ভালোবাসা সমাচার। ভালোবাসা কারে কয়

ভালোবাসা সমাচার। ভালোবাসা কারে কয়
4.6 (92.38%) 21 votes

ভালোবাসা হলো দুটি দেহ একটি প্রাণ, ভালবাসা হলো আত্মার সাথে আত্মার সম্পর্ক। হৃদয় কে কেন্দ্র করে আবেগের সমান ব্যাসার্ধ নিয়ে মনের ভিতরে যে বৃত্ত আঁকা হয় তাই ভালোবাসা। ভালবাসা হলো বিশ্বাসের প্রতিক। ভালোবাসার রয়েছে কিছু বৈশিষ্ট্য এবং সত্য। যে সত্যগুলো সকল সত্যিকারের ভালোবাসার মধ্যেই থাকে। তাইতো একটা গান আছে – সখী, ভাবনা কাহারে বলে। সখী, যাতনা কাহারে বলে । তোমরা যে বলো দিবস-রজনী ‘ভালোবাসা’ ‘ভালোবাসা’—. সখী, ভালোবাসা কারে কয়! সে কি কেবলই যাতনাময় ।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

ভালোবাসা

কিন্তু ডাক্তারদের মতে, ভালোবাসার পুরো ব্যাপারটি জৈবিক। কারণ ভালোবাসার অনুভূতির সাথে ডাক্তাররা নেশায় আসক্ত মানুষের অনুভূতির মিল খুঁজে পেয়েছেন। Love Affects Your Brain Like a Drug. একটি নেশাগ্রস্থ মানুষের মস্তিষ্কের যে অংশ ভালো লাগার কাজ গুলো করে থাকে, ভালোবাসলে মানুষের ঐ অংশটুকুই বেশি কাজ করে। তা থেকে বলা যায়, ভালোবাসার অনুভূতি আসলে একটি জৈবিক ব্যাপার। জৈবিক কারণেই আমাদের মধ্যে এই ভালোলাগা এবং ভালোবাসার অনুভূতি উৎপত্তি হয়। তাইতো জীবনানন্দ দাশের  বনলতা সেন কবিতাটি মনে পড়ে গেলো –

হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল সমুদ্র থেকে আরো দূর অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকার বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।

চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের’পর
হাল ভেঙ্গে যে নাবিক হারায়েছে দিশা
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,
তেমনই দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, ‘এতোদিন কোথায় ছিলেন?’
পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে চাওয়া নাটোরের বনলতা সেন।

সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন
সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;
পৃথিবীর সব রঙ মুছে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন,
তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল।
সব পাখি ঘরে আসে — সব নদী; ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন;
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।

ভালোবাসা কি তা মানুষের কাছে এক বিশাল আলোচিত বিষয়। প্রেম ও ভালোবাসার অধ্যায় গুলো নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন পৃথিবীর বিজ্ঞানী ও মনোবিদরা। কিন্তু এ বিষয় সম্পর্কে শেষ কথাটি বলতে পারেনি আজও কেউ। তবে তাদের গবেষণা মতে, প্রেমে পড়লে মস্তিষ্ক থেকে বিপুল পরিমাণ ‘ফিনাইল ইথাইল অ্যামিন’ ও ‘অ্যামফিটামিন’ জাতীয় রাসায়নিক নিঃসৃত হতে থাকে। যা স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে সমস্ত কোষে। যার ফলে ‘ইউফোরিয়া’ উৎপন্ন হয়। তাইতো ভালোবাসার মানুষটি কাছে থাকলে মাদকীয় অনুভূতি অনুভূত হয় তার শরীরে। এই রাসায়নিক প্রক্রিয়াটা প্রথমে অনেক বেড়ে যায়। তার পর আস্তে আস্তে কমতে থাকে। এই রাসায়নিক প্রক্রিয়া কমে যাওয়া মানে প্রেমানুভূতির তীব্রতা কমে যাওয়া। যত দিন যাবে ধীরে ধীরে দুটিই কমতে থাকে। তাই ৯৮% প্রেমে প্রথমে ভালোবাসার উপস্থিতি অনেক বেশী থাকে তারপর যত দিন যায় তত ভালোবাসাটি কমে যায়। অধিকাংশের ক্ষেত্রে একবারেই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু বিজ্ঞানীরা গবেষণায় প্রাণ-রসায়নের নানা বিক্রিয়াকেই ভালবাসা হিসেবে প্রমাণ করেছেন, তবু ভালোবাসার স্থান মানুষের জৈবিক স্তরের উপরে। কোন কামনা ছাড়া নিখাদ প্ল্যাটোনিক ভালোবাসা অতি বিরল ও টেকসই নয়। মানুষের জীবনের প্রয়োজনেই কামনা-বাসনা, চাওয়া-পাওয়া ভালোবাসার প্রয়োজনীয় জৈবিক উপাদান। ভালোবাসাই হলো নিঃস্বার্থ ভাবে প্রিয় মানুষটির জন্য মঙ্গল কামনা। কারো প্রতি অতিরিক্ত যত্নশীলতা কিংবা প্রতিক্ষেত্রে কারো উপস্থিতি অনুভব করা । বিশেষ কোন মানুষের জন্য স্নেহের শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ। আবার ভালোবাসাকে অনেকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে দেখে থাকে। ভালোবাসা সাধারণত শুধুমাত্র বন্ধুত্ব নয়। যদিও কিছু সম্পর্ককে অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব বলেও অবিহিত করা যায়। প্রচলিত ধারণায় ভালোবাসা, নিঃস্বার্থতা, স্বার্থপরতা, বন্ধুত্ব, মিলন, পরিবার এবং পারিবারিক বন্ধনের সাথে গভীরভাবে যুক্ত।

ভালোবাসা

অনেকে কাউকে দেখে পছন্দ হলে বলে ফেলেন, ‘আমি তাকে ভালোবেসে ফেলেছি।’ আসলে এটা ঠিক নয়। এটা ভালোবাসা নয়। এটা হচ্ছে ভালো লাগা। আবেগ, যেটি আমাদেরকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়, স্বপ্ন দেখতে শেখায়, ত্যাগ-তিতীক্ষা-ধৈর্য্য শেখায়। ভালোবাসা শুধুমাত্র প্রণয় থেকে হয় না। ভালোবাসা স্নেহ, মায়া, মমতা থেকেও আসে। নতুন একটি শিশুর জন্ম হলে মা তাকে লালন পালন করে। শিশুটি সময়ে অসময়ে জ্বালাতন করে – কাঁদে, ঠিকমত ঘুমায় না, খায় না ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এতকিছুর পরও যে কারণে মা তার সন্তানটিকে ফেলে রেখে যেতে পারে না তা হল – ভালোবাসা। অনেক সময় ভালোবাসা আসে শ্রদ্ধা, সম্মান থেকে। যেমন: আমরা আমাদের বাবা-মা, দাদা-দাদীকে শ্রদ্ধাভরে ভালবাসি। প্রণয় অর্থেই হোক, আর মায়া-মমতা-সম্মান অর্থেই হোক, ভালবাসা মানে হল কারো ভাল চাওয়া। প্রণয়ের দিক থেকে ভালোবাসাকে চিন্তা করলে দেখা যায় – যখন একটা ছেলে একটা মেয়েকে ভালোবাসে তখন তারা একে অপরের ব্যাপারে care করে, ভাবে। একজন আরেকজনের ব্যাপারে ছোটখাট বিষয় নিয়েও মাথা ঘামায়। একজন আরেকজনের ক্ষতি দেখতে পারে না বরং সবসময় তার ভাল চিন্তা করে। একজন আরেকজনকে মনে প্রাণে বিশ্বাস করে। একে অপরকে সবসময় দেখতে ইচ্ছে করে, একসাথে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত মনের ভিতর আগলে রাখতে ইচ্ছে করে। একজন আরেকজনকে দেখলে বুকের ভেতরে একটা শান্তির অনুভূতি সৃষ্টি হয়। একজন আরেকজনের দিকে তাকালে মনে হয় যেন, ‘দুচোখ ভরে দেখি।’ ভালোবাসা মানে জাস্ট আপন করে পাওয়া – একে অপরের প্রতি অধিকার সৃষ্টি ভালোবাসার অন্যতম আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে Sacrifice (ত্যাগ স্বীকার করা)। ভালোবাসার মানুষটির জন্য অনেক সুবিধা ছেড়ে দেয়া বরং অনেকটা আনন্দের বিষয় হয়ে থাকে। যেমন: বাবা-মায়েরা নিজেদের জন্য খরচ না করে সন্তানদের জন্য খরচ করে। তাইতো ভালোবাসা বিভিন্ন রকম হতে পারে, যেমন: প্রেমিক প্রেমিকার ভালোবাসা, নিস্কাম,ধর্মীয় ,গরিব, অনাথ, প্রতিবন্ধিদের ভালোবাসা, আত্মীয়দের প্রতি ভালোবাসা ইত্যাদি। তাইতো  মওলানা জালালুদ্দিন রুমি (রহঃ) তার কবিতায় লিখেছেন,“আমার কোন ধর্মীয় অনুভব নেই, ভালবাসা আমার ধর্ম, হৃদয় আমার উপাসনালয়।”  তবে আবেগধর্মী যে ভালোবাসা সেটাই হলো সবচেয়ে গভীরতম ভালোবাসা।  ভালোবাসার এই আবেগটাকে সেই সত্যিকার ভাবে অনুধাবন করতে পারে যখন কেউ প্রকৃত প্রেমে পড়ে। ভালোবাসায় যৌনকামনা কিংবা শারীরিক লিন্সা একটা গৌণ বিষয়। এখানে মানবিক আবেগটাই বেশী গুরুত্ব বহন করে। কবি রফিক আজাদের একটা কবিতা আছে, “ভালোবাসার সংজ্ঞা”।

ভালোবাসা মানে ঠাণ্ডা কফির পেয়ালা সামনে অবিরল কথা বলা;
ভালোবাসা মানে শেষ হয়ে-যাওয়া কথার পরেও মুখোমুখি বসে থাকা।

ভালোবাসা সুন্দর জীবনের কারণেই খুব প্রয়োজন। অমর ইংরেজ কবি কীটস বলে গেছেন, ‘ভালোবাসা যে পেল না, আর ভালোবাসা যে কাউকে দিতে পারল না, সংসারে তার মতো দুর্ভাগা নেই’।

708 total views, 2 views today

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে

About ইমন

আমি মহা মানব নই, আমি একজন সাধারণ মানুষ। তাই আমার এপিটাফ হবে আমার মতই সাধারণ, কালের গর্ভে এটিও হারিয়ে যাবে, যেমনটা হারায় একজন সাধারণ মানুষ।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন