ভালবাসার কবিতা – ২০ টি বিখ্যাত ভালবাসার কবিতা

ভালবাসার কবিতা – ২০ টি বিখ্যাত ভালবাসার কবিতা
5 (100%) 2 votes

ভালবাসার কবিতা পড়তে কার না ভালো লাগে! ভালবাসার কবিতা আমাদের মনে একটা আলাদা অনুভূতি তৈরি করে। ভালবাসা এক অদ্ভুদ জিনিস। ভালবাসা মানে কাউকে জয় করা নয় বরং নিজেই কারো জন্য হেরে যাওয়া। এটা জ্ঞানের গভীরতা দিয়ে হয়না, হয় হৃদয়ের পবিত্রতা দিয়ে ! পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত এবং আলোচিত শব্দ হলো ভালবাসা। এই ভালোবাসা কখনও কাঁদায়, কখন হাসায়, কেউ এর জন্য আত্মবিসর্জন দেয়। মানুষ কত ত্যাগ স্বীকার করে ভালোবাসার মানুষকে পাবার জন্য। আবার এই ভালবাসার জন্য মূল্যবান অনেক কিছুই হারায় যার জন্য বিন্দুমাত্র আফসোস ও কখনো হয় না। আর সেই কারণেই পৃথিবীর অসংখ্য কবি সাহিত্যিকগণ রচনা করেছেন ভালবাসার কবিতা। আজকে আপনাদের জন্য রইলো বিখ্যাত কবি সাহিত্যিকদের লেখা কয়েকটি ভালবাসার কবিতা ।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

ভালবাসার কবিতা

ভালবাসার কবিতা – (১)

ভালবাসার ছড়া
 অন্তলীন আমি

মিষ্টি কথার আড়ষ্ট ভাষায়
ভুলমনা আমি,
ভালবাসার রাজনীতিতে
আমি বিপথগামী ।

তুমি মেয়ে ভালবাস
নাকি করো ছলনা (?)
মেয়ে তুমি মিষ্টি করে
” আই লাভ ইউ ” বলনা… l

নিঝুম রাতে তারার আলোয়
দেখতে তুমি দারুন বেশ,
সেই রাতেরি অন্ধকারে
দারুন তোমার এলোকেশ l

আমি অনেক কথা বলি
তবুও তুমি স্বল্পভাষী ,
তাতেই আমি খুন হয়ে যাই
মুখে তোমার বাকানো হাসি ।

মেয়ে তোমায় ভালবাসি
যদি বুঝো অল্প ,
তাহলে কেন চুপ রয়েছো
করোনা একটু গল্প ।

গল্পচ্ছলে যদি বলো
একটু কাছে আসি,
তাহলে দেখবে তোমায়
আমি কত্ত ভালবাসি ।

যখন তুই রাগ করিস
আমি তখন কষ্ট পাই ,
বসে থাকি মন খারাপ
ধ্যাত ছাই তুমি পাশে নাই ।

ভালবাসার কবিতা – (২)

এ প্রেম নয়
তসলিমা নাসরিন

সারাক্ষণ তোমাকে মনে পড়ে
তোমাকে সারাক্ষণ মনে পড়ে
মনে পড়ে সারাক্ষণ।
তুমি বলবে আমি ভালোবাসি তোমাকে, তাই।
কিন্তু এর নাম কি ভালোবাসা?
নিতান্তই ভালোবাসা? যে ভালোবাসা হাটে মাঠে না চাইতেই মেলে!
ভালো তো আমি বাসিই কত কাউকে, এরকম তো মরে যাই মরে যাই লাগে না!
এ নিশ্চয় ভালোবাসার চেয়ে বেশি কিছু, বড় কিছু।
তোমার কথাগুলো, হাসিগুলো আমাকে এত উষ্ণ করে তোলে যেন
হিমাগারে শুয়ে থাকা আমি চোখ খুলছি, শ্বাস নিচ্ছি।
বলবে, আমি প্রেমে পড়েছি তোমার।
কিন্তু প্রেমে তো জীবনে আমি কতই পড়েছি,
কই কখনও তো মনে হয়নি কারও শুধু কথা শুনেই, হাসি শুনেই
বাকি জীবন সুখে কাটিয়ে দেব, আর কিছুর দরকার নেই!
এ নিশ্চয়ই প্রেম নয়, এ প্রেম নয়, এ প্রেমের চেয়ে বড় কিছু, বেশি কিছু।

ভালবাসার কবিতা – (৩)

আরও প্রেম দিও
তসলিমা নাসরিন

আরও প্রেম দিও আমাকে, এত অল্প প্রেমে আমার হয় না, আমি পারি না।
আরও প্রেম দিও, বেশি বেশি প্রেম দিও
যেন আমি রেখে কুলিয়ে উঠতে না পারি,
যেন চোখ ভরে,
হৃদয়ের সবকটি ঘর যেন ভরে যায়
যেন শরীর ভরে, এই তৃষ্ণার্ত শরীর।
প্রেম দিতে দিতে আমাকে অন্ধ করে দাও,
বধির করে দাও, আমি যেন শুধু তোমাকেই দেখি,
কোনও ঘৃণা, কোনও রক্তপাত যেন আমাকে দেখতে না হয়,
আমি যেন আকাশপার থেকে ভেসে আসা তোমার শুভ্র শব্দগুলো শুনি,
কোনও বোমারু বিমানের কর্কশতা, কারও আর্তনাদ, চিৎকার আমার কানে যেন না
পৌঁছোয়।
দীর্ঘকাল অসুখ আর মৃত্যুর কথা শুনতে শুনতে আমি ক্লান্ত
দীর্ঘকাল প্রেমহীনতার সঙ্গে পথ চলে আমি ক্লান্ত,
আমাকে শুশ্রুষা দাও, স্নান করিয়ে দাও তোমার শুদ্ধতম জলে।

যদি ভালো না বাসো, তবে বোলো না কিন্তু যে ভালোবাসো না,
মিথ্যে করে হলেও বোলো যে ভালোবাসো,
মিথ্যে করে হলেও প্রেম দিও,
আমি তো সত্যি সত্যি জানবো যে প্রেম দিচ্ছ,
আমি তো কাঁটাকে গোলাপ ভেবে হাতে নেব,
আমি তো টেরই পাবো না আমার আঙুল কেটে গেলে কাঁটায়,
রক্ত শুষে নেবে আঙুল থেকে, এদিকে ভাববো বুঝি চুমৃ খাচ্ছে!।

প্রেম দিও, যত প্রেম সারাজীবনে সঞ্চয় করেছো তার সবটুকু,
কোথাও কিছু লুকিয়ে রেখো না।
আমার তো অল্পতে হয় না, আমার তো যেন তেন প্রেমে মন বসে না,
উতল সমুদ্রের মত চাই, কোনওদিন না ফুরোনো প্রেম চাই,
কলঙ্কী কিশোরীর মত চাই,
কাণ্ডজ্ঞানহীনের মত চাই।

পাগল বলবে তো আমাকে? বলো।

ভালবাসার কবিতা – (৪)

ভালোবাসা
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

ভালোবাসা নয় স্তনের ওপরে দাঁত?
ভালোবাসা শুধু শ্রাবণের হা-হুতাশ?
ভালোবাসা বুঝি হৃদয় সমীপে আঁচ?
ভালোবাসা মানে রক্ত চেটেছে বাঘ!

ভালোবাসা ছিল ঝর্ণার পাশে একা
সেতু নেই আকাশে পারাপার
ভালাবাসা ছিল সোনালি ফসলে হওয়া
ভালোবাসা ছিল ট্রেন লাইনের রোদ।

শরীর ফুরোয় ঘামে ভেসে যায় বুক
অপর বহুতে মাথা রেখে আসে ঘুম
ঘুমের ভিতরে বারবার বলি আমি
ভালোবাসাকেই ভালবাসা দিয়ে যাবো।

ভালবাসার কবিতা – (৫)

ভালোবাসার পাশেই
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

ভালোবাসার পাশেই একটা অসুখ শুয়ে আছে
ওকে আমি কেমন করে যেতে বলি
ও কি কোনো ভদ্রতা মানবে না?
মাঝে মাঝেই চোখ কেড়ে নেয়,
শিউরে ওঠে গা
ভালোবাসার পাশেই একটা অসুখ শুয়ে আছে।

দু’হাত দিয়ে আড়াল করা আলোর শিখাটুকু
যখন তখন কাঁপার মতন তুমি আমার গোপন
তার ভেতরেও ঈর্ষা আছে, রেফের মতন
তীক্ষ্ম ফলা
ছেলেবেলার মতন জেদী
এদিক ওদিক তাকাই তবু মন তো মানে না
ভালোবাসার পাশেই একটা অসুখ শুয়ে আছে।

তোময় আমি আদর করি, পায়ের কাছে লুটোই
সিংহাসনে বসিয়ে দিয়ে আগুন নিয়ে খেলি
তবু নিজের বুক পুড়ে যায়, বুক পুড়ে যায়
বুক পুড়ে যায়
কেউ তা বোঝে না

ভালোবাসার পাশেই একটা অসুখ শুয়ে আছে।

ভালবাসার কবিতা – (৬)

বিরহ, এবং
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

।।১।।

জলের খানিক নীচে রয়েছে শৈবাল,
সামান্য ঝুঁকলেই দেখা যায়;
কিন্তু সে দেখে না, তার দৃষ্টিকে সে লাল
গোলাপের সন্ধানে পাঠায়।
আমি দেখি, উদয়াস্ত আমি দেখি তাকে,
বিরহ-ভাবনার মতো নিরন্তর দুলে যেতে থাকে
জলজ শৈবাল।

।।২।।

মর্মমূলে বিঁধে আছে পঞ্চমুখী তীর,
তার নাম ভালবাসা।
কেটেছে গোক্ষুরে যেন, নীল হয়ে গিয়েছে শরীর,
তার নাম ভালবাসা।
ঠাকুমা বলতেন, ওই সূর্যতাকে ছিঁড়ে
এনে যে লণ্ঠন জ্বালে দুঃখীর কুটিরে
তার নাম ভালবাসা।

ভালবাসার কবিতা – (৭)

চিঠি দিও
মহাদেব সাহা

করুণা করে হলে চিঠি দিও, খামে ভরে তুলে দিও
আঙুলের মিহিন সেলাই
ভুল বানানেও লিখো প্রিয়, বেশি হলে কেটে ফেলো তাও,
এটুকু সামান্য দাবি চিঠি দিও, তোমার শাড়ির মতো
অক্ষরের পাড়-বোনা একখানি চিঠি।
চুলের মতন কোনো চিহ্ন দিও বিস্ময় বোঝাতে যদি চাও
সমুদ্র বোঝাতে চাও, মেঘ চাও, ফুল, পাখি, সবুজ পাহাড়
বর্ণনা আলস্য লাগে তোমার চোখর মতো চিহ্ন কিছু দিও!
আজো তো অমল আমি চিঠি চাই, পথ চেয়ে আছি
আসবেন অচেনা রাজার লোক
তার হাতে চিঠি দিও, বাড়ি পৌঁছে দেবে।
এক কোণে শীতের শিশির দিও একফোঁটা, সেন্টের শিশির চেয়ে
তৃণমূল থেকে তোলা ঘ্রাণ
এমন ব্যস্ততা যদি শুদ্ধ করে একটি শব্দই শুধু লিখো, তোমার কুশল!
ওই তো রাজার লোক যায় ক্যাম্বিসের জুতো পায়ে,কাঁধে ব্যাগ,
হাতে কাগজের একগুচ্ছ জীজন ফ্লাওয়ার
কারো কৃষ্ণচূড়া, কারো উদাসীন উইলোর ঝোপ, কারো নিবিড় বকুল
এর কিছুই আমার নয় আমি অকারণ
হাওয়ায় চিৎকার তুলে বলি, আমার কি কোনো কিছু নাই?
করুণা করেও হলে চিঠি দিও, ভুলে গিয়ে ভুল করে একখানি চিঠি
দিও খামে
কিছুই লেখার নেই তবু লিখো একটি পাখির শিস
একটি ফুলের ছোটো নাম,
টুকিটাকি হয়তো হারিয়ে গেছে কিছু হয়তো পাওনি খুঁজে
সেইসব চুপচাপ কোনো দুপুরবেলার গল্প
খুব মেঘ করে এলে কখনো কখনো বড়ো একা লাগে, তাই লিখো
করুণা করেও হলে চিঠি দিও, মিথ্যা করে হলে বলো, ভালোবাসি।

ভালবাসার কবিতা – (৮)

ভালোবাসা
মহাদেব সাহা

ভালোবাসা তুমি এমনি সুদূর
স্বপ্নের চে’ও দূরে,
সুনীল সাগরে তোমাকে পাবে না
আকাশে ক্লান্ত উড়ে!
ভালোবাসা তুমি এমনি উধাও
এমনি কি অগোচর
তোমার ঠিকানা মানচিত্রের
উড়ন্ত ডাকঘর
সেও কি জানে না? এমনি নিখোঁজ
এমনি নিরুদ্দেশ
পাবে না তোমাকে মেধা ও মনন
কিংবা অভিনিবেশ?
তুমি কি তাহলে অদৃশ্য এতো
এতোই লোকোত্তর,
সব প্রশ্নের সম্মুখে তুমি
স্থবির এবং জড়?
ভালোবাসা তবে এমনি সুদূর
এমনি অলীক তুমি
এমনি স্বপ্ন? ছোঁওনি কি কভু
বাস্তবতার ভূমি?
তাই বা কীভাবে ভালোবাসা আমি
দেখেছি পরস্পর
ধুলো ও মাটিতে বেঁধেছো তোমার
নশ্বরতার ঘর!
ভালোবাসা, বলো, দেখিনি তোমাকে
সলজ্জ চঞ্চল,
মুগ্ধ মেঘের মতোই কখনো
কারো তৃষ্ণার জল।

ভালবাসার কবিতা – (৯)

বনলতা সেন
জীবনানন্দ দাশ

হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন।

চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের ’পর
হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,
তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে , ‘এতোদিন কোথায় ছিলেন?’
পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।

সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন
সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;
পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন
তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;
সব পাখি ঘরে আসে — সব নদী- ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন;
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।

ভালবাসার কবিতা – (১০)

ভালো, এই ভালো
শক্তি চট্টোপাধ্যায়

ভালো, এই ভালো, এই সম্পর্কে জটিল

হাওয়া লাগা।
কতদিনে হবে? মুক্তি, ওই তার ছিঁড়ে
দেয়াল ডিঙিয়ে
ভেঙে নয় কোনকিছু, শক্তি ভেঙে নয়
সম্মুখে সর্বস্ব বাধা–তাও ভেঙে নয়
শুধু ডানা পেলে উড়ে অথবা ডিঙিয়ে
ছিঁচকে কাজ, যা করে নির্বোধ চোর
তাই করে, শুধু তাই করে
আর কিছু নয়
আর কিছু করতেও পারে না।।

ভালবাসার কবিতা – (১১)

শুধু ভালোবাসা
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন

তোমাকে ভালোবাসা ছাড়া
আমার আর কী কাজ আছে বলো ?
বোশেখের বৃষ্টি আটকে থাকুক
কালো মেঘের মতো মেঘের পকেটে
আমি তবু বলবো , তোমাকে ভালোবাসি

আষাঢ়ের কদম গন্ধ না ছড়াক
সবুজ পাতাগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে যাক
আমি তবু বলবো , তোমাকে ভালোবাসি

বঙ্গোপসাগরের প্রবল জলোচ্ছ্বাসে
ভেসে যাক বিস্তীর্ণ ভূভাগ
পালক ভাঙা পাখির হাহাকারে
ভরে যাক আদিগন্ত আকাশ
তবু আমি বলবো , তোমাকে ভালোবাসি

বুকের ব-দ্বীপে ঘরবাঁধা সেই দুরন্ত কিশোরী
স্টপেজহীন ট্রেনের চাকার তলে পিষ্ট হয়ে যাক
তবু আমি বলবো, তোমাকে ভালোবাসি

তোমাকে ভালোবাসা ছাড়া
আমার আর কী কাজ আছে বলো ?

ভালবাসার কবিতা – (১২)

আশা
কাজী নজরুল ইসলাম

হয়ত তোমার পাব’ দেখা,
যেখানে ঐ নত আকাশ চুমছে বনের সবুজ রেখা।।

ঐ সুদূরের গাঁয়ের মাঠে,
আ’লের পথে বিজন ঘাটে;
হয়ত এসে মুচকি হেসে
ধ’রবে আমার হাতটি একা।।

ঐ নীলের ঐ গহন-পারে ঘোম্‌টা-হারা তোমার চাওয়া,
আনলে খবর গোপন দূতী দিক্‌পারের ঐ দখিনা হাওয়া।।
বনের ফাঁকে দুষ্টু তুমি
আসে- যাবে নয়্‌না চুমি’
সেই সে কথা লিখছে হেতা
দিগ্বলয়ের অরুণ-লেখা।

ভালবাসার কবিতা – (১৩)

এই জ্যোৎস্নারাতে জাগে আমার প্রাণ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

এই জ্যোৎস্নারাতে জাগে আমার প্রাণ;
পাশে তোমার হবে কি আজ স্থান।
দেখতে পাব অপূর্ব সেই মুখ,
রইবে চেয়ে হৃদয় উৎসুক,
বারে বারে চরণ ঘিরে ঘিরে
ফিরবে আমার অশ্রুভরা গান?

সাহস করে তোমার পদমূলে
আপনারে আজ ধরি নাই যে তুলে,
পড়ে আছি মাটিতে মুখ রেখে,
ফিরিয়ে পাছে দাও হে আমার দান।
আপনি যদি আমার হাতে ধরে
কাছে এসে উঠতে বল মোরে,
তবে প্রাণের অসীম দরিদ্রতা
এই নিমেষেই হবে অবসান।

ভালবাসার কবিতা – (১৪)

পাগলী, তোমার সঙ্গে…
 জয় গোস্বামী

পাগলী, তোমার সঙ্গে ভয়াবহ জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে ধুলোবালি কাটাব জীবন
এর চোখে ধাঁধা করব, ওর জল করে দেব কাদা
পাগলী, তোমার সঙ্গে ঢেউ খেলতে যাব দু’কদম।

অশান্তি চরমে তুলব, কাকচিল বসবে না বাড়িতে
তুমি ছুঁড়বে থালা বাটি, আমি ভাঙব কাঁচের বাসন
পাগলী, তোমার সঙ্গে বঙ্গভঙ্গ জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে ৪২ কাটাব জীবন।

মেঘে মেঘে বেলা বাড়বে, ধনে পুত্রে লক্ষ্মী লোকসান
লোকাসান পুষিয়ে তুমি রাঁধবে মায়া প্রপন্ঞ্চ ব্যন্জ্ঞন
পাগলী, তোমার সঙ্গে দশকর্ম জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে দিবানিদ্রা কাটাব জীবন।

পাগলী, তোমার সঙ্গে ঝোলভাত জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে মাংসরুটি কাটাব জীবন
পাগলী, তোমার সঙ্গে নিরক্ষর জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে চার অক্ষর কাটাব জীবন।

পাগলী, তোমার সঙ্গে বই দেখব প্যারামাউন্ট হলে
মাঝে মাঝে মুখ বদলে একাডেমি রবীন্দ্রসদন
পাগলী, তোমার সঙ্গে নাইট্যশালা জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে কলাকেন্দ্র কাটাব জীবন।

পাগলী, তোমার সঙ্গে বাবুঘাট জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে দেশপ্রিয় কাটাব জীবন
পাগলী, তোমার সঙ্গে সদা সত্য জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে ‘কী মিথ্যুক’ কাটাব জীবন।

এক হাতে উপায় করব, দুহাতে উড়িয়ে দেবে তুমি
রেস খেলব জুয়া ধরব ধারে কাটাব সহস্র রকম
লটারি, তোমার সঙ্গে ধনলক্ষ্মী জীবন কাটাব
লটারি, তোমার সঙ্গে মেঘধন কাটাব জীবন।

দেখতে দেখতে পুজো আসবে, দুনিয়া চিত্‍কার করবে সেল
দোকানে দোকানে খুঁজব রূপসাগরে অরূপরতন
পাগলী, তোমার সঙ্গে পুজোসংখ্যা জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে রিডাকশনে কাটাব জীবন।

পাগলী, তোমার সঙ্গে কাঁচা প্রুফ জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে ফুলপেজ কাটাব জীবন
পাগলী, তোমার সঙ্গে লে আউট জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে লে হালুয়া কাটাব জীবন।

কবিত্ব ফুড়ুত্‍ করবে, পিছু পিছু ছুটব না হা করে
বাড়ি ফিরে লিখে ফেলব বড়ো গল্প উপন্যাসোপম
পাগলী, তোমার সঙ্গে কথাশিল্প জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে বকবকম কাটাব জীবন।

ভালবাসার কবিতা – (১৫)

বাসর
হুমায়ূন আহমেদ

কপাটহীন একটা অস্থির ঘরে তার সঙ্গে দেখা ।
লোহার তৈরি ছোট্ট একটা ঘর ।
বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে কোন যোগ নেই ।
ঘরটা শুধু উঠছে আর নামছে ।
নামছে আর উঠছে ।
মানুষ ক্লান্ত হয় –
এ ঘরের কোন ক্লান্তি নেই।
এ রকম একটা ঘরেই বোধহয় বেহুলার বাসর হয়েছিল ।
নিশ্ছিদ্র লোহার একটা ঘর ।
কোন সাপ সেখানে ঢুকতে পারবে না ।
হিস হিস করে বলতে পারবে না, পাপ করো। পৃথিবীর সব আনন্দ পাপে ।
পুণ্য আনন্দহীন । উল্লাসহীন ।
পুণ্য করবে আকাশের ফিরিশতারা ।
কারণ পুণ্য করার জন্যেই তাদের তৈরি করা হয়েছে ।
লোহার সেই ঘরে ঢোকার জন্য সাপটা পথ খুঁজছিলো ।
সেই ফাঁকে বেহুলা তাঁর স্বামীকে বললেন, কি হয়েছে, তুমি ঘামছ কেন ?
আর তখন একটা সুতা সাপ ঢুকে গেলো।
ফিসফিস করে কোন একটা পরামর্শ দিতে গেলো ।
বেহুলা সেই পরামর্শ শুনলেন না বলেই কি লখিন্দরকে মরতে হল ?

তার সঙ্গে আমার দেখা কপাটহীন একটা অস্থির ঘরে ।
ঘরটা শুধু ওঠে আর নামে ।
আমি তাকে বলতে গেলাম – আচ্ছা শুনুন, আপনার কি মনে হচ্ছে না
এই ঘরটা আসলে আমাদের বাসর ঘর ?
আপনি আর কেউ নন, আপনি বেহুলা ।
যেই আপনি ভালবেসে আমাকে কিছু বলতে যাবেন
ওম্নি একটা সুতা সাপ এসে আমাকে কামড়ে দেবে ।
আমাকে বাঁচিয়ে রাখুন । দয়া করে কিছু বলবেন না ।

ভালবাসার কবিতা – (১৬)

ভালোবাসার কবিতা লিখবো না
আবুল হাসান

‘তোমাকে ভালোবাসি তাই ভালোবাসার কবিতা লিখিনি।
আমার ভালোবাসা ছাড়া আর কোনো কবিতা সফল হয়নি,
আমার এক ফোঁটা হাহাকার থেকে এক লক্ষ কোটি
ভালোবাসার কবিতার জন্ম হয়েছে।

আমার একাকীত্বের এক শতাংশ হাতে নিয়ে
তুমি আমার ভালোবাসার মুকুট পরেছো মাথায়!
আমাকে শোষণের নামে তৈরি করেছো আত্মরক্ষার মৃন্ময়ী যৌবন।
বলো বলো হে ম্লান মেয়ে,এতো স্পর্ধা কেন তোমার?

ভালোবাসার ঔরসে আমার জন্ম! অহংকার আমার জননী!
তুমি আমার কাছে নতজানু হও,তুমি ছাড়া আমি
আর কোনো ভূগোল জানি না,
আর কোনো ইতিহাস কোথাও পড়িনি!

আমার একা থাকার পাশে তোমার একাকার হাহাকার নিয়ে দাঁড়াও!
হে মেয়ে ম্লান মেয়ে তুমি তোমার হাহাকার নিয়ে দাঁড়াও!

আমার অপার করুণার মধ্যে তোমারও বিস্তৃতি!
তুমি কোন্ দুঃসাহসে তবে
আমার স্বীকৃতি চাও,হে ম্লান মেয়ে আমার স্বীকৃতি চাও কেন?
তোমার মূর্খতা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধে,পৃথিবীটা পুড়ে যাবে
হেলেনের গ্রীস হবে পুনর্বার আমার কবিতা!
এই ভয়ে প্রতিশোধস্পৃহায়
আজো আমি ভালোবাসার কবিতা লিখিনি
কোনোদিন ভালোবাসার কবিতা লিখিনি।

হে মেয়ে হে ম্লান মেয়ে তোমাকে ভালোবাসি তাই
ভালোবাসার কবিতা আমি কোনোদিন কখনো লিখবো না!’

ভালবাসার কবিতা – (১৭)

যদি ভালবাসা পাই
রফিক আজাদ

যদি ভালবাসা পাই আবার শুধরে নেব
জীবনের ভুলগুলি
যদি ভালবাসা পাই ব্যাপক দীর্ঘপথে
তুলে নেব ঝোলাঝুলি
যদি ভালবাসা পাই শীতের রাতের শেষে
মখমল দিন পাব
যদি ভালবাসা পাই পাহাড় ডিঙ্গাবো
আর সমুদ্র সাঁতরাবো
যদি ভালবাসা পাই আমার আকাশ হবে
দ্রুত শরতের নীল
যদি ভালবাসা পাই জীবনে আমিও পাব
মধ্য অন্তমিল।

ভালবাসার কবিতা – (১৮)

আমার ভিতরে বাহিরে অন্তরে অন্তরে
রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

আমার ভিতরে বাহিরে অন্তরে অন্তরে ,
আছো তুমি হৃদয় জুড়ে।

ঢেকে রাখে যেমন কুসুম, পাপড়ির আবডালে ফসলের ঘুম।
তেমনি তোমার নিবিঢ় চলা, মরমের মূল পথ ধরে।

পুষে রাখে যেমন কুসুম, খোলসের আবরণে মুক্তোর ঘুম।
তেমনি তোমার গভীর ছোঁয়া, ভিতরের নীল বন্দরে।

ভাল আছি ভাল থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো।
দিয়ো তোমার মালাখানি, বাউলের এই মনটারে।
আমার ভিতরে বাহিরে…

ভালবাসার কবিতা – (১৯)

তোমার চোখ এতো লাল কেন?
নির্মলেন্দু গুণ

আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে , আমি চাই
কেউ একজন আমার জন্য অপেক্ষা করুক,
শুধু ঘরের ভেতর থেকে দরোজা খুলে দেবার জন্য ।
বাইরে থেকে দরোজা খুলতে খুলতে আমি এখন ক্লান্ত ।

আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই
কেউ আমাকে খেতে দিক । আমি হাতপাখা নিয়ে
কাউকে আমার পাশে বসে থাকতে বলছি না,
আমি জানি, এই ইলেকট্রিকের যুগ
নারীকে মুক্তি দিয়েছে স্বামী -সেবার দায় থেকে ।
আমি চাই কেউ একজন জিজ্ঞেস করুক :
আমার জল লাগবে কি না, নুন লাগবে কি না,
পাটশাক ভাজার সঙ্গে আরও একটা
তেলে ভাজা শুকনো মরিচ লাগবে কি না ।
এঁটো বাসন, গেঞ্জি-রুমাল আমি নিজেই ধুতে পারি ।

আমি বলছি না ভলোবাসতেই হবে, আমি চাই
কেউ একজন ভিতর থেকে আমার ঘরের দরোজা
খুলে দিক । কেউ আমাকে কিছু খেতে বলুক ।
কাম-বাসনার সঙ্গী না হোক, কেউ অন্তত আমাকে
জিজ্ঞেস করুক : ‘তোমার চোখ এতো লাল কেন ?’

267 total views, 2 views today

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন