মা নিয়ে কিছু কথা। মায়ের তুলনা শুধুই মা

মা নিয়ে কিছু কথা। মায়ের তুলনা শুধুই মা
4.3 (86.59%) 85 votes

মা এমন একজন মানুষ, যিনি সন্তানের সব কষ্ট হাসিমুখে সয়ে যান, নিজে না খেয়ে সন্তানকে খাওয়ান। সন্তানের সুখের জন্য নিজের সব সুখ বিলিয়ে দেন। মায়ের তুলনা শুধুই মা। আমরা প্রথম যে বুলি শিখি সেটাও মায়ের মুখ থেকে। পৃথিবীর কেউ আপনার মনের ভাষা বুঝতে না পারলেও মা আপনার মুখ দেখেই বলে দিতে পারবেন আপনি কষ্টে আছেন, না সুখে আছেন। ‘মা’- এক অক্ষরের ছোট এই শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে আছে পৃথিবীর সব মমতা আর ভালোবাসা।  তাইতো আব্রাহাম লিংকন বলেছেন, “যার মা আছে, সে কখনও গরীব নয়।”

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মা

মা শুধু নিজের সন্তানের মধ্যেই নয়, সবার মাঝেই অকাতরে বিলাতে পারেন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। মায়ের মতো এতো মধুর ডাক পৃথিবীর কোনো অভিধানে দ্বিতীয়টি আর নেই। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় কবি কাজী কাদের নেওয়াজ ‘মাকে’ নিয়ে লিখেছেন –

মা কথাটি ছোট্ট অতি
কিন্তু জেনো ভাই,
ইহার চেয়ে নাম যে মধুর
ত্রি ভুবনে নাই।

সত্যিই মা কথাটি অনেক মধুর এবং ভালোবাসার এক বিশাল আকাশ, অথৈ সাগর এবং সভ্যতার উষালগ্ন থেকেই সবচেয়ে বেশী উচ্চারিত প্রেমময়ী এক নাম। হুমায়ুন আহমদ যথার্তই বলেছেন, ” মা হল পৃথিবীর একমাত্র ব্যাংক, যেখানে আমরা আমাদের সব দুঃখ, কষ্ট জমা রাখি এবং বিনিময়ে নেই বিনা সুদে অকৃত্রিম ভালোবাসা।”

আপনি যত বড়ই হন না কেন, মায়ের কাছে আপনি সেই ছোট শিশুর মতোই। আপনার বাড়ি ফিরতে দেড়ি হলে কিংবা ফোন বন্ধ থাকলে মায়ের চেয়ে বেশি কষ্ট আর কেউ পায় না। যখন আপনি দরজায় এসে দাঁড়ালে  সবার আগে দৌড়ে গিয়ে বলবে খোকা এসেছিস, কত টেনশনে ছিলাম। মায়ের হাতের রান্না করা খাবার সব খাবারের ঊর্ধ্বে। মায়ের আর বাবার দুজনেরই সমান অবদানের কথা বলা হলেও বাবা খানিকটা আড়ালেই থাকেন মায়ের অপরিসীম আর অনবদ্য ভূমিকার কারণে। মা হলো একাধারে অভিভাবক, বন্ধু বা কাছের একজন, যাঁর সঙ্গে অভিমান কার যায়, আবার নিজের ভেতরের সবকিছু উগড়ে দেওয়া যায়।
পৃথিবীতে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া বেশ কষ্ট হবে যে মাকে ভালোবাসে না। ব্যতিক্রমের বিষয়টা বাদ দিয়ে এটাই আমাদের সাধারণ জীবনের অসাধারণ এক সমীকরণ। যে বৃত্তে বন্দি প্রায় প্রতিটি প্রাণী; শুধু মানুষ বললেই ভুল হবে, প্রায় প্রতিটি জীবই মাতৃত্বের এই গোলক ধাঁধার কাছে হার মানতে বাধ্য হয়েছে। একবার চিন্তা করে দেখুন তো, মাতৃত্বের এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া যদি ব্যাহত হতো। তাহলে অবস্থাটা কী হতো? আর যাই হোক, যে এক জীবনে মাকে পেল, সে মাকে হারাতে চাইবে না কোনো দিন। এই পৃথিবীতে মা ছাড়া কেউ তাঁর সন্তানকে স্বার্থহীন ভাবে ভালোবাসে না। মায়ের ভালোবাসার মধ্যে আছে প্রকৃত সুখ।

মা

দূর গাঁয়ে ফেলে আসা মায়ের মুখ, মায়ের স্নেহ ছায়ায় বেড়ে ওঠা, মায়ের কাছ থেকে দূরে থাকার বেদনা কিংবা সাতসমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে দূর অজানায় পাড়ি জমানোর পর মায়ের স্মৃতি। এসবই আমাদের প্রতিনিয়ত পোড়ায়। হু-হু করে ওঠে বুকের ভেতরটা। আর যখনই মায়ের কথা মনে পড়ে, মনের অজান্তেই চোখ ভিজে যায়। ইচ্ছা করে ছুটে যাই মায়ের কাছে। এক চিলতে আদর আর শাড়ির আঁচলে মুখটা বেঁধে ডুব দিই ভালোবাসার সাগরে। জন্মের সূচনা পর্ব থেকে পরিণত বয়স পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে মায়ের অবদান অতুলনীয়। তাইতো মাকে নিয়ে অনেক গান, কবিতা, গল্প, কাহিনী রচিত হয়েছে। ফকির আলমগীরের গাওয়া একটি গান আছে, ‘মায়ের একধার দুধের দাম, কাটিয়া গায়ের চাম, পাপোশ বানাইলেও ঋণের শোধ হবে না আমার মা।’ সত্যিই মায়ের ঋণ শোধ হবার নয়।

মায়ের ভালোবাসাকে স্বরণীয় করে রাখতে প্রতি বছর পালন করা হয় Mother’s Day মা দিবস। মে মাসের দ্বিতীয় রোববারকে “মা দিবস” হিসাবে উদযাপনের ঘোষণা দেয়া হয় ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের ৮ মে মার্কিন কংগ্রেসে। আর তখন থেকেই এই দিনে সারা বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে  এই দিবস। বিশ্বের প্রায় ৪৬টি দেশে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হয়। কথিত আছে, ব্রিটেনেই প্রথম শুরু হয় মা দিবস পালনের রেওয়াজ, কেননা সেখানে প্রতি বছর মে মাসের চতুর্থ রোববারকে মাদারিং সানডে হিসাবে পালন করা হতো।

ইসলাম ধর্ম মাকে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মা-বাবাই হলো তোমার জান্নাত এবং জাহান্নাম’- (ইবনে মাজাহ-মিশকাত, পৃ. ৪২১)। অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘যখন কোনো অনুগত সন্তান নিজের মা-বাবার দিকে অনুগ্রহের নজরে দেখে, আল্লাহ তায়ালা তার প্রতিটি দৃষ্টির বিনিময়ে একটি করে কবুল হজের সাওয়াব দান করেন’- (বায়হাকি-মিশকাত, পৃ. ৪২১)।

মা-ই পারে নিদ্রাহীন রাত কাটিয়ে রোগগ্রস্ত সন্তানকে সেবা প্রদান করে সুস্থ করে তুলতে। এই মা-ইতো প্রথমে অ আ অক্ষর এবং ধর্মীয় শিক্ষার প্রাথমিক পাঠ দেন। তারপর ধীরে ধীরে প্রস্তুত করেন স্কুলে পাঠাতে। প্রাথমিক থেকে সর্বশেষ শিক্ষা সমাপনে মায়ের যে ভূমিকা তা কোন সু-সন্তানকে নিশ্চয়ই নূতন করে মনে করিয়ে দেবার প্রয়োজন আছে বলে আমার মনে হয়না। তবে কু-সন্তানেরা এই মমতাময়ী মাকে দুধের ঋণ শোধ দূরে থাক, কুলাঙ্গার সন্তান সেই মাকে কতইনা কষ্ট দিয়ে চলে। মায়ের আদর, মমতা, শাসন সর্বোপরি দায়িত্ববোধ আর কারও সাথে তুলনা চলেনা। সেই মায়েরা যখন সন্তানদের কাছ থেকে কষ্ট পায়, আঘাত পায় এবং অমানুষিক নির্যাতন ভোগ করে তখন ঐ মা যে কিভাবে নিজেকে শীতল রাখেন তা ভাবা অত্যন্ত কঠিন বিষয়। মা তো মা, সে তবুও সন্তানকে সুপথে ফিরিয়ে আনতে প্রাণান্ত চেষ্টায় নিবিষ্ট থাকে, কখনো সফল হয় কখনো ব্যর্থ হয়। মা ভীষণ কষ্ট পায় যখন নিজের গর্বের সন্তান তার বৌয়ের অসহযোগিতার কারণে মাকে নিজের সাথে না রেখে বৃদ্ধ বয়সে আলাদা করে দেয়। এই কষ্ট কোন ভাষায় প্রকাশ করা যায়না। সন্তান যখন ভরন পোষণের দায়িত্ব নেয়না, এমনকি দেখা সাক্ষাতও করেনা, একটু গভীর ভাবে ভাবুনতো কি অব্যক্ত ব্যথা জাগবে মায়ের মনে! ভাববেন, তা হলে বাবার দায়িত্ব কি? হ্যাঁ সেই দায়িত্ব বোধের জায়গায় হয়তো ঐ সময়ে বাবা কাছে থাকলে সে তার সাধ্যমতো নিজের জীবন সঙ্গীকে আগলে রাখে। কিন্তু মা যদি সত্যিই একা হয়ে পড়ে তার যে ক’টি দরোজায় ঢু দিতে হয় সেগুলো হলো; ১) নিজের বাবার বাড়ীতে যদি কেউ সদয় থাকে, ২) বৃদ্ধাশ্রম এবং ৩) ভিক্ষাবৃত্তি।

আজকাল দেখা যায় অনেকেই মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে থাকেন। অথচ যত কষ্টই হোক না কেন মা কিন্তু কোন সন্তানকেই শিশু আশ্রমে পাঠায় না। কিছু কিছু মায়ের কষ্ট দেখলে খুব খারাপ লাগে। সারা জীবন মায়েরা কষ্ট করে সন্তানদেরকে বড় করে লেখাপড়া শিখিয়ে উপর তলায় উঠার ব্যবস্থা করে দেয়, অথচ সেই সন্তানেরা মাকে বয়স্কাবস্থায় বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দিয়ে নিজেরা আরাম আয়েশে ফ্লাট বাড়িতে থাকে। এমন কি মায়ের কোন রকম খোঁজ খবরও রাখে না। বৃদ্ধা মা মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত সন্তানদের মুখ দেখার জন্য প্রতিদিনই পথ পানে চেয়ে থাকে। কেউ আসে না। চেয়ে চেয়ে চোখ জলে ভরে যায়। কান্না করতে করতে আঁচলে চোখ মুছে। তবু সন্তানদের অভিশাপ দেয় না। আশায় থাকে, হয়তো সময় পেলেই আসবে। এক নজর দেখে যাবে। আহারে নিষ্ঠুর সন্তান! নিজের সুখের জন্য গর্ভধারিনী মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দিয়ে স্ত্রী সন্তান নিয়ে কত না সুখে দিন কাটায়। আর বৃদ্ধা মা স্বজন হারা হয়ে চোখের জল ছেড়ে ছেড়ে কান্না করে। কান্না করতে করতে একদিন চোখে ছানি পড়ে অন্ধ হয়ে যায়। অন্ধ হওয়ার পরও মা ছেলে আসার অপেক্ষায় বসে থাকে। যদি একদিন এসে মা-কে ডাকে। এই অবস্থায় একদিন মা পরোপারে চলে যায়। তবু ছেলেরা তাকে দেখতে আসে না। যারা নিজের সুখের জন্য গর্ভধারিনী মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠায়, কোন খোঁজ খবর রাখে না, ধিক ঐ সব কুলাঙ্গার সন্তানদের।

আসুন আমরা আদর্শ সন্তান হই, শুদ্ধ মানুষ হই, দায়িত্ববান সন্তান হই, মায়ের হাসিমাখা মুখ দেখে প্রতিটি মুহূর্ত অতিক্রম করি, মায়ের আশীর্বাদে ধন্য হয়ে। আমাদের সকলের প্রতিজ্ঞা হোক ‘আমরা কখনো মাকে কষ্ট বা আঘাত দেবনা, মা যেমন বুকে আগলে আমাদের সমস্ত ভয় অন্তরায় দূর করতো, ঠিক তেমনি করে ‘মা’কে পরম শ্রদ্ধায়, পরম মমতায়, পরম সম্মানে এবং পরম শান্তিতে শেষ নিঃশ্বাস নিতে সহায়তা করবো। এই শপথ হোক আমাদের বেঁচে থাকার উজ্জীবনী শক্তি।

2,346 total views, 2 views today

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে
  • 117
    Shares

About আলোকিত আধারে

কেউ হয়ত জানতেই চাইবেনা কোথায় বাঁধা ছিল এ হৃদয়। শুধু রচিত হবে আমার এপিটাফ - মৃত্যু হবে আমার সকল আবেগের, ভালবাসার, যন্ত্রণার।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন