মেছতা দূর করার ঘড়োয়া উপায়

মেছতা দূর করার ঘড়োয়া উপায়
5 (100%) 2 votes

মেছতা সমস্যায় অনেকেই ভূগেন। ত্বকের যে সমস্ত সমস্যা বেশি দেখা যায় তার মাঝে অন্যতম হলো মেছতা। এর জন্য মেয়েরা খুব দুঃশ্চিন্তাগ্রস্থ থাকে। মেছতা ছেলে মেয়ে উভয়েরই হতে পারে। তবে তুলনামূলকভাবে মেয়েদের বেশি হয়। সাধারণত ২০ থেকে ৫০ বছর বয়সী মেয়েদের হয়ে থাকে। মুখে মেছতা হলে মুখের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়। দেখতেও অনেক বিশ্রী লাগে। অনেকে মেছতার দাগ দূর করার ক্রিম ব্যবহার করেও এর প্রতিকার পাচ্ছে না। কিন্তু কিছু ঘরোয়া উপাদান ব্যবহার করার দ্বারাও মেছতা দূর করা যায়। আজকে চলুন মেছতা নিয়ে বিস্তারিত জানা যাক।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মেছতা

মেছতা কি 

আমাদের ত্বকের নীচে মেলানিন নামক এক ধরণের রঞ্জক পদার্থ থাকে। কোন কারণে ত্বকের বিশেষ জায়গায় এটির কার্যক্ষমতা বেশি হলে ত্বকের সেই অংশটি পার্শ্ববতী অংশের চেয়ে বেশি গাঢ় হয়ে যায়। ফলে ওই অংশটি কালো বা বাদামী থেকে হালকা বাদামী দেখায়। একে মেছতা বলে। এটি কোন এলার্জী বা ক্যান্সার না। শুধুমাত্র এইটা একটাই ক্ষতি করে আর তা হলো সৌন্দর্যহানি।

মেছতার উপসর্গ কি 

মেছতা শরীরের যে কোন জায়গায় হতে পারে তবে সাধারণত যে সকল জায়গায় সূর্যের আলো বেশি পড়ে সেই জায়গায় বেশি হয়। মেছতার উপসর্গ একটাই ,তা হলো কালো বা বাদামী রঙের ছোপ বিশেষ করে –

গালে
নাকের উপরে
থুতনিতে
উপরের ঠোঁটের উপরের অংশে
গলায়
ঘাড়ে
এমনকি হাতেও হতে পারে।

মেছতা হওয়ার কারণ কি 

▪প্রোটেকশন ছাড়া অতিরিক্ত সূর্যের আলোতে গেলে এটি হয়। সূর্যের আলোই এটির প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হয়।
▪হরমোনের তারতম্য ঘটলে, যেমন গর্ভাবস্থায় এটি হয়ে থাকে।
▪হরমোন ওষুধ ব্যবহারে বা হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি নিলে।
▪জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল খেলে।
▪থাইরয়েড হরমোনের তারতম্য ঘটলে।
▪বংশগত কারণে হতে পারে।
▪ত্বক নিয়মিত ভাল ভাবে পরিষ্কার না করলে।

মেছতা দূর করবেন যেভাবে

পর্যাপ্ত পরিমাণ সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন। এক্ষেত্রে এসপিএফের মাত্রা যেন ৩০ হয়। বাইরে বের হওয়ার সময় স্কার্ফ, ওড়না বা আঁচল মাথায় জড়িয়ে নিন। সম্ভব হলে চওড়া ঘেরের টুপি পরুন। ঘাড়-পিঠ ঢাকা, ফুলহাতা জামা পরুন। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যবর্তী সময়ে চেষ্টা করুন রোদের মধ্যে কম বের হতে। বাইরে বের হলেও ছায়ায় থাকার চেষ্টা করুন এবং ছাতা ব্যবহার করুন। শিশুদের সানস্ক্রিন ব্যবহারের অভ্যাস গড়ুন। স্কুলে বা পার্কে খেলাধুলার সময় রোদ থেকে তাদের পক্ষে দূরে থাকা অসম্ভব। এছাড়া ত্বকে মেছতা দেখা দিলে আরো যা করবেন।

ঘৃতকুমারী – প্রথমে একটি পরিস্কার ঘৃতকুমারী বা অ্যালোভেরার পাতা নিন। পাতাটি কেটে এর ভেতর থেকে জেলটুকু বের করে নিন। তারপর এই জেলটুকু সারা মুখে লাগিয়ে এক থেকে দুই মিনিট ম্যাসাজ করে ১৫ থেকে ২০ মিনিট লাগিয়ে রেখে হালকা গরম পানিতে মুখ ধুয়ে ফেলুন। এটি প্রতিদিন দুইবার করে কয়েক সপ্তাহ করুন।

চালের গুঁড়া ও ডিম – সপ্তাহে দুই দিন চালের গুঁড়া ও ডিম একসঙ্গে পেস্ট করে ত্বকে লাগিয়ে ২মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন। এতে মেছতা দূর হবে ও একই সঙ্গে ত্বক নরম ও কোমল হবে।

টমেটো – টমেটোর রস ভিটামিন সি সমৃদ্ধ। এটি ত্বকের কালো দাগ দূর করে ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করে। টমেটোর পাল্প ত্বকে ম্যাসাজ করে ১০ থেকে ১৫ মিনিট এবং ঠাণ্ডা পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলুন। এটি প্রতিদিন অথবা সপ্তাহে তিন- চার দিন ব্যবহার করুন মেছতা দূর করে। এটি ত্বককে পরিষ্কার ও সজীব করে। আবার এক চা চামচ টমেটোর রস এবং চন্দন গুঁড়া, দুই চা চামচ মুলতানি মাটি একসাথে মিশিয়ে ত্বকে লাগিয়ে রাখুন ২০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। এটা সপ্তাহে দুই দিন ব্যবহার করতে পারেন।

লেবু – ত্বককে উজ্জ্বল করতে, ত্বকের কালো দাগ দূর করতে লেবুর জুড়ি নেই। এটি ব্লিচের কাজ করে। লেবুর রসের উচ্চমাত্রার সাইট্রিক এসিড ত্বকের অধিক তেল শোষণ করে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ থেকে ত্বককে রক্ষা করে। তাজা লেবুর রস ত্বকে লাগিয়ে রাখুন ১৫ থেকে ২০ মিনিট। এটি প্রতিদিন অথবা সপ্তাহে একদিন ব্যবহার করুন। এক চা চামচ লেবুর রসের সঙ্গে এক চা চামচ টমেটোর রস মিশিয়ে এটি ত্বকে লাগিয়ে হালকা ভাবে ম্যাসাজ করুন এবং ১৫ থেকে ২০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। এক মাস এটি করলে ত্বকের মেছতা দূর হবে।

আলু –  আলু এবং আলুর রস মেছতার দাগ দূর করতে সাহায্য করে। এটি চোখের চার পাশে জমে থাকা কালো দাগ (ডার্ক সার্কেল) দূর করতে সাহায্য করে।

স্ট্রবেরি – স্ট্রবেরি উচ্চমাত্রার ভিটামিন সি, হাইড্রোক্সি এসিড, স্যালিলিক এসিড, অ্যালিজিক এসিড সমৃদ্ধ। এটি ত্বকের মরা কোষ দূর করে, দাগ, একনে এবং ত্বক ফাটা থেকে রক্ষা করে। দুই থেকে তিনটি স্ট্রবেরি চটকে নিন। দুই চা চামচ দই এবং মধু মিশিয়ে নিন। হালকা ভাবে ত্বকে ম্যাসাজ করুন ১০ থেকে ১৫ মিনিট পর এটি পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।

টকদই – টকদই মেছতা দূরীকরণে খুবই কার্যকরী। সপ্তাহে তিনদিন ত্বকে টক দই লাগিয়ে ১৫ থেকে ২০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। টক দই মেছতা দূর করে ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়িয়ে দেবে বহুগুণ।

ভিনেগার – ভিনেগার ও সমপরিমাণ পানি মিশিয়ে ত্বকে লাগালে মেছতা দূর হয়, সেইসঙ্গে ত্বক উজ্জ্বল ও মসৃন হয়।

মুলতানি মাটি – মুলতানি মাটি ত্বকের মরা কোষ পরিষ্কার করে এবং ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। এটি ত্বকের এক্সট্রা অয়েল শুষে নিয়ে ত্বককে পরিষ্কার ও উজ্জ্বল করে। গোলাপজল, সবুজ চা, শসার রস, লেবুর রস এবং পানি ও মুলতানি মাটির মিশ্রণটি তৈরি করে ত্বকে লাগিয়ে রাখুন। ১৫ থেকে ২০ মিনিট পর পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।

ওটমিল – ওটমিল একটা দারুণ এক্সফলিয়েটিং (exfoliating) উপাদান যা ত্বকের ব্রাউন স্পট ও মৃতকোষ সরিয়ে চামড়াকে করে উজ্জ্বল আগ্রসর। প্রথমে দুই চা চামচ ওটমিল, দুই চা চামচ দুধ এবং এক চা চামচ মধু ভালোভাবে মিশিয়ে মেছতা আক্রান্ত জায়গায় ২০ মিনিট লাগিয়ে রাখুন । এরপর পানি দিয়ে হালকা ভাবে ঘষে ঘষে ধুয়ে ফেলুন। এটি সপ্তাহে দুই অথবা তিনবার করে এক মাস করুন।

লেবুর রস – লেবুর রস একটি প্রাকৃতিক চামড়া লঘুকরণ। এটি প্রাকৃতিক ভাবেই চামড়া সাদা করে থাকে। ফলে চামড়ার পিগমেন্টেড অংশটি হালকা করতে সক্ষম। একটি লেবু কেটে রস বের করে মুখের মেছতা আক্রান্ত জায়গাতে সরাসরি মাখুন। এরপর ২০মিনিট রেখে হালকা গরম পানিতে মুখ ধুয়ে ফেলুন। প্রতিদিন দুই দিন করে টানা তিন সপ্তাহ লাগিয়ে দেখুন মেছতা উধাও হয়ে যাবে।

অ্যাপল সাইডার ভিনেগার – এর মধ্যে থাকা এসিটিক এসিডের কারণে এটি খুব কার্যকরি একটি স্কিন ব্লিচিং এজেন্ট হিসেবে স্বীকৃত। সমপরিমাণ পানি ও ভিনেগার নিয়ে মিশিয়ে মেছতা আক্রান্ত জায়গায় লাগান এবং বাতাসে শুকাতে দিন। ১৫ থেকে ২০ মিনিট পরে হালকা গরম পানিতে ধুয়ে ফেলে হালকা ভাবে মুখ মুছে ফেলুন। এটি প্রতিদিন একবার করে করুন।

হলুদ – অ্যান্টি অক্সিডেন্ট ও প্রাকৃতিক ত্বক লাইটেনার হিসেবে পরিচিত হলুদের মধ্যে থাকা নানা গুণাগুণ ত্বকের মেলানিন কমিয়ে মেছতা হালকা করতে খুবই কার্যকর। এক চা চামচ হলুদের মধ্যে ৫ চা চামচ দুধ দিন। তরল দুধ ব্যবহার করা ভালো। এর মধ্যে দুই চামচ বেসন দিন । এইবার এই ঘন ক্রিমের মত পেস্টটি মেছতা আক্রান্ত জায়গায় লাগিয়ে ২০ মিনিট রাখুন। হালকা গরম পানিতে মুখ ধুয়ে মুছে নিন। প্রতিদিন একবার করে করুন।

কাঠ বাদাম – কাঠবাদামের মধ্যে থাকা হাই প্রোটিন ও ভিটামিন সি ত্বক মসৃণ করে, রঙ হালকা করে ও ত্বকে পুষ্টি যুগিয়ে সুস্থ আভাস আনে। এটি মেছতা সারাতেও সমান ভাবে সক্ষম। দুই চামচ বাদাম বাটা অথবা গুড়ার সাথে এক চামচ মধু মিশিয়ে মুখে মেছতার উপর লাগিয়ে ৩০ মিনিট রাখুন। হালকা গরম পানিতে মুখ ধুয়ে মুছে নিন। সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন করুন যতক্ষণ না কোন উন্নতি দেখছেন। অথবা ৬/৭ টি বাদাম সারাদিন কয়েক চা চামচ দুধের ভিতর ভিজিয়ে রাখুন। এরপর বেটে ক্রিমের মত বানান। এবার এই ক্রিমটি মেছতা আক্রান্ত স্থানে লাগিয়ে সারারাত রাখুন। প্রতিদিন একবার করে টানা দুই সপ্তাহ লাগান।

পেঁপে – পেঁপের ভিতর থাকা পেপেইন নামক এনজাইমের কারণে এটি প্রাকৃতিক এক্সফলিয়েটিং এজেন্ট হিসেবে খুব ভালো কাজ করে। এটি ত্বকের ক্ষতিগ্রস্ত কোষকে সারিয়ে তোলে ও মৃতকোষ দূর করে। আধা কাপ পাকা পেঁপে নিয়ে থেতলে নিন। এবার এতে মিশান দুই টেবিল চামচ মধু। এবার আক্রান্ত স্থানে ২০ মিনিট লাগিয়ে ধুয়ে ফেলুন। প্রতিদিন একবার করে কয়েক মাস লাগাতে হবে।

চন্দনের গুড়া – ত্বকের রঙ হালকা কারি উপাদান গুলো মধ্যে খুব ভালো হল চন্দন। এটি ত্বকের যে কোন দাগ সারাতে খুব ভালো কাজে দেয়। মেছতার মত জেদি দাগ সরাতেও এটি কার্যকর। সমপরিমাণ চন্দন গুড়া, দুধ, লেবুর রস আর হলুদ মিশিয়ে পেস্ট বানিয়ে মেছতা আক্রান্ত জায়গাতে মাখুন। এবার এটাকে শুকাতে দিন। শুকিয়ে গেলে পানির ঝাপটা দিয়ে মাস্কটা নরম করে সার্কুলার মোশনে ম্যাসাজ করে ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে ৩/৪ দিন করে করুন যতদিন না আপনি কোন উন্নতি দেখছেন।

ব্লিচিং বা ফেডিং ক্রিম – বাজারে নানা ব্র্যান্ডের ব্লিচিং-ফেডিং বা ত্বক ফর্সাকারী ক্রিম পাওয়া যায়। এগুলো নিয়মিত ব্যবহার করলে মেছতার দাগ ক্রমশ হালকা হয়ে যায়। তবে এসব ক্রিম ব্যবহারের পর রোদে বের হওয়া যাবে না। তাতে ত্বক পুড়ে যায়।

পরিশেষে – মেছতা সমস্যা না কমলে একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন। প্রয়জনে লেজার ট্রিটমেন্ট নিতে পারেন। লেজার ট্রিটমেন্ট ক্রায়োসার্জারির মতোই সহজ ও নিরাপদ। এতে মেছতার দাগ যেমন পুরোপুরি চলে যায়, তেমনি কোনো ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে না। এছাড়া ফটো ফেসিয়াল করতে পারেন।ফটোফেসিয়াল অনেকটা লেজার ট্রিটমেন্টের মতোই। তবে ফটোফেসিয়াল পদ্ধতি আমাদের দেশে খুব একটা প্রচলিত হয়নি।

50 total views, 1 views today

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন