বেগুন খাওয়ার স্বাস্থ্য উপকারিতা এবং বেগুনের গুনাগুন

বেগুন খাওয়ার স্বাস্থ্য উপকারিতা এবং বেগুনের গুনাগুন
5 (100%) 4 votes

বেগুন সবার কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি সবজি। বেগুন সহজলভ্য এবং সুস্বাদু খাবার। মধ্যযুগে ইউরোপে যেসব বেগুন পাওয়া যেত সেগুলোর আকৃতি অনেকটাই মুরগির ডিমের মতো ছিল। এ কারণেই বোধহয় ইংরেজিতে বেগুনের নাম Eggplant . বেগুন ভাজা অথবা সাদা ভাতের সঙ্গে ঝাল ঝাল বেগুন ভর্তা খেতে পছন্দ করেন না এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এই সবজি প্রায়ই আমাদের খাদ্য তালিকায় থাকে। বেগুনে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন বি, ভিটামিন বি সিক্স, রিবোফ্লাভিন, নায়াসিন এবং থায়ামিন। এগুলো আমাদের দেহের ‘মেটাবোলিজম’ সক্রিয় রাখে। ফলে খাবার ভালো হজম হয় এবং শরীরে মেদ জমে না। তবে টাটকা এবং কচি বেগুন খাওয়া ভালো। এতে স্বাদ ও পুষ্টিগুণ দুটোই ঠিক থাকে। উল্লেখ্য, বেগুনের ত্বক পুষ্টি উপাদানের একটি ভালো উৎস। তাই বেগুনের খোসা ছাড়িয়ে রান্না করা উচিত নয়। সুস্বাদু এই সবজিটির রয়েছে নানা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। তাহলে চলুন জেনে নেই বেগুন খাওয়ার স্বাস্থ্য উপকারিতা এবং বেগুনের গুনাগুন সম্পর্কে।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

বেগুন

বেগুন থেকে পাওয়া পুষ্টিগুন

প্রতি ১০০ গ্রাম খাদ্যোপযোগী বেগুনে রয়েছে ০.৮ গ্রাম খনিজ পদার্থ, ১.৩ গ্রাম আঁশ, ৪২ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি, ১.৮ গ্রাম আমিষ, ২.২ গ্রাম শর্করা, ২৮ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ০.৯ মিলিগ্রাম লৌহ, ৮৫০ মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিন, ০.১২ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-১, ০.০৮ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-২, ৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন-সি। ইত্যাদি।

বেগুন খাওয়ার স্বাস্থ্য উপকারিতা

হৃদপিন্ডের জন্য উপকারী – এই সবজিটি ফাইবার, ভিটামিন বি ১, বি ৬, বি ৩, সি, কে তে ভরপুর থাকে। এছাড়াও এতে ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট থাকে বলে বেগুন হৃদপিন্ডের জন্য উপকারী একটি খাবার।  তাই নিয়মিত বেগুন খেলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে যায় অনেক ক্ষেত্রে। কোলেস্টেরল হলো চর্বি জাতীয় উপাদান, যা রক্তে জমে যায়। যাদের রক্তে কোলেস্টেরল বেশি থাকে, তারা কোনো রকম দুশ্চিন্তা ছাড়াই খেতে পারে এই সবজিটি। কারণ বেগুনে কোনো চর্বি বা কোলেস্টেরল নেই।

ক্যান্সার প্রতিহত করতে – বেগুনে পলিফেনল থাকে যা কোষকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে। এই সবজিটি টিউমারের বৃদ্ধি প্রতিহত করে এবং ক্যান্সার কোষের বিস্তার বন্ধ করতে সাহায্য করে। অন্য উপাদান যেমন- এন্থোসায়ানিন ও ক্লোরোজেনিক এসিড শরীরে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্টিইনফ্লামেটরি প্রভাব ফেলে। ক্লোরোজেনিক এসিড কোষের ভেতরের এনজাইম পরিষ্কার করে, যা ক্যান্সার কোষের মৃত্যুকে উৎসাহিত করে এবং ভাইরাস জনিত রোগ তাড়াতে সাহায্য করে।

খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায় – মনে রাখবেন আপনার শরীরের খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমানোর শক্তি আছে বেগুনের মধ্যেই। অবশ্য তেলে ভাঁজালে  আপনি খুব বেশি উপকৃত হতে পারবেন না। ৪০০ ডিগ্রী তাপে বেগুনকে বেক করলে এর পুষ্টিগুণ বজায় থাকে না এবং সুগন্ধও পাওয়া যায় না। সুতরাং ভাজা বাদে রান্না খাওয়া উচিত।

তারুণ্য ধরে রাখে – বেগুন থেকে প্রচুর পরিমাণের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পাওয়া যায় যা অন্যান্য হালকা সবজির তুলনায় প্রায় চারগুণ বেশি। অ্যান্টিওক্সিডেন্ট ত্বকের তারুণ্য ধরে রাখতে সাহায্য করে। বলা যায়, সবজির রং যত বেশি গাঢ় খাবার তত বেশি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ।

ইউরেনারি ইনফেকশন প্রতিরোধ করে – এই সবজি থেকে পাওয়া যায় অ্যান্থোসায়ানিন নামক উপাদান। যা মূত্রনালীর দেওয়ালের ব্যাক্টেরিয়া ধ্বংস করে ‘ইউরেনারি ট্র্যাক ইনফেকশন’ বা ইউটিআইএস এর ঝুঁকি কমায়। এছাড়া অ্যান্থোসায়ানিন নামক উপাদান থাকার কারণে আলসার ও মাড়ির রোগ সৃষ্টি করে এমন ব্যাক্টেরিরা প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে এই সবজিটি।

মস্তিষ্কের উন্নতি ঘটায় – বেগুনের ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট জ্ঞানীয় দক্ষতা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে এবং সর্বদা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যই উপকারী। ফ্রি র‍্যাডিকেলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ছাড়াও এই উপাদানটি মস্তিষ্ককে রোগ ও টক্সিন থেকে মুক্ত থাকতেও সহায়ক এবং মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহ বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। মস্তিষ্কে বেশি রক্ত প্রবাহিত হলে অক্সিজেনও বেশি পৌঁছে দিতে থাকে। যার ফলে স্মৃতি শক্তি ও বিশ্লেষণ মূলক চিন্তার উন্নতি ঘটে।

হজম শক্তি বৃদ্ধি করে – হজম শক্তির ক্ষেত্রে এটি অনেক সহায়ক একটি সবজি। কারন ফাইবারে সমৃদ্ধ এই সবজিটি প্ররিপাক প্রক্রিয়ার জন্য উপকারী। এর ফাইবার শরীরের খাদ্য প্রক্রিয়াজাৎকরণে সাহায্য করে এবং পাকস্থলীতে পরিপাক রসের উৎপাদন বৃদ্ধি করার মাধ্যমে পুষ্টি উপাদান শোষণে সাহায্য করে থাকে।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে – বেগুনে উচ্চ মাত্রার ফাইবার ও কম দ্রবণীয় কার্বোহাইড্রেট থাকে বলে রক্তের গ্লুকোজ ও ইনসুলিনের মাত্রার সমস্যা আছে যাদের তাদের জন্য উপকারী খাবার। তাই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য আপনার খাদ্য তালিকায় রাখতে হবে এই সবজিটি।

রক্ত বাড়াতে সাহায্য করে – বেগুনে আয়রনও রয়েছে অনেক মাত্রায়, যা রক্ত বাড়াতে সাহায্য করে। তাই রক্তশূন্যতার রোগীরাও খেতে পারে বেগুন। এতে চিনির পরিমাণ খুবই সামান্য। তাই ডায়াবেটিসের রোগী, হৃদরোগী ও অধিক ওজন সম্পন্ন ব্যক্তিরা নিশ্চিন্তে খেতে পারে এই সবজিটি।

মুখ ও ঠোঁটের কোণের ঘা সারায় – বেগুনে রয়েছে রিব্লোফ্ল্যাভিন নামক উপাদান। এই উপাদান জ্বর হওয়ার পরে মুখ ও ঠোঁটের কোণের ঘা, জিহ্বার ঘা প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। তাছাড়া জ্বর জ্বর ভাব দূর করতে সাহায্য করে থাকে।

ত্বক, চুল, নখকে মজবুত করে – বেগুন ভিটামিন ‘এ’, ‘সি’, ‘ই’ এবং ‘কে’ সমৃদ্ধ সবজি। ভিটামিন ‘এ’ চোখের পুষ্টি জোগায়, চোখের যাবতীয় রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। আর ভিটামিন ‘সি’ ত্বক, চুল, নখকে করে মজবুত। দেহে রক্ত জমাট বাঁধার বিরুদ্ধে কাজ করে ভিটামিন ‘ই’ ও ‘কে’। এই ভিটামিন চারটি শরীরের রোগ-প্রতিরোধ বিরাট ভূমিকা রাখে। এককথায় শুষ্ক ত্বকের জন্য এই সবজিটি খুবই উপকারী। কারণ এই সবজিটি ত্বকের সিক্ততা প্রদান করে অনেকাংশে।

ঋতুস্রাবের সমস্যা সমাধানে – বেগুনের মধ্যে অনেক খাদ্য গুনাগুন বিদ্যমান থাকে। এই গুন ঋতুস্রাবের সমস্যা সমাধানে অনেক উপকার করে। সুতরাং যেসব মহিলা নিয়মিত এই সবজিটি খান তাদের ঋতুস্রাবের সমস্যা হয় তুলনামূলকভাবে কম।

বেগুন পানি খাওয়ার উপকারিতা

নিয়মিত বেগুনের পানি পান করুন, আর দেখুন ম্যাজিকের মতো কী ভাবে আপনার ওজন কমে। বেগুনের পানিকে ‘মিরাক্যল ওয়াটার’ও বলা হয়ে থাকে। ওজন কমানোর উপায় হিসাবে বেগুন খেতে পারেন যা আপনার এনার্জি লেভেলকে বুস্ট আপ করবে। তাই বেগুন আপনাকে মোটা না করেই সুস্বাস্থ্যের অধিকারী করে তুলবে। জেনে নিন, কী ভাবে বানাবেন বেগুনের পানি-
একটা মাঝারি মাপের বেগুন ভালো করে ধুয়ে চাকা চাকা করে কেটে নিন (খোসাসুদ্ধ)। একটা কাঁচের জারে বেগুনের টুকরোগুলো পরপর সাজিয়ে রাখুন। এক লিটার পানির মধ্যে ঢেলে দিন। একটা মাঝারি মাপের পাতিলেবু নিংড়ে পুরোটা রস এর মধ্যে মিশিয়ে দিন। চামচ দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে সারা রাত ফ্রিজে রেখে দিন। পরের দিন ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, ডিনারের আগে এক কাপ করে এই পানি পান করুন। সারা দিনে এক কাপ করে এই **পানি** খাবেন। সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে ফল পাবেন।

বেগুন এর আয়ুর্বেদিক ব্যবহার

যুগ যুগ ধরে বেগুনের রয়েছে নানা রকম আয়ুর্বেদিক ব্যবহার। নানা রোগে এই সবজিটি ঔষধ হিসাবে কাজ করে।
১। রোজ সকালে খালি পেটে কচি বেগুন পুড়িয়ে গুড় মিশিয়ে খেলে ম্যালেরিয়ার ফলে লিভারের যে ক্ষতি হয় সেটা ভালো হয়।
২। এই সবজিটি অনিদ্রা রোগ দূর করে। বেগুন খেলে ভালো ঘুম হয়। এর জন্য বেগুনের আর নাম হল নিদ্রালু। যাদের ঘুমের সমস্যা আছে তারা সন্ধ্যায় সামান্য বেগুন পুড়িয়ে মধু মিশিয়ে খেলে রাতে ভালো ঘুমাতে পারবেন।
৩। নিয়মিত এই সবজিটি খেলে প্রসাবের জ্বালাপোড়া কমে। প্রস্রাব পরিষ্কার করে প্রারম্ভিক অবস্থার কিডনির পাথরও নাকি গলিয়ে দিতে পারে এই সবজিটি।
৪। বেগুন একেবারে পুড়িয়ে ছাই করে সেই ছাই বা ভস্ম গায়ে মাখলে চুলকানি ও চর্মরোগ সারে।
৫। কচি ও শাসালো বেগুন খেলে জ্বর সারে।
৬। বেগুনের রসে মধু মিশিয়ে খেলে কফজনিত রোগ দূর হয়।
৭। বেগুন বীর্যের পরিমান বাড়ায়।

গর্ভাবস্থায় বেগুন খাওয়া কি নিরাপদ

বিশেষজ্ঞরা বলেন, গর্ভাবস্থায় বেগুন মাঝে মাঝে খাওয়া যেতে পারে। তবে খুব বেশি খাওয়া  **গর্ভবতী** মা ও ভ্রুণের ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ায়। জীবনধারা বিষয়ক ওয়েবসাইট বোল্ডস্কাইয়ের প্রেগনেন্সি ও প্যারেন্টিং বিভাগে প্রকাশিত হয়েছে এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে – বেগুন ভ্রুণের জন্মগত ত্রুটি কমায়; ভ্রূণের বৃদ্ধিতে কাজ করে তবে গর্ভাবস্থায় এই সবজিটি খাওয়ার কিছু ক্ষতিকর দিকও রয়েছে। এটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ঘটাতে পারে। অনেক বিশেষজ্ঞ বলেন, বেগুনের মধ্যে ফাইটো-হরমোন থাকার কারণে এটি বেশি খেলে গর্ভপাত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। এ ছাড়া অপরিপক্ব শিশুও হতে পারে এর কারণে। এই সবজিটি এসিডিটি বাড়ায়। গর্ভাবস্থায় এসিডিটির সমস্যায় অনেকেই ভোগেন। তাই ভেবে দেখুন কতটুকু পরিমানে খাবেন এই সবজিটি।

বেগুন খাওয়ার ফলে যেসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়

কাঁচা বেগুন খাওয়া উচিৎ নয়, তাতে পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা হতে পারে। যাদের অ্যালার্জি জনিত সমস্যা রয়েছে তাদের জন্য এই সবজিটি ভীষণ ক্ষতিকর। এছাড়াও, যাঁরা আর্থ্রাইটিস বা সন্ধিপ্রদাহে ভুগছেন, তাঁদের জন্য ক্ষতিকর। এই সবজিটি অনেকের গলদেশ ফোলা, বমি ভাব, চুলকানি এবং চামড়ার ওপর ফুসকুড়ির সমস্যা তৈরি করে থাকে। তাই মায়েদের উচিত বেগুন খাওয়ানোর সময় বাচ্চাদের ওপর এর প্রভাব লক্ষ করা। অ্যালার্জির সমস্যা থাকলে এই সবজিটি পরিহার করা উচিত। বেগুন অধিকাংশ মানুষের অ্যালার্জি বাড়িয়ে দেয়।  জিঙ্কের ঘাটতি পূরণ করার জন্য ডায়রিয়া চলাকালীন বেগুনের তরকারি খাওয়া অনুচিত। ডায়রিয়া ভালো হয়ে যাওয়ার পরে বেগুনের তরকারি খাবেন।

193 total views, 2 views today

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন