বাংলা আমার প্রাণের মাতৃভাষা

বাংলা আমার প্রাণের মাতৃভাষা
3 (60%) 1 vote

বাংলা পৃথিবীর প্রাচীনতম ভাষাগুলোর মধ্যে একটি। বাংলা ভাষার সঠিক ইতিহাস আমাদের অনেকেরই অজানা। বিভিন্ন পন্ডিতদের ধারনা, চর্যাপদের ভাষাতেই বাংলা প্রথম সাহিত্যিক রূপ লাভ করেছে। ভৌগলিক সীমারেখায় বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, মায়ানমারের আরাকান রাজ্য ছাড়াও বিভিন্ন প্রান্তের বাংলাভাষী মানুষ বাংলায় কথা বলছে। তার মানে বিশ্ব দরবারে বিশাল একটা বাংলাভাষী জনগোষ্ঠী তৈরি হচ্ছে।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

বাংলা

বাংলা ভাষার উৎপত্তি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে গিয়ে পন্ডিতগণকে একটি জটিল প্রক্রিয়া অতিক্রম করতে হয়েছে। সংস্কৃত পন্ডিতদের মতে, বাংলা ভাষা সংস্কৃতের কন্যা। অন্যদিকে স্যার জর্জ গ্রিয়ারসনের মতে, বাংলা ভাষার উদ্ভব হয়েছে মাগধী প্রাকৃত থেকে। ডক্টর সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় স্যার জর্জ গ্রিয়ারসনকে সমর্থন করেছেন। কিন্তু ড. মুহাম্মদ শীহদুল্লাহর মতে, বাংলা ভাষার উদ্ভব হয়েছে গৌড়ীয় অপভ্রংশ থেকে।
ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ সংস্কৃত পন্ডিতদের মতো খন্ডন করে বলেছেন, সংস্কৃত কখনো বাংলা ভাষার জননী হতে পারে না। কারণ, ভাষা প্রবাহের মধ্যে বাংলার পূর্বে অপভ্রংশ, তার পূর্বে প্রাকৃত যুগ দেখা যায়। সংস্কৃত ছিল প্রাকৃত যুগের সমসাময়িক একটি সাহিত্যিক ভাষা। এর প্রচার ব্রাহ্মণ্য সমাজেই সীমাবদ্ধ ছিল। জন সাধারণের মধ্যে এর ব্যবহার ছিল না। সে জন্য সংস্কৃত যুগ বলতে পৃথক যুগ অনুমান করা যায় না। প্রাকৃতের পূর্বে ছিল প্রাচীন প্রাকৃতের যুগ। আর এর সাহিত্যিক রূপ আমরা পালি ভাষায় দেখতে পাই। প্রাচীন প্রাকৃতের পূর্বে ছিল প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষার যুগ। সুতরাং, দেখা যাচ্ছে, সংস্কৃতের সঙ্গে বাংলা ভাষার প্রত্যক্ষ কোনো সম্পর্ক নেই। এ প্রসঙ্গে কয়েকটি সাধারণ প্রচলিত শব্দের দ্বারা উদাহরণ দেয়া যায়। যেমন- বাপ, মা, বোন, গরু, হাত, পা, গাছ প্রভৃতি বাংলা শব্দগুলো কখনো সংস্কৃত পিতা, মাতা, ভগিনী, গো, হস্ত, পদ, বৃক্ষ শব্দ হতে প্রত্যক্ষভাবে ব্যুৎপন্ন হতে পারে না। এদের প্রাকৃত রূপ যথাক্রমে বাপ্পা, মাআ, বহিনী, গোরূআ, হত্থ, পাঅ, গচ্ছ। এই সকল প্রাকৃত শব্দের ক্রমশ পরিবর্তনে বাংলা শব্দের ব্যুৎপত্তি হয়েছে। আদিম প্রাকৃত থেকে বাংলা পর্যন্ত ভাষার স্তরগুলো বিচার করলে দেখা যায় বাংলা সংস্কৃতের কন্যা ভাষা নয়।

স্যার জর্জ গ্রিয়ারসনের মতে, বাংলা মাগধী প্রাকৃত হতে মাগধী প্রাকৃতের অপভ্রংশের মধ্য দিয়ে উৎপন্ন হয়েছে। ভাষা বিজ্ঞানী ড. সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় এ মতকে সমর্থন করেছেন। তাঁরা দু’জনেরই এক মত, বাংলা ভাষা আসামি, উড়িয়া ও বিহারী ভাষাগুলোর সহোদরা। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এই মতের বিপক্ষে মন্তব্য প্রদান করেছেন। তাঁর মতে, বাংলা ও তার সহোদরা ভাষাগুলো মাগধী প্রাকৃত থেকে উৎপন্ন হয়নি। কেবল কিছু সংখ্যক শব্দের প্রমাণে ভাষার উৎপত্তি নির্ণয় করা বিজ্ঞান সম্মত নয়। কারণ, এক উপভাষা থেকে অন্য উপভাষার শব্দের ঋণ গ্রহণ সাধারণ ঘটনা। বাংলা ভাষার উৎপত্তি গৌড় অপভ্রংশ থেকে।

শ্রুতি মধুর বাংলা ভাষায় আজ আমরা মনের ভাব, আবেগ, উচ্ছ্বাস প্রকাশ করি। কিন্তু অনেক প্রতিকূলতা ডিঙ্গিঁয়ে বাংলা ভাষা আজকের এই অবস্থানে এসেছে। পেছনে ফিরে তাকালে আমরা দেখি তৎকালীন গণ পরিষদে বাংলা ভাষার ব্যবহার সিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে কুমিল্লার সন্তান ধীরেন্দ্র নাথ দত্তের আনীত প্রস্তাব অগ্রাহ্য হলে ভাষার দাবি ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি আন্দোলনে রূপ নেয়। আর সেই আন্দোলনে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালালে রাজপথে শহীদ হন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরও অনেকে। রক্তের ইতিহাস আমাদের আরও আছে। তবে ভাষার জন্যে বাঙালির যে আত্মত্যাগ সেটা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণালী আভা ছড়ায়। যার জন্য প্রতি বছর একুশ এলে আমরা বাঙালিরা যেন নতুন করে প্রেরণা পাই। শহীদ মিনার সাজাই নতুন করে। আনন্দে রাজপথে বের হই শহীদ মিনারে যাবো বলে। ফুলে ফুলে আমরা ভরিয়ে দেই শহীদ মিনার।

বায়ান্ন, ঊনসত্তর, একাত্তর আমাদের হৃদয় মণিকোঠায় গাঁথা কয়েকটি শব্দ। এই শব্দগুলো আমরা বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলন থেকে উচ্চারণের অধিকার পেয়েছি। পেয়েছি বলেই আজ আমরা গর্ব করে বলতে পারছি বাংলা আমার মাতৃভাষা! বাংলা প্রাণের ভাষা! একবার দেখি, বার বার দেখি, দেখি এই ভাষার রূপ। ত্যাগের মহিমা আর রূপের সুধা নিয়ে বাংলা ভাষা আরও বিকশিত হোক। সকল অলি-গলি পেরিয়ে বিশ্ব বাসীরও প্রিয় ভাষা হয়ে যাক। একুশে ফেব্রুয়ারির এই দিনে এমনটা আমরা চাইতে পারি। বাংলা ভাষা, আমার মাতৃভাষা- তুমি জেগে থাকো অনন্তকাল। বাংলা ভাষা! আমার প্রাণের ভাষা! তুমি আমার অহংকার।

তবে একটি বিষয় না বললেই নয়। বর্তমান নতুন প্রজন্ম না শিখেছে ইংরেজি না শিখেছে বাংলা। একটি খিচুরি কেজো ভাষা শিখেছে যা দিয়ে গ্রাসাচ্ছদন হয়তো করা যায়। উনিশ শতকে বাংলা ভাষার পক্ষ নিয়ে যাঁরা কাজ করছিলেন তাঁরা কেউ ভাষার ক্ষেত্রে নেতিবাচক ভূমিকা গ্রহণ করেননি। বাংলা ভাষায় কী করে সুললিতভাবে সমকালীন ভাবনাকেও প্রকাশ করা যায়, বঙ্কিমের মতো ভাষাভাবুক সেই দায়িত্ব নিয়েছিলেন। আর রবীন্দ্রনাথ ইংরেজি কীভাবে এবং কতটা পড়াতেন তাঁর স্কুলে, সে বৃত্তান্ত তো একটু চেষ্টা করলেই জানা যায়। যেমন ম্যাথু আর্নল্ডের কবিতা পড়াতে গিয়ে কবি কী পরিশ্রম করেছেন তা ভাবলে অবাক লাগে। কবিতার মূল বাক্যগুলোকে নানা রূপের ইংরেজি গদ্যে তর্জমা করে শোনাচ্ছেন লেখাচ্ছেন পড়ুয়াদের। কবি আসলে জানতেন অপর ভাষার সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে বাংলা বাঁচবে না।

বর্তমানে আপত্তিকর মিশ্র ভাষার উদ্ভব ঘটছে বাংলায়, যা আবার আধুনিকতার ও বিশেষ ঐতিহ্যের আবরণে যুক্তিগ্রাহ্য করে তোলার চেষ্টা চলছে। ইংরেজি-হিন্দির যুক্তিহীন বা জবরদস্তির দূষণে ভাষার অন্তর্নিহিত শক্তি দুর্বল হচ্ছে। নতুনত্বের নামে, স্থানিক চেতনার নামে এ মিশ্রণ আসলেই ভাষিক দূষণ। এ জাতীয় দূষণে বেশ কিছুকাল থেকে শক্তিমান ভূমিকা পালন করছে এফএম রেডিওর অরুচিকর পাচন, যা আবার বিনোদনের নামে তরুণদের প্রভাবিত করছে। এ দূষণ মূলত শাব্দিক ও ভাষিক। সংশ্লিষ্ট সাংস্কৃতিক কর্তৃপক্ষের এ বিষয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। একই রকম উদাহরণ দেখা যায় টিভির টকশো নামীয় উদ্ভট ভাষিক লড়াইয়ের জায়গাগুলোতে। সেখানে টকের চেয়ে তেতো ঝাঁজই বেশি। রাজপথে বের হলে চোখে পড়বে দোকানের নামপত্রে, সাইনবোর্ডে, বিজ্ঞাপনী বার্তায় বাংলা বানান ভুলের মহোৎসব। কোথাও কোথাও তা মারাত্মক চরিত্রের এক সরণির বানান যে কত মাত্রায় পরিস্ফুট, তা দেখে চমকে যেতে হয়। তাছাড়া দোকানপাটের নামকরণে ‘দি’, ‘এন্ড’ এবং ‘নিউ’র ব্যবহার মহামারীর চরিত্র ধারণ করেছে। তাছাড়া রয়েছে অনুষ্ঠানাদিতে, আমন্ত্রণপত্রে ইংরেজির একচেটিয়া আধিপত্য। যে বাঙালি-গৃহকর্তা একসময় সবরকম নিমন্ত্রণপত্রে, সন্তান বা আবাসন বা বাসস্থানের নামকরণে বাংলা ব্যবহারে গর্ববোধ করতেন, তাঁদের বা তাঁদের উত্তরসূরি প্রায় সবারই বর্তমান গর্ব ইংরেজি ভাষার ব্যবহারে। আগে সংস্কৃতি মনস্ক মানুষ বিভিন্ন উপলক্ষে একসময় বই উপহার দিয়ে আনন্দ পেতেন তাঁর উত্তরসূরিদের কাছে সে রীতি এখন বৈষয়িক বিবেচনায় মূল্যবান আধুনিক সামগ্রী উপহারে বিকোয়। অলঙ্কার বা দামি পোশাক-পরিচ্ছদ সাংস্কৃতিক মননশীলতার জায়গাটি দখল করে নিয়েছে। ভাষা বা ভাষিক সংস্কৃতি এমনই ভাবে নানা মাত্রায় বিপন্ন অবস্থানে পৌঁছে গেছে। ‘বাংলা আমার গর্ব, বাংলা আমার অহংকার’- এর আবেগ এখন নানা টানে ফেরারি।

72 total views, 1 views today

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন