্রিজে রেখে দিন। পুরো ঠাণ্ডা হয়ে জমে গেলে এবারে একটি গ্রেটার দিয়ে লেবুর খোসা সমেত গ্রেট করুন। রান্না করা গরম গরম সুপ, মাছের ঝোল বা নুডলসের উপরে ছড়িয়ে দিন লেবুর কুচি। জলের উপরেও এই গোটা লেবুর কুচি ছড়িয়ে খেতে পারেন। যেমন স্বাস্থ্যকর, তেমনই খাবারে স্বাদও বাড়ায় গোটা লেবুর কুচি। তাই খাবার শেষে লেবুর খোসা ফেলে না দিয়ে আমরা ব্যবহার করতে পারি নিত্যদিনের নানা কাজে। তাহলে দেখে নিন।

রান্নার কাজে – চিকেন ফ্রাই রান্নার সময় খাবারে লেবুর সুঘ্রাণ পেতে দুই-এক টুকরো লেবুর খোসা দিতে পারেন। সুঘ্রাণের পাশাপাশি খাবারও হবে সুস্বাদু।

চিনি ঝরঝরে রাখতে – রান্নাঘরের চিনির কৌটায় রেখে দিতে পারেন এক টুকরো লেবুর খোসা। এর ফলে চিনি থাকবে একেবারে ঝরঝরে।

মুখের দুর্গন্ধ এড়াতে – মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে লেবুর উপকারিতা অনস্বীকার্য। প্রতিদিন সকালে খালি পেটে এবং কিছুক্ষণ পরপর সারাদিন লেবু বা কমলার খোসা চিবাতে পারেন। এতে যেমন আপনার মাড়ি ভালো থাকবে তেমনি নিঃশ্বাসে থাকবে প্রাকৃতিক সজীবতা।

পোকা-মাকড়ের হাত থেকে রক্ষা পেতে – আলমারি বা ওয়ারড্রবকে কীটপতঙ্গ থেকে মুক্ত রাখতেও লেবুর খোসার জুড়ি নেই। লেবুর শুকনো খোসা শুকিয়ে একটি ছোটো পলিপ্যাকে নিয়ে মোজা কিংবা অন্তর্বাসের ড্রয়ারে রেখে দিন। দুর্গন্ধ তো দূর হবেই, সাথে সাথে আপনার পোশাক হবে দারুণ সুরভিত।

ফ্রিজ সতেজ রাখতে – ফ্রিজের ভেতরে দুর্গন্ধ এড়াতে লেবুর উপকারিতা অনস্বীকার্য। ফ্রিজে রেখে দিতে পারেন দুই এক টুকরো লেবুর খোসা। এতে ফ্রিজ থাকবে লেবুর সুগন্ধময়।

ডাস্টবিনে দুর্গন্ধ এড়াতে – দুর্গন্ধময় ময়লা-আবর্জনায় লেবুর খোসা নিক্ষেপ করুন। লেবুর খোসা দুর্গন্ধ শুষে নিবে।

চায়ের কেটলি পরিষ্কার করতে – জমে থাকা চা কিংবা কফির পট পরিষ্কার করতে পারেন লেবুর খোসা দিয়ে। এক্ষেত্রে কেটলিতে পানি নিয়ে লেবুর খোসা দিয়ে কিছুক্ষণ সেদ্ধ করতে হবে। এরপর ময়লা জায়গা পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে।

কাটিং বোর্ড পরিষ্কার করতে – কাটিং বোর্ডের সব ময়লা দাগ পরিষ্কার করতে লেবুর খোসা কেটে কয়েক ঘণ্টা রেখে দিন। দেখবেন একেবারে ঝকঝকে হয়ে গেছে।

মাইক্রোওয়েভ পরিষ্কার করতে – মাইক্রোওয়েভের তেল চিটচিটে হলে বাটিতে পানি দিয়ে লেবুর খোসা ছেড়ে গরম করতে হবে। এরপর পানি দিয়ে শুকনো কাপড় দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। এতেই মাইক্রোওয়েভ ঝকঝকে হয়ে যাবে।

লেবুর পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া – যাদের অ্যাসিডিটির সমস্যা আছে তাদের অতিরিক্ত লেবু খেলে বুক জ্বালা করে। লেবুর রস বা লেবুতে কারো কারো অ্যালার্জি হয়ে থাকে, তাই আগে থেকে জেনে নিয়ে লেবু চিকিৎসা শুরু করা উচিত৷ তা না হলে হিতে বিপরীত হতে পারে৷ ওজন কমানোর উদ্দেশ্যে খাদ্যাভ্যাসে লাগাম টানা হলে কার্বোহাইড্রেট এবং অন্যান্য পুষ্টিগুণের অভাব দেখা দিতে পারে। সেক্ষেত্রে লেবু পানি পানের পরিমাণ বাড়িয়ে দিলে শরীরে ক্লান্তি ভর করতে পারে। অতিরিক্ত লেবু ও লেবুর শরবত পানের ফলে পেটে ব্যথা এবং তল পেটে ব্যথা অনুভূত হতে পারে।

108 total views, 1 views today

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন