বাবা মা যেন সন্তানের কাছে বোঝা না হয়

বাবা মা যেন সন্তানের কাছে বোঝা না হয়
4.4 (88%) 5 votes

বাবা মা আমাদের কাছে সবচেয়ে বেশি সম্মানিত এবং আপনজন। বাবা মা তার সন্তানকে যেমন ভালবাসে পৃথিবীতে আর কেউ এতো ভালোবাসতে পারেনা। তাই আমাদের ও উচিত বাবা মা কে ভালবাসা এবং সন্মান করা। কেননা, জন্মের পর সর্ব প্রথম যে দোলনায় দুলেছিলাম তা আমার মায়ের তুলতুলে দোলনা। চোখ খুলে প্রথমে যে আখি দেখেছিলাম তা আমার মায়ের মায়াবি আঁখি। শুরুতে যে মোবারক চেহারা দেখেছিলাম তা আমার মায়ের পবিত্র চেহারা। প্রথমে যে ভাষায় কথা বলেছিলাম তা আমার মায়ের ভাষা। আকাশের নিচে আর জমিনের উপর সবচেয়ে প্রিয় আদুরে, পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে দয়ালু, সোহাগি বাবা মা ছাড়া আর কেউ নাই। শিশুর মুখের পবিত্র হাসি মায়ের মনে সুখের ঢেউ তুলে। সন্তানের জন্মলাভ করার পর মানব সন্তানকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বাবা মা যে কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করেন, পৃথিবীর কোনো কিছু দিয়ে তার পরিমাপ করা যাবে না। প্রতি মুহুর্তে শিশুর সেবা সুস্থ্যতা করতে মা-বাবাকে গলদর্ঘম হতে হয়। শিশুর অসুস্থতায় মায়ের ঘুমহীন রাত কাটে। এত কষ্টের পরও মা বাবার সঙ্গে সন্তানের থাকে স্বর্গীয় একটি সম্পর্ক। সন্তানের পড়া-লেখা, খাওয়া-দাওয়া, আর শালিনতার উপর মা-বাবার কতোইনা গুরুত্ব। এসব কারণেই বুঝি বাবা মা আমাদের সবচেয়ে আপন।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

বাবা মা

প্রিয়নবী মুহাম্মাদ (স.) বলেছেন, পিতা-মাতাই সন্তানের জান্নাত ও জাহান্নাম। সত্যিই মা-বাবার সন্তুষ্টিই জান্নাত লাভের সহজ উপায়। আর তাদের অসুন্তুষ্টিই জাহান্নামের অধিবাসী করে দেয়। প্রিয়নবী (স.) আর বলেছেন, মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত। সত্য কথা বলতে গেলে বাবা মা আমাদেরকে নিজের প্রাণের চাইতেও বেশী ভালোবাসেন। আর  সীমাহীন পরিশ্রম করেন আমাদের প্রয়োজন মেটাতে। আমাদের জামা কাপড় আসবাবপত্র সংগ্রহে। আমাদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য কঠোর পরিশ্রম করে শরীরের ঘাম ঝরান। কিন্তু আমরা! আমাদের বন্ধুরা! চিনলাম না তাদের। মা-বাবা যে কত বড় অমূল্য স্বর্গীয় সম্পদ, তা না জানার কারণেই যতসব বিভ্রান্তি আর ভুলে ভরা আমাদের জগৎ সংসার। অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত থেকে আমরা অনেকেই বৃদ্ধ মা-বাবার প্রতি যে অন্যায় আচরণ করে যাচ্ছি।

মা-বাবার প্রতি কৃতজ্ঞতা, আদব, সম্মান, সদ্ব্যবহার ও আনুগত্য করা অবশ্য কর্তব্য। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনের সূরা লোকমানের ১৪নং আয়াতে এরশাদ ফরমান, “আর আমি মানুষকে তার মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে। সন্তানের দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে। নির্দেশ দিয়েছি, আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও এবং মা-বাবার প্রতিও কৃতজ্ঞ হও। অবশেষে আমার কাছেই ফিরে আসতে হবে।” পবিত্র কুরআনে অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে, “তোমরা সবাই আল্লাহর ইবাদত কর, তার সঙ্গে কাউকে শরীক করনা। মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার কর।” (সূরা আন-নিসাঃ ৩৬) “আমি মানুষকে নিজেদের মা-বাবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছি।” (সূরা আন-কাবুত)। প্রিয়নবী মুহাম্মদ (স.) বলেছেন, “যথা সময়ে নামাজ আদায় করার পর সর্বোত্তম কাজ হচ্ছে পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ, সদ্ব্যবহার করা।” বাইবেল গ্রন্থে বলা হয়েছে, “তোমার পিতা ও তোমার মাতাকে সম্মান প্রদর্শন করো।
কার্ডিনাল মারমিলড বলেছেন, “মা হচ্ছেন তিনি যিনি অন্য সকলের স্থান পূরণ করতে পারেন, কিন্তু তার স্থান কেউ পূরণ করতে পারবে না।” কবি রবার্ট ব্রাউনিং বলেছেন, “মাতৃত্বই সকল ভালোবাসার শুরু এবং শেষ।” দক্ষিণ আফ্রিকার লেখক স্রেইনার বলেছেন, “এমন কোনো মহান ব্যক্তি ছিলেন না, যার একজন মহান মা ছিলো না।” মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন বলছেনন, “যা কিছু তিনি হয়েছেন বা হবেন, তার জন্য তিনি তার মা এর কাছে ঋণী।” মার্কিন কবি রালফ ওয়ালজে এমারসন বলেছেন, “মানুষ তাই যা তার মা তাকে বানায়।” এক কথায় পৃথিবীর সকল ধর্মে বাবা মায়ের সঙ্গে উত্তম ব্যবহার ও যথাযোগ্য মর্যাদা দেখানোর নির্দেশ রয়েছে। আমাদের যাদের বাবা মা আছে। মা আমাদের আদর করেন। স্নেহ ভালবাসা আর মায়া মমতা দিয়ে কোলে তুলে নেন। গাল ভরে চুমো খান। বাবা অতি সোহাগ করে আমাদের প্রতিপালন করেন, আমাদের উচিত মা-বাবার সঙ্গে হাসি মুখে কথা বলা। তাদের সর্বদা সম্মান করা। তাদের সঙ্গে আদৌ রাগ না করা, তাদের কথা মান্য করা। যে কোনো আদেশ মেনে নেয়া। কখনো তাদের অবাধ্য না হওয়া। মাকে আদর করে মায়াবি সূরে ডাকা। বাবাকে শ্রদ্ধা ভরে ডাকা, মা-বাবাকে পেলেই সালাম দেয়া। তাহলে কি হবে? বাবা মা প্রাণ খুলে মন উজাড় করে দোয়া করবেন। আর আমরা সকলেই জানি মা-বাবার দোয়া পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ দোয়া। হযরত খিজির আলাইহিসসালাতু ওয়া-সাল্লাম, হযরত আবদুল কাদের জীলানি রাহমাতুল্লাহি তাআলা আলাইহি ও হযরত বায়েজিদ বোস্তামি রাহমাতুল্লাহি তাআলা আলাইহি এদের ইতিহাস তো আমরা অনেকেই জানি। এরা তো মা-বাবার দোয়ায় এই বিশ্বে ইতিহাস হয়ে আছেন। কিন্তু আমি! আমরা! আমাদের সন্তানেরা! আমার বন্ধুরা! কী রকম আচরণ করছি তাদের সঙ্গে। প্রতিটি সন্তান মাত্রই তার মায়ের আদর, সোহাগ ও স্নেহ পায় তা এক বাক্যে স্বীকার করতে হবে। কতো রাত মায়ের নির্ঘুম কেটেছে। কতো কষ্ট না জানি আমার বাবা করেছেন। তাদের সঙ্গে হাসি মুখে কথা বলা ভদ্র ও সুন্দর আচরণ করা প্রতিটি সন্তানের অবশ্যই দায়িত্ব। আর মুসলমান হিসেবে এটা আমাদের ঈমানী দায়িত্ব। তাই মহান পালনে ওয়ালা পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেছেন, “তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন, তিনি ব্যতিত অন্য কারো ইবাদত না করতে ও মাতা-পিতার প্রতি ভালো ব্যবহার করতে। তাদের একজন বা উভয়ই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে পৌছলে তাদের প্রতি ‘উফ’ তথা বিরক্তি, উপেক্ষা, অবজ্ঞা, ক্রোধ ও ঘৃনাসূচক কোনো কথা বলবে না। আদর করবে। মমতাদেশে তাদের প্রতি নম্রতার সঙ্গে ব্যবহার করবে। আর বলবে, রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বা ইয়ানিস সাগিরা। অর্থাৎ হে আমার প্রতিপালক তাদের প্রতি দয়ার আচরণ কর। যে ভাবে তারা শৈশবে আমাকে প্রতিপালন করেছেন।” (সূরা বনি ইসরাইল: ২৩, ২৪)

বাবা মা কিন্তু বোঝা নয়

মা হল এমন একটা ব্যাংক, যেখানে আমরা আমাদের সব রাগ, অভিমান, কষ্ট জমা রাখতে পারি। আর বাবা হল এমন একটা ক্রেডিট কার্ড,যেটা দিয়ে আমরা পৃথিবীর সমস্ত সুখ কিনতে পারি। সত্যি কথা এটাই। মা বাবা কাছে থাকলে আমরা বুঝিনা মা বাবার কদর। যখন মা বাবা চলে যায় অনেক দূরে তখন খুব মিস করি মা বাবার আদর। সত্যি আমরা সন্তান হিসাবে বড়ই স্বার্থপর। শিশু বেলায় যখন অবুঝ থাকি বলি মা বাবাই সবচেয়ে আপন। আর যখন বড় হয়ে বুদ্ধিমান হই তখন এই মা বাবা হয়ে যায় সবচেয়ে পর। আজ আমরা এতোটাই স্বার্থপর হয়ে গেছি যে একবারও ভাবিনি প্রতিটি সন্তানেই মা বাবার স্বাদ নেবে, তবে আমাদের সন্তানও যদি আমাদের সাথে এমন বাজে ব্যবহার করে তখন কেমন লাগবে?

খুব লজ্জা লাগে! যে সন্তানের জন্য মা বাবা জীবনের বিনিময়ে গড়ে তুলে নিরাপদ আশ্রয়। সেই সন্তানের জন্যই বাবা মাকে সব ছেড়ে চোখের জলে যেতে হয় বিদ্ধাশ্রম। আমাদের বড় করতে গিয়ে তাদের কতই না কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। তবুও আমরা জেনে না জেনে প্রতিনিয়ত কষ্ট দেই তাদের। ছোট বেলায় যে মা আমাদের একমুঠো ভাত বেশি খাওয়ানোর জন্য হাজারো রূপকথার গল্প শুনাতো, সেই মা-কে আজ আমরা কয়জন জিঙ্গেস করি, মা তুমি খেয়েছো কিনা? খুব কম জনকেই পাওয়া যাবে এক্ষেত্রে। যে মানুষ দু-টি আমাদের লালন পালন করার জন্য সারাটি জীবন এতো কষ্ট সহ্য করে যায়,তার মনও তো শুনতে ইচ্ছে করে। সেই ৫ মাসের ছোট্র খোকাটি আজ কত্তো বড় হয়েছে তার খাওয়ার খোঁজ খবর নিচ্ছে। বিশ্বাস করুন কথাটি শুনে মানুষ দুটি এতোটা এতোটা আনন্দিত হবে যা লক্ষ্য টাকা দিয়েও কেনা সম্ভব নয়। আপনি যদি কোনো দিন জিজ্ঞেস না করে থাকেন তাহলে আজই বলে দেখুন, ফলাফল কতোটা প্রাপ্তির হয়। হয়তো অনেকই আছেন যারা প্রতিনিয়ত বাবা-মার সকল খোঁজ খবর নেন। তাদের ব্যাপার আলাদা, সেই সব ছেলেদের থেকে শুনে দেখুন তাদের প্রাপ্তি কতো গভীর।

আফসোস আমরা আজ এতোটাই হতোভাগা যে তাদের জন্য আজ আমাদের কোনো সময় নেই। চায়ের দোকান, কলেজের ক্যাম্পাসে, ফেসবুকে কতই না সময় অযথা গল্প করে নষ্ট করি। সেখান থেকে অল্প একটু সময় আমরা বের করতে পারিনা বাবা মায়ের জন্য। ঘন্টার পর ঘন্টা প্রেমিক-প্রেমিকার সাথে ফোনে কথা বলার সময় থাকে আমাদের। আর বৃদ্ধ বাবা-মা’র সাথে ১০ মিনিট বসে কথা বলার সময় নেই।
সকাল বিকেল ফেসবুকে অচেনা মেয়েদের মেসেজ দিয়ে খাওয়ার কথা জিঙ্গেস করার সময় থাকে আমাদের। কিন্তুু আপন দু-টি মানুষ চোখের সামনে থাকার পরেও জানতে ইচ্ছে করেনা-“মা তুমি খেয়েছো কিনা রাতে” জানার আগ্রহ জাগেনা-” বাবা তোমার শরীর টা কেমন”?

এই লজ্জা কার? এই লজ্জা কোনো সমাজের নয়, লজ্জা আমাদের। হয়তো আমিও এর ভুক্তভোগী তবে সর্বদা চেষ্টা করে যাই তাদের খেয়াল রাখার। বাকীটা আল্লাহই জানে। পরিশেষে বলতে চাই-দুনিয়ার এই কঠিন ব্যস্ততা থেকে একটু সময় বের করে বাবা মায়ের সেবা করুন। হয়তো আপনি আজ বড় কোনো অফিসের বস অথবা আপনার কথায় হাজার হাজার মানুষ ওঠা বসা করে, আপনার ১ মিনিটের মূল্য হাজার টাকার সমান। কিন্তুু কি হবে এসব কিছুতে? হয়তো আরাম আয়েশ করে যাবেন আর সন্তানদের জন্য জমা করে যাবেন। আর সেই সন্তান টাই যদি ভুলে যায় আপনাকে, ঠিক আপনি যেমন ভুলে গেছেন আপনার বাবা মা কে। তখন কেমন লাগবে আপনার? নিশ্চয় অনেক খারাপ। তাই নিজেকে সব সময় বর্তমান থেকে চিন্তা না করে অতীত-ভবিষ্যতের সাথে মিলিয়ে নিবেন। তাহলে বিবেক বোধই আপনাকে উওর দিবে! ভালো থাকি আমরা, ভালো রাখি আপন দুটি মানুষ বাবা মা কে। তবেই সুন্দর হবে আমাদের ভূবন। বাবা মা  যেন আমাদের কাছে বোঝা না হয় কখনো।

283 total views, 1 views today

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে

About ইমন

আমি মহা মানব নই, আমি একজন সাধারণ মানুষ। তাই আমার এপিটাফ হবে আমার মতই সাধারণ, কালের গর্ভে এটিও হারিয়ে যাবে, যেমনটা হারায় একজন সাধারণ মানুষ।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন