মন নিয়ে কিছু অমিমাংসিত প্রশ্নের উত্তর

মন নিয়ে কিছু অমিমাংসিত প্রশ্নের উত্তর
4.8 (95.38%) 13 votes

মন নিয়ে কতই না ভাবনা,জল্পনা কল্পনা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, পুরুষের মতো নারীরও মনের বেশির ভাগ কাজকর্মই নিয়ন্ত্রিত হয় মস্তিষ্কের সাহায্যে। মন (Mind) হলো দর্শনশাস্ত্রের একটি অন্যতম কেন্দ্রীয় ধারণা। মন বলতে সাধারণ ভাবে বোঝায় যে, বুদ্ধি এবং বিবেকবোধের এক সমষ্টিগত রূপ যা চিন্তা, অনুভূতি, আবেগ, ইচ্ছা এবং কল্পনার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। বাংলা ভাষায় মনের সমার্থক শব্দ হলো – অন্তঃকরণ, অন্তরিন্দ্রিয়, চিত্ত, হৃদয়, ধারণা, বোধ, বিবেচনা, ইচ্ছা, প্রবৃত্তি, নিবিষ্টতা, আন্তরিকতা, নিষ্ঠা।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন

তবে মন নিয়ে অনেক অমিমাংসিত প্রশ্ন লুকিয়ে আছে। আসলেই মন কি জাগতিক মস্তিস্কের কার্যক্রম না কি আলাদা কোন অস্তিত্ব যা মস্তিস্কের সমন্বয়ে কাজ করে? আবার অনেক সময় বলা হয়ে থাকে ‘মন-শরীর বৈকল্য’, যা থেকে পরিস্কার প্রতীয়মান হয় যে, মন ও শরীর দু’টি আলাদা অস্তিত্ব; যারা একে অপরের উপর নির্ভরশীল। শরীরের সাথে মনের সম্পর্ক যাই হোকনা কেন, এ কথা সকলেই স্বীকার করে যে, প্রাণীর মন হল সেই স্বত্ত্বা যার রয়েছে অনুভূতি প্রবণতা,চিন্তাশক্তি ও আবেগ। আবেগ, ভালবাসা, ভয়,সাহস আনন্দ ইত্যাদি সবই প্রাণীর মনের মৌলিক বৈশিষ্ট। অনেকে মনে করেন মন হল প্রাণীর চিন্তাশক্তি যা উদ্ভূত হয় আমাদের মস্তিস্ক থেকে। কেউ মনকে দেখেনা,মন সম্পর্কে সম্যক কোন জ্ঞান কারোরই নেই, শুধু মনে করে প্রাণীর অন্তর বা মন বলে কিছু আছে যা শুধুমাত্র অনুভব বা উপলব্ধি দিয়ে ধারণা করা হয়। মনের এই বৈশিষ্ট গুলি বুঝতে হয় শুধুমাত্র অনুভবের দ্বারা। তবে মন যে মানুষকে তাড়িয়ে বেড়ায় তা খুবই পরিস্কার। আমরা লক্ষ্য করলেই বুঝতে পারবো যে, বিভিন্ন মানুষের মনের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। মনের বৈশিষ্ট গুলোকে কোন সাধারণ ছকে ফেলা যায়না; তবে বিভিন্ন প্রজাতির মনের বিভিন্ন রকম মানসিক বৈশিষ্ট,যেমন মানুষের মনের কিছু বিশেষ  বৈশিষ্ট দেখা যায়,তন্মধ্যে রয়েছে আবেগ, ভালবাসা, বুদ্ধি, ভাব প্রবণতা, চিন্তাশক্তি, ভয়, ইতাদি। আপনি আরো জানতে পড়তে পারেন এই লেখাটি – What Is the Mind?

স্নায়ুবিজ্ঞান বলছে, মনের ভৌত কাঠামো হল স্নায়ু তন্ত্র, স্নায়ুবিজ্ঞানীরা খুঁজে দেখছেন কিভাবে  জৈব স্নায়ু তন্ত্র  মন তৈরী করে এবং ভৌতভাবে পরস্পর ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া করে মানসিক কার্যোক্রম যেমন – আবেগ তৈরী, শিক্ষা গ্রহন,স্মৃতিশক্তি তৈরী ইত্যাদি পরিচালনা করে। যদিও মানুষের মস্তিস্ক কি ভাবে চিন্তাভাবনা করে তা বিজ্ঞানের কাছেও বিষ্ময়। যদিও জড়বাদী দার্শনিকগণ মনে করেন যে, মানুষের মনের প্রবৃত্তির কোন কিছুই শরীর থেকে ভিন্ন নয়। বরং মানুষের মস্তিষ্ক থেকে উদ্ভূত শারীরবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মন গড়ে উঠে। সত্যিই মন বড়ই অদ্ভুদ। তাইতো গান আছে –

মন আমার দেহ ঘড়ি সন্ধান করি
কোন মিস্তরি বানাইয়াছে
ও একখান চাবি মাইরা দিছে ছাইড়া
জনম ধইরা চলতে আছে।।

মন – এর অবস্থান কোথায়?

মন নামক দৃশ্য বা অদৃশ্য অঙ্গ আছে! তবে তার অবস্থান কোথায়? বিজ্ঞান পরিস্কার ভাবে মনের অবস্থান ব্যাখ্যা করেনি; বলছে মানুষের সেরিব্রামের সহায়তায় ফ্রন্টাল লোব এই মনশীলতার জন্ম দেয়। মস্তিষ্ক হলো মাথার খুলির গহ্বরের ভেতরের নরম টিস্যু। তার আছে আবার কয়েকটি ভাগ। স্পাইনাল কর্ড ও ব্রেইন স্টেম। এরই দু’পাশে থাকে দু’টি ফুলের মতো জিনিস, নাম সেরিব্রাম। এরা আমাদের কথা বলা, হাত-পা নাড়া ইত্যাদি বেশ কয়েকটি কাজের ভারসাম্য ঠিক রাখে। মস্তিষ্কের একেবারে ওপর দিকে থাকে সেরিব্রাল হেমিসফিয়ার। তার দু’টি ভাগ আছে। রাইট বা ডান দিকের সেরিব্রাল হেমিসফিয়ার, অন্যটি লেফট বা বাম সেরিব্রাল হেমিসফিয়ার। রাইট সেরিব্রাল হেমিসফিয়ারের সামনের দিকে থাকে ফন্সন্টাল লোব বলে একটি অংশ। মাঝখানের অংশের নাম প্যারাটাল লোব। পেছনের অংশের নাম সিপিটাল লোব। আর তার পাশে থাকে টেমপোরাল লোব। এরই নিচে থাকে লিমবিক সিস্টেম, তারপর থাকে পিটুইটারি হাইপোথ্যালামাস। ফন্সন্টাল লোব আমাদের কথা বলা, লেখা, চোখে দেখা ইত্যাদিকে নিয়ন্ত্রণ করার সাথে সাথে সামাজিক আচরণ ও মনোভাবকেও নিয়ন্ত্রণ করে। এ জন্য অনেক সময় দেখা যায়, এই ফন্সন্টাল লোবে মারাত্মক চোট পাওয়ার কারণে কারো সামাজিক আচরণ বা ব্যবহারে রুক্ষতা বা অসঙ্গতি এসে যায়। মাঝের প্যারাটাইল লোবে আছে সেন্সর এরিয়া। নানা ধরনের অনুভূতির নিয়ন্ত্রণ হয় এই অংশ থেকে। আর পেছনের অকসিপিটাল লোব থেকে চোখে দেখার অনুভূতি নিয়ন্ত্রিত হয়। চোখ দিয়ে যা দেখি, সেটার অর্থবহতাই মস্তিষ্কের এই অংশের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। এই তিনটি লোবের পাশে যে টেমপোরাল লোব থাকে, সেটাই আমাদের সব ধরনের ব্যবহার, মনোবৃত্তি, ইন্দ্রিয় অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। মস্তিস্ক বিনা উদ্যোগে কোন কাজে ব্রতী হয়না। যদি বলা হয় মানুষ তার দৃষ্টি ইন্দ্রীয় দিয়ে কোন কিছু দেখে উক্ত দুই অঞ্চলের সহযোগিতায় ভাবনা চিন্তা করে। তবে মানুষের মন যখন দৃষ্টি ও শ্রবণ ছাড়াও জটিল চিন্তায় নিমগ্ন হয় তখন মস্তিস্ক কি ভাবে তা সমন্বয় করে? যদি বলা হয় মানুষের মনের অবস্থান মস্তিষ্কে এবং সেটিই মস্তিষ্কে এই অনুভূতি জাগায়, কিন্ত  বিজ্ঞান সেই অবস্থানটির খোঁজ এখনও পায়নি।

মন

বিজ্ঞান এর কোন খোঁজ দিতে না পারলেও মানুষ কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের জন্মের আগে থেকেই তার খোঁজ পেয়েছে, আবেগে আপ্লুত হয়ে তার নাম দিয়েছে মন বা অন্তর। তবে মনের সঠিক অবস্থানটি কেউ সঠিকভাবে বলতে পারছেনা, কেউ বলছেন এর অবস্থান হৃৎপিণ্ডে, কেউ বলছেন মস্তিষ্কে। মনের এই অবস্থান নিয়ে পবিত্র কোরআনে প্রচুর আয়াত নাজিল হয়েছে; যা থেকে ধরে নেওয়া যায় মানুষের ভাবনা চিন্তার উপর মনের নিবির সম্পর্ক রয়েছে। মনকে বাদ দিয়ে মস্তিস্কের ভাবনা চিন্তার কথা যেমন কল্পনা করা যায়না তেমনি মস্তিষ্ককে বাদ দিয়ে মন কোন ভাবনা চিন্তা করতে পারেনা এবং বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ভাবনা চিন্তার উদ্রেক তৈরী করে আর মস্তিষ্ক তার সম্প্রসারণ ঘটায়; মূলত ভাবনা চিন্তার কাজ ও তার ফলশ্রুতিতে পরিকল্পনা গ্রহন ইত্যাদি সবই মস্তিষ্কের কাজ। এই আলোচনায় একটা বিষয় পরিস্কার যে, ভাবনা চিন্তার কাজটি মস্তিষ্কই সম্পন্ন করে, মন তার যোগান দাতা; আর এমনিতর সুনির্দিষ্ট আয়াতও পবিত্র কোরআনে অবতীর্ণ হয়েছে। “এতে উপদেশ রয়েছে তার জন্যে, যার অনুধাবন করার মত অন্তর রয়েছে। অথবা সে নিবিষ্ট মনে শ্রবণ করে। সুরা- ক্বাফ- ৫০:৩৭”

কি বিষ্ময়কর বর্ণনা! ‘যার অনুধাবন করার মত অন্তর রয়েছে। অথবা সে নিবিষ্ট মনে শ্রবণ করে’। যার অনুধাবন করার মত অন্তর রয়েছে-কার অনুধাবন করার মত অন্তর রয়েছে? সেই অনুধাবনকারী যার হৃৎপিণ্ড আবেগ অনুভূতিতে উদ্দীপ্ত হয়; সে রকম ব্যাক্তির জন্যে রয়েছে উপদেশ। আবার যে নিবিষ্ট মনে শ্রবণ করে মহান আল্লাহর বাণী, অবশ্যই তার মস্তিষ্ক হৃৎপিণ্ডকে উদ্দীপ্ত করে। বিজ্ঞান বলছে এমনটা করে তখনই যখন মানুষ আবেগে উদ্বেলিত হয়, মন যখন গভীর অনুভূতি প্রবণ হয়ে উঠে অর্থাৎ মস্তিষ্ক যখন নিবিষ্টতার সাথে কিছু ধরে রাখতে চায়,তখন সে হরমোন নিষ্কাশণের মাধ্যামে হৃৎপিণ্ডকে উদ্দীপ্ত করে। এখানে যে বিষয়টা বোঝা যায় তা হল, মানুষ কান দিয়ে শোনে মস্তিষ্ক দিয়ে ভাবে আর হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করে।

210 total views, 2 views today

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে

About ইমন

আমি মহা মানব নই, আমি একজন সাধারণ মানুষ। তাই আমার এপিটাফ হবে আমার মতই সাধারণ, কালের গর্ভে এটিও হারিয়ে যাবে, যেমনটা হারায় একজন সাধারণ মানুষ।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন