মশা সমাচার এবং মশা তাড়ানোর প্রকৃতিক উপায়

মশা সমাচার এবং মশা তাড়ানোর প্রকৃতিক উপায়
5 (100%) 4 votes

মশা একটি বর্তমান সময়ে একটি আতংকের নাম। মশা যেন ঘরের সবচেয়ে পরিচিত অংশ। মশা সব চেয়ে বিরক্তিকর, আর ভয়ংকরও বটে। একে তো সুযোগ পেলেই কামড়ে অতিষ্ঠ করে, তার ওপর যদি বিশেষ প্রজাতির মশা কামড় দেয় তাহলে তো নানা রোগেও ভুগতে হয়। মশার মাধ্যমে চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, জিকা ভাইরাস প্রভৃতি মারাত্মক রোগ সংক্রমিত হয়ে থাকে। এই মশা তাড়াতে কয়েল বা অ্যারোসল ব্যবহার করেন অনেকে। এগুলো সহায়ক হলেও, এসবে রাসায়নিক উপাদান থাকে, যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। মশা নামক এই প্রাণী অতি ক্ষুদ্র হলেও মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তাই আজ আপনাদের জন্য রইলো মশা তাড়ানোর সহজ কিছু ঘরোয়া উপায়।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মশা

কিছু মানুষকে মশা বেশী কামড়ায়

সাধারণত মশার স্বভাব হলো মানুষের দিকে আকর্ষিত হওয়া। সাধারণত এই প্রাণী কাউকে বেশি কামড়ায় কাউকে কম। যাদেরকে মশা বেশি কামড়ায় তার পেছনের কারণ হলো এই প্রাণী তাদেরকে বেশি পছন্দ করে। গবেষকদের মতে মশার সমস্ত গ্রুপের রক্ত হজম করার ক্ষমতা নেই। মশা তাদেরকে বেশি কামড়ায় যাদের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কম থাকে। মশা সাধারণত O গ্রুপের লোকেদের বেশি কামড়ায়। এছাড়া মশার কামড়ানো আপনার জামা কাপড়ের রং এর উপর নির্ভর করে। হাল্কা রঙের জামা কাপড় যারা পরে মশা তাদের কম কামড়ায়। কিন্তু গাঢ় রঙে যেমন লাল, কালো, নীল রঙের জামা পড়া ব্যক্তিদের ঘিরে ধরে মশারা। গর্ভবতী মহিলাদের মশার থেকে বেশি অস্বস্তি হয়। গবেষকদের মতে গর্ভবতী মহিলারা ২১ শতাংশের বেশি কার্বন ডাই অক্সাইড ছাড়ে, এটাই মশাদের তাদের প্রতি আকর্ষণ বাড়ায়। আর যদি আপনি বিয়ার খান তাহলে এটি আপনাকে বেশি পছন্দ করবে। বিয়ার পান করার পর শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এটা অনেকটা মশাদের আমন্ত্রণ করার মতো। সেই কারণে অসুস্থ রোগীদের মশার থেকে সাবধানে থাকতে হয়। যাদের পায়ে এটি বেশি কামড়ায় তাদের চামড়ায় ব্যাকটেরিয়া বেশি থাকতে পারে। ত্বকে বাসকারী ব্যাকটেরিয়াগুলি মশাদের নিজেদের প্রতি আকর্ষণ করে।

মশা তাড়ানোর ঘড়োয়া উপায়

লেবু ও লবঙ্গের ব্যবহার – লেবু খণ্ড করে কেটে ভেতরের অংশে অনেকগুলো লবঙ্গ গেঁথে দিন। লেবুর মধ্যে লবঙ্গের পুরোটা ঢুকাবেন শুধুমাত্র লবঙ্গের মাথার দিকের অংশ বাইরে থাকবে। এরপর লেবুর টুকরাগুলো একটি প্লেটে করে ঘরের কোণায় রেখে দিন। ব্যস, এতে বেশ কয়েকদিন মশার উপদ্রব থেকে মুক্ত থাকতে পারবেন। এই পদ্ধতিতে ঘরের মশা একেবারেই দূর হয়ে যাবে। আপনি চাইলে লেবুতে লবঙ্গ গেঁথে জানালার গ্রিলেও রাখতে পারেন। এতে করে এই প্রাণী ঘরেই ঢুকবে না।

নারিকেলের আঁশ পোড়ান – নারিকেলের গায়ে থাকা আঁশের সাহায্য দূর করতে পারেন মশা। নারিকেলের আঁশ শুকিয়ে টুকরা করুন। একটি কাঠের পাত্রে রেখে জ্বলন্ত ম্যাচের কাঠি ধরুন। ৫-৬ মিনিটের মধ্যেই মশা দূর হবে।

কেরোসিন তেল স্প্রে – কেরোসিন তেল স্প্রে বোতলে নিন। কয়েক টুকরা কর্পূর মেশান। ভালো করে ঝাঁকিয়ে স্প্রে করুন রুমে।

টবে লেমন গ্রাস লাগান – থাই লেমন গ্রাসে আছে ‘সাইট্রোনেলা অয়েল’ যা থেকে বের হয় একধরনের শক্তিশালী সুগন্ধ। এই সুগন্ধ কিন্তু মশাদের যম। মশারা এর কাছেও ঘেঁষে না। ফলে আপনার আশেপাশে লেমন গ্রাসের ঝাঁড় থাকলে মশারা আপনাকে খুঁজে পাবে না। আর লেমন গ্রাস দেখতেও কিন্তু মন্দ নয়। এমন সব স্থানে এসব গাছের টব রাখুন যেখানে সকাল বিকাল কিংবা রাতে পরিবারের অন্যদের নিয়ে কিংবা বন্ধু বান্ধব নিয়ে আড্ডা বা সময় কাটান।

নিমের তেল ও পুদিনার ব্যবহার – নিমের মশা তাড়ানোর বিশেষ একটি গুণ রয়েছে। নিমের তেল ত্বকের জন্যও বেশ ভালো। তাই একসাথে দুটি উপকার পেতে ব্যবহার করতে পারেন নিমের তেল। সমপরিমাণ নিমের তেল ও নারকেল তেল মিশিয়ে ত্বকে লাগিয়ে নিন। দেখবেন এই প্রাণী আপনার ধারে কাছে ভিড়বে না এবং সেই সাথে ত্বকের অ্যালার্জি, ইনফেকশন জনিত নানা সমস্যাও দূর হবে। আর একটি ছোট গ্লাসে একটু পানি নিয়ে তাতে ৫ থেকে ৬ গাছি পুদিনা রেখে দিন খাবার টেবিলে। ৩ দিন অন্তর পানি বদলে দেবেন।

কফি – একটি পাত্রে বা ফয়েল পেপারে অল্প পরিমাণ কফি বিছিয়ে এর ওপর জ্বলন্ত কয়লার ছোট টুকরো রেখে দিতে হবে। এ ধোঁয়া চারপাশে ছড়িয়ে পড়লে মশা তো দূর হবেই সঙ্গে সঙ্গে বিদায় নেবে সব ধরণের পোকামাকড়ও।

তুলসি – মশার লার্ভা মারতে তুলসি খুবই উপকারী। জানলার পাশে তুলসি গাছ থাকলেই বাড়িতে মশার উপদ্রব কমবে।

টি ট্রি অয়েল – এই তেল মশা তাড়াতে যেমন উপযোগী, তেমনই ত্বক ও চুল ভাল রাখতেও উপকারী টি ট্রি অয়েল। তাই গায়ে মেখে নিতে পারেন টি ট্রি অয়েল বা চাইলে ঘরে স্প্রে করেও নিতে পারেন।

ল্যাভেন্ডার – রুম ফ্রেশনার হিসেবে ল্যাভেন্ডার অয়েল খুব ভাল। অনেকেই ঘরে সুগন্ধ ধরে রাখতে ল্যাভেন্ডার অয়েল স্প্রে করেন। বেশ উপকারী ল্যাভেন্ডার অয়েল।

সিটরোনিলা – এক বিশেষ ধরণের ঘাষের এক্সট্রাক্ট এই প্রাণী তাড়াতে খুব উপযোগী। বাজার চলতি অনেক মসকিউটো স্প্রে-তে এই তেল ব্যবহার করা হয়ে থাকে। সরাসরি ঘরে স্প্রে করতে পারেন সিটরোনিলা অয়েল।

বাগান – যদি ভেবে থাকেন বাড়িতে বাগান করলে মশার আখড়া হবে তাহলে ভুল ভাবছেন। বাড়ির আশে পাশে এমন গাছেন বাগান করলে ঘরে মশার উপদ্রব থেকে রেহাই পাবেন।

ক্যাটনিপ অয়েল – ক্যাটনিপ অয়েলের nepetalactone  নামক পদার্থ মশা তাড়াতে DEET (Diethyle-Meta-toluamide)  থেকে প্রায় ১০ গুন বেশি শক্তিশালী। ক্যাটনিপ অয়েল মাখালে মশারা ধারেকাছেও ঘেঁষবে না।

ধুনোর সঙ্গে নিশিন্দা ও নিমপাতার গুঁড়ো – প্রতিদিন নিশিন্দা ও নিমপাতার গুঁড়ো ধুনোর সঙ্গে ব্যবহার করলে মশার হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়।

চা-পাতা ও নিমপাতা পোড়ান – ব্যবহৃত চা-পাতা ফেলে না দিয়ে ভাল করে রোদে শুকিয়ে নিন। এইভাবে ওই চা পাতা ধুনোর বদলে ব্যবহার করুন। শুকনো চা পাতা পোড়ানো ধোঁয়ায় ঘরের সমস্ত মশা, মাছি পালিয়ে যাবে। এছাড়া নিমপাতা পোড়ালে যে ধোঁয়া হয় তা এই প্রাণী তাড়ানোর জন্য খুবই কার্যকর।

কর্পূর ও রসুনের ব্যবহার – এই প্রাণী কর্পূরের গন্ধ একেবারেই সহ্য করতে পারে না। একটি ৫০ গ্রামের কর্পূরের ট্যাবলেট একটি ছোট বাটিতে রেখে বাটিটি পানি দিয়ে পূর্ণ করুন। এরপর এটি ঘরের কোণে রেখে দিন। তাৎক্ষণিকভাবেই এটি গায়েব হয়ে যাবে। দুই দিন পর পানি পরিবর্তন করে নিন। এছাড়া রসুনের স্প্রে এটি তাড়াতে খুবই কার্যকারী প্রাকৃতিক উপায়। ৫ ভাগ পানিতে ১ ভাগ রসুনের রস মেশান। মিশ্রণটি একটি বোতলে ভরে শরীরের যেসব স্থানে মশারা কামড়াতে পারে সেসব স্থানে স্প্রে করুন। এতে করে যে কোন ধরণের রক্ত চোষারা আপনার ধারে কাছেও আসবে না।

ইউক্যালিপটাস আর লেবু তেল – ইউক্যালিপটাস আর লেবু তেলে এক ধরণের উপাদান পাওয়া যায় যার নাম সিনিওল (cineole)। সম পরিমাণে ইউক্যালিপটাস আর লেবু তেল ভাল করে মিশিয়ে নিন। এবার গায়ে মেখে নিলে যেকোনো পোকামাকড় আপনার থেকে দূরে থাকবে। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে মশা তাড়াতে এই উপকরণের জুড়ি নেই।

মশা তাড়াতে যেসব গাছ লাগাবেন বাড়িতে

 শহরাঞ্চলে সারা বছরই কমবেশি মশা থাকে। মশারি টাঙিয়ে, কয়েল জ্বালিয়ে কিংবা স্প্রে ব্যবহার করেও মশার হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায় না। এক্ষেত্রে মশা তাড়ানোর প্রকৃতিক উপায় কাজে লাগতে পারে। বাসার বারান্দা আর রুমের মধ্যে যদি কিছু গাছ লাগাতে পারেন, তাহলে এই প্রাণী আর ধারে কাছে ঘেঁষবে না। আসুন জেনে নেয়া যাক সেই উপকারী গাছগুলোর নাম-

লেমন থাইম: বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, লেমন থাইমের পাতা গুঁড়া করে ঘরে রাখলে মশার উপদ্রব ৬২ ভাগ পর্যন্ত কমানো যায়।

ল্যাভেন্ডার: শুধু মশা তাড়ানোর জন্য নয়, ল্যাভেন্ডারের রয়েছে আরও প্রচুর গুণ। উত্কণ্ঠা, ব্যথা উপশম, শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যাতেও দারুণ উপকারী ল্যাভেন্ডার।

লেমন বাম: লেবু পাতার সুগন্ধ যেমন মশা তাড়াতে সাহায্য করে, তেমনই এই গাছের পাতা দিয়ে তৈরি হার্বাল চা হজমের সমস্যা, ঘুমের সমস্যাতেও উপকারী। তাই বাসার বারান্দায় বা ঘরে লাগাতে পারেন।

তুলসি: নতুন করে তুলসির গুণের কথা বলার প্রয়োজন নেই। তুলসি মশা তাড়াতে সাহায্য করে।

লেমন গ্রাস: এক জাতীয় ঘাস। এই ঘাসের মধ্যে থাকে ন্যাচারাল অয়েল সিনট্রোনেলা, যা মশা তাড়ানোর কাজে ব্যবহার করা হয়। বাসায় লেমন গ্রাস লাগালে তাই রেহাই পেতে পারেন মশার হাত থেকে।

ক্যাটনিপ: এই পুদিনা জাতীয় গাছকে বলা হয় মশার যম। যে কোনও মসকিউটো রিপেলেন্টের থেকে ১০ গুণ বেশি শক্তিশালী ক্যাটনিপ।

রোজমেরি: বাসায় যদি রোজমেরি গাছ লাগান তাহলে মশার হাত থেকে রেহাই তো পাবেনই, সঙ্গে জুটবে আরও অনেক উপরি পাওনা। সুগন্ধী রোজমেরি শুঁকলে স্মৃতিশক্তি ও মনোসংযোগ বাড়ে। ঔষধী গুণও রয়েছে রোজমেরির। ব্যবহার করতে পারেন রান্নাতেও।

রসুন: রান্নায় স্বাদ বাড়ায়, ইনফেকশন সারাতে সাহায্য করে, রসুনের এই গুণগুলো তো জানতেন। কিন্তু জানতেন কি বাড়িতে রসুন গাছ লাগালে মশার উপদ্রবে থেকেও রেহাই পাওয়া যায়?

গাঁদা: এই ফুল লাগালে শুধু যে দেখতে সুন্দর লাগে তাই নয়, পোকামাকড়ও থাকে শতহাত দূরে। গাঁদা গাছে থাকা পাইরেথ্রামের গন্ধ পোক-মাকড়, মশা সহ্য করতে পারে না। বাগানের চারপাশ জুড়ে লাগাতে পারেন গাঁদা গাছ। শোভাও বাড়বে, মশাও হবে না বাড়িতে।

134 total views, 2 views today

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে
  • 22
    Shares

About ইমন

আমি মহা মানব নই, আমি একজন সাধারণ মানুষ। তাই আমার এপিটাফ হবে আমার মতই সাধারণ, কালের গর্ভে এটিও হারিয়ে যাবে, যেমনটা হারায় একজন সাধারণ মানুষ।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন