লাউ খাওয়ার স্বাস্থ্য উপকারিতা

লাউ খাওয়ার স্বাস্থ্য উপকারিতা
5 (100%) 3 votes

লাউ এমন একটি সবজি যা অনেকের কাছেই প্রিয়। মজাদার এই সবজি লাউ খাবার হিসেবে খুবই লোভনীয়। লাউ শীতকালীন সবজিগুলোর মধ্যে অন্যতম। লাউ পৃথিবীর অন্যতম পুরনো সবজি, যার জন্ম আফ্রিকায়। লাউকে কোন কোন স্থানে আঞ্চলিক ভাষায় কদু বলা হয়। লাউয়ের উপকারিতাকে উপেক্ষা করার কোনো উপায় নেই। কারণ, লাউয়ে প্রচুর পরিমাণে পানি থাকার পাশাপাশি এতে রয়েছে ফাইবার, ভিটামিনসহ গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান। লাউ (bottle gourd) এর বৈজ্ঞানিক নাম – Lagenaria siceraria. এটি কাচা অবস্থায় সবজি হিসেবে খাওয়া হয়, আর পরিপক্ব অবস্থায় শুকিয়ে এটি বোতল, পাত্র বা নল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এ কারণেই লাউ এর ইংরেজি নাম হয়েছে Bottle gourd। লাউকে আঞ্চলিক ভাষায় কদু বলা হয়। লাউয়ের পাতা ও ডগা শাক হিসেবে এবং লাউ তরকারী ও ভাজি হিসেবে খাওয়া যায়। লাউয়ের চেয়ে এর শাক বেশি পুষ্টিকর।

লাউ

লাউ এর জাত

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

বাংলাদেশে লাউয়ের অনেক জাত চোখে পড়ে। ফলের আকার আকৃতি এবং গাছের লতার পরিমাণ থেকেও জাতগুলো পাথর্ক্য করা যায়।

১। দেশীয় জাতঃ গাঢ় সবুজ থেকে হালকা সবুজ।

২। বারি -১: এ জাতটি বাছাইয়ের মাধ্যমে উদ্ভাবন করে ১৯৯৬ সনে সর্বত্র চাষাবাদের জন্য অনুমোদন করা হয়। পাতা সবুজ ও নরম। পুরুষ এবং স্ত্রী ফুল যথাক্রমে চারা রোপণের ৪০-৪৫ দিন এবং ৬০-৬৫ দিনের মধ্যে ফুটে। এই জাতটি সারা বছরই চাষ করা যায়।

৩। হাইব্রিড জাতঃ গোলাকার বা লম্বা। এই লাউ একই সঙ্গে সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর।

লাউ থেকে পাওয়া পুষ্টিগুন

প্রতি ১০০ গ্রাম লাউ এ রয়েছে কার্বোহাইড্রেট ২.৫ গ্রাম, প্রোটিন ০.২ গ্রাম, ফ্যাট ০.৬ গ্রাম, ভিটামিন-সি ৬ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ২০ মি.গ্রা., ফসফরাস ১০ মি.গ্রা.,পটাশিয়াম ৮৭ মি.গ্রা., নিকোটিনিক অ্যাসিড ০.২ মি.গ্রা. রয়েছে। এছাড়া এতে রয়েছে খনিজ লবণ, ভিটামিন বি-১, বি-২, আয়রন প্রভৃতি আরও নানা উপাদান।

লাউ খাওয়ার উপকারিতা

১। ওজন কমতে সাহায্য করে – লাউয়ে ফ্যাট ও ক্যালরির পরিমাণ খুব কম থাকে বলে লাউ ওজন কমতে সাহায্য করে। রক্তের কোলেস্টেরল কমতেও সাহায্য করে লাউ। ওজন কমানোর খাবার হিসাবে লাউকে রাখতে পারেন আপনার খাদ্য তালিকায়।

২। ত্বকের জন্য উপকারী – ত্বকের ভেতর থেকে পরিষ্কার করতে সাহায্য করে লাউ। এটি মুখের ত্বকের তেলের নিঃসরণের ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করে এবং ব্রণের সমস্যা দূর করতেও সাহায্য করে। বিভিন্ন প্রকার ত্বকের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।

৩। পরিপাকে সাহায্য করে – লাউয়ে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে দ্রবণীয় ও অদ্রবণীয় ফাইবার এবং পানি । এটি পরিপাকে এবং পরিপাক সম্পর্কিত সমস্যা যেমন- কোষ্ঠকাঠিন্য, পেট ফাঁপা ও এসিডিটির সমস্যা সমাধানে সাহায্য করে থাকে। যাদের পাইলসের সমস্যা রয়েছে তাদের জন্য খাওয়া খুবই উপকারী।

৪। ভালো ঘুম হতে সাহায্য করে – তিলের তেলের সাথে লাউয়ের জুসের মিশ্রণ ইনসমনিয়ার সমস্যা সমাধানে সাহায্য করে। এর পাতা রান্না করে খেলে মস্তিষ্ককে ঠান্ডা রাখে এবং ঘুমের সমস্যা সমাধানে সাহায্য করে।

৫। ইউরিনারি সমস্যা সমাধানে – লাউ মূত্র বর্ধক হিসেবে কাজ করে। শরীরের অতিরিক্ত পানি বের করে দিতে সাহায্য করে । ১ গ্লাস লাউয়ের জুসের সাথে ১ চা চামচ লেবুর রস মিসিয়ে পান করুন। ক্ষারীয় এই মিশ্রণটি এসিডিক মিশ্রণকে তরল হতে সাহায্য করে এবং মূত্রনালীর জ্বালাপোড়া কমতে সাহায্য করে।

৬। শিতলীকারক – লাউয়ে প্রচুর পরিমাণে পানি থাকায়  শরীর ঠান্ডা ও শান্ত রাখে। তাই গরমের সময় এই সবজিটি খাওয়া উপকারী। বিশেষ করে যারা প্রখর সূর্যতাপে কাজ করেন তাদের হিটস্ট্রোক প্রতিরোধে সাহায্য করে লাউ।

৭। অকালে চুল পাকা রোধ করে – আয়ুর্বেদে বলা হয়েছে যে, সকালে নিয়মিত তাজা লাউয়ের জুস পান করলে অকালে চুল পাকা প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় সাহায্য করে।

৮। পুনরুজ্জীবিত করে – ডায়রিয়া, উচ্চমাত্রার জ্বর এবং অন্য কোন স্বাস্থ্যসমস্যার কারণে যদি শরীর থেকে ঘামের মাধ্যমে পানি বের হয়ে যায় তাহলে ১ গ্লাস লাউয়ের জুস পান করুন। এটি শরীরের হারিয়ে যাওয়া পানির প্রতিস্থাপনে সাহায্য করে এবং ডায়াবেটিসের রোগীদের অত্যধিক তৃষ্ণা কমাতেও সাহায্য করে।

৯। কম ক্যালরি – কম ক্যালরির খাবার হিসেবে লাউ আদর্শ খাবার। লাউয়ে ৯৬% পানি থাকে। এছাড়াও উচ্চমাত্রার ডায়াটারি ফাইবার থাকে লাউয়ে। ১০০ গ্রাম লাউয়ে রয়েছে ১৫ ক্যালরি ও ০.১ গ্রাম ফ্যাট । এতে ভিটামিন সি ও সামান্য বি ভিটামিন, আয়রন, সোডিয়াম এবং পটাসিয়াম ও রয়েছে।

লাউ শাক খাওয়ার উপকারিতা

লাউয়ের শাক ফলিক এসিড সমৃদ্ধ খাবার। গর্ভবতী মায়ের গর্ভস্থ শিশুর স্পাইনাল কর্ড এবং মস্তিষ্কের বৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে ফলিক এসিড সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ প্রয়োজন। ফলিক এসিডের অভাবে গর্ভস্থ শিশুর স্পাইনাল কর্ডের বৃদ্ধি ব্যহত হয়; যার ফলে প্যারালাইসিস, মস্তিষ্ক বিকৃতি অথবা মৃত শিশু জন্মাতে পারে। লাউ শাক উচ্চ মাত্রার ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ। ভিটামিন-সি ঠাণ্ডা এবং যে কোন ধরনের সংক্রমণ প্রতিরোধে সাহায্য করে।

লাউয়ের শাক বিটা-ক্যারোটিন, লুটেইন এবং জিয়েজ্যান্থিন-এ পরিপূর্ণ। বিটা-ক্যারোটিন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে এবং লুটেইন ও জিয়েজ্যান্থিন চোখের রোগ প্রতিরোধ করে। উচ্চ মাত্রায় ক্যালসিয়াম থাকায় লাউ শাক অস্টিওপোরেসিস এবং অন্যান্য ক্যালসিয়ামের অভাবজনিত রোগের ঝুঁকি কমায়। এছাড়া এই শাক পটাসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার। পটাসিয়াম কোষের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যা শরীরে তরলের মাত্রা ঠিক রাখে এবং হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখে। এই শাকে ক্যালসিয়াম এবং ম্যাগনেশিয়াম প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায় যা হাড় শক্ত ও মজবুত করে। আয়রন সমৃদ্ধ এই শাক রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ এবং লোহিত রক্ত কনিকার সংখ্যা বাড়িয়ে রক্ত তৈরিতে সাহায্য করে।

এছাড়াও জন্ডিস ও কিডনির সমস্যার সমাধানেও উপকারী ভূমিকা রাখে লাউ। অসাধারণ উপকারিতা সম্বলিত এই সবজিটি বিভিন্ন ভাবে খাওয়া যায়। তবে আয়ুর্বেদ বিশেষজ্ঞেরা সকালে খালি পেটে লাউয়ের জুস পান করার পরামর্শ দেন। আবার অনেকের মতে লাউ দিনের যেকোন সময় যেকোন উপায়ে রান্না করে খাওয়াও উপকারী।

246 total views, 1 views today

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন