নারী কি শুধুই নারী

নারী কি শুধুই নারী
5 (100%) 4 votes

নারী কখনো মা, কখনো স্ত্রী, কখনো মেয়ে বা বোন। পৃথিবীর অর্ধেক বা তারও বেশি অংশ হচ্ছে নারী। এই অংশকে পেছনে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়া কঠিন। বলা যায় অসম্ভব। পুরুষ এবং নারী একে অন্যের পরিপূরক। আদিম যুগ থেকেই নারী অবহেলিত, নির্যাতিত। ইসলাম পূর্ব-যুগে নারীদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত উপেক্ষিত ও শোচনীয়। সব ধরনের নৈরাজ্যের মাঝে বর্বরতা ও নৃশংসতাকে ছাড়িয়ে গেছে নারী নির্যাতন। সমাজে নারীদের মানুষরূপেই ভাবা হতো না। নারীরা ছিল পুরুষের লালসার শিকার, ভোগের সামগ্রী, ভোগ্যপণ্য হিসাবে তাদেরকে ক্রয় বিক্রয় করা হতো। রাসূল (সাঃ) এর আবির্ভাবের সময় পৌত্তলিক আরবে কন্যা সন্তানকে জীবন্ত পুঁতে ফেলা হতো। অনেকে নারীকে নরকের কীট ও অকল্যাণের উৎস মনে করত। চীনে নারীদের দ্বারা লাঙল টানাতো। ঘোড়ার লেজের অগ্রভাগে নারীর চুল বেধে তাকে টেনে-হিঁচড়ে ঘোড়া দৌড়ের প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা হতো।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

নারী

ইসলাম ধর্ম এবং নারী

একমাত্র ইসলাম ধর্ম নারীকে দিয়েছে  সন্মান। পবিত্র আল কুরানের অনেক সূরায় নারীর অধিকার ও নারীর মর্যাদা সম্পর্কে উল্লেখ করা আছে। সূরা আন নিসার ৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পাক ঘোষণা করেছেন, পিতামাতা এবং আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষের যেমন অংশ রয়েছে তেমনি নারীরও অংশ রয়েছে। পবিত্র কুরআনের বহু জায়গায় বিভিন্ন ভাবে নারীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং নারীর মর্যাদা ও সম্মান দান করেছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরুষের সমান অধিকার আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়েও বেশি অধিকার দিয়েছেন। সূরা বাকারার ১৮৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তারা তোমাদের পোশাক, তেমনি তোমরা তাদের পোশাক। সূরা আলে ইমরানের ১৯৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘আমি তোমাদের কোনো কর্মী বা সহপাঠীর কাজ নষ্ট করি না। সে নারী হোক বা পুরুষ হোক। তোমরা পরস্পর এক। অন্য এক আয়াতে বলা হয়। ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার রমনীরা একে অপরের সহায়ক ও বন্ধু। তারা একে অপরকে সৎ কাজের আদেশ করবে এবং মন্দ কাজের নিষেদ করবে।’ ইসলাম ধর্মে নারীর জীবনব্যবস্থা ও সমাজের অপরিহার্য অঙ্গ হিসাবে বিবেচনা করেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে স্ত্রী, কন্যা, মাতা ও ভগ্নী হিসাবে তার ব্যক্তিগত মর্যাদা অধিকার ও স্বাধীনতার সঙ্গে সামগ্রিক সব বিষয়ে তাদের মতামত প্রকাশের অধিকার দেওয়ার কথাও বলেছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা সংস্কৃতি প্রতিটি বিষয়ে পুরুষের পাশাপাশি নারীকেও উৎসাহিত করেছে।

নারী দিবস এবং কিছু বাস্তবতা

১৬৪৭ সালে নারী অধিকার নিয়ে সর্বপ্রথম কথা বলা শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রে। সেই ধারাবাহিকতায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নারীরা জেগে উঠেন। নিজেদের অধিকার নিয়ে সচেতন হন। তেমনই একজন ছিলেন ফ্রান্সের নাট্যকার ও বিপ্লবী নারী ওলিম্পে দ্যা গগ্স। তিনি নারী অধিকার নিয়ে সক্রিয় ছিলেন। নারী অধিকার নিয়ে আন্দোলন করায় ১৭৯৩ সালে এই নারী নেত্রীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করে ফ্রান্সের সরকার। ফ্রান্সের নাট্যকার ও বিপ্লবী নারী ওলিম্পে দ্যা গগ্স’র হত্যার মধ্য দিয়েও নারী অধিকার সেভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে না পারলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নারীরা কিন্তু তাদের অধিকার নিয়ে যথেষ্ট রকম সচেতন হয়ে উঠে। এর ফলে নারীরা সংগঠিত অথবা স্ব স্ব অবস্থান থেকে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়ে যান। অন্ধত্ব, দাসত্ব, পুরুষতান্ত্রিক, ধর্মীয় প্রথা ভেঙে যে সমস্ত নারী আন্দোলন সংগ্রাম করে গেছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মার্গারেট ব্রেন্ট, মার্গারেট লুকাস, ওলিম্পে দ্যা গগ্স, মেরি ওলস্ট্যানক্রাফট ছিলেন অগ্রজ। এরপর ১৮৪০ সালে নারী আন্দোলন নিয়ে দারুণ ভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেন এলিজাবেথ কেডি স্ট্যান্টন, লুক্রেশিয়া মটো, সুশান বি অ্যান্টনি, লুসি স্টোন, অ্যাঞ্জেলিনা এম গ্রিম, সারা এম গ্রিম। তবে আলোচিত এই নারী বিপ্লবীদের সক্রিয় হয়ে উঠার ৩৭ বছর পূর্বেও ভারতের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারী জেগে উঠেছিল নিজ অধিকার নিয়ে। এই বিপ্লবী নারীর নাম হচ্ছে নাঙ্গেলি (Nangeli)। ১৮০৩ সালে একটি কুস্কার প্রথা চালু ছিল ভারতের কেরল অঙ্গরাজ্যে। ত্রিবাঙ্কুর রাজা এ রাজ্যের নিচু হিন্দু জাতের মধ্যে এক প্রকার শুল্ক বা করারোপ করেছিল। এ করটির নাম ‘স্তনশুল্ক’ (Breast Tax), স্থানীয় ভাষায় নাম ‘মুলাক্করম’ (Mulakkaram)। সে সময় ওই রাজ্যে নিয়ম ছিল শুধু ব্রাহ্মণ ছাড়া অন্য কোনো হিন্দু নারী তাদের স্তনকে কাপড় দ্বারা আবৃত করে রাখতে পারবে না। এখানে শুধুমাত্র ব্রাহ্মণ শ্রেণির হিন্দু নারীরাই তাদের স্তনকে এক টুকরো সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতে পারত। এছাড়া বাকি হিন্দু শ্রেণির নারীদের প্রকাশ্যে স্তন উন্মুক্ত করে রাখার আইন প্রচলন ছিল ত্রিবাঙ্কুর রাজার এই রাজ্যে। তবে যদি কোনো নারী যদি তার স্তনকে কাপড় দ্বারা আবৃত করতে চাইত, তাহলে তাকে স্তনের মাপের উপর নির্ভর করে নির্দিষ্ট হারে ট্যাক্স বা কর দিতে হত। ‘মুলাক্করম’ বা ‘স্তনশুল্ক’র বড় অংশই যেত ত্রিবাঙ্কুরের রাজাদের কুলদেবতা পদ্মনাভ মন্দিরে। দলিতদের আজীবন ঋণের নিগড়ে বেঁধে রাখার এই ব্রাহ্মণ্যবাদী প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন আলাপুঝার এঝাওয়া সম্প্রদায়ের নারী নাঙ্গেলি (Nangeli)। ১৮০৩ সালে এই সাহসিনী নারী রাজার ওই নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তার স্তনকে আবৃত করে রাখে।
নাঙ্গেলি তার স্তন আবৃত করে রাখায় গ্রামের শুল্ক সংগ্রাহক তার কাছ থেকে ‘মুলাক্করম’ বা ‘স্তনশুল্ক’ দাবি করেন। কিন্তু নাঙ্গেলি ‘মুলাক্করম’ বা ‘স্তনশুল্ক’ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। তবে ‘মুলাক্করম’ বা ‘স্তনশুল্ক’র প্রতিবাদে নাঙ্গেলি ক্ষুব্ধ হয়ে নিজের দুটি স্তন ধারালো অস্ত্র দিয়ে কেটে কলাপাতায় মুড়ে ওই শুল্ক সংগ্রাহকের হাতে তুলে দেন। কাটা স্তন দেখে শুল্ক সংগ্রাহক হতবাক হয়ে যায়। স্তন কেটে ফেলার কিছুক্ষণ পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যু হয় নাঙ্গেলির। শেষকৃত্যের সময় নাঙ্গেলির স্বামী নিজেও ঝাঁপিয়ে পড়েন জ্বলন্ত চিতায়। এই ঘটনার পর থেকেই ‘মুলাক্করম’ বা ‘স্তনশুল্ক’ রোহিত হয়। তবে ‘মুলাক্করম’ বা ‘স্তনশুল্ক’ রোহিত হলেও দক্ষিণ ভারতে নারীদের স্তন আবৃত করার জন্য বহু সংগ্রাম করতে হয়েছে। এমনকি এ নিয়ে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা পর্যন্ত হয়েছে। উনিশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে এসে কিছু হিন্দু নারী তাদের শরীরের উপরের স্তন আবৃত করার অধিকার দাবি করেন, তখন হিন্দু পুরোহিতরা স্পষ্ট করে বলে দেন, নিচু বর্ণের নারীদের শরীরের উপরের অংশ আবৃত করা ধর্মবিরোধী। এ বিষয়টি নিয়ে ১৮৫৯ সালে দক্ষিণ ভারতে দাঙ্গা পর্যন্ত হয়েছিল। এই দাঙ্গার উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু নারীদের শরীরের উপরের অংশ আবৃত করার অধিকার আদায় করা। ভারতে এই দাঙ্গা ‘কাপড়ের দাঙ্গা’ হিসাবেও পরিচিত।

নারীর অধিকার আন্দোলনের ইতিহাসকে স্মরণ করতে বিশ্বব্যাপী প্রতি বছরই পালিত হয় নারী দিবস। ভারতের কেরালা রাজ্যে প্রতি বছর নারী দিবসে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয় নাঙ্গেলিকে। নিম্নবর্ণের নারীর আত্মমর্যাদা আদায়ের সংগ্রামে আজও নাঙ্গেলি সে রাজ্যে এক এবং অনন্য সৈনিক। নিজের জীবন দিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নিম্নবর্ণের নারীর সম্মান।

নারী অবলা নয়

নারীর প্রতিশব্দ হিসাবে এসেছে ‘অবলা’ শব্দটি। কিন্তু নারী যে অবলা নয় তার প্রমাণ দেয় ইতিহাস! কালে কালে পৃথিবীতে এমনই কিছু নারী আবির্ভূত হয়েছিলেন, যারা সভ্যতা বিকাশে রেখেছেন অনন্য ভূমিকা। প্রয়োজনের তাগিদে রাষ্ট্র ক্ষমতার শীর্ষে অবস্থান করেছেন, হাতে তুলে নিয়েছেন অস্ত্র। আজ আমরা এমনই কিছু মহান নারী যোদ্ধাদের কথা জেনে নিন।

জোয়ান অফ আর্ক – ফ্রান্সের শত বর্ষের যুদ্ধের ইতিহাসে সবার আগে আসে এই কিশোরীর নাম। ফ্রান্সের পুরো সেনাবাহিনীকে পরিচালনা করে সে। জোয়ান অফ আর্ক বরাবরই শত্রুপক্ষের পুরুষ সৈন্যদের সাথে সম্মুখ সমরে লিপ্ত থাকতো। ফ্রান্সের এক সাধারণ লোকালয়ে অশিক্ষিত কৃষকের মেয়ে হয়ে জন্মানোর পরেও তাঁর আত্মপ্রভা তাঁকে সমসাময়িক উচ্চশিক্ষিত মেয়েদের চেয়েও সফল করে তোলে। যদিও ইংরেজরা পরবর্তীতে ডাইনী ঘোষণা করে এবং তাঁকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। কিন্তু এখনও তাঁর বীরত্ব পৃথিবীর ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।

বীর আর্টেমিসিয়া – তিনি ছিলেন খৃষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর পারস্য সাম্রাজ্যের এক অঙ্গরাজ্যের শাসক। তাঁকে প্রধাণত স্মরণ করা হয় সালামিসের যুদ্ধে তাঁর অসাধারণ নৈপুণ্যের জন্য। তাঁর যুদ্ধ শৈলী এতই নিপুণ ছিল যে যে গ্রীক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস তার অনেক রচনায় তার উল্লেখ করেন। তার সমুদ্রপথে যুদ্ধ এতই অসাধারণ ছিল যে রাজা জাক্সিজ তাকে নিয়ে বলেন, ‘আমার পুরুষেরা যুদ্ধক্ষেত্রে নারী হয়ে গেছে, আর আমার নারীরা হয়ে গেছে পুরুষ’।

গুডিত – তিনি ছিলেন দশম শতাব্দীর ইথিওপিয়ার রাণী যিনি কিনা পূর্ববর্তী সাম্রাজ্যের সদস্যদের লুটপাট, চার্চ ধ্বংসের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। ঐতিহাসিকরা বলেন তিনি সম্রাটকে হত্যা করে সিংহাসনে বসেন, এবং প্রায় ৪০ বছর শাসন করেন। ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চলের কৃষক সমাজে তিনি আজও এক আতংকের মূর্তি হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন।

নন্দী – জুলু রাজকন্যা আর খ্যাতনামা আফ্রিকান যোদ্ধা শাকা-জুলুর মা নন্দী ছিলেন একজন মহাযোদ্ধা যিনি  উনবিংশ শতাব্দীতে আফ্রিকার দাস-বণিকদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন এবং ছেলেকে মহান নেতা ও যোদ্ধা হিসেবে গড়ে তোলেন। তাই যখন  তাঁর ছেলে শাকা রাজা হন তখন তিনি তাঁর মায়ের সম্মানে একটি পূর্ণ নারী-রেজিমেন্ট গঠন করেন।

টমি গোযেন – একজন সামুরাই মাস্টারের উপপত্নী, যিনি নিজেকে সামুরাইয়ের দীক্ষায় দীক্ষিত করে তোলেন। সেই সাথে তিনি ছিলেন দক্ষ তীরন্দাজ আর তলোয়ার চালক। গেনপেই যুদ্ধে তার রণকৌশলের জন্য তাকে সম্মান প্রদান করা হয়।

আহতেপ – তিনি ছিলেন ষোড়শ শতাব্দীর একজন মিশরীয় রানী। এশিয়াটিক জনগোষ্ঠী, হিক্সোস মিশর আক্রমণ করলে রানী একাই বিশাল সেনাবহর নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে তাদের বিতাড়িত করেন।

হ্যারিয়েট টাবম্যান – আমেরিকান গৃহযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন ইউনিয়ন আর্মির অন্যতম একজন গোয়েন্দা, নারীদের নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার, আর একজন মহান মানবতাবাদী। জীবনের বেশিরভাগ সময়ই তিনি ফ্রন্টলাইনে অতিবাহিত করেন, নিজের দেশপ্রেম আর নৈতিক বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে। সম্প্রতি, তাঁকে স্মিথসোনিয়ানের আমেরিকান সিভিল যুদ্ধের নারী গোয়েন্দাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

রানী বুদিক্কা – ব্রিটন শহরের এই যোদ্ধারানীর জন্ম হয় আইসেনি গোত্রে, যিনি ব্রিটেনে রোমানদের মত বিশাল ও শক্তিশালী সেনাদের আক্রমণের বিরুদ্ধে তার সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত করেন। তাঁর নেতৃত্বে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে গঠিত সেনাবাহিনীর সাথে লড়াই করে রোমান জেনারেল,শাসক ও সৈন্যদের মধ্যে ত্রাসের সঞ্চার হয়।

শান্তি কিংবা সমরে সবখানেই নারী সমান অবদান রাখতে সক্ষম। পৃথিবীর অনেক যুদ্ধ পুরুষের পাশাপাশি অকুতোভয় নারীদের বীরত্বের কারণে বিখ্যাত হয়ে আছে।

বিখ্যাত ৫ নারী বিজ্ঞানী

বিজ্ঞানী বলতেই আমরা কল্পনা করি অগোছালো একজন প্রবীণ পুরুষের ছবি। আর ছোটবেলা থেকে বইয়ের পাতায় কেবলই নিউটন-ডাল্টনদের কথা। অথচ ইতিহাসের পাতায় চোখে পড়ে বিখ্যাত কিছু নারী বিজ্ঞানীর নাম। বিজ্ঞানের বিভিন্ন অংশে যাদের অবদান অসামান্য।

ম্যারি কিউরী (১৮৬৭-১৯৩৪) – ম্যারি কিউরী প্রথম নারী বিজ্ঞানী যিনি নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন। তিনি ছিলেন একাধারে একজন রসায়নবিদ ও পদার্থবিদ। ম্যারি ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব প্যারিসের অধ্যাপক।

আইরিন কিউরী-জুলিয়ট (১৮৯৭-১৯৫৬) – রসায়নবিদ আইরিন কিউরী-জুলিয়ট ছিলেন বিজ্ঞানী ম্যারি কিউরীর মেয়ে। তিনি সর্ব প্রথম আর্টিফিসিয়াল রেডিওঅ্যাক্টিভিটি বা কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার করেন। মায়ের মত তিনিও নোবেল বিজয়ী।

লিস মাইটনার (১৮৭৮-১৯৬৮) – লিস মাইটনার ছিলেন একজন পদার্থবিদ। নিউক্লিয়ার পাওয়ার ও অস্ত্রশাস্ত্র নিয়ে তার অবদান অন্যতম। ১৯৪৪ সালে তিনি নোবেল প্রাইজ প্রত্যাখ্যান করেন।

জেন গুডল – জেন গুডল ছিলেন শ্রেষ্ঠ বর্গভুক্ত স্তন্যপায়ী প্রাণী গবেষক বা প্রিম্যাটোলোজিস্ট। তিনি কোন ডিগ্রী সনদ ছাড়াই ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। এর আগে জেন শিম্পাঞ্জি নিয়ে গবেষণা করতে ৫৫ বছর তানজেনিয়াতে কাটান। জেনের পাওয়া প্রায় অর্ধ শতাধিক প্রাইজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্রিটিশ একাডেমির রাষ্ট্রপতি পদক। ২০১৭ তে তিনি আন্তর্জাতিক কসমজ প্রাইজ লাভ করেন।

জোসেলিন বেল বার্নেল – জোসেলিন বেল বার্নেল একজন সক্রিয় জ্যোতিঃ পদার্থ বিজ্ঞানী। ১৯৬৭ সালে তিনি রেডিও পালসারস আবিষ্কার করেন এবং এ বিষয়ে গবেষণা শুরু করেন। তিনিও নোবেল প্রাইজ প্রত্যাখ্যানকারী।

বাংলা সাহিত্যে নারী লেখক

লেখক কিংবা কবি হওয়ার যে কয়টি উপকরণ অর্থাৎ প্রেম-ভালোবাসা, বিরহ-প্রতারণা, ক্রোধ-দ্রোহ, ক্ষয় আর লয়ের সঙ্গে একাকিত্ব কিংবা চাপানো প্রথার সবই সংরক্ষিত রয়েছে নারীর জীবনে। এর সবই ক্রিয়াশীল নারীর মনে। নারীর এ দগ্ধতা এ যাতনা চিরায়ত। বাংলাদেশ থেকে ফ্রান্স কিংবা ইথিওপিয়া থেকে গ্রিস কি রাশিয়ার যে কোনো নারীর জীবনেই রয়েছে এর আগ্রাসন। তাই পৃথিবীজুড়েই নারীর লেখা সাহিত্য পুরুষের পাশাপাশি হয়ে উঠেছে কিংবদন্তি। যে দেশপ্রেমের বোধে অনুপ্রাণিত এরিক মারিয়া রেমার্ক, ঠিক একই প্রেরণায় জ্বলজ্বলে নীলিমা ইব্রাহিম, সেলিনা হোসেন। বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে তাই যে কোনো নারী লেখকেরই অবদান অসীম। শুধু বাংলাদেশের কথাই বলি যদি সৃষ্টির শুরু থেকেই সামাজিক ও পারিবারিক ভাবে চাপানো অন্যায়-শৃঙ্খলিত করে রাখার প্রয়াস আর পরবর্তীতে বাল্যবিবাহ, সতীদাহ প্রথা, বিধবা বিয়ে নিষিদ্ধ এইসব অন্যায় নারীর ওপর দীর্ঘদিন ধরে চাপিয়ে দেয়ার কারণে যুগ যুগ ধরেই নির্যাতিত হয়ে এসেছে আমাদের নারীরা। সেই পরিস্থিতি যে খুব পাল্টে গেছে তা বলা না গেলেও মোটাদাগে বলা যায় অবস্থার উন্নতিও খুব বেশি হয়নি। বিরুদ্ধ সামাজিক প্রতিবেশে নারীর সাহিত্যকর্ম তো দূরের, নারীর লেখাপড়া করার সুযোগটাই যে দুরূহ ছিল তার একটা বাস্তবরূপ আমরা পেয়ে যাই বেগম রোকেয়ার জীবনীতে। তবু ওই বিরুদ্ধ প্রতিবেশ তিনি জয় করেছিলেন। তার লেখায় তিনি ধরে রেখেছেন প্রতিবাদ, স্পষ্ট করে তুলেছেন শোষণ ও আগ্রাসনের ছাপ। সুলতানাজ ড্রিম তার অসাধারণ এক রূপ। তাহলে এবার নারী সাহিত্যিক সম্পর্কে কিছু জেনে নিন।

▪বাংলা সাহিত্যের ভুবনে যেসব মহীয়সী নারী আলোর প্রদীপ জ্বালিয়েছেন তাদের মাঝে আধুনিকতার প্রথম পর্বে ছিলেন-স্বর্ণকুমারী দেবী। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম উল্লেখযোগ্য নারী সাহিত্যিক হিসেবেই তার পরিচিতি। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের নাতনি ও মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের চতুর্থ মেয়ে স্বর্ণকুমারী দেবী ছিলেন শিক্ষিত বাঙালি নারী সমাজের প্রথম যুগের অন্যতম প্রতিনিধি। ১৮৭৬ সালে স্বর্ণকুমারী দেবীর প্রথম উপন্যাস ‘দীপনির্বাণ’ প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাসের মধ্য দিয়ে তিনি প্রথম বাঙালি নারী ঔপন্যাসিকের মর্যাদায় অভিসিক্ত হন। স্বর্ণকুমারী দেবীর সমসাময়িক আরেকজন নারী নওয়াব ফয়জুন্নেসা। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে সাহিত্য সাধনায় আত্মনিয়োগ করা এই বাঙালি মুসলিম নারীর একমাত্র আত্মজৈবনিক উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৭৬ সালে ‘রূপজালাল’ নামে।

▪আমাদের সাহিত্যে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত থেকে শুরু করে রাবেয়া খাতুন পর্যন্ত নারী লেখকরা ধারাবাহিকতায় তাদের কথাসাহিত্যের বিষয়বস্তু, শিল্পরীতি ও জীবনবোধে বিভিন্ন মাত্রা নিয়ে উপস্থিত। রক্ষণশীল পরিবারে সম্পূর্ণ প্রতিকূল পরিবেশে জন্মগ্রহণ করেও নিজের চেষ্টা ও মনোবল সম্বল করে বেগম রোকেয়া সমাজ সংস্কার ও গঠনমূলক কাজে নিজেকে উজাড় করে দেন। বেগম রোকেয়া মতিচূর, পদ্মরাগ, অবরোধবাসিনী, সুলতানার স্বপ্ন প্রভৃতি বইয়ের ভেতর দিয়ে তার চিন্তা ও কর্মাদর্শের বাণী পৌঁছে দেয়ার প্রয়াস পেয়েছেন। রোকেয়া সাখাওয়াতের পদ্মরাগ উপন্যাস যে সময় লেখা হয়, তাতে যে আঙ্গিক ব্যবহৃত হয়েছে, তা থেকে বহু বছর পরের লেখক রাবেয়া খাতুনের উপন্যাসের আঙ্গিক সম্পূর্ণ ভিন্নই শুধু নয়, বিষয়বস্তু ও জীবনবোধেও আলাদা হয়েছে সময়কালের ব্যবধানে। এর ফলে নারী লেখকদের উপন্যাসের বিবর্তন, বৈচিত্র্য, বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করা গেছে। নূরুন্নেছা খাতুন, বিদ্যাবিনোদনী, জানকী বাঈ নামক উপন্যাস লিখেছেন ঐতিহাসিক পটভূমিতে।

▪বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট কবি বেগম সুফিয়া কামাল। স্কুল কলেজে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ না পেলেও সুফিয়া কামালের সাহিত্য প্রভাব বিস্তারী ভূমিকা পালন করে। কবিতার পাশাপাশি তিনি গল্প, ভ্রমণ কাহিনী, প্রবন্ধ ও স্মৃতিকথাও লিখেছেন। কামিনী রায়ের পর বাংলা সাহিত্যে নতুন করে সুফিয়া কামালের মধ্য দিয়েই নারী কণ্ঠস্বর স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। বেগম সুফিয়া কামাল কেয়ার কাঁটা গল্পগ্রন্থে লিখেছেন ব্যক্তিগত প্রেম, নর-নারীর ভালোবাসা নিয়ে গ্রাম-শহরের পটভূমিকায়।

▪এম ফাতেমা খানমের ছোটগল্প রচিত হয়েছে পারিবারিক ও গার্হস্থ্য জীবনকে ঘিরে। জোবেদা খানমের আকাশের রং, বন মর্মর ও অনন্ত পিপাসা উপন্যাসে নর-নারীর সম্পর্ক, সংগ্রাম ও নীতিনিষ্ঠ ভূমিকার প্রেক্ষাপট রচনা হয়েছে। কখনো কখনো দার্শনিক জিজ্ঞাসাও উপন্যাসে উঁকি দিয়েছে।

▪নীলিমা ইব্রাহিমের উপন্যাসে বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের ঢাকা নগরীর পটভূমিতে শিক্ষিত উচ্চবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও শিক্ষিত চাকরিজীবী পরিবারের দ্বন্দ্ব, সংকট ও মানবিকতা প্রকাশিত হয়েছে; বিশেষ করে শিক্ষিত ও শহরের নব্য চাকরিজীবী মহিলাদের জীবন সংকট ও জীবনবোধ বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের নারীদের ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর জঘন্য এবং ঘৃণ্য আচরণের সঙ্গে তাদের দোসর রাজাকার আলবদর আল শামসের অনুপ্রেরণা আর সহযোগিতার যে চিত্র আঁকা আছে তা কেবল সাহিত্যই নয়, ইতিহাসেরও এক অনন্য দলিল।

▪রাবেয়া খাতুন তার উপন্যাসে তুলে এনেছেন গ্রামীণ জীবনের কথা। তুলে এনেছেন রাজনৈতিক পালাবদলের ইতিহাস।

▪সেলিনা হোসেন একই সঙ্গে কথাসাহিত্যিক, গবেষক এবং প্রাবন্ধিক। তার লেখায় লোক পুরাণের চরিত্রগুলো একদিকে যেমন জীবন্ত হয়ে উঠেছে, তেমনি ভাবে তিনি আধুনিক জীবন এবং জীবনবোধকেও গভীর উপলব্ধির মধ্য দিয়ে প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছেন, যা তাকে বাংলা সাহিত্যে বিশিষ্ট লেখকের সম্মান এনে দিয়েছে। অন্যদিকে পূরবী বসুর রচনার ভেতরে দিয়ে উঠে এসেছে বিশ্বের নারীদের পাশাপাশি বাংলাদেশের নারীর শারীরিক মানসিক অবস্থা। তার সাহিত্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে নারীর অনগ্রসরতার মূল কারণগুলো। উপস্থাপিত হয়েছে নারী অসহায়তা, হাহাকার। এরও তারও অনেক অনেক বছর আগে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের লোকগীতিকার কবি চন্দ্রাবতীর কথা না বললে বাংলা সাহিত্যে নারী লেখকের অবদান অনালোচিতই থেকে যাবে। বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবি কে এ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও মধ্যযুগের কবি চন্দ্রাবতীকেই প্রথম মহিলা কবি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন সমালোচকদের অনেকে। চন্দ্রাবতীর বাবা ছিলেন মনসা মঙ্গল কাব্যের অন্যতম রচয়িতা দ্বিজ বংশী দাস এবং মা সুলোচনা। তার রচনার মাঝে মলুয়া, দস্যু কেনারামের পালা ও রামায়ণ কথা (অসমাপ্ত) অন্যতম। বাংলার লোককবির লোককথা আজও এ যুগেরও দারুণ সব সাহিত্য কীর্তির অনুপ্রেরণা হয়ে রয়েছে। কবি সৈয়দ শামসুল হক তার পরাণের গহীন ভিতরের সূচনায় বলেছেন, এই সনেটগুলো লিখতে গিয়ে বারবার আমি অনুভব করেছি আমার পেছনে অজানা অচেনা লোককবিদের উপস্থিতি। আমরা কে না জানি যে বাংলার প্রাচীন লোক কবিদের একজন চন্দ্রাবতী আর তার মৈমনসিংহ গীতিকা বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস সমৃদ্ধ ইতিহাস। এই ইতিহাস সমৃদ্ধ হয়েছে যুগে যুগে বিভিন্ন লেখকের হাত ধরে। আর এক্ষেত্রে নারীর অবদানও অপরিসীম। বাংলা সাহিত্যে নারীর অবস্থান সাহিত্যকে দিয়েছে নতুন গতি। নারী তার নিজস্বতা দিয়ে জাগিয়ে তুলেছে মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা জীবনের অন্যরূপ। নারীর লেখনী আমাদের সাহিত্যের এক অনন্য দলিল। বাংলা সাহিত্যের আকাশে নারী সাহিত্যিকদের অবদান বলে শেষ করার নয়। সময়ের প্রয়োজনে বাংলার নারী লেখকরা নিজের মত যেমন প্রকাশ করেছেন, তেমনি ভাবে মানুষের প্রয়োজনকেও মাথায়

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ এবং নারী

মুক্তিযোদ্ধার কথা ভাবলেই আমাদের চোখের সামনে অস্ত্র হাতে এক বীরপুরুষের অবয়ব ভেসে ওঠে। কিন্তু আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে শুধু পুরুষরা নয়, অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে নারীও। তবু মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদানের কথা এলে নির্যাতিত আর ধর্ষিত হওয়ার কথাই বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও দলিলপত্রে ৩০ লাখ শহীদ আর ২ লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার কথা উল্লেখ রয়েছে। বীরাঙ্গনা বা ধর্ষিত হওয়ার ঘটনা এতবেশি ঘটেছে যে তার আড়ালে চাপা পড়ে গেছে নারীর অস্ত্র হাতে বীরত্বের কথা, সাহসিকতার কথা। মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদানের ইতিহাস সমান ভাবে বীরত্বের ও গৌরবের। অথচ সেই গৌরবের ইতিহাসের অনেকটাই রয়ে গেছে অনালোচিত ও অজানা। তারামন বিবি, সিতারা বেগম কাঁকন বিবির মতো গুটিকয়েক নারী মুক্তিযোদ্ধাদের কথাই কেবল জানি। ইতিহাস আর স্বীকৃতির বাইরে রয়ে গেছে অসংখ্য নারী মুক্তিযোদ্ধা। আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধেও অনেক নাম না জানা নারী যোদ্ধা অবদান রেখেছেন। আমরা তাঁদের আত্মত্যাগ ও অবদানের কথা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করি। তাহলে এবার জেনে নিন তাদের সম্পর্কে কিছুটা।

করুন – যুদ্ধ শুরু হলে স্বামী শহীদুল যুদ্ধে যোগদান করেন। কিন্তু রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ে শহীদ হয় শহীদুল। স্বামীর মৃত্যুর একমাস পর তিন বছরের মেয়েকে মায়ের জিম্মায় রেখে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন। বরিশালের মুলাদী থানার কুতুব বাহিনীর অধীনে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন করুনা। এই বাহিনীর ৫০ জন নারীযোদ্ধার কমান্ডার হন তিনি। অসীম সাহসিকতা আর বীরত্বের সঙ্গে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনের দায়িত্ব পালন করেন করুনা ও তাঁর নারী মুক্তিযোদ্ধা বাহিনী। এক অপারেশনে পাক বাহিনীরত এলোপাতাড়ি গুলিতে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। আর তাতে সারা জীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করে নিতে হয় করুনাকে।

মনোয়ারা বেগম – শত্রু ও শত্রু শিবিরের গোপন খবর পৌঁছে দিতেন মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। পাক বাহিনীর গতিবিধির খবর জানতে ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন কিশোরগঞ্জ সদর। নিকলী ও বাজিতপুরের আশপাশের এলাকায়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এ কাজ করে গেছেন মনোয়ারা। এ ছাড়াও তিনি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার সংগ্রহ ও রান্না করা, যুদ্ধাহতদের সেবাশুশ্রষা করেছেন।

মনিকা – সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন একাধিকবার। রাজাকার ও পাক বাহিনীর আসা যাওয়ার খবরসহ মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আদান-প্রদান করতেন। বন্দুক চালাতে না জানলেও অস্ত্রহাতে ক্যাম্প পাহারা দিয়েছেন। সম্মুখ যুদ্ধে সহযোদ্ধাদের গুলি-বোমা বহন করেছেন।

ফাতেমা – ৭১ এ ফাতেমার বয়স ছিল ১৩ বছর। মাথার চুল ছোট থাকায় তাকে ছেলেই মনে হতো। মুক্তিযুদ্ধে টাঙ্গাইলের এই কিশোরী জীবনবাজি রেখে শত্রুর মোকাবেলা করেছেন। কাদেরিয়া বাহিনীর ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রান্না করা, অস্ত্র ও গোলাবারুদ পাহারা দেয়া, খবর আনা নেয়াসহ অস্ত্র সরবরাহ করার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজও করেছেন।

কাঞ্চনমালা – মুক্তিযোদ্ধা কাঞ্চনমালার বাড়ি লৌহজং থানার কমলা ইউনিয়নের ছোট্ট গ্রাম ডহরিতে। যুদ্ধের দু’বছর আগে বিয়ে হয় তার। ’৭১-এ পাকবাহিনীর ধরপাকড়ে পাকবাহিনীর ক্যাম্পে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয় কাঞ্চনমালা। ক্যাম্প থেকে একদিন পালাতে গিয়ে পুনরায় পাকি সেনার হাতে ধরা পড়ে। নির্মম পাশবিক অত্যাচারে জ্ঞান হারালে পাকিস্তানি বাহিনী তাকে মৃত ভেবে নদীর ধারে ফেলে যায়। এক মুক্তিযোদ্ধার সহায়তায় সে যাত্রায় বেঁচে যায় কাঞ্চনমালা। ভারতের তুরা ক্যাম্প হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন তিনি। টাঙ্গাইল ও ঘাটাইলে কয়েকটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে সাহসিকতা আর বীরত্বের পরিচয় দেন তিনি।

দেশ স্বাধীন হবার মাত্র কয়েকদিন আগে পাক বাহিনী আর তাদের দেশীয় দোসরদের নির্মমতার শিকার হন সাংবাদিক সেলিনা পারভীন। স্বাধীনতার প্রাক্কালে ১৩ ডিসেম্বর তাঁর সিদ্ধেশ্বরীর বাসা থেকে তাঁকে তুলে নিয়ে যায় মিলিটারি জিপ। ১৮ ডিসেম্বর রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে পাওয়া যায় তাঁর মৃতদেহ। সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের মতো পাক বাহিনী আর তাদের দোসর রাজাকার আলবদরের রোষানলে পড়েন কবি মেহেরুন নিসা। রাজাকার বাহিনীর হাতে নির্মম ভাবে শহীদ হন তিনি।

সাধারণ মানুষ জানে না মুক্তিযুদ্ধে নারীর কতবড় ভূমিকা ছিল। জীবনবাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে নারীও অংশ নিয়েছিল। সাহসিকতা আর বীরত্বের পরিচয় দেয়া সত্ত্বেও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি মেলেনি অনেক নারী যোদ্ধার কপালে। ইতিহাসের পাতায়ও ঠাঁই হয়নি করুনা, মনিকা, ফাতেমা আর কাঞ্চনমালার মতো আরও অনেক নাম না জানা নারী মুক্তিযোদ্ধাদের। মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসে তাঁরা হয়ে আছেন অদৃশ্য। মুক্তিযুদ্ধে পুরুষরা করেছেন দু’রকম যুদ্ধ। দেশরক্ষা আর জীবন রক্ষার যুদ্ধ। আর নারী তখন করেছেন তিনটি যুদ্ধ। দেশরক্ষা, জীবন রক্ষার পাশাপাশি তাদের ছিল সম্ভ্রম রক্ষার আরেক যুদ্ধ। অথচ মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের ইতিহাস কেবল পুরুষ মুক্তিযোদ্ধাদের।

বাঙালী বীর নারীরা চরম অবহেলা আর উদাসীনতার আড়ালে পড়েও তাদের কর্তব্য পালন করে গেছেন নীরবে, নিভৃতে। ভাষা আন্দোলন, ’৭১-এর স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে স্বাধীনতা পরবর্তীকালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতেও তারা ছিলেন সোচ্চার। সিতারা বেগম ও কাঁকন বিবিদের পর সে পথ দেখিয়েছেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম, কবি সুফিয়া কামাল। তাদের পথে আজ হাঁটছে এ প্রজন্মের নারীরা, মায়েরা, মেয়েরা। যুগে যুগে দেশ ও জাতি গঠনে নারীর অবদান স্বীকৃতি না পেলেও নারীর কৃতিত্ব তাতে মলিন হবে না এতটুকুও। কেননা নারীই জননী, আর জননী মানেই তো জন্মভূমি।

114 total views, 1 views today

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে
  • 15
    Shares

About অনন্যা মিতু

রক্তের সর্ম্পক ছাড়া যদি আর কোনো ঘনিষ্ট কোনো সর্ম্পক থাকে সেটা হলো বন্ধুত্ব।ভাগ্য তোমার আত্মীয় বেছে দেয় আর তুমি বেছে নাও তোমার বন্ধু।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন