বিয়ে সমাচার। বিয়ে নিয়ে এ টু জেড জানুন

বিয়ে সমাচার। বিয়ে নিয়ে এ টু জেড জানুন
5 (100%) 1 vote

বিয়ে মানব জীবনের একটি গুরত্বপূর্ণ অধ্যায়। অনেক তরুণ-তরুণীরা হয়ত বিয়ে করতে চায় কারণ তাদের বন্ধুবান্ধবরা বিয়ে করে ফেলছে, কারও আবার বাবা মা চাপ সৃষ্টি করছে বিয়ে করার জন্য, কেউ ঘরের পারিবারিক জীবনের সমস্যা থেকে মুক্তির জন্যও বিয়ে করতে চায়। কেউ কেউ অন্যের শারীরিক সৌন্দর্য দেখে বা অর্থ-সম্পদের কারণে বিয়ে করতে আগ্রহী হয়। কেউ কেউ খুঁজে একজন সঙ্গী, কেউ পারিবারিক ভাবে শক্ত একটা অবলম্বন পেতেও বিয়ে করতে চায় যেটা একটা বিয়ের মাধ্যমে সম্ভব। আবার মুসলিম হিসেবে রাসূলের সুন্নাহ পালনের মাধ্যমে ইবাদাত হিসেবেও বিয়ে করতে চান।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

বিয়ে

বিয়ে কি

বাংলাদেশে বিয়ের জন্য অভিন্ন পারিবারিক আইন নেই ফলে বর্তমান বাস্তবতায় প্রত্যেক ধর্মের নিজন্ব পারিবারিক আইন মতে বিবাহ ও বিবাহ রেজিষ্ট্রেশন সম্পাদিত হয়। মুসলিম আইন মতে বিয়ে হচ্ছে ধর্ম কর্তৃক অনুমোদিত একটি দেওয়ানি চুক্তি। বিবাহ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো মিলানো, একত্র করা কিংবা সহবাস। ইসলামী আইন অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট একজন নর ও নারীর একত্রিত হওয়ার চুক্তিকেই বিবাহ বলে। ডি এফ মোল্লা তাঁর ‘মুসলিম আইনের মূলনীতি’ বইয়ে বিবাহের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘বিয়ে বা নিকাহ এমন একটি চুক্তি যার উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য হলো বৈধভাবে সন্তান লাভ ও প্রতিপালন।’ বিচারপতি মাহমুদ তাঁর ‘আঃ কাদির ও সালিসী মোকদ্দমার রায়ে বলেছেন, ‘মুসলিম বিবাহ কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, একটি বিশুদ্ধ দেওয়ানী চুক্তি যার উদ্দেশ্য পারিবারিক জীবন যাপন ও বৈধ সন্তান দান।’

মানুষ কেন বিয়ে করে

বর্তমান সময়ে টেলিভিশন মিডিয়া, কমার্শিয়ালের মাঝে ডুবে থেকে অনেক ছেলেমেয়েরাই বিয়েকে মডার্ন ডেটিং টাইপের কিছু ভেবে বসেন। কেবল অবিমিশ্র সুখ, উদ্দাম আনন্দ। অথচ, বিয়ের পর দেখা যায় টুথব্রাশ এখানে কেন, টাওয়েল ওখানে কেন টাইপের ছোট ছোট জিনিসেও অমিল পাওয়া যায় একজন আরেক জনের। বিয়ের প্রথম দিকে ভালোবাসা উপচে পড়ার কারণে এইসব অগ্রাহ্য করলেও কিছুদিন পর আরেকজনের এইসব ছোটখাটো অমিল গুলোও অসহ্যবোধ হতে থাকে। তবে সেই প্রাচীন কাল থেকেই এই বিবাহ করা ব্যাপারটি নিয়ে একটা অমীমাংসিত প্রশ্ন রয়েই গেছে আর সেটা হলো, কেন মানুষ বিয়ে করে? কিংবা বিয়ের উপকারিতা কী? অথবা এর প্রয়জনটা কি? এই ব্যাপার নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে নানান সময়ে ও বিশেষজ্ঞদের আছে ভিন্ন ভিন্ন অনেক মতামত। আজকালকার আধুনিক মানুষ যেসব কারণে বিয়ে করে, সেগুলির অধিকাংশ কারন দেওয়া হল-

▪দীর্ঘ আয়ু লাভ করার জন্য মানুষ বিবাহ করে।
▪বিয়ের কারণে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া যায়।
▪অনেকে আবার বিবাহ করেন বংশ বৃদ্ধির জন্য।
▪বিয়ে আপনার জীবনের একাকীত্ব দূর করে।
▪বিয়ে আপনাকে আরও বেশি সুন্দর ও আকর্ষণীয় করে তোলে সমাজের চোখে।
▪বিয়ে মানুষের জীবনে সন্তান ও পরিবারের সুখ বয়ে আনে।
▪সাধারনত যৌন চাহিদার কারনে অনেকেই বিবাহ করে থাকে।
▪সবাই মনে করেন যে, বিবাহিত নারী-পুরুষ অন্যান্য মানুষের তুলনায় সুখী হয়।
▪বিয়ের মাধ্যমে একজন নারী ও পুরুষ ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে বলে অনেকেই মনে করে।

বিয়ে করা কি ফরজ

বিয়ে করা ফরজ আবার সুন্নতও, দুটোই মনে করতে পারেন। নবী (সা.) যেহেতু বিবাহ করেছেন, তাই সুন্নত। আর ফরজ হবে, যদি আপনার চাহিদা থাকে, আপনার যদি আশঙ্কা থাকে আপনার নৈতিক যে পবিত্রতা রয়েছে সেটি রক্ষা হবে না, যেকোনো ধরনের অপরাধ, অন্যায়, ব্যাভিচারের মধ্যে লিপ্ত হতে পারেন, তাহলে আপনার জন্য ফরজ। মূলত এখানে বিয়ের বিধানটি নির্ভর করছে ব্যক্তির ওপর। বিষয়টি আপেক্ষিক। কারো জন্য ফরজ, কারো জন্য সুন্নত। এর বিভিন্ন পর্যায় রয়েছে। কেউ যদি নিজেকে সংযত করতে পারেন, বিয়ে করতে না চান, সে ক্ষেত্রে তাঁর কোনো গুনাহ হবে না। তিনি যদি মনে করেন, তাঁর কোনো আশঙ্কা নেই, নৈতিক অবক্ষয় হবে না এবং যদি মনে করেন বিবাহ না করলেও চলবে, তাহলে তাঁর জন্য জায়েজ আছে বিবাহ না করা। এটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কোনো কোনো আলেমের মতে, বিয়ে করা ওয়াজিব। অবশ্য তার সপক্ষে হাদীসেরও সমর্থন রয়েছে। ফিকাহবিদগণ লিখেছেন, যৌন তাকীদ যখন সহ্য সীমা অতিক্রম করে যায় এবং শরঈ সীমা ভেঙে ফেলার আশঙ্কা  দেখা দেয়, অর্থাৎ উক্ত দুর্ঘটনায় লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রবলতর হয়ে ওঠে, তখন মুমিন লোকের পক্ষে বিয়ে করা ওয়াজিব হয়ে যায়। কিন্তু যৌন তাড়না যদি সীমা অতিক্রম না করে, তাহলে সেমতাবস্থায় বিয়ে সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ। পক্ষান্তরে, স্ত্রীর হক আদায় করতে না পারার ধারণা যদি প্রবলতর হয়, তাহলে সেমতাবস্থায় বিয়ের ফাঁদে নিজেকে জড়ানো শরীয়তের দৃষ্টিতে অপছন্দনীয় অর্থাৎ মাকরূহ। বরং স্ত্রীর হক আদায় করতে না পারার ব্যাপারে যে ব্যক্তি স্থির নিশ্চিত, তার পক্ষে বিবাহ করা হারাম।

ইসলাম ধর্মে বিয়ে

মুসলিম আইন উৎসগত দিক থেকে কুরআন, হাদীস, ইজমা, কিয়াস নির্ভর। শরীয়া আইন থেকেই বিয়ে সংক্রান্ত বিধানসমূহ অনুসৃত হয়ে থাকে। ইসলাম ধর্মে বিবাহ একটি আইনগত, সামাজিক ও ধর্মীয় মর্যাদা রয়েছে। ছেলে ও মেয়ের একসাথে জীবন-যাপন ও সংসার ধর্ম পালনকে আইনগত, ধর্মীয় ও সামাজিক সুরক্ষা দিতেই বিবাহ প্রথার জন্ম। মুসলিম আইন অনুযায়ী বিয়ে হলো দেওয়ানী চুক্তি। এখানে খুব বেশি আনুষ্ঠানিকতা পালন করতে হয় না। অন্যান্য চুক্তির মতই এতে দুটি পক্ষ থাকে। সাক্ষীদের উপস্থিতিতে একপক্ষ বিয়ের প্রস্তাব করলে এবং অন্যপক্ষ তা গ্রহণ করলে বিয়ে সম্পন্ন হয়ে যায়। মুসলিম বিয়েতে মহর বাধ্যতামূলক, আর বিয়ের পর ছেলের বাড়িতে অলিমা (বৌভাতের আয়োজন) করা সুন্নত। ব্যভিচারের অপকারিতা বর্ণনা করার পর আল্লাহ তাআলা মানব জাতিকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, পুরুষ ও নারী যারই বিয়ের প্রয়োজন দেখা দেবে, সে অবশ্যই  বিবাহ করবে। কেননা, বিয়েই হচ্ছে যৌন পবিত্রতা সংরক্ষণ ও যৌন ক্ষুধা নিবারণের সবচেয়ে বড় উপায় ও মাধ্যম। তাই আল্লাহ তায়ালা বিয়ের নির্দেশ দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা জুড়িহীন, তাদের বিয়ে করিয়ে দাও এবং তোমাদের দাস-দাসীদের মধ্যে যারা উপযুক্ত তাদেরও।’ (সূরা নূর-৩২)

আল্লাহ তা‘আলা বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের তাকীদ দান করেছেন এবং যে সব নারী ও পুরুষের বিয়ে করা প্রয়োজন, তাদের সবাইকে বিয়ে করানোর নির্দেশ দিয়েছেন। আর এ দায়িত্ব আল্লাহ অর্পণ করেছেন গোটা জাতির ওপর, যাতে তারা এর গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারে। এ ব্যবস্থার দ্বারা আল্লাহ পাক এটাই বুঝাতে চান যে, বিয়ে-শাদীর দরুন যে উপকার লাভ হয়, গোটা জাতি তার দ্বারা উপকৃত হয়। আর বিয়ে না করার দরুন যে ক্ষতি সাধিত হয়, তাও গোটা জাতিকেই বহন করতে হয়। বস্তুত বৈধ বিবাহ প্রথা রহিত করে দিলে গোটা জাতীয় চরিত্রই যে তাতে গন্ধময় হয়ে উঠবে, কোনো চিন্তাশীল ব্যক্তিই তা অস্বীকার করতে পারবেন না। যা হোক, উক্ত আয়াত থেকে এ কথা পরিষ্কারভাবেই জানা গেলো যে, যে নারী কিংবা পুরুষ বিয়ের যোগ্য হবে, তাকে বিয়ে করাতে হবে। আর বিয়ে করানোর এ দায়িত্ব অর্পিত হবে যুগপৎ অভিভাবক ও রাষ্ট্রের ওপর। এ দুয়ের কেউই এ দায়িত্ব এড়াতে পারবে না।

মুসলিম বিয়ে এবং তার শর্তগুলো

মানব ইতিহাস লক্ষ্য করলে দেখা যায়, প্রাচীন সমাজে নারীদের মান-মর্যাদার প্রতি কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ইসলাম ধর্মের বিধান অনুযায়ী বিবাহের মাধ্যমে নারীর মর্যাদা ও গুরুত্ব সংরক্ষিত হয়। ১৯৬১ সালে প্রণীত মুসলিম বিবাহ আইন অনুযায়ী, বিবাহ করতে ইচ্ছুক পক্ষদ্বয়কে অবশ্যই প্রাপ্তবয়স্ক বয়স্কা এবং সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হতে হবে। এ ক্ষেত্রে পুরুষের বয়স ন্যূনতম ২১ বছর এবং স্ত্রীলোকের বয়স ন্যূনতম ১৮ বছর হতে হবে।
প্রস্তাব দান এবং কবুল – বিবাহ করতে ইচ্ছুক পক্ষদ্বয়ের মধ্যে এক পক্ষকে প্রস্তাব দিতে হবে এবং অপর পক্ষ থেকে তা গ্রহণ করতে হবে। প্রস্তাব দান ও গ্রহণ একই বৈঠক/মজলিসে কমপক্ষে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন পুরুষ সাক্ষী কিংবা একজন পুরুষ ও দু’জন মহিলা সাক্ষীর সামনে হতে হবে। তবে সাক্ষীগণকে একই বৈঠকে হাজির থাকতে হবে। এটিই বিবাহ বন্ধন সংগঠিত হওয়ার মূল শর্ত। বিবাহের জন্য পাত্র এবং পাত্রীর স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতির প্রয়োজন। বল প্রয়োগে সম্মতি আদায়ে বিবাহ বাতিল বলে গণ্য হবে। সাধারণত একটি আইনসম্মত বৈধ বিয়েতে নিন্মলিখিত পাঁচটি শর্ত পালন অপরিহার্য। যথাঃ
▪বর ও কনের উপযুক্ত বয়স (আইন সন্মত ভাবে বরের বয়স ২১ বছর ও কনের বয়স ১৮ বছর)
▪বর ও কনের স্বাধীন সম্মতি
▪সাক্ষী
▪দেনমোহর
▪বিয়ে রেজিষ্ট্রি ইত্যাদি।

প্রচার – ইসলামিক স্কলাররা এ ব্যাপারে একমত যে বিয়ের ব্যাপারটি গোপন রাখা ঠিক নয় বরং সেটিকে সমাজে প্রচার (publicity) করা জরুরী। এজন্য বর (বা বর পক্ষ) তার সামর্থ্য অনুযায়ী ভোজের ব্যবস্থা করবে। আগেই বলা হয়েছে যে, বড় ভোজের আয়োজন করা বাধ্যতামূলক নয়। বড় বা ছোট ভোজ এ ব্যাপারে ইসলাম কোন বাধ্যবাধকতা দেয় নি। বরং সামর্থ্য অনুযায়ী ভোজকেই (কৃপণতা বা বিলাসিতা দু’ই ইসলাম অপছন্দ করে) ইসলাম উৎসাহিত করে। এখানে উল্লেখ্য আমাদের সমাজে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে পাত্রী পক্ষের ওপর বড় ভোজ আয়োজনের দায়িত্ব বেশী থাকে। অথচ ইসলাম ভোজ আয়োজনের দায়িত্ব দিয়েছে বরপক্ষকে। তবে পাত্রী পক্ষ যদি স্বেচ্ছায় সামর্থ্য অনুযায়ী ভোজের আয়োজন করে তাতে দোষের কিছু নেই। পাত্র পক্ষের উচিত হবে না পাত্রী পক্ষের উপরে এ ভোজ আয়োজনের জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ চাপ প্রয়োগ করা। আমাদের দেশে অনেকেই বরযাত্রীর নাম করে একটি বড় সংখ্যা পাত্রীপক্ষের উপর চাপিয়ে দেন।

দেনমোহর – আর একট গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো দেনমোহর । এটি আদায় করা প্রতিটি স্বামীর জন্য ফরজ, তা যৌন মিলন করার পূর্বে হোক বা পরেই হোক। এক্ষেত্রে স্বামীর উচিত তার সামর্থ্য অনুযায়ী যতটা সম্ভব দ্রুত দেনমোহর আদায় করায় সচেষ্ট হওয়া। অনেকে মনে করেন কেবল তালাক হলেই মোহর দিতে হয়। এটি একেবারেই ভুল ধারণা। দেনমোহর বিয়ে বৈধতার একটি শর্ত।

বিয়ে রেজিষ্ট্রেশন কি

বিবাহ সংক্রান্ত গুরত্বপূর্ণ তথ্যাদি সরকারী রেজিষ্ট্রারে লিপিবদ্ধ করাই হচ্ছে বিবাহ রেজিষ্ট্রেশন। মুসলিম বিবাহ রেজিষ্ট্রেশন বাধ্যতামূলক। মুসলিম বিয়ে ও তালাক (রেজিষ্ট্রেশন) আইন ১৯৭৪ মতে বিয়ে রেজিষ্ট্রেশন না করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।বিয়ে রেজিষ্ট্রেশন কপি হচ্ছে বিয়ের প্রথমপত্র, যা সব বিবাহিত নারীর জন্য অপরিহার্য একটি দালিলিক প্রমাণ। বিয়ে রেজিষ্ট্রেশন ব্যপারে কিছু বিষয় পক্ষগুলোকে খেয়াল রাখতে হবে,যথা-

▪ বিয়ের মঞ্চেই বিয়ে রেজিষ্ট্রি করতে হয়।
▪বিয়ের মঞ্চে সম্ভব না হলে বিয়ের অনুষ্টানের দিন থেকে ১৫ দিনের মধ্যে কাজী অফিসে গিয়ে বিবাহ রেজিষ্টি করতে হয়।
▪কাবিন নামার সব শর্ত যথাযথ পূরণ করার পর বর-কনে, উকিল সাক্ষী ও অন্য সব ব্যক্তিগণের স্বাক্ষর নিতে হবে।

বিয়ে রেজিষ্টেশন কেন গুরত্বপূর্ণ

বিয়ের রেজিষ্টেশন বর কনে উভয়ের জন্য দরকারি। বাংলাদেশে সামাজিক পরিস্থিতিতে বিবাহিত নারীদের জন্য বিয়ের রেজিষ্টেশন জরুরী। যেসব কারণে বিয়ে রেজিষ্টেশন গুরত্বপূর্ণ, তা হলোঃ

▪কেউ এর সত্যতা অস্বীকার করতে পারে না।
▪এ দলিলের মাধ্যমে স্ত্রী বা স্বামী আবার বিয়ের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহন করতে পারে।
▪ভরণ-পোষণ আদায়ের জন্য এটি একটি প্রমাণপত্র।
▪দেনমোহর আদায়ের জন্য রেজিষ্টিকৃত নিকাহনামা দরকার।
▪স্বামী-স্ত্রী দু’জনের মধ্যে একজন মারা গেলে মৃতের সম্পতিতে নিজের অংশের ভাগ পেতে পারে।

কোর্ট ম্যারেজে বিয়ে কি

কোর্ট ম্যারেজ বা আদালতের মাধ্যমে বিয়েকে পূর্ণাঙ্গ বিয়ে ভেবে থাকেন অনেকেই। অনেক সময় প্রেমিক প্রেমিকা আদালতপাড়ায় আইনজীবীর চেম্বারে গিয়ে কোর্ট ম্যারেজ করতে চান। অনেক আইনজীবীও কোর্ট ম্যারেজের বিষয়টি ব্যাখ্যা না দিয়ে বিয়ের একটি হলফনামা সম্পন্ন করে দেন। কিন্তু কোর্ট ম্যারেজ যে পূর্ণাঙ্গ বিয়ে নয়; সেটি জানেন না অনেকেই। অনেকেরই ধারণা, কেবল অ্যাফিডেভিট করে বিয়ে করলে বন্ধন শক্ত হয়। ধারণাটি সম্পূর্ণরূপে ভুল।

কোর্ট ম্যারেজ কী – কোর্ট ম্যারেজ বলে আইনে নির্দিষ্ট করে সঠিক কিছু উল্লেখ নেই। নারী-পুরুষরা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে একত্রে বসবাস করার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে যে হলফনামা সম্পাদন করে তা-ই ‘কোর্ট ম্যারেজ’ নামে পরিচিত। প্রচলিত অর্থে কোর্ট ম্যারেজ বলতে সাধারণত হলফনামার মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিয়ের ঘোষণা দেওয়াকেই বোঝানো হয়ে থাকে। এ হলফনামাটি ২০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে লিখে নোটারি পাবলিক কিংবা প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে সম্পন্ন করা হয়ে থাকে। অর্থাৎ এ হলফনামার মাধ্যমে বর-কনে নিজেদের মধ্যে আইন অনুযায়ী বিয়ে হয়েছে মর্মে ঘোষণা দেন মাত্র। বিয়ে বা বন্ধন হিসেবে আলাদা ভাবে এর কোনো (কোর্ট ম্যারেজ) আইনগত ভিত্তি নেই।

টেলিফোনে বিয়ে কি বৈধ

ইসলামের দৃষ্টিতে অধুনা প্রচলিত টেলিফোনে বিয়ে কোনোক্রমেই জায়েজ নয়। কারণ ইসলামী শরিয়তের বিধা অনুযায়ী বিবাহ সঠিক হওয়ার জন্য সাক্ষী শর্ত। সাক্ষী ছাড়া বিবাহ হয় না। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “সাক্ষী ছাড়া কোনো বিবাহ হয় না।“ (জামে তিরমিজি, বিয়ে অধ্যায়, অনুচ্ছেদঃ সাক্ষী ছাড়া বিবাহ হয় না)। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত অপর এক হাদিসে রয়েছে, ‘যেসব মহিলা সাক্ষী ছাড়া বিবাহ করে তারা ব্যভিচারিণী।’ ইমাম তিরমিজির উপরোক্ত হাদিস দুটি বর্ণনা করার পর লিখেন, এ ধরনের হাদিসের ভিত্তিতেই সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন তাবে-তাবেঈন ও চার মাজহাবের ইমামরা বলেছেন, সাক্ষী ছাড়া কোনো বিবাহ হয় না। এ বিষয়ে তাদের মধ্যে কোনো ধরনের মতবিরোধ নেই। সবাই এ ব্যাপারে একমত। ফিকহ ও ফতোয়ার কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে, “কোনো দুজন মুসলমান নর-নারীর বিয়ে দুজন স্বাধীন, সুস্থ জ্ঞানসম্পন্ন, প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দুজন মহিলা সাক্ষীর উপস্থিতি ছাড়া সংঘটিত হবে না।“ (হিদায়া-দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ. ২৭৬, শামি চতুর্থ খণ্ড, পৃ. ৮৬-৮৭, আলমগীরি-প্রথম খণ্ড, পৃ. ২৬৭ ইত্যাদি)।

বিয়ে করতে কি প্রস্তুতির দরকার হয়

প্রশ্ন হলো, আপনি কীভাবে জানেন যে আপনি আসলেই বিবাহ করতে প্রস্তুত? আর আরো সূক্ষ্মভাবে বললে, আপনি যে আপনার পছন্দ করা একজন নির্দিষ্ট মানুষকেই বিয়ে করতে প্রস্তুত তা কী করে নিশ্চিত হলেন? আপনি বিয়ের জন্য প্রস্তুত কিনা, এটা জানার জন্য আপনার নিজেকে জানা জরুরি। এই কারণে কিছু ব্যক্তিগত হিসাব করতে বসতে হবে নিজের ভালো দিকগুলো জানতে আর নিজের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করতে। আপনি কি আসলেই আপনার জীবনটা অন্য কারো সাথে ভাগাভাগি করতে প্রস্তুত? আপনি কি আপনার পরিবার গঠনের জন্য দ্বায়িত্ব নিতে, বিভিন্ন বিষয়ে কম্প্রোমাইজ করতে, সঙ্গী/সঙ্গিনীর সাথে একত্রে কাজ করতে, আপনার ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক লক্ষ্যগুলো পূরণের জন্য প্রস্তুত? বিয়ের পর পরিবারে আপনি কতটুকু অবদান রাখবেন সেটা জানা গুরুত্বপূর্ণ এবং একটা স্বাস্থ্যকর, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবার গঠন করতে আপনি কতখানি কী করতে পারবেন, করতে চান — সেটা জানাও জরুরি। আপনি আসলেই বিবাহ করতে চান কিনা এবং বিবাহ করতে প্রস্তুত কিনা, তা জানার জন্য বিবাহপূর্ব প্রস্ততির জ্ঞান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া বেশিরভাগ মানুষকেই দেখা যায় তারা কী — এটা বুঝার আগেই তারা বিয়ে করে ফেলে, ফলে নানাবিধ জটিলতা হয়, অস্বস্তিকর পারিবারিক সম্পর্কের পেছনে এর ভূমিকা থাকে। বিয়ের আগে কিছু চিন্তা রাখা প্রয়জন।

▪আপনার বাচনভঙ্গী, শব্দচয়ন, মোটকথা কমিউনিকেশন স্কিল।
▪বাজেট করা এবং টাকা পয়সার হিসেব করা।
▪রাগকে সংযত করতে পারা।
▪আপনার সাথে কারো সমস্যা হলে কীভাবে তা সামলান।
▪সম্পর্কের টানাপোড়েন হলে সমাধান করার ব্যাপারে আপনার প্রস্তুতি।

বিয়ের জন্য এই সবগুলোই খুব দরকারি গুণাবলী। তাই এইসব ব্যাপারে সম্ভব হলে কারো সাথে কাউন্সেলিং করে নেয়া উচিত।

সম্ভাব্য পছন্দ – যখন কেউ সম্ভাব্য জীবনসঙ্গী নির্বাচনের কাছাকাছি চলে আসেন, তখন থেকেই ইস্তিখারা নামায আদায় করা প্রয়োজন, পরিবারের এবং বন্ধুদের মাঝে যারা জ্ঞানী এবং প্রজ্ঞাসম্পন্ন মানুষ তাদের সাথে আলাপ করা দরকার। আলাপ ও উপদেশের জন্য যিনি ধর্মীয় জ্ঞানে এবং আচরণে উন্নত, এমন মানুষের পরামর্শই নেয়া দরকার।

পরিশেষে – বিয়ে হলো দ্বীনের অর্ধেক। এটি জীবনে নেয়া সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটা। তাই সম্ভাব্য জীবন সঙ্গীর ব্যাপারে, তার আচার-আচরণ সম্পর্কে, তার চরিত্র সম্পর্কে যতটুকু সম্ভব খোঁজ নেয়া ভালো। আর তার স্বভাব, ব্যবহারের সাথে অপরজনের মিলবে কিনা, এটা নিয়ে চিন্তাভাবনার প্রয়োজন আছে।

62 total views, 1 views today

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে

About ইমন

আমি মহা মানব নই, আমি একজন সাধারণ মানুষ। তাই আমার এপিটাফ হবে আমার মতই সাধারণ, কালের গর্ভে এটিও হারিয়ে যাবে, যেমনটা হারায় একজন সাধারণ মানুষ।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন