বই কেন পড়বেন ? বইয়ের তুলনা শুধুই বই

বই কেন পড়বেন ? বইয়ের তুলনা শুধুই বই
5 (100%) 2 votes

বই পড়তে আমরা অনেকেই ভালবাসি। বই পড়ে আমরা অনেক কিছু জানতে পারি সহজেই। ভালো বই পড়ে আমরা  নিজেদের সমৃদ্ধ করতে পারি জীবন ও জগত সম্পর্কে আমাদের চিন্তা চেতনা আরো একটু বাড়াতে পারি। আজকালের তরুণ প্রজন্ম ল্যাপটপ, মোবাইলে শুধু মুভি আর ভিডিও গেমস খেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট করে কিন্তু বই পড়ার বেলায় তারা কৃপণ। আবার কিছু তরুণ একাডেমিক পড়ার বাইরে কোনো বই পড়তে চায় না। একাডেমিকের বাইরে না পড়ার ফলে অনেক তরুণের মেধা ও মন-মানসিকতা সংকীর্ণ হয়ে যায়। এর ফলে একাডেমিকের বাইরের জগত নিয়ে তারা ভাবতেই পারে না। জ্ঞানার্জন যে কোন বয়সেই করা যায়। কেননা মহানবী (সা:) বলেছেন, তোমরা দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞানার্জন কর (আল-হাদিস)। আর
জ্ঞানার্জন করার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো বই।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

বই

বিশ্ব বই দিবস

ইউনেস্কোর উদ্যোগে ১৯৯৫ সাল থেকে প্রতিবছর এই দিবসটি পালন করা হয়ে থাকে। বই দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো, বই পড়া, বই ছাপানো, বইয়ের কপিরাইট সংরক্ষণ করা ইত্যাদি বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো। বিশ্ব বই দিবসের মূল ধারণাটি আসে স্পেনের লেখক ভিসেন্ত ক্লাভেল আন্দ্রেসের কাছ থেকে। ১৬১৬ সালের ২৩ এপ্রিল মারা যান স্পেনের আরেক বিখ্যাত লেখক মিগেল দে থের্ভান্তেস। আন্দ্রেস ছিলেন তার ভাবশিষ্য। নিজের প্রিয় লেখককে স্মরণীয় করে রাখতেই ১৯২৩ সালের ২৩ এপ্রিল থেকে আন্দ্রেস স্পেনে পালন করা শুরু করেন বিশ্ব বই দিবস। এরপর দাবি ওঠে প্রতিবছরই দিবসটি পালন করার। অবশ্য সে দাবি তখন নজরে আসেনি কারোই। বহুদিন অপেক্ষা করতে হয় দিনটি বাস্তবে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য। অবশেষে ১৯৯৫ সালে ইউনেস্কো দিনটিকে বিশ্ব বই দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং পালন করতে শুরু করে। এরপর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিবছর ২৩ এপ্রিল বিশ্ব বই দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। উল্লেখ্য, ২৩ এপ্রিল শুধুমাত্র বিশ্ব বই দিবসই নয়, শেক্সপিয়র, সত্যজিৎ রায়, ইনকা গার্সিলাসো ডে লা ভেগাসহ প্রমুখ খ্যাতিমান সাহিত্যিকদের জন্ম ও প্রয়ান দিবসও। আর এ কারণেও ২৩ এপ্রিলকে বিশ্ব বই দিবস হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে বলে মনে করেন অনেকেই।

কোন বই পড়বেন

এই পৃথিবীতে যত বই লেখা হয়েছে তার সবই ভালো বই না। মার্ক টোয়েন যখন বলেন, একজন লোক যে ভালো বই পড়ল না, তার সাথে পার্থক্য নেই পড়তে পারে না এমন লোকের। এখানে মার্ক টোয়েন বইয়ের কথা বলেন নি, ভালো বইয়ের কথা বলেছেন। বই এবং ভালো বই এক জিনিস নয়। খারাপ বই বা স্বস্তা খবরের কাগজেও লেখা থাকে, কিন্তু ক্ষতিকর। বিশ্ব সাহিত্যের বড় লেখক; পৃথিবীর তাবত বড় ঔপন্যাসিক যাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখেন, সেই তলস্তয় বলেন,  “সাধারণ বিষ আর বুদ্ধিবৃত্তিক বিষের মধ্যে পার্থক্যটা হল সাধারণ বিষ তার কটু স্বাদের জন্য চেনা সম্ভব। কিন্তু স্বস্তা পত্রিকা বা বইতে যেসব বুদ্ধিবৃত্তিক বিষ থাকে সেগুলো দূর্ভাগ্যজনক ভাবে মাঝে মাঝে হয় আকর্ষনীয়।” কী পড়বেন অথবা কী পড়বেন না এটা ঠিক করতে হবে আপনার কী দরকার তার উপরে। ধরা যাক আপনার কোন জিনিস বা যন্ত্র দরকার কিন্তু আপনি তা কিনছেন না, ভাবছেন না কিনে অনেক টাকা বাঁচানো যাচ্ছে। কিন্তু অন্যদিক থেকে এই যন্ত্র না থাকা আপনার অনেক ক্ষতি করছে যাও এক ধরনের মূল্য, যা আপনাকে পরোক্ষভাবে দিতে হচ্ছে। অতএব শুধু বই পড়লেই হবে না, ভালো বই পড়তে হবে।

যে কারণে বই পড়বেন

কেন বই পড়া? বিনোদনের জন্য? থ্রিলের জন্য? নিজেকে ফ্যাশনেবল দেখানোর জন্য? না, তা নয়। এসবের জন্য আরো অনেক সহজ উপায় আছে। শুধুমাত্র তথ্যের জন্যও নয়, পত্রিকাতে তথ্যে ঠাঁসা থাকে। তা পড়ার পর কয়জন মনে রাখে কী পড়েছিল? ডেইলি স্টোয়িক বইয়ের (রায়ান হলিডে এবং স্টিফেন হ্যানসেলম্যান) একটি অংশ এখানে উল্লেখ করা যায়, ‘আপনি এই বই কেন পড়তে হাতে নিয়েছেন? কেন যেকোন বই হাতে নেন পড়তে? নিজেকে স্মার্ট দেখাবে এজন্য নয়, বিমানে টাইম পাস করার জন্য নয়, আপনি যেসব কথা শুনতে চান সেসব কথা শোনার জন্য নয় – ঐসবের জন্য বই পড়ার চাইতে আরো অনেক সহজ উপায় আছে। এই বই আপনি হাতে নিয়েছেন কারণ আপনি শিখছেন কীভাবে জীবন যাপন করা যায়। আপনি আরো মুক্ত হতে চান ,কম ভয় পেতে চান, এবং প্রশান্তি অর্জন করতে চান। শিক্ষা হচ্ছে মহান জ্ঞানীদের জ্ঞানবানী পড়া এবং সেসব নিয়ে চিন্তা করা। এটা শুধু করার জন্য করা নয়। এর উদ্দেশ্য আছে। দর্শন শিক্ষা বা বই পড়ার চাইতে টিভি দেখা বা হালকা খাওয়া দাওয়া ইত্যাদিকে কোন কোন দিন অধিকতর ভালো মনে হতে পারে আপনার কাছে, সেইসব দিনে এই উপদেশটি মনে রাখুন, জ্ঞান – বিশেষত নিজেকে জানাই হচ্ছে স্বাধীনতা।’ স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, কম্পিউটার ও অনলাইন জমানার এ সময়টাতে ভালো বইয়ের মাঝে ডুবে থাকার মজাটা হারিয়ে যায়নি। হাফিংটন পোস্ট তাদের একটি প্রতিবেদনে জানায় বই পড়া অন্যান্য বিনোদনের চেয়েও বেশি মজার। কয়েকদিন আগে এক গবেষণা দেখিয়েছে, সাহিত্য পাঠ মনকে পড়া বা অধ্যয়ন করার ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। তাই কেন আপনি বই পড়তে বাধ্য তার কয়েকটি বিজ্ঞানসম্মত কারণ তুলে ধরা হলো।

প্রকাশ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয় – বিভিন্ন ধরণের বই পড়লে ভাষাগত দক্ষতা বেড়ে যায়। এজন্য পাঠকের বলার ও লেখার ক্ষমতায় আকর্ষণীয় পরিবর্তন চলে আসে। লেখালেখির সাথে যাদের পেশাগত সংশ্লিষ্টতা আছে তাদের জন্য বই পড়া অবশ্য কর্তব্য। আর যেসব শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো লিখতে চান তারা বই পড়ে জ্ঞান লাভ করার সাথে সাথে ভালো লেখার হাতও নিয়ে আসতে পারবেন। মানুষ নিজেকে প্রকাশ করে তার কথার মাধ্যমে। মানুষকে সাধারণত তার কথাবার্তার মাধ্যমে মেপে ফেলা যায়। নিজেকে পরিপূর্ণভাবে এবং সুন্দর ভাবে প্রকাশ করার জন্য বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান রাখা অবশ্য পালনীয়। এক্ষেত্রে বই হচ্ছে সবচেয়ে বড় সহায়ক। এজন্য বই পড়ার মাধ্যমে নিজের প্রকাশ ক্ষমতা বাড়িয়ে নিন।

মনোযোগ মজবুত করে – কোন একটা বই বা প্রবন্ধ পড়ার জন্য দীর্ঘ সময় হাতে নিয়ে বসতে হয়। গভীর মনোযোগের সাথে, অনেক সময় নিয়ে, একনিষ্ঠ ভাবে পড়তে হয়। পড়ার ক্ষেত্রে এ অভ্যাস চর্চার ফলে সেটা অন্য ক্ষেত্রেও চলে আসে এজন্য একজন পাঠক তার ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার মনোযোগ, একনিষ্ঠতা, নিবিষ্টতা বাড়াতে পারে।

কল্পনাশক্তি বাড়ায় – একটা বই একটা দুনিয়া এবং প্রত্যেক লেখক তার আপন দুনিয়া সৃষ্টি করেন তার লেখনীর মাধ্যমে। একেকটা বই আমাদেরকে একেকজন লেখকের দুনিয়ায় নিয়ে যায়। এর মাধ্যমে আমাদের কল্পনাশক্তি সমৃদ্ধ হয়।

বই বিনোদনের মাধ্যম – টিভি, ইন্টারনেট, কম্পিউটার ও মোবাইল ফোনের এই দুনিয়াতে বই এখনো প্রথম সাড়ির বিনোদন মাধ্যমের একটি। প্রযুক্তির এই অভাবনীয় বিকাশের আগে বিনোদনের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম ছিল বই। এখন বইয়ের ভাগে ভাগ বসিয়েছে প্রযুক্তি কিন্তু বইয়ের প্রয়োজনীয়তাকে একটুও টলাতে পারেনি। মজা করে বলতে গেলে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাব, কিন্ডল বা মোবাইলে বই পড়া হচ্ছে প্রিয়তমার সাথে চ্যাট করার মত ব্যাপার! আর বই পড়া যেন প্রিয়তমার সাথে সরাসরি বাতচিত করা। চ্যাট করে অনেক প্রয়োজন পূরণ করা যায় কিন্তু সেটা সরাসরি কথা বলার প্রয়োজনীয়তাকে খারিজ করে দেয় না। এজন্য বইয়ের স্থলে এখন অনেক প্রযুক্তি এসে জায়গা করে নিচ্ছে কিন্তু তা বইয়ের বিকল্প নয়, সহযোগী মাত্র!

বই মানুষকে শীতল করে – খুব দুশ্চিন্তায় আছেন? একটা বই হাতে নিন। ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখানো হয়, বই পড়া হচ্ছে চাপ মোকাবেলার সর্বোত্তম পন্থা। চাপ ঠেকানোর অন্যান্য পন্থা যেমন: গান শোনা, এককাপ চা কিংবা কফি পান অথবা একটু হেঁটে আসার চেয়েও কার্যকরি হলো বই পড়া। টেলিগ্রাফ সাময়িকীতে ওই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছিল। ওই গবেষণায় দেখা যায়, কোনো অংশগ্রহণকারী বইয়ের পাতা উল্টানো শুরুর ছয় মিনিটের মধ্যেই তার উত্তেজনা প্রশমিত হয়ে যায় বা তিনি শীতল হয়ে যান। ওই গবেষণার গবেষক ড. ডেভিড লুইস টেলিগ্রাফকে বলেন, ‘এটা যেকোনো বই-ই হতে পারে, আপনি আপনার প্রাত্যহিক চাপ থেকে বইয়ের জগতে হারিয়ে যেতে পারেন, লেখকের কল্পনার জগতকে আবিষ্কার করতে পারেন।’

মস্তিষ্ককে সচল ও ধারালো রাখে – এ বছরের শুরুতে ‘নিউরোলজি’ সাময়িকীতে একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। ওখানে বলা হয়, দীর্ঘ সময়ের বই পড়ার অভিজ্ঞতা বৃদ্ধ বয়সে মস্তিষ্ককে সচল রাখতে সাহায্য করে। ওই গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছিল ২৯৪ জন অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে মৃত্যুকালে যাদের গড় বয়স ছিল ৮৯। দেখা যায়, তাদের মধ্যে যারা অনেক বছর ধরে বই পড়া ধরে রেখেছিলেন, তাদের স্মৃতিশক্তি হারানোর হারটা অন্যদের চেয়ে কম যারা বই কম পড়েছেন। ‘আমাদের গবেষণায় আমরা দেখিয়েছি যে, শৈশব থেকে মস্তিষ্কের ব্যায়াম বুড়ো বয়সের মস্তিষ্কের সবলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ।’ এ গবেষণার লেখক রবার্ট এস উইলসন এক বিবৃতিতে এ কথা বলেন। তিনি শিকাগোতে অবস্থিত রাশ ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারে পিএইচডি করছেন। তিনি আরো বলেন, ‘এ গবেষণা থেকে আমরা এ সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, আমাদের প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ডে লেখা-পড়ার গুরুত্বকে অবজ্ঞা করতে পারি না।’

সহানুভূতিশীল করে তোলে – একটা ভালো উপন্যাসে হারিয়ে যাওয়া আপনার সহানুভূতিশীলতাকে বাড়িয়ে দিবে। নেদারল্যান্ডে পরিচালিত ওই গবেষণায় দেখানো হয়, যেসব পাঠক কোনো উপন্যাসের কাহিনী দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়েন তাদের সহানুভূতিশীলতা বৃদ্ধি পায়। এ গবেষণায় দুজন লেখকের লেখা ব্যবহার করা হয়- আর্থার কোনান ডয়েল ও হোসে সারামাগো। এক সপ্তাহ এ দুজনের বইয়ের মাঝে ডুবে থাকার পর পাঠকদের সহানুভূতিশীলতার পার্থক্যটা পরিষ্কার হয় গবেষকদের কাছে।

আত্মনির্ভরশীল এবং বিষন্নতা দূরে – সবাইকে জীবনের কোনো না কোনো সময় বিষন্নতা আক্রমণ করে। কেউ এটা থেকে দাঁড়াতে পারে আবার অধঃপতিত হয়ও অনেকে। আত্মনির্ভরশীল হওয়ার কিছু বই আছে যেগুলো আপনাকে এক্ষেত্রে সাহায্য করবে। বিষন্নতা আপনার কাজ করার ক্ষমতাকে কমিয়ে দেয়। এটা কাটিয়ে উঠার ক্ষেত্রে ডাক্তারি চিকিৎসার চেয়েও বই পড়া অনেক কার্যকরি মহৌষধ। বিশ্বাস হচ্ছে না? পরীক্ষা করে দেখুন না!

আলজেইমার রোগ প্রতিরোধে বই – একটি বিজ্ঞান সাময়িকীতে ২০০১ সালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখানো হয়, যেসব বয়স্ক লোকেরা মস্তিষ্কের ব্যায়ামের সঙ্গে যুক্ত সৌখিন কাজ যেমন: বই পড়া ও ধাঁ ধাঁ সমাধান করে থাকেন তাদের আলজেইমার রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। ইউএসএ টুডে- কে এক সাক্ষাৎকারে লেখক ড. রবার্ট পি. ফ্রিডল্যান্ড বলেন, ‘ব্যবহারের ওপর যেমন অন্যান্য অঙ্গের বুড়ো হওয়া নির্ভর করে মস্তিষ্কের বেলাও এ কথাটি প্রযোজ্য। শারীরিক কর্মকাণ্ড যেমন আমাদের হৃৎপিণ্ড, মাংসপেশি ও হাড়কে শক্তিশালী করে। বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ড ও আমাদের মস্তিষ্ককে সচল রাখে এবং মস্তিষ্কের রোগ ঠেকাতে ভূমিকা রাখে।’

ভালো ঘুমে সহায়ক – ঘুমানোর আগে মন থেকে চাপ দূর করে ফেলা ও মনকে দুশ্চিন্তা মুক্ত রাখার সুপারিশ করে থাকেন ঘুম বিশেষজ্ঞরা। ল্যাপটপ বা উজ্জ্বল আলো থেকে দূরে থেকে টেবিল ল্যাম্প বা বিছানার পাশের বাতিতে একটা বই হাতে নিয়ে পড়া শুরু করলে ঘুম এসে যাবে অল্পতেই। তবে বইটি যেন রহস্য উপন্যাস বা ক্রাইম ফিকশন না হয়!

বিশ্লেষণ ক্ষমতা বাড়ায় – কখনো কোন রহস্য গল্প বা উপন্যাস পড়া শুরু করার প্রথম দিকে কি প্রধান রহস্যটা ধরতে পেরেছিলেন? পড়া শেষে নিজের ধারণা করা সমাধানের সাথে মিল দেখে বিস্মিত হয়েছেন এমন ঘটনা ঘটেছে কি? তাহলে বলা যায় আপনার বিশ্লেষণ ও অনুমান করার ক্ষমতা অসাধারণ। আবার যদি রহস্যের কুলকিনারা খুজে নাও পেয়ে থাকেন তাহলেও কোন সমস্যা নেই। কারণ এই টান টান উত্তেজনা আপনাকে গল্প বা উপন্যাসের শেষ পর্যন্ত নিয়ে যাবে। এবং গল্প শেষে আপনিও একজন কঠিন ধাঁধাঁর সমাধানকারী হিসেবে নিজেকে মনে করতে পারবেন। এই সব চর্চার মাধ্যমে আপনার অজ্ঞাতেই আপনার বিশ্লেষণ ক্ষমতার অসাধারণ উন্নতি ঘটে যাবে।

বইয়ের বিকল্প কেবল বই

বর্তমান বিশ্বের শীর্ষধনী বিল গেটস বলেন, আপনি যদি আমার বাসায় আসেন দেখবেন বই, যদি আপনি আমার অফিসে যান দেখবেন বই, আর যদি আমি গাড়িতে থাকি সেখানে থাকে বই, এমনকি যখন আমি প্লেনে চড়ি সেখানেও আমার সঙ্গে থাকে বই। আগে একটা সময় ছিল যখন অনেকে মনে করত শুধু কবি, সাহিত্যিক অর্থাত লেখকরা প্রচুর বই পড়ে কিন্তু ধারণা ভুল আজকাল শুধু কবি-সাহিত্যিকরাই নয় ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা, রাজনীতিক এককথায় সকল শ্রেণি-পেশার মানুষেই বই পড়েন। পৃথিবীর বিখ্যাত সকল মানুষের একটা দিক দিয়ে মিল আছে আর সেটা হলো তাঁরা সবাই প্রচুর পড়াশোনা করেন এবং করতেন। আর এজন্যই বাঙালি সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী বলেছেন, ‘সুশিক্ষিত লোক মাত্রই স্বশিক্ষিত’। মানুষ বই পড়ার মাধ্যমেই জানতে পারে এ মহাবিশ্বের রহস্য। যে-যত বেশি পড়ে সে ঠিক তত বেশিই অন্যের থেকে মেধা, মননে, চিন্তায় এগিয়ে থাকে। প্রবাদে আছে, ‘যতই পড়িবেন, ততই শিখিবেন।’ আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘আমি যত জানি তত আমার নিকট স্পষ্ট হয় আমার কত অজানা রয়েছে’। মহান প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন তাঁর পুত্রের শিক্ষকের নিকট লিখিত ঐতিহাসিক চিঠিতে তিনি শিক্ষক মহাশয়কে বলেছিলেন, ‘আমার পুত্রকে শিখাবেন বইয়ের মধ্যে কি রহস্য লুকিয়ে আছে।’ তাঁর এ কথাটা খুব ইন্টারেস্টিং না? সত্যিই বইয়ের মধ্যে রহস্য লুকিয়ে আছে। যারা এ রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করেছেন তারাই সৃজনশীল কিছু সৃষ্টি করেছেন এবং করে চলেছেন। উদাহরণস্বরূপ নীরদ. সি চৌধুরী তাঁর জীবনে ১০ হাজার বই না পড়লে হয়ত তিনি জগদ্বিখ্যাত সাহিত্যিক হতে পারতেন না। ড.কাজী  দ্বীন মোহাম্মদ প্রায় ১৫ হাজার বই না পড়লে হয়ত তিনি এত বড় একজন পণ্ডিত হতে পারতেন না যিনি বাংলা সাহিত্যের একজন ধ্রুপদি গবেষক। কে জানে বিল গেটস প্রচুর পরিমাণ বই না পড়লে হয়ত তিনি আজকের বিশ্বের শীর্ষ ধনী হতে পারতেন না। পলান সরকারকে কে বা কারা চিনত বা তাকে নিয়ে ভাবত? যদি তিনি মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়ার জন্য মানুষকে বই দিয়ে না আসতেন। কর্তৃপক্ষের কি ঠেকা পড়েছিল তাঁকে একুশে পদক দেওয়ার? যদি তিনি মানুষকে বই পড়তে উতসাহ না জোগাতেন, আর এসব সম্ভব হয়েছে আগে তাঁর নিজের বই পড়ার মাধ্যমে। তিনি বই পড়ে বুঝতে পারছিলেন যে, বইয়ের মধ্যে কি রহস্য রয়েছে। আর এসব রহস্য  মানুষ জনের জানা দরকার। আর তারা বই পড়ার মাধ্যমেই তা জানতে পারবে। আর বই পড়ার জন্য বইয়ের হার্ড কপির বিকল্প নেই। যদিও আজকাল অনেকে বলেন, এখন তো অনলাইনে বই পড়া যায়, যেমন ই-বুক, আইপ্যাড, স্মার্টফোনে তাই শত-সহস্র বই কিনে টাকার অপচয় ও বাসার জায়গার সংকোচনের কি দরকার? এ ধারণা একেবারেই ভুল। কেননা, দেখা যায় ই-বুক, প্যাডে বা ল্যাপটপে অনেকে ডাউনলোড দিয়ে বই কালেক্ট করে রেখে দেয় পরে পড়বে বলে। কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রেই পরে আর পড়া হয়ে উঠে না। স্বয়ং মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসও প্যাডে বই পড়েন না। আর আমি-আপনি কোন ছার? বর্তমান তরুণ প্রজন্মের বই কেনার প্রতি যেরকম অনীহা  দেখা যাচ্ছে- শঙ্কা হচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতে বই জাদুঘরে পৌঁছবে কিনা? কিন্তু না তা হতে পারে না বা তা হতে দেওয়া যায় না। যতদিন মানুষ থাকবে ততদিন বইও থাকবে। আর তরুণ প্রজন্মকে ৬০ ও ৭০-এর দশকের ন্যায় আবার বই পড়ার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে হবে। তরুণদেরকে বইয়ের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। এছাড়া আমরা যারা নিজেদেরকে শিক্ষিত বলে দাবি করি তারা প্রতিমাসে অন্ততপক্ষে দুইটা বই পড়ছি কি? এ প্রশ্ন নিজেদেরকে করতে হবে। আর অব্যাহতভাবে বই পড়ে যেতে হবে। তবেই উন্নত ও সমৃদ্ধ হবে জাতি আর এগিয়ে যাবে দেশ। এতগুণ যে বইয়ের, তাহলে কেন আর অপেক্ষা। হাতে নিন একটা বই। হারিয়ে যান সেখানে, বইয়ের ভেতরে বা কোনো চরিত্রের সঙ্গে!

106 total views, 1 views today

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে
  • 20
    Shares

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন