নীল ছবি পর্নোগ্রাফি এবং অশ্লীল সাহিত্যের উৎপত্তি যেভাবে

নীল ছবি পর্নোগ্রাফি এবং অশ্লীল সাহিত্যের উৎপত্তি যেভাবে
5 (99.05%) 21 votes

নীল ছবি বা ‘ব্লু ফিল্ম’ যাই বলুন না কেন এর দ্বারা পর্ন সিনেমাকেই বোঝানো হয়। কিন্তু কেন? পর্নো সিনেমার সঙ্গে নীল রঙের কী যোগ? নীল কী রগরগে যৌনতার রঙ! না, নীল তো ভালবাসার রঙ,আবেগের রঙ। বরং যৌনতার সঙ্গে যদি কোনও রঙ যায়, তাহলে হয়তো লাল বা গোলাপি এ জাতীয় রঙকেই বলা যায়। তাহলে? আসলে নীল ছবি বা ব্লু ফিল্ম কথাটা এসেছে ”ব্লু ল’ থেকে। ‘ব্লু ল’ হল যা মোরাল কোড বা নীতির বাইরে তৈরি হওয়া জিনিস তাদের জন্য তৈরি হওয়া নিয়ম। ব্লু ল অনুযায়ী নীতি বিরুদ্ধ কোনও কাজকে স্বীকৃত দেওয়ার একটা চেষ্টার আইন। আগে ইউরোপে পর্ন সিনেমাকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু বেশ কিছু জায়গায় দেখা যায় এই জাতীয় সিনেমা নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। প্রথমে পর্ন সিনেমার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার করা হত। কিন্তু পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হত। এভাবে ধরা, ছাড়ার খেলায় পুলিশ বিরক্ত হয়ে গেল। তখন ‘ব্লু ল’ অনুযায়ী জেল নয় তাদের জরিমানা করা শুরু হল। তারপর থেকেই পর্ন সিনেমাকে বলা হল নীল ছবি, ব্লু ফিল্ম, বা নীতি বিরোধী সিনেমা। দুনিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্ন ওয়েবসাইটে ‘পর্ন হাব’ বলা হয়েছে, The term “blue film” or “blue movie” refers to a cinematic production that is contrary to the standard moral code.

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

নীল ছবি

অনেকে আবার বলেন, অষ্টাদশ শতকের শেষে রেভ স্যামুয়েল পিটার একটা কথা আনেন সেটা হল ‘ব্লু নসেস’ “bluenoses”। এটা হল নীল পাতায়, নীল কভার দেওয়া এক বই যা তত্‍কালীন ধর্মবিরোধী বিভিন্ন কাজকে নানা যুক্তি দিয়ে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানানো হয়। এই বইতে বলা হয় নীল ছবি বা পর্ন সিনেমা হল মানুষের জন্য দারুণ একটা জিনিস, যা মানুষের চাহিদা পূরণ করে। অনেকে বলেন, সেই ব্লু বুক থেকেই নাকি ব্লু ফিল্ম নাম হয়।

আবার অনেকে বলেন, আগে নীল ছবি পর্ন বা ওই জাতীয় সিনেমা কিছু প্রেক্ষাগৃহে ব্লু প্রোজেক্টরের মাধ্যমে দেখানো হত, তাই নাকি ব্লু ফিল্ম বলা হয়। কারও কারও আবার যুক্তি, ইংরেজিতে একটা কথা আছে ‘ওয়ান্স ইন এ ব্লু মুন’। মানে মাঝে খুব কম যেটা হয়। যেহেতু সেকালে খুব কমই পর্ন রিলিজ করত, তাই ওকে ‘ব্লু মুন’ থেকে ‘ব্লু ফিল্ম’ ডাকা হয়।

 

অশ্লীল সাহিত্য থেকে নীল ছবি

যখন ইন্টামেডিয়েটে পড়তাম সালটা ২০০৪ তখন তিথি প্রিয়া নামক একজন লেখিকা খুবই জনপ্রিয় ছিল স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েদের কাছে। রেলস্টেশনের বইয়ের দোকান গুলিতে তিথি প্রিয়ার বইগুলো খুব চলতো। মুলতো সেই সময়ের যৌন সুড়সুড়ি দেওয়া বইগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল তিথি প্রিয়ার বই। স্কুল লাইফে দেখতাম নায়ক নায়িকাদের ছবি যেটাকে আমরা ভিউ কার্ড বলতাম তার প্রচলন ছিল খুবই।
তবে নীল ছবি বা অশ্লীল সাহিত্য কোনটাই আধুনিক সভ্যতার আবিষ্কার নয়। বহু আগে থেকেই এদের অস্তিত্ব আছে। প্রস্তর যুগে বহু গুহাচিত্র বা ভাষ্কর্যে নগ্নতার ছাপ আছে । ভারতের বিভিন্ন মন্দিরে নগ্ন মুর্তির চিত্রগুলো কিন্তু বর্তমান সময়ে তৈরি না। গ্রীক এবং রোমান সভ্যতায়ও অশ্লীলতা চর্চা ছিল। মুসলিম সম্রাজ্য গুলোতে অনেক রাজা বাদশাহর হারেমে যৌনতার ব্যাপক চর্চা সবারই কম বেশি জানা। বর্তমানে ইন্টারনেটের কারনে পর্ন এত সহজলভ্য এবং সস্তা যে পর্নের নিষিদ্ধ আকর্ষন অনেকটাই হারাতে বসেছে। বর্তমানে চটি পড়ার জন্য কারোর আর বই কেনার প্রয়জন পড়ে না ইন্টারনেটে আছে চটির ভান্ডার। অশ্লীল সাহিত্য রচনা হচ্ছে সেই আদিম কাল থেকেই। অশ্লীল সাহিত্যের সরস বিবরণ পাওয়া যায় ‘বাৎস্যায়ন’ আমলে এবং তার লেখা কাম সুত্র বইয়ে। বাৎস্যায়নয়ের বাল্যকাল কেটেছিল এক পতিতালয়ে এবং সেখানে তাঁর মাসি কাজ করতেন। ঐখান থেকেই তিনি কামকলা সংক্রান্ত জ্ঞান লাভ করেছিলেন। ঐ সময় **পতিতাবৃত্তি** এবং যৌনতা খুব স্বাভাবিক এবং সন্মানিত বিষয় ছিল। কামসুত্রের ০৬ – ভার্যাধিকারিক (৩.১) এর ৫৩ নম্বর শ্লোকে আছে -“স্বামী যাহাকে প্রচ্ছন্ন ভাবে কামনা করে, তাহার সহিত স্বামীর সঙ্গম করিয়া দিবে ও গোপন করিয়া রাখিবে।।৫৩।।” এই শ্লোক থেকেই বোঝা যায় অনাচার কেমন পর্যায়ে ছিল। তাছাড়া পুরো কামসুত্র বইটাতে রগরগে যৌন উত্তেজনক বাণীতে ভর্তি। এমনকি আইয়্যামে জাহিলিয়া যুগে আরবে প্রচুর অশ্লীল কবিতা রচনা হতো। ইতিহাসবিদ পি.কে হিট্টি বলেন,’মহানবী (সাঃ) এর আবির্ভাবের একশ বছর আগে আইয়্যামে জাহিলিয়া শুরু হয়।’ ঐ যুগে ইমরুল কায়স,তারাকা আমর,লবীদ,যুহায়ে নামক কবি অশ্লীল কবিতা রচনা করতো। মধ্যযুগ থেকেই অনেক সাহিত্যে পতিতা প্রসঙ্গ ও অশ্লীলতা পাওয়া যায়। “পঞ্চদশ শতাব্দীতে বিদারের রাজসভায় রচিত হয় গ্রন্থ ‘লজ্জত উন নিসা'(একটি ভারতীয় কামোদ্দীপক উপাখ্যান) যা ঐ যুগেরই বিদ্যমান কামোদ্দীপক রচনাগুলির একটি। নবম শতকে ‘কুট্টনীমত’ গ্রন্থ লিখেছিলেন কাশ্মীরের মন্ত্রী ও কবি ‘দামোদর গুপ্ত’। ‘বিকরবালা’ নামের এক বৃদ্ধা পতিতার উপদেশ নামা নিয়েই মুলতো ‘কুট্টনীমত’ গ্রন্থ লেখা। বাৎসায়নের কামসূত্রের মতো ‘কুট্টনীমত’ একটা কামশাস্ত্র গ্রন্থ।” এছাড়া মহাকবি কালিদাসের মহাকাব্য দোনা গাজির- সয়ফুল মুলক বদিউজ্জামাল, আবদুল হাকিমের- লালমতি সয়ফুল মুল্লুক, শুকুর মাহমুদের- গুপীচন্দ্রের সন্ন্যাস — এইসব কাব্য পুথিতে পতিতা সংস্কৃতির সরস এবং রগরগে বিবরণ দেওয়া রয়েছে।

বর্তমান বাংলা সাহিত্যে অশ্লীলতা অশ্লীলতা জোর করে আনীত হয় বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনের গদ্যে। পুরুষকে প্রতিপক্ষ ভাবতে গিয়ে তিনি যৌনতাকে অশ্লীল মাত্রায় উপস্থাপন করেন। পাঠক এখানে যৌনতাকে তথ্য হিসেবে পায় না বরং সুড়সুড়ি হিসেবে মনে করে। আবার হুমায়ুন আজাদ তার অনেক লেখায় যৌনসুড়সুড়ি দিয়েছেন, উদাহরণ হিসাবে – এক একটি উর্বশীকে আমি মেপে মেপে দেখি ,মাঝারী স্তন আমার পছন্দ, সরু মাংসল উরু আমার পছন্দ…। সমকালীন বাংলা সাহিত্যে কবি আল-মাহমুদের অনেক কবিতাই যৌন উত্তজক। উপন্যাস-সাহিত্যের চেয়ে আধুনিক কবিতায় আজ অশ্লীলতার অধিক ছড়াছড়ি। আধুনিক পরাবাস্তববাদীরা আজ কবিতার নামে সাহিত্যে আমদানি করে চলেছেন উৎকট যৌনতা আর অশ্লীলতা। আধুনিক কবিরা আজ সাদামেঘের ভেলাতেও খুঁজে বেড়ান কিশোরীর স্তন আর বাতাসের বয়ে চলার মধ্যে শৃঙ্গারের ডাক। এরই সর্বশেষ নজির আমরা পাই কবি সৈয়দ জামিলের কবিতার বইয়ে। কবিতার বইটিতে কারণে-অকারণে, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে অশ্লীলতা ও যৌনতা এবং গালাগাল ভেসে উঠেছে বন্যার মতো যা লেখা সম্ভব নয়।

নীল ছবি বা পর্ন দেখার কুফল

পুরুষ তো বটেই, আজকাল মেয়েদেরও একটা অংশ নীল ছবি দেখে। গত বছর একটি সমীক্ষা থেকে এ কথা জানা গেছে। ফলে নীল ছবি বা পর্ন ফিল্ম দেখা নিয়ে রাখঢাক করে লাভ নেই। বাস্তবটা মেনে নেওয়াই ভালো। তবে, এর কুফলও পড়তে শুরু করেছে। এবং সেটা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। কী দেখে, কেন দেখে- এসব আলোচনা ছেড়ে সোজাসুজি একটা কথা বুঝে নেওয়া দরকার, উপমহাদেশে সেক্স-এডুকেশন বলে কিছু নেই। ভালোমন্দ বুঝে ওঠার আগেই অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা নীল ছবি ছবি দেখতে শুরু করছে। আর তার চেয়ে বড় চিন্তার বিষয়, দেখে দেখে সেটাকে অনুকরণ করার চেষ্টা করছে। শুধু অনুকরণই নয়, অনেকে আবার ছবি তুলে সংগ্রহ করে রাখছে নিজের কাছে। ফল যে কত মারাত্মক হতে পারে, তা চিন্তা না করেই। নীল ছবি দেখার আরও কুফল আছে। সেগুলো একনজরে দেখে নেওয়া যাক।

১. মন নয়, শুধুই শরীর – প্রেমের সম্পর্ক হারিয়ে যাচ্ছে। সবটাই শরীর সর্বস্ব হয়ে উঠছে। শরীরের চাহিদা মেটাতেই অপরের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হচ্ছে। ফলে ভেঙেও যাচ্ছে খুব তাড়াতাড়ি। বিয়ের পর, অনেক ক্ষেত্রেই যৌনতায় অতৃপ্তি তৈরি হচ্ছে। এবং শেষ পর্যন্ত ছাড়াছাড়ি পর্যন্ত গড়াচ্ছে।

২. বিপরীত লিঙ্গের প্রতি অশ্রদ্ধা – অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুরুষ অশ্রদ্ধার চোখে দেখতে শুরু করছে মেয়েদের। ভাবছে নারী বোধহয় শুধুই ভোগ্যবস্তু। শুধু সহবাসের জন্য নারীর প্রয়োজন। সমাজে নারীর গুরুত্ব হারাচ্ছে। ফলে বাড়ছে ধর্ষণ, শ্লীলতাহানির মতো ঘটনা। যে দেশে অশিক্ষিতের সংখ্যা বেশি, সেখানে এর কুফলই বেশি আসবে, তাতে সন্দেহ কী। কারণ ভালোমন্দ বুঝে নেওয়ার ক্ষমতা এই অশিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে নেই। অথচ হাতে আছে সিডি, ডিভিডি, পেন-ড্রাইভ, ইন্টারনেট।

৩. সামাজিক মূল্যবোধ হারাচ্ছে – সৃষ্টিশীলতা, সৃজনশীলতা ধ্বংস হচ্ছে। সারাক্ষণই যৌনতা ঘুরছে অল্পবয়সী,না বুঝে ওঠা ছেলে মেয়েদের মধ্যে। বাঁধন হারাচ্ছে সবকিছুর। সামাজিক মূল্যবোধ হারাচ্ছে। নারী হলেই হলো। সম্পর্ক দেখছে না। ছাত্রী, পাড়ার বোন, ভাবি- বাদ যাচ্ছে না কিছুই। এমনকী রেহাই পাচ্ছে না ছোটো ছোটো শিশু। সবার দিকেই লোলুপ দৃষ্টি। সামাজিক অবনমন হয়েই চলেছে দিন কে দিন।

৪. অশ্রাব্য ভাষা ও ইঙ্গিত বাড়ছে – ছোটো ছোটো ছেলেরা নীল ছবি দেখে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। নারী দেখলেই অশ্রাব্য ভাষায় কথা বলছে। ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলছে। লজ্জা, শঙ্কা, ভয়, ডর- কিছুই থাকছে না।

নীল ছবি বা পর্ন ছবির যৌনতাকে বাস্তবায়িত করার চেষ্টা নীল ছবির রগরগে যৌনতাকে অনুকরণ করার চেষ্টা করছে। কখনও সেটা ভয়ংকর হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

981 total views, 1 views today

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন