পতিতালয় কি – পতিতালয়ের ইতিহাস জানুন

পতিতালয় কি – পতিতালয়ের ইতিহাস জানুন
5 (100%) 4 votes

পতিতালয় এমন একটি জায়গা যেখানে মানুষ আসে কোনো পতিতার সাথে যৌন সঙ্গমের উদ্দেশ্যে । সাধারণত যে স্থানে পতিতাদের অবস্থান সে স্থানকেই পতিতালয় বলা হয়, কিন্তু যেখানে পতিতাবৃত্তি বা পতিতালয় নিষিদ্ধ সেখানে বিভিন্ন ব্যবসা যেমন ম্যাসেজ পার্লার, বার ইত্যাদির আড়ালে পতিতালয় বা পতিতাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়। পুরুষ যখন যৌনক্ষুধা মেটাবার জন্য স্ত্রী ব্যতিরেকে যখন অবৈধভাবে অন্য নারীর সঙ্গে কামনা করে, অন্যদিকে নারী তার অন্ন-বস্ত্রের সংগ্রহের প্রয়োজনে তার দেহদান করতে প্রস্তুত হয়। তখনই একটা আর্থিক বিনিময়ের মাধ্যমে পারস্পরিক একটা অবৈধ যৌনসম্পর্ক স্থাপিত হয়। এটা হল পতিতাবৃত্তির পেশাগত রূপ, তা সামাজিকভাবে ও নৈতিকতার দৃষ্টিতে দোষণীয় হোক আর না হোক- এই পদ্ধতি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। কিন্তু এর বাইরেও অবৈধ যৌনসম্পর্ক স্থাপিত হয়। সেখানে কোনো আর্থিক লেনদেন থাকে না।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

পতিতালয়

ইতিহাসের প্রথম পতিতালয়

অ্যাথেন্সের আইন প্রণেতা ও কবি সোলোন (খ্রি.পূ. ৬৩৮-খ্রি.পূ. ৫৫৮) প্রাচীন গ্রিকের – যিনি তৎকালীন গ্রিকের সাতজন জ্ঞানী লোকের একজন হিসাবে গণ্য হতেন, খ্রিস্টপূর্ব ছয় শতকে এথেন্সে প্রথম পতিতালয় স্থাপন করেন। “ইতিহাসের জনক হিসাবে খ্যাত হিরোডেটাস এর লেখায় ‘পবিত্র বেশ্যাবৃত্তির’ প্রচুর উদাহরণ পাওয়া যায়। যেটি প্রথম শুরু হয়েছিল ব্যাবিলনে। সেখানে প্রত্যেক নারীকে বছরে অন্তত একবার করে যৌনতা, উর্বরতা ও সৌন্দর্যের দেবী আফ্রোদিতির মন্দিরে যেতে হত এবং সেবা শুশ্রূষার নমুনা হিসাবে নামমাত্র মূল্যে যৌন সঙ্গম করতে হত অন্যদের সঙ্গে। তাদের বাধ্য করা হতো যৌন সঙ্গম করতে। চীনে তা’ও রাজবংশ একটি নির্দিষ্ট এলাকায় পতিতালয় চালু করে। কিন্তু পরবর্তী সা’ঙ রাজবংশ (৯৬০-১১২৬ খৃ:) সেই পতিতালয় সরিয়ে শুধু হাংচৌ শহরে সীমাবদ্ধ করে দেয়। রোমান আমলেই পৃথিবীতে প্রথম পতিতা পেশার জন্য লাইসেন্স দেয়া হয় ও কর ধার্য করা হয়। শিল্প বিল্পবের ফলে ব্যাপক নগরায়ন ও অর্থনৈতিক শোষণের ফলে আধুনিক পতিতাবৃত্তির উম্মেষ ঘটে। মুলতো ‘নগরায়ণ’, ‘অর্থনৈতিক শোষণ’ ও ‘সাম্রাজ্যবাদের বিস্তার’ এই তিনটি কারণে  বিশ্বব্যাপী পতিতালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।

বৃটিশ আমলে পতিতালয়

বৃটিশ আমলের পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যাবে কি অবস্থা ছিল ঐ সময়। “১৮৫৩ তে কলকাতা শহরে ৪০৪৯ টি বেশ্যাগৃহ ছিল যাতে বাস করছিলেন ১২,৪১৯ জন পতিতা। ১৮৬৭ তে ছিল ৩০,০০০ জন। ১৯১১ সালের আদম শুমারি অনুযায়ী ১৪২৭১ জন। ১৯২১ সালের আদম শুমারিতে অনুযায়ী ১০,৮১৪ জন পতিতা ছিল কলকাতায়। কিন্তু প্রকৃত সংখ্যা হয়তো আরো বেশী হবে। কলকাতায় খুবই রমরমা ছিল পতিতালয়। বিনয় ঘোষ তার ‘কলকাতা শহরের ইতিবৃত্ত’ বইয়ে লিখেছেন,গৃহস্থের বাড়ির পাশে বেশ্যা, ছেলেদের পাঠশালার পাশে বেশ্যা, চিকিৎসালয়ের পাশে বেশ্যা, মন্দিরের পাশে বেশ্যা। রামবাগান, সোনাগাছি, মেছোবাজার, সিদ্ধেশ্বরীতলা, হাড়কাটা, চাঁপাতলা, ইমামবক্স সহ আরো অনেক জায়গায় ছিল পতিতালয়। এমনকি কিছু পতিতা শহরে প্রকাশ্য রাজপথে নৃত্য পর্যন্ত করতো। সাধারণ মানুষ পুলিশের কাছে আবেদন করা স্বত্বেও এর কোনো প্রতিকার হয়নি। কারণ কলকাতার পুলিশ ধনীদের তৈরি পতিতালয় গুলোতে হস্তক্ষেপ করতে সাহস পেত না। শুধু মাত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদা দ্বারকানাথ ঠাকুরের কলকাতার একটি এলাকাতেই তেতাল্লিশটি পতিতালয় ছিল। আসলে নারীদের সবসময় ভোগের পন্যই মনে করা হয়েছে, ইংরেজ আমলেও এর ব্যতিক্রম ছিল না। শুধু তাই নয় সেই সময় ইংরেজ সৈন্যরা মাত্রাতিরিক্ত পতিতালয় যেতো। যার ফলে ১৮৬০ সালে ইংরেজ সৈন্যদের মধ্যে ৬০% এর বেশী যৌনরোগে আক্রান্ত হয়ে পরে। তাই ইংরেজ সরকার ১৮৬৪ সালে পাশ করালেন – (Cantonment Act) আইন। সেনা ছাউনি গুলোতে ইংরেজ সৈন্যদের জন্য তৈরি হল আলাদা পতিতালুয়, সেখানে যেসব পতিতারা আসতেন তাঁদের রেজিস্ট্রি ভুক্ত করে পরিচয় পত্র দেওয়া হত। যৌনরোগ থেকে তাঁদের মুক্ত রাখার জন্য ‘লক হসপিটাল’ নামে বিশেষ হাসপাতাল স্থাপন করা হয় প্রধান সেনা ছাউনিতে।

আমাদের দেশে পতিতালয়

জেমস টেলরের,”A Sketch of the Topography & Statistics of Dacca” (কোম্পানি আমলে ঢাকা) বইয়ের তথ্য মতে – অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধেও ঢাকা শহরে সংগঠিত আকারে পতিতা বৃত্তির অস্তিত্ব ছিল। উল্লেখ্য যে জেমস টেলর (১৮২৫ থেকে ১৮৩৫) ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে ঢাকায় সিভিল সার্জন হিসেবে নিয়োগ ছিলেন। “১৯০১ সালের, সরকারি হিসাব মতে, ঢাকায় পতিতার সংখ্যা ছিল ২১৬৪। যশোর শহরে পতিতাবৃত্তির ইতিহাস রয়েছে ৫শ’ বছরের। মোঘল সম্রাট আকবরের শাসনামল থেকেই যশোর শহরে চলে আসছে পতিতাবৃত্তি। ব্রিটিশ যুগে যশোর শহরের তিনটি স্থানে পতিতালয় ছিল। কলকাতার জমিদার মনমত নাথ রায় ঘোড়া গাড়ি করে প্রতি শনিবার আসতেন ফুর্তি করতে। আর সে সময়ে তাকে মেয়ে সাপ্লাই দিতো চাঁচড়া রায় পাড়ার ব্রাহ্মণ পরিবার থেকে।

দেশে বর্তমান যৌনকর্মীর সংখ্যা ৭৪,০০০ (মানব জমিন- ২১ ডিসেম্বর ২০১৪)। যাদের ৫ শতাংশ হোটেলে, ৪১ শতাংশ ভাসমান ও ৫৪ শতাংশ যৌন পল্লীতে অবস্থান করছেন। (বাংলা নিউজ, ২০/১২/২০১৪)। Guardian পত্রিকায় 9 January 2008 এ একটা প্রতিবেদন ছাপা হয় – ‘I’m just here for survival’ (আমি শুধু বেঁচে থাকার জন্য এখানে আছি) এই শিরোনামে। সেখানে বলা হয় দৌলতদিয়া বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পতিতালয় এবং সেখানে ১৬০০ এর অধিক পতিতা আছে, গড়ে প্রতিদিন ৩০০০ পুরুষ সেখানে দৈহিক সম্পর্ক করতে যায়। তবে চিন্তার বিষয় এই যে, “প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২০০ থেকে ৪০০ নারী ও শিশু বাংলাদেশ থেকে পাচার হয় পাকিস্তানে। অপরদিকে ১০ থেকে ১৫ হাজার মেয়ে প্রতি বছর ভারতে পাচার হচ্ছে। এবং এইসব পাচারকৃত নারীদের বাধ্যতামূলক পতিতাবৃত্তি, নীল ছবি ছবি নির্মাণ ও ভিক্ষাবৃত্তিতে ব্যবহার করা হয়।

204 total views, 1 views today

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে

About ইমন

আমি মহা মানব নই, আমি একজন সাধারণ মানুষ। তাই আমার এপিটাফ হবে আমার মতই সাধারণ, কালের গর্ভে এটিও হারিয়ে যাবে, যেমনটা হারায় একজন সাধারণ মানুষ।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন