বন্ধু সমাচার। প্রকৃত বন্ধু কি আসলেই চেনা যায়

বন্ধু সমাচার। প্রকৃত বন্ধু কি আসলেই চেনা যায়
4.8 (96%) 10 votes

বন্ধু ছোট্ট একটি শব্দ। বন্ধু শব্দের মাঝে মিশে আছে পৃথিবীর সব প্রশান্তির ছায়া, নির্ভরতা। এরিস্টটল বলেছেন,বন্ধু হলো এক আত্মার দুইটি শরীর। বন্ধু যার আভিধানিক অর্থ –  সখা, মিত্র, স্বজন, প্রিয়জন, প্রণয়ী, হিতৈষী ব্যক্তি। আত্মীয়তার সম্পর্কের বাইরে যে সম্পর্কটি মানুষের সবচেয়ে কাছের সেটা হলো বন্ধুত্ব। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে নতুন নতুন সম্পর্ক আমাদের জীবনে এলেও একমাত্র বন্ধু শব্দটিই আমাদের জীবনে স্বমহিমায় ভাস্বর হয়ে থাকে। বন্ধুই একমাত্র সম্পর্ক যা মানুষকে বিশ্বাস, আস্থা আর সাহস জোগায়। বন্ধুর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে জর্জ হার্ভার্ট বলেছেন, ‘একজন বন্ধু হলো সর্বোৎকৃষ্ট আয়না।’ তার মানে, এই আয়নাতে প্রতিমুহূর্তে সে নিজেকে দেখবে। বন্ধু বা কল্যাণকামী ব্যক্তিটি হতে পারে যেকোনো গোত্রের বা বয়সের। বন্ধু হতে পারে পরম হিতৈষী ব্যক্তি, মা-বাবা, হতে পারে ভাইবোন অথবা স্কুলের সহপাঠী কিংবা অন্য যে কেউ। FRIEND শব্দের প্রত্যেকটি অক্ষরের অর্থ হলো F = Few, R = Relation, I = In ,E = Earth, N = Never, D = Die / ” Few relation in the earth never die” = Friend

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

বন্ধু

চেনাজানা মানুষই শুধু বন্ধু নয়ঃ

বন্ধুত্বের ধরন, অবস্থা বর্তমানে বদলাচ্ছে। বন্ধু মানে কি শুধুই প্রতিদিনের চেনাজানা মানুষই ? তা কিন্তু নয়। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্ধুত্ব হয়। ফেসবুক,টুইটার বা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন বন্ধুর দেখা পাচ্ছি আমরা। অপরিচিত যে কারো সাথে হয়ে যাচ্ছে বন্ধুত্ব। আর এসব বন্ধুত্ব অনেক সময়ে ভালোর চেয়ে মন্দ ডেকে আনে। বন্ধুত্ব কি সব সময়ই আশীর্বাদ, নাকি বন্ধুত্বের আড়ালে রয়েছে অচেনা অজানা কোনো মৃত্যুফাঁদ; যে ফাঁদে পড়ে জীবনকে বিসর্জন দিতে হয়। বন্ধুবিহীন জীবন যেমন ভাবা যায় না, ঠিক তেমনই বন্ধুই হতে পারে অভিশপ্ত জীবনের একটি অংশ। বন্ধুবেশে বন্ধুর ক্ষতি করাটাও সোজা, কারণ বন্ধুকে মানুষ অন্ধের মতো বিশ্বাস করে। আর এই সরল বিশ্বাসের সুযোগ নেয় বন্ধুরূপী শত্রুরা। এমন বিশ্বাসে পাল্টে যেতে পারে  জীবনের গতিপথ। স্বাভাবিক জীবন হয়ে যেতে পারে কষ্টের জীবন। তাই বলে কি সব বন্ধুকেই অবিশ্বাস করা যায়? মনে অবিশ্বাস নিয়ে তো আর বন্ধুত্ব করা যায় না। শিবরাম চক্রবর্তী লিখেছেন,বন্ধু পাওয়া যায় সেই ছেলেবেলায় স্কুল-কলেজেই। প্রাণের বন্ধু। তারপর আর না। আর না? সারা জীবনে আর না? জীবন জুড়ে যারা থাকে তারা কেউ কারো বন্ধু নয়। তারা দু’রকমের। এনিমি আর নন-এনিমি। নন-এনিমিদেরই ‘বন্ধু’ বলে ধরতে হয়।

প্রকৃত বন্ধু কি চেনা যায়ঃ

আমাদের এ বিচিত্র জীবনে মানুষ অন্যের সঙ্গে আনন্দের অংশীদার হতে চায় কিন্তু দুঃখের বা কষ্টের সময় তারা ঐ মানুষের সঙ্গ ত্যাগ করে। তাই এই পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষই স্বার্থপর ও সুযোগ সন্ধানী। স্বার্থ সিদ্ধির আশায় বন্ধুর মুখোশ এঁটে সুসময়ের সঙ্গী হয়। কিন্তু দুঃসময় আসলেই এই বন্ধুই আবার দূরে চলে যায়। প্রকৃতিতে যখন ফুলের মেলা বসে, গাছে গাছে যখন সবুজ পাতার ছড়াছড়ি তখনই কোকিল আসে। শীতের মাঝে এই কোকিলকে আর পাওয়া যায় না। এদেরকে বলে বসন্তের কোকিল।  সত্যিকার বন্ধুর সুসময় বলে কোন নির্দিষ্ট সময় নেই। সে সব সময়ই বন্ধুর পাশে বন্ধুত্বের মহিমায় চির অম্লান। ভ্রমরের মতো ফুলের মধু শেষ হলেই এর কাজ শেষ হয়ে যায় না। কৃত্রিম বন্ধুত্বের বন্ধনে নিজেকে শুধু স্বার্থ উদ্ধারের আশায় জড়িয়ে রাখে না। বন্ধুর বিপদে নিজের বিপদ মনে করেই তার পাশে থাকে সবসময় এবং সব ধরনের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। এরাই প্রকৃত বন্ধু অসময়ে বা অভাবের সময় বন্ধুর কাছে থাকে। সুসময়ে বা প্রাচুর্যের সময় যারা ভীড় জমায় তারা কেউ প্রকৃত ‘বন্ধু’ নয়।

প্রকৃত বন্ধুত্ব কখনোই মিথ্যার প্রশয় নেবে না,তারা সময়ে-অসময়ে বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যার বুলি আওড়িয়ে বেড়াবেনা। অনেকেই  নিজের পরিচিতি নিয়ে মিথ্যা বলে, পরিবারের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার কথা গোপন রেখে বাড়িয়ে বলে,পরে আসল তথ্য বের হয়ে এলে বন্ধুত্বের মধ্যে ফাটল ধরে। আবার কখনো নিজের দোষ বন্ধুর ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়ার জন্যও মিথ্যা বলে থাকে। একজন বন্ধু যদি সারাক্ষণ অপর বন্ধুর দোষ ধরে, তাহলে সেটা প্রকৃত বন্ধুত্ব নয়। কিছু মানুষ আছে যারা সারাক্ষণই বন্ধুর দোষত্রুটি ধরার জন্য তৎপর থাকে যা একজন ভালো বন্ধুর পরিচয় হতে পারে না। এ ক্ষেত্রে বন্ধুর দোষ গুলোকে সংশোধন করার চেষ্টা করতে হবে। আবার অনেকে বন্ধুত্বের সম্পর্কের খাতিরে টাকা ধার নিয়ে ফেরত দেয় না। আবার এমন উদাহরণও রয়েছে। টাকা না দেয়ার উদ্দেশ্যে টাকা নিয়ে থাকে। এমন অনেকে আছে, যারা অন্যের ব্যক্তিগত কথা কিংবা গোপনীয় বিষয় আরেক বন্ধুকে অবলীলায় বলে ফেলে; যা কারোরই কাম্য নয়। কোনো বন্ধু হয়তো আরেক বন্ধুকে বিশ্বাস করে কিছু কথা বলেছিল, কিন্তু সে এসে অন্য বন্ধুকে সহজেই বলে দিলো। বিষয়টি যখন কোনোভাবে জানতে পারবে তার গোপনীয় কথাটি ফাঁস হয়েছে গেছে, তখন বন্ধুর সাথে দেখা দেবে মনোমালিন্য, সৃষ্টি হবে দূরত্বের। তাই এ ধরনের বন্ধুদের বিশ্বাস করা ঠিক হবে না। অনেক বন্ধুই আরেক বন্ধুর বিপদের সময় পাশ কাটিয়ে যায়। পরে মিথ্যার মাধ্যমে বন্ধুকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু প্রকৃত বন্ধুর পরিচয় হলো তার বিপদের সময় পাশে থাকবে। অনেকে আবার বিনা কারণে নানা রকম বাজে সমালোচনা করে থাকে। ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে যারা বিভিন্ন রকম অভিযোগ তুলেন, তারা প্রকৃত বন্ধু নয়।
বাস্তাবিক অর্থে দু-এক দিনের পরিচয়ে কাউকে বন্ধু বলা যায়? এমন প্রশ্ন আমাদের সবার। সুখে অসুখে, কষ্টে, সফলতায় ব্যর্থতায়, আনন্দ-নিরানন্দে যাকে পাশে পাওয়া যায় সেই বন্ধু। সাম্প্রতিক সময়ে পত্র-পত্রিকার পাতা খুললেই দেখা যায় বন্ধুর হাতে আরেক বন্ধুর খুনের ঘটনা । এ ধরনের ঘটনা আমাদের কারো কাম্য নয়, তবু অহরহ এ ধরনের ঘটনা। এতে আঁতকে উঠতে হয় আমাদের।

বন্ধু

বন্ধু অবশ্যই প্রয়োজনঃ

মানুষের বেঁচে থাকার জন্য বন্ধুর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। পৃথিবীর সৃষ্টিকাল থেকে শুরু করে মানুষের জন্য বন্ধুর প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। বন্ধুত্ব প্রতিটি মানুষের জীবনের একান্ত অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে আদিকাল থেকে। আমাদের জীবনে এমন সব ঘটনা যা কারো না কারো কাছে শেয়ার করা যায়। নিজের একান্ত কথাগুলো যাকে নিঃসঙ্কোচে বলা যায় সেই তো একমাত্র বন্ধু। শুধু তা-ই নয়, জীবনে ছোট-বড় যত ঘটনাই ঘটুক না কেন, যার কাছে বলার পর নিজেকে অনেক হালকা লাগে এমন ব্যক্তিটিও হতে পারে বন্ধুর মতো। সেই বন্ধুটি হতে পারে পরিবারের কোনো সদস্য। জীবন চলার পথে উত্তম একজন বন্ধু হতে পারে পথপ্রদর্শক।

বন্ধুত্ব সম্পর্কটিতে থাকবে না কোনো চাওয়া পাওয়া। থাকবে না লাভ-ক্ষতির কোনো হিসাব-নিকাশ, বন্ধুর প্রতি থাকবে অফুরন্ত ভালোবাসা ও সম্প্রীতির এক বন্ধন। সবাই ভালো বন্ধু হতে পারে না। বন্ধু যেহেতু আপনার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ, তাই বন্ধু নির্বাচনে একটু সচেতন হতে হয়।

622 total views, 1 views today

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে

About ইমন

আমি মহা মানব নই, আমি একজন সাধারণ মানুষ। তাই আমার এপিটাফ হবে আমার মতই সাধারণ, কালের গর্ভে এটিও হারিয়ে যাবে, যেমনটা হারায় একজন সাধারণ মানুষ।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন