বন্ধুত্ব কি? বন্ধুত্ব এবং ভালোবাসা কি এক

বন্ধুত্ব কি? বন্ধুত্ব এবং ভালোবাসা কি এক
5 (100%) 14 votes

বন্ধুত্ব হল মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক। বন্ধুত্ব শব্দের মাঝে মিশে আছে নির্ভরতা আর বিশ্বাস। **বন্ধু** আর বন্ধন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। বন্ধুত্ব মানেই যেন হৃদয়ের সবটুকু আবেগ নিংড়ে, ভালোবাসা দিয়ে মন খুলে জমানো কথা বলা। আত্মার শক্তিশালী বন্ধন হল বন্ধুত্ব। সমাজবিদ্যা, সামাজিক মনোবিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব এবং দর্শনে বন্ধুত্বের শিক্ষা দেয়া হয়। ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস ডেটাবেজের গবেষণায় দেখা গেছে যে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের কারণে মানুষ সুখী হয়। তাইতো বন্ধুত্বের জন্য গেয়ে উঠা যায় –

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

হাল ছেড়ো না বন্ধু বরং কণ্ঠ ছাড়ো জোরে,
দেখা হবে তোমার-আমার অন্যদিনের ভোরে।

বন্ধুত্ব

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘বন্ধুত্ব (Friendship) বলিতে তিনটি পদার্থ বুঝায়। দুই জন ব্যক্তি ও একটি জগৎ। অর্থাৎ দুই জনে সহযোগী হইয়া জগতের কাজ সম্পন্ন করা। আর, প্রেম বলিলে দুই জন ব্যক্তি মাত্র বুঝায়, আর জগৎ নাই। দুই জনেই দুই জনের জগৎ।’ বন্ধুত্ব বয়স ও শ্রেণি মানে না। বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে পারে, মায়ের সঙ্গে, বাবার সঙ্গে, ভাইয়ের সঙ্গে, বোনের সঙ্গে। সহপাঠী হোক, হোক সমবয়সী। কোনো তফাৎ সেই বন্ধুত্বের গভীরতায় যদি কোনো খাদ না থাকে। মানুষের জীবনে প্রথম প্রেম আর প্রথম বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার স্মৃতি থাকে অমলিন। দেখা না হলেও বন্ধুকে ভোলা যায় না। শিবরাম চক্রবর্তী লিখেছেন,ছেলেবেলার বন্ধুরা মেয়েদের ভালোবাসার মতই কোথায় যেন হারিয়ে যায়। ভাবতে অবাক লাগে একেক সময়। মনে হয় যে, বুঝি একরকম ভালোই। তাদের নির্মেদ দেহ আর নির্মেঘ মন নিয়ে কৈশোরের নিবিড় মাধুর্যে মিশিয়ে নিটোল মুক্তোর মতই চিরদিনের স্মৃতির মধ্যে অক্ষয় থেকে যায় তারা – পরে যে কখনও আর ফিরে দেখা দেয় না তাতে জীবনের মতই সুমধুর থাকে, পলে পলে দন্ডে দন্ডে অবক্ষয়ে টাল খায় না, ক্ষয় পায় না।

সময়ের প্রয়োজনে কোনো বন্ধু দূরে সরে যেতে পারে কিন্তু মনের দূরত্ব কখনই তৈরি হয় না। বন্ধুর সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্তই অমূল্য। স্কুল শুরুর দিনে যে ছেলেটি বা মেয়েটি আপনারা পাশে বসেছিল তাকে কী ভোলা যায় সহজে? জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন, যদি থাকে বন্ধুর মন গাং পাড় হইতে কতক্ষন।

বন্ধুত্ব এবং ভালোবাসা কি এক

বন্ধুত্ব এবং ভালোবাসা এই দুটি শব্দের মধ্যে অনেক পার্থক্য । বন্ধুত্ব ও ভালোবাসায় অনেক তফাৎ আছে, কিন্তু সে তফাৎ অনেক সময় ধরা যায় না। বন্ধুকে অনেকে প্রেমের সঙ্গে অথবা ভালোবাসার সঙ্গে এক করে ফেলেন। বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘একটা কথা আছে প্রেম হলো মন্দির আর বন্ধুত্ব বাসস্থান। মন্দির হইতে যখন দেবতা চলিয়া যায় তখন সে আর বাসস্থানের কাজে লাগিতে পারে না, কিন্তু বাসস্থানে দেবতা প্রতিষ্ঠা করা যায়।’ আসলে বন্ধুত্ব নির্ভর করে আন্তরিকতার উপর আর ভালোবাসা নির্ভর করে আত্মবিশ্বাসের উপর। আপনি হয়তো কাউকে ভালবাসেন তার উপর আপনার কোন আত্মবিশ্বাস নেই। তাকে আপনার বিশ্বাস হয় না সব সময় তার জন্য আপনার মনে একটি সন্দেহ থেকেই যায়। একজন আরেক জনকে যদি অবিশ্বাস করেন তাহলে মনে করবেন আপনাদের হৃদয়ে প্রকৃত ভালবাসার জন্ম হয়নি। আপনাদের দুজনের মন এক হয়নি। ভালবাসা মানে কি তা এক কথায় বললে বলা যায় জীবন সাথী আর বন্ধুত্ব মানে কাছের একজন মানুষ। যার সাথে সুখ দুঃখ এমন কি ভালবাসার মানুষের সাথে একটু মনমালিন্য হলে সেই কথা ও বন্ধুর সাথে অনায়াসে শেয়ার করা যায় যা অন্য কারো সাথে করা যায় না। মানুষের জীবনে এমনও কিছু ঘটনা ঘটে । এমন কিছু কথা আছে যা কাউকে বলা যায় না এমন কি জীবন সাথীকেও না কিন্তু বন্ধুর সাথে শেয়ার করা যায় । একজন ছেলে আর একজন মেয়ে অবশ্যই প্রথমে বন্ধু হয়। ভালো লাগা থেকে ভালোবাসা হতেই পারে। কিন্তু সব ক্ষেত্রে হবে এমনটা না। যেমন একজন মেয়ের যদি একাধিক বন্ধু হয়, তার মানে এটা না সে ওদের সবাইকে ভালোবাসে। একই কথা ছেলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বন্ধুত্ব যদি সীমার মধ্যে থাকে, তবে অবশ্যই সারা জীবন বন্ধু হয়ে থাকা সম্ভব।

বন্ধুত্ব

যদিও বন্ধুত্ব আটপৌরে, ভালোবাসা পোশাকী। বন্ধুত্বের আটপৌরে কাপড়ের দুই-এক জায়গায় ছেঁড়া থাকলেও চলে কিন্তু ভালোবাসার পোশাক একটু ছেঁড়া থাকবে না, ময়লা হবে না, পরিপাটি হবে। প্রাচীন প্রবাদে বন্ধুত্বের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘সম্পর্ক যখন জ্বরে পুড়ে তখন তার নাম হয় ভালোবাসা, আর ভালোবাসা যখন জ্বরে পুড়ে তার নাম হয় বন্ধুত্ব। সবচেয়ে বড় যে পার্থক্য বন্ধুত্ব এবং ভালোবাসার মধ্যে সেটা হলো, ভালোবাসা এক-তরফা হয় আবার দু’তরফাও হতে পারে কিন্তু বন্ধুত্ব কখনোই একতরফা হওয়া সম্ভব না। বন্ধুত্ব হতে হয় হাত আর চোখের সম্পর্কের মতো। হাতে ব্যথা লাগলে চোখে জল আসে। আর চোখে যদি জল ঝরে, তবে হাত এগিয়ে যায় তা মুছে দিতে।

বন্ধুত্বকে কোনো পরিমাপক যন্ত্র দিয়ে মাপা যায় না। মাপার দরকারও নেই। কিন্তু ভালো বন্ধু খুঁজে পাওয়া খুব সহজ নয়। অনেক সময় সামান্য ভুল বোঝাবুঝি থেকে সহসাই বন্ধুত্বের সম্পর্কে ফাটল ধরতে দেখা যায়! যে ব্যাপারটা সামান্য আলোচনার মাধ্যমেই মিটে যেতো, তাকে বছরের পর বছর মনের মধ্যে পুষে রেখে বন্ধুত্ব নষ্ট হবার দৃষ্টান্তও নিতান্ত স্বল্প নয়। বন্ধুত্বে বিশ্বাস রাখুন। তৃতীয় কোন পক্ষের বক্তব্যের জের ধরে সম্পর্কে ফাটল ধরাবেন না। বন্ধুর কোন কিছু অপছন্দ হলে বা বন্ধুর কথায়া কষ্ট পেলে অন্যের কাছে সমালোচনা না করে সরাসরি বলুন। শুনতে তিক্ত হলেও ফলাফল মধুর হবে। বন্ধুত্বে সৎ থাকুন। মিথ্যা তথ্য কিংবা ধারণা দিয়ে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়বেন না। আপনি যা সেটাই প্রকাশ করুন। অযথা কৃত্রিমতা বর্জন করে নিজের ব্যাক্তিত্বকে প্রদর্শন করুন। মনের মতো বন্ধু পেতে সততার কোন বিকল্প নেই। সততা প্রিজারভেটিভ ছাড়াই বন্ধুত্বের সম্পর্ককে সতেজ রাখে।

470 total views, 4 views today

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন