বাংলা ছবি এবং তার অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ

বাংলা ছবি এবং তার অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ
5 (100%) 3 votes

বাংলা ছবি দেখতাম ছোটবেলায়। শুক্রবার আর শনিবার মানেই দুপুর তিনটার সংবাদের পর পূর্নদৈর্ঘ্য বাংলা ছবি। আজ থেকে পনের বছর আগের কোন শুক্রবারের কথা যদি মনে করি তাহলে কোন আনন্দময় বিকেলের কথা মনে পড়ে। কারণ এই দিনটিতে বিকাল থেকে টেলিভিশনে বাংলা ছবি হতো। গ্রামে একটা দুইটার বেশি টেলিভিশন ছিলো না। প্রাইমারিতে যে কয়জনের সাথে ভালো বন্ধুত্ব ছিলো সবাই মিলে দল বেধে সিনেমা দেখতে যেতাম আমাদের হেডস্যারের বাড়িতে। বেশির ভাগ সময় খুব সহজে ভেতরে ঢুকতে দিতো না। টিনের ঘরের বেড়ার ফাঁক দিয়ে কিংবা দরজার নিচ দিয়ে সিনেমা দেখার চেষ্টা করতাম। যখন মুরব্বি কেউ আসতো তখন তার সাথে সুকৌশলে ভেতর ঢুকার একটা চেষ্টা করতাম। আমার সবচেয়ে পছন্দের নায়ক ছিলেন সালমান শাহ আর মান্না। অভিনয়কে একটি নতুন মাত্রা এনে দিয়েছিলেন তারা। কিন্তু ক্রমেই এই বাংলা সিনেমার উপর থেকে আগ্রহ উঠে যেতে থাকে মানসম্পন্ন সিনেমার অভাবে।

বাংলা ছবি

বাংলা ছবি যেভাবে এলো

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

ভারতীয় উপমহাদেশে চলচ্চিত্রের পথচলার শুরুটা বলা যায় ১৮৯৮ সালের দিকে। মানিকগঞ্জের হিরালাল সেনের হাত ধরেই এই অঞ্চলে চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু। ঢাকায় সর্বপ্রথম চলচ্চিত্র নির্মিত হয় ১৯২৭-২৮ সালে। সেটা ছিল নওয়াব পরিবারের কিছু তরুণের উদ্যোগে, যার পরিচালকের ভূমিকায় ছিলেন অম্বুজপ্রসন্ন গুপ্ত। ১৯৪৬ সালে বিশিষ্ট সাংবাদিক ওবায়েদ উল হক, হিমাদ্রী চৌধুরি ছদ্মনাম নিয়ে ‘দুঃখে যাদের জীবন গড়া’ নামক বাংলা ছবি প্রযোজনা ও পরিচালনা করেন। ‘দুঃখে যাদের জীবন গড়া’ চলচ্চিত্রটি কলকাতায় নির্মিত হলেও বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল। এটি বাংলাদেশের প্রথম কোনো মুসলিম পরিচালকের হাতে নির্মিত পূর্ণাঙ্গ বাংলা ছবি। এর পরের বছরই ইসমাইল মুহাম্মদ নির্মাণ করেন ‘মানুষের ভগবান’ এবং ১৯৪৮ সালে নাজীর আহমেদ ‘ইন আওয়ার মিডস্ট’ নামে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন যা উপমহাদেশের সর্বপ্রথম তথ্যচিত্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ভাষা আন্দোলনের পরে তাঁর পরিচালনায় দ্বিতীয় প্রামাণ্যচিত্র ‘সালামত’ নির্মিত হয়। ১৯৫৪ সালে বেশ কজন প্রথিতযশা ব্যক্তির সমন্বয়ে ‘ইকবাল ফিল্মস’ এবং ‘কো-অপারেটিভ ফিল্ম মেকার্স লিমিটেড’ গঠিত হয়। ১৯৫৫ সালের জুন মাসে সরকারি ফিল্ম স্টুডিও চালু হয়। ১৯৫৫ সালে ইকবাল ফিল্মস- এর ব্যানারে আব্দুল জব্বার খানের পরিচালনায় প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ দিয়ে বাংলাদেশে চলচ্চিত্রের নতুন দিগন্তের সূচনা হয়। ১৯৫৭ সালে চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা (এফডিসি) প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ১৯৫৯ সাল থেকে প্রতি বছর বাংলা ছবি মুক্তি পেতে থাকে। তৎকালীন এফডিসি ছাড়াও পপুলার স্টুডিও, বারী স্টুডিও এবং বেঙ্গল স্টুডিও চলচ্চিত্র প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এফডিসি প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর বেশকিছু যোগ্য পরিচালক চলচ্চিত্র নির্মাণে এগিয়ে আসেন। ষাটের দশকে বাংলা চলচ্চিত্রের বৈপ্লবিক উন্নতি দেখা যায়। জহির রায়হান, খান আতাউর রহমানের মতো কীর্তিমান নির্মাতারা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাদের উজ্জ্বল হস্তাক্ষর রাখা শুরু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের চাহিদা ও গ্রহণযোগ্যতা দিন দিন বাড়তে থাকে। বাণিজ্যিক প্রসারের পাশাপাশি নান্দনিক দৃষ্টিকোণ থেকেও চলচ্চিত্রের শৈল্পিক মূল্য বৃদ্ধি পায়। সত্তরের দশকের কীর্তিমান কজন পরিচালকের মধ্যে সুভাষ দত্ত, আমজাদ হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, নারায়ণ ঘোষ মিতা উল্লেখযোগ্য। মসিউদ্দিন শাকের ও শেখ নেওয়ামত আলীর যৌথ পরিচালনায় নির্মিত ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ বিশ্বের দরবারে বাংলা ছবি বা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে নতুন ভাবে তুলে ধরে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে আলমগীর কবির, জহিরুল হক, ঋত্বিক ঘটক প্রমুখ নির্মাতা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে বিশেষ মানে উন্নীত করেন এবং বহু গুণী নির্মাতার অগণিত বাংলা ছবি দর্শক প্রিয়তা লাভ করে। আশির দশকে চাষী নজরুল ইসলাম ও কাজী হায়াত নির্মিত চলচ্চিত্র ছাড়া অল্প কিছু ভালো চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। এ সময় থেকেই চলচ্চিত্রের বাণিজ্যিকীকরণে মনোনিবেশ এবং ভারতীয় চলচ্চিত্রের কাহিনী নকল করা শুরু করায় চলচ্চিত্রের শিল্পগুণ কমতে থাকে।

বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের অশ্লীল রূপ দেখা যেতে শুরু করে নব্বই দশকের গোড়ার দিক থেকেই। যার ফলে দর্শকদের একটা বড় অংশ সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখা প্রায় বন্ধ করে দেয়। ২০০০ সাল থেকে ২০০৫ সাল ছিল বাংলাদেশি বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে মাত্রাহীন অশ্লীলতা ব্যবহারের অন্ধকার সময়। একবিংশ শতাব্দীর নির্মাতাদের মধ্যে তারেক মাসুদ, চাষী নজরুল ইসলাম, তানভীর মোকাম্মেল, কাজী মোরশেদ, হুমায়ুন আহমেদ, নাসির উদ্দিন ইউসুফ, মোস্তফা সরওয়ার ফারুকী, গিয়াস উদ্দিন সেলিমরা হচ্ছেন অগ্রদূত। অস্কারে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য পাঠানো হয় তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’। এটাই বাংলাদেশি কোনো চলচ্চিত্রের প্রথম অস্কার ভ্রমণ। ২০০৬ সাল থেকে এর ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ থাকে। ওই বছর থেকে এখন প্রায় নিয়মিত ভাবেই অস্কারে যাচ্ছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র। এটা অবশ্যই আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য সামগ্রিক ভাবে একটা ইতিবাচক দিক। অস্কারে যাওয়ার ধারাবাহিকতায় এক সময় হয়তো কোনো গুণী নির্মাতার হাত ধরে অস্কার পুরস্কার জিতবে বাংলাদেশের কোনো চলচ্চিত্র। মানসম্মত চলচ্চিত্রের জন্য ঢালিউডকে চিনবে পুরো বিশ্ব। এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প।

ঈদ এবং বাংলা ছবি

ঈদের সেরা আকর্ষণ ছিল বাংলা ছবি গুলো। সেইসময়ে ঈদে মুক্তি পেতো দারুন সব জমজমাট তারকাবহুল ছবি। ঈদে বাংলা ছবি সিনেমা হলে না দেখলে আমাদের ঈদের আনন্দটাই পূর্ণ হতো না। প্রতিটি সিনেমা হল ঘুরে ঘুরে সপ্তাহ ধরে ঈদের ছবিগুলো দেখতাম। ঈদের ছবি ‘লড়াকু ‘ দিয়েই চলচ্চিত্রে এসেছিলেন কংফু নায়ক রুবেল , বাংলা চলচ্চিত্রের ‘ফ্যাশন আইকন’ চিরসবুজ সালমান শাহ , রিয়াজ, চিত্রনায়িকা মৌসুমি , সোনিয়া প্রমুখও। ঈদের ছবির মাঝেই কুংফু নায়ক রুবেলকে পেয়েছিলাম বলিউডের সালমানের রোমান্টিক চরিত্রে ‘স্বজন’ ছবিতে। ঈদের ছবিতেই পেয়েছিলাম কাঞ্চন মৌসুমি , রুবেল মৌসুমি জুটির মতো নতুন নতুন জুটি । মাসখানেক আগ থেকেই ঈদের ছবিগুলোর বিজ্ঞাপন দিতো  পত্রিকায় ও বাংলাদেশ বেতারে যা আমরা নিয়মিত লক্ষ্য রাখতাম । এই বিজ্ঞাপনের উপরেই নির্ভর করতো আমরা কোন ছবিটি আগে দেখবো আর কোনটি পরে দেখবো তা। চাঁদরাতের সন্ধ্যায় পাড়ার বন্ধুরা মিলে রিক্সা, বাইসাইকেলে সারা শহরের সবগুলো সিনেমাহল ঘুরে ঘুরে জেনে নিতাম কোন ছবি কোন হলে এসেছে। ঈদের ছবির মাঝে নিয়মিত থাকতেন জসিম ,আলমগীর, সোহেল রানা, রুবেল, মান্না, ইলিয়াস কাঞ্চন আর সালমান শাহ সহ আরো অনেক তারকা।  একেকটি ছবি থেকে একেকটি ছবি দারুন লাগতো। পরিলচালকদের মধ্যে দেলোয়ার জাহান ঝনটু, শহিদুল ইসলাম খোকন, শিবলি সাদিক, মোতালেব হোসেন, মনোয়ার খোকন, মমতাজুর রহমান আকবর, দেওয়ান নজরুল , সোহানুর রহমান সোহান, গাজী মাজহারুল আনোয়ারের, আমজাদ হোসেন, এ জে মিন্টু’র মতো বাঘা বাঘা ও সফল পরিচালকদের ছবিগুলো ঈদে মুক্তি পেতো । নবীন প্রবীণ সেরা পরিচালকদের দারুন সব ছবি দেখার জন্য প্রতিটি সিনেমা হলে দর্শকদের উপচে পড়া ভিড় থাকতো । সেই সুযোগে সিনেমা হলের ব্ল্যাকার’রা টিকেটের দাম ৫ থেকে ৭/৮ গুন বেশি কখনও কখনও ১০ গুন বেশিও দাবী করতো । সিনেমা পাগল মানুষেরা সেইসব তোয়াক্কা না করেই যে যার আগে টিকেট কেটে সিনেমা হলে ঢুকার চেষ্টা করতো আর পছন্দের তারকার পছন্দের বাংলা ছবি দেখে তৃপ্তি নিয়ে ঘরে ফিরতো। ছবি দেখার পর বন্ধুদের আড্ডায় যে যার প্রিয় তারকার ছবি নিয়ে যুক্তিতর্ক করতো।

ঈদে কতগুলো ছবি দেখেছি সেটা হিসাব করে বলতে পারবো না। শুধু বন্ধুদের সাথে দলবেঁধে সিনেমা হলে দেখা উল্লেখযোগ্য ঈদের ছবিগুলো হলো দেওয়ান নজরুলের কালিয়া, বাংলার নায়ক , রাজ্জাকের প্রেম শক্তি, গাজী মাজহারুল আনোয়ারের শর্ত, স্বাধীন, ক্ষুধা, উল্কা, তপস্যা, শহিদুল ইসলাম খোকনের লড়াকু, দুঃসাহস, রাক্ষস, পালাবি কোথায় , মোতালেব হোসেনের হিংসা, স্ত্রী হত্যা, ভালোবাসার ঘর ,এ জে মিন্টুর বিশ্বাসঘাতক , বাংলার বধূ , সোহানুর রহমান সোহানের কেয়ামত থেকে কেয়ামত, স্বজন, বিদ্রোহী কন্যা, দেলোয়ার জাহান ঝনটু’র জজ ব্যারিস্টার, কন্যাদান, হারানো প্রেম ,বাদল খন্দকারের বিশ্বনেত্রী, কামাল আহমেদের অবুঝ সন্তান, নায়ক উজ্জলের পাপের শাস্তি, মুখলেসুর রহমানের স্বপ্নের ঠিকানা , মমতাজুর রহমান আকবরের ডিস্কো ড্যান্সার, কে আমার বাবা, খলনায়ক, গুন্ডা নাম্বার ওয়ান, কুক্ষ্যাত খুনি, জীবন এক সংঘর্ষ, ভয়ানক সংঘর্ষ, নাদিম মাহমুদের মহাসম্মেলন, শাহ আলম কিরনের বিচার হবে , উত্তম আকাশের মুক্তির সংগ্রাম সহ অসংখ্য বাংলা ছবি।

ঈদের ছবিগুলো দেখার প্রস্তুতি নিতাম আমরা প্রায় মাসখানেক আগে থেকে। সেই সময় ঈদে সম্ভাব্য মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিগুলো নিয়ে বাংলাদেশ বেতার ঢাকা কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হতো দারুন সব অনুষ্ঠান । প্রতি ছবির আলাদা আলাদা বিজ্ঞাপনধর্মী বিশেষ অনুষ্ঠানগুলো থাকতো ১০ মিনিটের (সিনেমা বিষয়ক এই ধরণের অনুষ্ঠানগুলো সারা বছরই চলতো)। সেই বিজ্ঞাপন গুলোর উপর আমাদের অনেকাংশে নির্ভর করে বাংলা ছবি বাছাই করতে হতো কোনটা আগে দেখবো আর কোনটা পরে। এর সাথে যুক্ত হতো দৈনিক ইত্তেফাকের সিনেমার বিজ্ঞাপনের পাতা , সাপ্তাহিক চিত্রালির রিপোর্ট, পাক্ষিক ‘ছায়াছন্দ’র রিপোর্ট সব মিলিয়ে ছবি দেখা সেই সময় ছিল আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ ।

আমাদের মাঝে কে রুবেলের ভক্ত, কে মান্না’র ,কে কাঞ্চনের আর কে সালমান , কে ওমর সানির ভক্ত তা কোন বিবেচ্য বিষয় ছিলো না । যে যার ভক্ত হোক সবাই ছবি দেখতে যাবো একসাথে । সবগুলো ছবি দেখতে হবে এই বিষয়ে কোন দ্বিমত ছিলো না কারও। সিনেমা হলে ছবি দেখতে যেয়ে পাড়ার বড় ভাই অথবা বড় ভাইয়ের বন্ধু এমন পরিচিত মানুষ পাওয়া ছিল নিত্যদিনের ঘটনা তাই এমন বিব্রতকর পরিস্থিতি সামলাতে আমাদের সবার পকেটে থাকতো রুমাল। আমরা রুমাল দিয়ে মুখ ঢেকে হলে ঢুকতাম আর বেরুতাম। অবশ্যই কলেজে উঠার পর আর রুমাল দিয়ে মুখ ঢেকে ঢুকা লাগতো না। কারণ সিনেমাহলে ছবি দেখতে গিয়েছি সেটা তখন অভিভাবকদের কাছে খুব বড় অপরাধের বিষয় ছিল না। শুধু স্কুল পালিয়ে যেন না দেখে সেদিকটা খেয়াল করতেন। এমনও দিন গেছে যে বাসায় বলেই গিয়েছিলাম সিনেমা দেখতে যাচ্ছি। সেই সময় ঈদের দিন বা ঈদের প্রথম সপ্তাহে প্রিয় তারকার জমজমাট বাংলা ছবি দেখার একটাই সমস্যা ছিল তা হলো টিকেটের চড়ামূল্য। ভিড়ের ঠেলা ও ধস্তাধস্তির কারণে কাউন্টার থেকে টিকেট কেনা ছিল দায় তাই কালোবাজারি বা ব্ল্যাকার মামারাই ছিলেন আমাদের ভরসা। আজ এসব আনন্দ শুধুই স্মৃতি যা আর কোনদিন ফিরে আসবে না জীবনে । খুব খুব ইচ্ছে হয় সেই দিন গুলোতে ফিরে যেতে ।

বাংলা ছবি এবং তার বর্তমান অবস্থা

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প যে আজ ঝিমিয়ে পড়েছে সিনেমা হলগুলোর রুগ্ন চেহারা দেখলে তা সহজেই অনুমান করা যায়। অধিকাংশ দর্শক চলচ্চিত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। ঢাকা শহরের নামি-দামি সিনেমা হলে এখন আর দর্শক সমাগম নেই। বন্ধ হয়ে গেছে অনেক হল। অথচ ষাট-সত্তরের দশকে বাংলা সিনেমার কী এক সুবর্ণ সময় ছিল। সেকালে চলচ্চিত্র শিল্পের কারিগরি মান তেমন উন্নত না হলেও সুস্থ ধারার অনেক ছায়াছবি নির্মিত হয়েছে। প্রয়াত জহির রায়হান এবং আলমগীর কবীর বেশ কিছু ক্লাসিক্যাল বাংলা ছবি বানিয়ে দেশে-বিদেশে সম্মান কুড়িয়েছেন। জয় করেছেন দর্শক হৃদয়। রাজ্জাক, হাসান ইমাম, আনোয়ার হোসেন, কবরী, সুচন্দা, ববিতার মতো শিল্পীরা অভিনয় প্রতিভার কম স্বাক্ষর রাখেননি। সত্যজিৎ রায়ও ববিতাকে দিয়ে ‘অশনি সংকেত’-এর মতো ছায়াছবি বানাতে সাহস করেছিলেন। এসব ছায়াছবি, অভিনেতা-অভিনেত্রীর কথা এ দেশের দর্শক আজো ভোলেনি।

সেকালে বাংলা ছবি এবং চলচ্চিত্র শিল্পের কারিগরি মান তেমন উন্নত না হলেও সুস্থ ধারার অনেক ছায়াছবি নির্মিত হয়েছে। প্রয়াত জহির রায়হান এবং আলমগীর কবীর বেশ কিছু ক্লাসিক্যাল ছবি বানিয়ে দেশে-বিদেশে সম্মান কুড়িয়েছেন। জয় করেছেন দর্শক হৃদয়। রাজ্জাক, হাসান ইমাম, আনোয়ার হোসেন, কবরী, সুচন্দা, ববিতার মতো শিল্পীরা অভিনয় প্রতিভার কম স্বাক্ষর রাখেননি। সত্যজিৎ রায়ও ববিতাকে দিয়ে ‘অশনি সংকেত’ এর মতো বাংলা ছবি বানাতে সাহস করেছিলেন। এসব ছায়াছবি, অভিনেতা-অভিনেত্রীর কথা এ দেশের দর্শক আজো ভোলেনি।

বর্তমানে বাংলাদেশের কিছু বাংলা ছবি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হচ্ছে। কুড়িয়ে আনছে সম্মান। দেশে-বিদেশে বাংলাদেশের নায়ক-নায়িকা, ছবির কলাকুশলীরা হচ্ছেন পুরস্কৃত, সংবর্ধিত। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের বর্তমান অবস্থার উত্তরণের লক্ষ্যে সুস্থ ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণে সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগী হওয়া জরুরি। প্রয়াত জহির রায়হান ও আলমগীর কবীরের মতো চলচ্চিত্রকার চলচ্চিত্র নির্মাণে যে ধারা শুরু করেছিলেন তার পথ ধরে বর্তমান চলচ্চিত্র নির্মাতাদের বাংলা ছবি নির্মাণে এগিয়ে যেতে হবে। অশ্লীল বাংলা ছবি নির্মাণ এবং ভিডিও পাইরেসি বন্ধ করতে সবার একাত্ম হতে হবে। শিল্পমান সম্পন্ন সুস্থধারার ছায়াছবি তৈরি করতে শিল্প-সাহিত্য সংশ্লিষ্টদের হতে হবে অঙ্গীকারবদ্ধ। দেশের শিশু কিশোরদের চরিত্র গঠনের লক্ষ্যে শিক্ষামূলক শিশুতোষ ছায়াছবি নির্মাণে তৎপর হতে হবে। চলচ্চিত্র যে শিল্প সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান বলিষ্ঠ মাধ্যম তা ছায়াছবি নির্মাণের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করতে হবে। এফডিসি ও ফিল্ম সেন্সর বোর্ডকে এ ব্যাপারে নিতে হবে বিশেষ দায়িত্বশীল ভূমিকা। সুস্থ ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণে সরকারি সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা বিশেষ জরুরি। এ ক্ষেত্রে সরকারের পর্যাপ্ত অনুদান প্রদান এবং চলচ্চিত্র প্রদর্শনের সময় প্রেক্ষাগৃহের টিকিট থেকে বিনোদন কর মওকুফ করার ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি গুণী চলচ্চিত্র শিল্পী ও সংশ্লিষ্টদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিসহ রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত করা হলে তা চলচ্চিত্র শিল্পের মানোন্নয়ন ও বিকাশে সহায়ক হবে।

চলচ্চিত্র শিল্প দেশের শিল্প-সংস্কৃতি বিকাশের একটি প্রধান মাধ্যম। সুস্থধারার শিল্প মানসম্মত চলচ্চিত্র যেমন দেশের অর্থনৈতিক বিকাশে ভূমিকা রাখে তেমনি দেশকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করে দেয়। শুধু তা-ই নয়, বর্তমান যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয় থেকে ফিরিয়ে আনতে সুষ্ঠুধারার চলচ্চিত্র ভূমিকা রাখতে পারে। কেননা চলচ্চিত্র যেমন একটি সর্বজন গ্রহণযোগ্য শক্তিশালী বিনোদন মাধ্যম তেমনি ভালো চলচ্চিত্র মানুষের সুকুমার বৃত্তিগুলোকে জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করে। শিক্ষামূলক চলচ্চিত্র চরিত্র গঠনেও রাখতে পারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা।

আজো ঈদ আসে ঈদ যায় কিন্তু সেদিনের মতো এফডিসি বা চলচ্চিত্র পাড়া দারুন সব ছবির পসরা সাজায় না। আজ নেই সেদিনের সেইসব পরিচালকরা যারা দর্শকদের কথা মাথায় রেখে চলচ্চিত্র বানাবেন। সেদিন সিনেমা হল ছিল হাজারেরও বেশি আর আজ তার অর্ধেকও নেই। অথচ এই অর্ধেক সিনেমাহল গুলো টিকিয়ে রাখার ক্ষমতাও আজকের তথাকথিত নতুন ধারার পরিচালকদের নেই। সেদিনের সিনেমা হলের অবস্থা আরও খারাপ ছিল, আরও নাজুক ছিল কিন্তু সেইসব প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শকরা সিনেমাহলে ঈদের ছবি দেখতে ভিড় জমাতেন। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে আজ যেখানে এফডিসি’র মূলধারার বাণিজ্যিক ছবির প্রযোজক পরিচালকেরা সারাদেশে ঈদের জন্য ৪/৫ ছবি দিতে হিমশিম খায় সেখানে ‘টেলিফিল্ম’ নামের এক আজব সিনেমা হাউস নিজেদের টিভি চ্যানেলে ৭ দিনে ৭ টি নতুন বাংলা ছবি মুক্তি দেয় যা এই চলচ্চিত্র শিল্পের সাথে এক নির্মম তামাশা ছাড়া কিছুই নয়।

114 total views, 1 views today

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন