রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের কবিতা সমগ্র

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের কবিতা সমগ্র
5 (100%) 2 votes

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের কবিতা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। পদ্য ও গদ্য রচনার বৈচিত্র্যে রবীন্দ্র সাহিত্য অতুলনীয়। একথা স্বীকার না করে উপায় নেই যে, রবীন্দ্রনাথ মূলত কবি। কালজয়ী রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠেছেন বিশ্বকবি। তার সাহিত্যে প্রেমের অপূর্ব উপস্থাপনা এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের কবিতা বিমোহিত করে সবাইকে। ব্যক্তি জীবনে সৃষ্টিশীল রবীন্দ্রনাথ প্রেমের জন্য মরিয়া ছিলেন। স্ত্রী মৃণালিনীর সঙ্গে তো বটেই, জীবনে বেশ কয়েকবার প্রেমের উত্তাল সমুদ্রে ভেসেছেন বিশ্বকবি। রবীন্দ্রনাথ প্রথম প্রেমে পড়েন বোম্বাইতে থাকাকালীন। প্রেমিকার নাম আন্না তড়খড়। এই মারাঠি কন্যার প্রেম খুব অল্প সময়ের জন্য হলেও বেশ গুরত্বপূর্ণ ছিল কবি জীবনে। কারণ কবি তখন সবে কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পদার্পণ করেছেন। উল্টোদিকে আন্না তড়খড় বিদুষী, বুদ্ধিমতি, রূপলাবণ্যে ভরপুর এক তরুণী। এই মারাঠি কন্যা কবির কাছ থেকে ভালোবেসে একটি ডাকনাম চেয়েছিলেন। ‘নলিনী’ নামটি তার জন্য যেন তুলে আনেন কবি। সেই নাম পেয়ে আন্না বলেছিল, ‘কবি,  তোমার গান শুনলে আমি  বোধহয় আমার মরণ দিনের থেকেও প্রাণ পেয়ে জেগে উঠতে পারি। ’ যাই হোক আজকে আপনাদের জন্য রইলো বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের কবিতা গুলো।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের কবিতা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের কবিতা – ১

হে প্রিয়, আজি এ প্রাতে
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

হে প্রিয়, আজি এ প্রাতে
নিজ হাতে
কী তোমারে দিব দান।
প্রভাতের গান?
প্রভাত যে ক্লান্ত হয় তপ্ত রবিকরে
আপনার বৃন্তটির ‘পরে;
অবসন্ন গান
হয় অবসান।

হে বন্ধু কী চাও তুমি দিবসের শেষে
মোর দ্বারে এসে।
কী তোমারে দিব আনি।
সন্ধ্যাদীপখানি?
এ-দীপের আলো এ যে নিরালা কোণের,
স্তব্ধ ভবনের।
তোমার চলার পথে এরে নিতে চাও জনতায়?
এ যে হায়
পথের বাতাসে নিবে যায়।

কী মোর শকতি আছে তোমারে যে দিব উপহার।
হোক ফুল, হোক-না গলার হার,
তার ভার
কেনই বা সবে,
একদিন যবে
নিশ্চিত শুকাবে তারা ম্লান ছিন্ন হবে।
নিজ হতে তব হাতে যাহা দিব তুলি
তারে তব শিথিল অঙ্গুলি
যাবে ভুলি–
ধূলিতে খসিয়া শেষে হয়ে যাবে ধূলি।

তার চেয়ে যবে
ক্ষণকাল অবকাশ হবে,
বসন্তে আমার পুষ্পবনে
চলিতে চলিতে অন্যমনে
অজানা গোপন গন্ধে পুলকে চমকি
দাঁড়াবে থমকি,
পথহারা সেই উপহার
হবে সে তোমার।
যেতে যেতে বীথিকায় মোর
চোখেতে লাগিবে ঘোর,
দেখিবে সহসা–
সন্ধ্যার কবরী হতে খসা
একটি রঙিন আলো কাঁপি থরথরে
ছোঁয়ায় পরশমণি স্বপনের ‘পরে,
সেই আলো, অজানা সে উপহার
সেই তো তোমার।

আমার যা শ্রেষ্ঠধন সে তো শুধু চমকে ঝলকে,
দেখা দেয়, মিলায় পলকে।
বলে না আপন নাম, পথেরে শিহরি দিয়া সুরে
চলে যায় চকিতে নূপুরে।
সেথা পথ নাহি জানি,
সেথা নাহি যায় হাত, নাহি যায় বাণী।
বন্ধু, তুমি সেথা হতে আপনি যা পাবে
আপনার ভাবে,
না-চাহিতে না-জানিতে সেই উপহার
সেই তো তোমার।
আমি যাহা দিতে পারি সামান্য সে দান–
হোক ফুল, হোক তাহা গান।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের কবিতা – ২

আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আজিঝড়ের রাতে তোমার অভিসার,
পরানসখা বন্ধু হে আমার।
আকাশ কাঁদে হতাশ-সম,
নাই যে ঘুম নয়নে মম,
দুয়ার খুলি হে প্রিয়তম,
চাই যে বারে বার।
পরানসখা বন্ধু হে আমার।

বাহিরে কিছু দেখিতে নাহি পাই,
তোমার পথ কোথায় ভাবি তাই।
সুদূর কোন্‌ নদীর পারে,
গহন কোন্‌ অন্ধকারে
হতেছ তুমি পার।
পরানসখা বন্ধু হে আমার।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের কবিতা – ৩

যে-কথা বলিতে চাই
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

যে-কথা বলিতে চাই,
বলা হয় নাই,
সে কেবল এই–
চিরদিবসের বিশ্ব আঁখিসম্মুখেই
দেখিনু সহস্রবার
দুয়ারে আমার।
অপরিচিতের এই চির পরিচয়
এতই সহজে নিত্য ভরিয়াছে গভীর হৃদয়
সে-কথা বলিতে পারি এমন সরল বাণী
আমি নাহি জানি।

শূন্য প্রান্তরের গান বাজে ওই একা ছায়াবটে;
নদীর এপারে ঢালু তটে
চাষি করিতেছে চাষ;
উড়ে চলিয়াছে হাঁস
ওপারের জনশূন্য তৃণশূন্য বালুতীরতলে।
চলে কি না চলে
ক্লান্তস্রোত শীর্ণ নদী, নিমেষ-নিহত
আধো-জাগা নয়নের মতো।
পথখানি বাঁকা
বহুশত বরষের পদচিহ্ন-আঁকা
চলেছে মাঠের ধারে, ফসল-খেতের যেন মিতা,
নদীসাথে কুটিরের বহে কুটুম্বিতা।

ফাল্গুনের এ-আলোয় এই গ্রাম, ওই শূন্য মাঠ,
ওই খেয়াঘাট,
ওই নীল নদীরেখা, ওই দূর বালুকার কোলে
নিভৃত জলের ধারে চখাচখি কাকলি-কল্লোলে
যেখানে বসায় মেলা– এই সব ছবি
কতদিন দেখিয়াছে কবি।
শুধু এই চেয়ে দেখা, এই পথ বেয়ে চলে যাওয়া,
এই আলো, এই হাওয়া,
এইমতো অস্ফুটধ্বনির গুঞ্জরণ,
ভেসে-যাওয়া মেঘ হতে
অকস্মাৎ নদীস্রোতে
ছায়ার নিঃশব্দ সঞ্চরণ,
যে আনন্দ-বেদনায় এ জীবন বারেবারে করেছে উদাস
হৃদয় খুঁজিছে আজি তাহারি প্রকাশ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের কবিতা – ৪

লজ্জা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আমার হৃদয় প্রাণ
সকলই করেছি দান,
কেবল শরমখানি রেখেছি।
চাহিয়া নিজের পানে
নিশিদিন সাবধানে
সযতনে আপনারে ঢেকেছি।
হে বঁধু, এ স্বচ্ছ বাস
করে মোরে পরিহাস,
সতত রাখিতে নারি ধরিয়া–
চাহিয়া আঁখির কোণে
তুমি হাস মনে মনে,
আমি তাই লাজে যাই মরিয়া।
দক্ষিণপবনভরে
অঞ্চল উড়িয়া পড়ে
কখন্‌ যে নাহি পারি লখিতে।
পুলকব্যাকুল হিয়া
অঙ্গে উঠে বিকশিয়া,
আবার চেতনা হয় চকিতে।
বদ্ধ গৃহে করি বাস
রুদ্ধ যবে হয় শ্বাস
আধেক বসনবন্ধ খুলিয়া
বসি গিয়া বাতায়নে,
সুখসন্ধ্যাসমীরণে
ক্ষণতরে আপনারে ভুলিয়া।
পূর্ণচন্দ্রকররাশি
মূর্ছাতুর পড়ে আসি
এই নবযৌবনের মুকুলে,
অঙ্গ মোর ভালোবেসে
ঢেকে দেয় মৃদু হেসে
আপনার লাবণ্যের দুকূলে–
মুখে বক্ষে কেশপাশে
ফিরে বায়ু খেলা-আশে,
কুসুমের গন্ধ ভাসে গগনে–
হেনকালে তুমি এলে
মনে হয় স্বপ্ন ব’লে,
কিছু আর নাহি থাকে স্মরণে।
থাক্‌ বঁধু, দাও ছেড়ে,
ওটুকু নিয়ো না কেড়ে,
এ শরম দাও মোরে রাখিতে–
সকলের অবশেষ
এইটুকু লাজলেশ
আপনারে আধখানি ঢাকিতে।
ছলছল-দু’নয়ান
করিয়ো না অভিমান,
আমিও যে কত নিশি কেঁদেছি;
বুঝাতে পারি নে যেন
সব দিয়ে তবু কেন
সবটুকু লাজ দিয়ে বেঁধেছি–
কেন যে তোমার কাছে
একটু গোপন আছে,
একটু রয়েছি মুখ হেলায়ে।
এ নহে গো অবিশ্বাস–
নহে সখা, পরিহাস,
নহে নহে ছলনার খেলা এ।
বসন্তনিশীথে বঁধু,
লহ গন্ধ, লহ মধু,
সোহাগে মুখের পানে তাকিয়ো।
দিয়ো দোল আশে-পাশে,
কোয়ো কথা মৃদু ভাষে–
শুধু এর বৃন্তটুকু রাখিয়ো।
সেটুকুতে ভর করি
এমন মাধুরী ধরি
তোমাপানে আছি আমি ফুটিয়া,
এমন মোহনভঙ্গে
আমার সকল অঙ্গে
নবীন লাবণ্য যায় লুটিয়া–
এমন সকল বেলা
পবনে চঞ্চল খেলা,
বসন্তকুসুম-মেলা দুধারি।
শুন বঁধু, শুন তবে,
সকলই তোমার হবে,
কেবল শরম থাক্‌ আমারি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের কবিতা – ৫

শৈশবসন্ধ্যা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ধীরে ধীরে বিস্তারিছে ঘেরি চারিধার
শ্রান্তি আর শান্তি আর সন্ধ্যা-অন্ধকার,
মায়ের অঞ্চলসম। দাঁড়ায়ে একাকী
মেলিয়া পশ্চিমপানে অনিমেষ আঁখি
স্তব্ধ চেয়ে আছি। আপনারে মগ্ন করি
অতলের তলে, ধীরে লইতেছি ভরি
জীবনের মাঝে– আজিকার এই ছবি,
জনশূন্য নদীতীর, অস্তমান রবি,
ম্লান মূর্ছাতুর আলো– রোদন-অরুণ,
ক্লান্ত নয়নের যেন দৃষ্টি সকরুণ
স্থির বাক্যহীন– এই গভীর বিষাদ,
জলে স্থলে চরাচরে শ্রান্তি অবসাদ।
সহসা উঠিল গাহি কোন্‌খান হতে
বন-অন্ধকারঘন কোন্‌ গ্রামপথে
যেতে যেতে গৃহমুখে বালক-পথিক।
উচ্ছ্বসিত কণ্ঠস্বর নিশ্চিন্ত নির্ভীক
কাঁপিছে সপ্তম সুরে, তীব্র উচ্চতান
সন্ধ্যারে কাটিয়া যেন করিবে দুখান।
দেখিতে না পাই তারে। ওই যে সম্মুখে
প্রান্তরের সর্বপ্রান্তে, দক্ষিণের মুখে,
আখের খেতের পারে, কদলী সুপারি
নিবিড় বাঁশের বন, মাঝখানে তারি
বিশ্রাম করিছে গ্রাম, হোথা আঁখি ধায়।
হোথা কোন্‌ গৃহপানে গেয়ে চলে যায়
কোন্‌ রাখালের ছেলে, নাহি ভাবে কিছু,
নাহি চায় শূন্যপানে, নাহি আগুপিছু।
দেখে শুনে মনে পড়ে সেই সন্ধ্যাবেলা
শৈশবের। কত গল্প, কত বাল্যখেলা,
এক বিছানায় শুয়ে মোরা সঙ্গী তিন;
সে কি আজিকার কথা, হল কত দিন।
এখনো কি বৃদ্ধ হয়ে যায় নি সংসার।
ভোলে নাই খেলাধুলা, নয়নে তাহার
আসে নাই নিদ্রাবেশ শান্ত সুশীতল,
বাল্যের খেলানাগুলি করিয়া বদল
পায় নি কঠিন জ্ঞান? দাঁড়ায়ে হেথায়
নির্জন মাঠের মাঝে, নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়,
শুনিয়া কাহার গান পড়ি গেল মনে–
কত শত নদীতীরে, কত আম্রবনে,
কাংস্যঘণ্টা-মুখরিত মন্দিরের ধারে,
কত শস্যক্ষেত্রপ্রান্তে, পুকুরের পাড়ে
গৃহে গৃহে জাগিতেছে নব হাসিমুখ,
নবীন হৃদয়ভরা নব নব সুখ,
কত অসম্ভব কথা, অপূর্ব কল্পনা,
কত অমূলক আশা, অশেষ কামনা,
অনন্ত বিশ্বাস। দাঁড়াইয়া অন্ধকারে
দেখিনু নক্ষত্রালোকে, অসীম সংসারে
রয়েছে পৃথিবী ভরি বালিকা বালক,
সন্ধ্যাশয্যা, মার মুখ, দীপের আলোক।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের কবিতা – ৬

মেঘের পরে মেঘ জমেছে
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

মেঘের ‘পরে মেঘ জমেছে,
আঁধার করে আসে,
আমায় কেন বসিয়ে রাখ
একা দ্বারের পাশে।
কাজের দিনে নানা কাজে
থাকি নানা লোকের মাঝে,
আজ আমি যে বসে আছি
তোমারি আশ্বাসে।
আমায় কেন বসিয়ে রাখ
একা দ্বারের পাশে।

তুমি যদি না দেখা দাও,
কর আমায় হেলা,
কেমন করে কাটে আমার
এমন বাদল-বেলা।
দূরের পানে মেলে আঁখি
কেবল আমি চেয়ে থাকি,
পরান আমার কেঁদে বেড়ায়
দুরন্ত বাতাসে।
আমায় কেন বসিয়ে রাখ
একা দ্বারের পাশে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের কবিতা – ৭

প্রেমের হাতে ধরা দেব
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

প্রেমের হাতে ধরা দেব
তাই রয়েছি বসে;
অনেক দেরি হয়ে গেল,
দোষী অনেক দোষে।
বিধিবিধান-বাঁধনডোরে
ধরতে আসে, যাই সে সরে,
তার লাগি যা শাস্তি নেবার
নেব মনের তোষে।
প্রেমের হাতে ধরা দেব
তাই রয়েছি বসে।

লোকে আমায় নিন্দা করে,
নিন্দা সে নয় মিছে,
সকল নিন্দা মাথায় ধরে
রব সবার নীচে।
শেষ হয়ে যে গেল বেলা,
ভাঙল বেচা-কেনার মেলা,
ডাকতে যারা এসেছিল
ফিরল তারা রোষে।
প্রেমের হাতে ধরা দেব
তাই রয়েছি বসে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের কবিতা – ৮

চাই গো আমি তোমারে চাই
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

চাই গো আমি তোমারে চাই
তোমায় আমি চাই–
এই কথাটি সদাই মনে
বলতে যেন পাই।
আর যা-কিছু বাসনাতে
ঘুরে বেড়াই দিনে রাতে
মিথ্যা সে-সব মিথ্যা ওগো
তোমায় আমি চাই।

রাত্রি যেমন লুকিয়ে রাখে
আলোর প্রার্থনাই–
তেমনি গভীর মোহের মাঝে
তোমায় আমি চাই।
শান্তিরে ঝড় যখন হানে
শান্তি তবু চায় সে প্রাণে,
তেমনি তোমায় আঘাত করি
তবু তোমায় চাই।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের কবিতা – ৯

কথা ছিল এক-তরীতে কেবল তুমি আমি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কথা ছিল এক-তরীতে কেবল তুমি আমি
যাব অকারণে ভেসে কেবল ভেসে,
ত্রিভুবনে জানবে না কেউ আমরা তীর্থগামী
কোথায় যেতেছি কোন্‌ দেশে সে কোন্‌ দেশে।
কূলহারা সেই সমুদ্র-মাঝখানে
শোনাব গান একলা তোমার কানে,
ঢেউয়ের মতন ভাষা-বাঁধন-হারা
আমার সেই রাগিণী শুনবে নীরব হেসে।

আজো সময় হয় নি কি তার, কাজ কি আছে বাকি।
ওগো ওই-যে সন্ধ্যা নামে সাগরতীরে।
মলিন আলোয় পাখা মেলে সিন্ধুপারের পাখি
আপন কুলায়-মাঝে সবাই এল ফিরে।
কখন তুমি আসবে ঘাটের ‘পরে
বাঁধনটুকু কেটে দেবার তরে।
অস্তরবির শেষ আলোটির মতো
তরী নিশীথমাঝে যাবে নিরুদ্দেশে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের কবিতা – ১০

তুমি নব নব রূপে এসো প্রাণে
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তুমি নব নব রূপে এসো প্রাণে ।
এসো গন্ধে বরনে , এসো গানে ।
এসো অঙ্গে পুলকময় পরশে ,
এসো চিত্তে অমৃতময় হরষে ,
এসো মুগ্ধ মুদিত দু নয়ানে ।
তুমি নব নব রূপে এসো প্রাণে ।

এসো নির্মল উজ্জ্বল কান্ত ,
এসো সুন্দর স্নিগ্ধ প্রশান্ত ,
এসো এসো হে বিচিত্র বিধানে ।
এসো দুঃখে সুখে , এসো মর্মে ,
এসো নিত্য নিত্য সব কর্মে ;
এসো সকল-কর্ম-অবসানে ।
তুমি নব নব রূপে এসো প্রাণে ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের কবিতা – ১১

তোমায় খোঁজা শেষ হবে না মোর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তোমায় খোঁজা শেষ হবে না মোর,
যবে আমার জনম হবে ভোর।
চলে যাব নবজীবন-লোকে,
নূতন দেখা জাগবে আমার চোখে,
নবীন হয়ে নূতন সে আলোকে
পরব তব নবমিলন-ডোর।
তোমায় খোঁজা শেষ হবে না মোর।

তোমার অন্ত নাই গো অন্ত নাই,
বারে বারে নূতন লীলা তাই।
আবার তুমি জানি নে কোন্‌ বেশে
পথের মাঝে দাঁড়াবে, নাথ, হেসে,
আমার এ হাত ধরবে কাছে এসে,
লাগবে প্রাণে নূতন ভাবের ঘোর।
তোমায় খোঁজা শেষ হবে না মোর।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের কবিতা – ১২

আত্মসমর্পণ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তোমার আনন্দগানে আমি দিব সুর
যাহা জানি দু-একটি প্রীতি-সুমধুর
অন্তরের ছন্দোগাথা; দুঃখের ক্রন্দনে
বাজিবে আমার কণ্ঠ বিষাদবিধুর
তোমার কণ্ঠের সনে; কুসুমে চন্দনে
তোমারে পূজিব আমি; পরাব সিন্দূর
তোমার সীমন্তে ভালে; বিচিত্র বন্ধনে
তোমারে বাঁধিব আমি, প্রমোদসিন্ধুর
তরঙ্গেতে দিব দোলা নব ছন্দে তানে।
মানব-আত্মার গর্ব আর নাহি মোর,
চেয়ে তোর স্নিগ্ধশ্যাম মাতৃমুখ-পানে
ভালোবাসিয়াছি আমি ধূলিমাটি তোর।
জন্মেছি যে মর্ত-কোলে ঘৃণা করি তারে
ছুটিব না স্বর্গ আর মুক্তি খুঁজিবারে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের কবিতা – ১৩

একা আমি ফিরব না আর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

একা আমি ফিরব না আর
এমন করে–
নিজের মনে কোণে কোণে
মোহের ঘোরে।

তোমায় একলা বাহুর বাঁধন দিয়ে
ছোটো করে ঘিরতে গিয়ে
আপনাকে যে বাঁধি কেবল
আপন ডোরে।

যখন আমি পাব তোমায়
নিখিলমাঝে
সেইখনে হৃদয় পাব
হৃদয়রাজে।
এই চিত্ত আমার বৃন্ত কেবল
তারি ‘পরে বিশ্বকমল;
তারি ‘পরে পূর্ণ প্রকাশ
দেখাও মোরে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের কবিতা – ১৪

সে যে পাশে এসে বসেছিল
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সে যে পাশে এসে বসেছিল
তবু জাগি নি।
কী ঘুম তোরে পেয়েছিল
হতভাগিনী।
এসেছিল নীরব রাতে
বীণাখানি ছিল হাতে,
স্বপনমাঝে বাজিয়ে গেল
গভীর রাগিণী।

জেগে দেখি দখিন-হাওয়া
পাগল করিয়া
গন্ধ তাহার ভেসে বেড়ায়
আঁধার ভরিয়া।
কেন আমার রজনী যায়–
কাছে পেয়ে কাছে না পায়
কেন গো তার মালার পরশ
বুকে লাগি নি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের কবিতা – ১৫

কবে আমি বাহির হলেম তোমারি গান গেয়ে
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কবে আমি বাহির হলেম তোমারি গান গেয়ে–
সে তো আজকে নয় সে আজকে নয়।
ভুলে গেছি কবে থকে আসছি তোমায় চেয়ে
সে তো আজকে নয় সে আজকে নয়।

ঝরনা যেমন বাহিরে যায়,
জানে না সে কাহারে চায়,
তেমনি করে ধেয়ে এলেম
জীবনধারা বেয়ে–
সে তো আজকে নয় সে আজকে নয়।

কতই নামে ডেকেছি যে,
কতই ছবি এঁকেছি যে,
কোন্‌ আনন্দে চলেছি, তার
ঠিকানা না পেয়ে–
সে তো আজকে নয় সে আজকে নয়।

পুষ্প যেমন আলোর লাগি
না জেনে রাত কাটায় জাগি,
তেমনি তোমার আশায় আমার
হৃদায় আছে ছেয়ে–
সে তো আজকে নয় সে আজকে নয়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের কবিতা – ১৬

আমার খেলা যখন ছিল তোমার সনে
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আমার খেলা যখন ছিল তোমার সনে
তখনকে তুমি তা কে জানত।
তখন ছিল না ভয় ছিল না লাজ মনে
জীবনবহে যেত অশান্ত।
তুমি ভোরের বেলা ডাক দিয়েছ কত
যেন আমার আপন সখার মতো,
হেসে তোমার সাথে ফিরেছিলেম ছুটে
সেদিন কত না বন-বনান্ত।

ওগো সেদিন তুমি গাইতে যে-সব গান
কোনো অর্থ তাহার কে জানত।
শুধু সঙ্গে তারি গাইত আমার প্রাণ,
সদা নাচত হৃদয় অশান্ত।
হঠাৎ খেলার শেষে আজ কী দেখি ছবি,
স্তব্ধ আকাশ, নীরব শশী রবি,
তোমার চরণপানে নয়ন করি’ নত

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের কবিতা – ১৭

কোথায় আলো
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কোথায় আলো, কোথায় ওরে আলো।
বিরহানলে জ্বালো রে তারে জ্বালো।
রয়েছে দীপ না আছে শিখা,
এই কি ভালে ছিল রে লিখা–
ইহার চেয়ে মরণ সে যে ভালো।
বিরহানলে প্রদীপখানি জ্বালো।

বেদনাদূতী গাহিছে, “ওরে প্রাণ,
তোমার লাগি জাগেন ভগবান।
নিশীথে ঘন অন্ধকারে
ডাকেন তোরে প্রেমাভিসারে,
দুঃখ দিয়ে রাখেন তোর মান।
তোমার লাগি জাগেন ভগবান।’

গগনতল গিয়েছে মেঘে ভরি,
বাদল-জল পড়িছে ঝরি ঝরি।
এ ঘোর রাতে কিসের লাগি
পরান মম সহসা জাগি
এমন কেন করিছে মরি মরি।
বাদল-জল পড়িছে ঝরি ঝরি।

বিজুলি শুধু ক্ষণিক আভা হানে,
নিবিড়তর তিমির চোখে আনে।
জানি না কোথা অনেক দূরে
বাজিল প্রাণ গভীর সুরে,
সকল গান টানিছে পথপানে।
নিবিড়তর তিমির চোখে আনে।

কোথায় আলো, কোথায় ওরে আলো।
বিরহানলে জ্বালো রে তারে জ্বালো।
ডাকিছে মেঘ, হাঁকিছে হাওয়া,
সময় গেলে হবে না যাওয়া,
নিবিড় নিশা নিকষঘন কালো।
পরান দিয়ে প্রেমের দীপ জ্বালো।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের কবিতা – ১৮

আমার এ প্রেম নয় তো ভীরু
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আমার এ প্রেম নয় তো ভীরু,
নয় তো হীনবল,
শুধু কি এ ব্যাকুল হয়ে
ফেলবে অশ্রুজল।
মন্দমধুর সুখে শোভায়
প্রেমকে কেন ঘুমে ডোবায়।
তোমার সাথে জাগতে সে চায়
আনন্দে পাগল।

নাচো যখন ভীষণ সাজে
তীব্র তালের আঘাত বাজে,
পালায় ত্রাসে পালায় লাজে
সন্দেহ-বিহ্বল।
সেই প্রচণ্ড মনোহরে
প্রেম যেন মোর বরণ করে,
ক্ষুদ্র আশার স্বর্গ তাহার
দিক সে রসাতল।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের কবিতা – ১৯

আমার মাঝে তোমার লীলা হবে
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আমার মাঝে তোমার লীলা হবে,
তাই তো আমি এসেছি এই ভবে।
এই ঘরে সব খুলে যাবে দ্বার,
ঘুচে যাবে সকল অহংকার,
আনন্দময় তোমার এ সংসারে
আমার কিছু আর বাকি না রবে।

মরে গিয়ে বাঁচব আমি, তবে
আমার মাঝে তোমার লীলা হবে।
সব বাসনা যাবে আমার থেমে
মিলে গিয়ে তোমারি এক প্রেমে,
দুঃখসুখের বিচিত্র জীবন
তুমি ছাড়া আর কিছু না রবে।

414 total views, 1 views today

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে

About অনন্যা মিতু

রক্তের সর্ম্পক ছাড়া যদি আর কোনো ঘনিষ্ট কোনো সর্ম্পক থাকে সেটা হলো বন্ধুত্ব।ভাগ্য তোমার আত্মীয় বেছে দেয় আর তুমি বেছে নাও তোমার বন্ধু।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন