ধর্ম জীবন এবং নৈতিকতা একে অন্যের পরিপূরক

ধর্ম জীবন এবং নৈতিকতা একে অন্যের পরিপূরক
5 (100%) 3 votes

ধর্ম মানব জীবনের জন্য অপরিহার্য। ধর্ম মানুষের মনে মানবিক মূল্যবোধ সঞ্চার করে। মানুষের পারস্পরিক কল্যাণকর কর্ম ও সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠাই সকল ধর্মের মৌলিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। ধর্ম পালন করলে যে কোন মানুষের মনে সহানুভূতির জন্ম হয়। ধর্ম সমাজ থেকে অন্যায় অত্যাচারের অবসান ঘটিয়ে সমাজ জীবনে মানুষের নিরাপত্তা বিধান করেছে। যদিও মানুষের লিখিত ইতিহাসের বয়স মাত্র ৫০০০ বছর। তাই এর আগের ধর্মীয় ইতিহাস সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা সম্ভব নয়। কালের আবর্তে অনেক ধর্ম হারিয়ে গেছে, আবার অনেক নতুন ধর্মের সৃষ্টি হয়েছে।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

ধর্ম

বিশ্বের প্রধান ধর্ম সমূহের সংক্ষিপ্ত ধারণা

ইসলাম ধর্ম – ইসলাম ধর্ম একটি একেশ্বরবাদী ধর্ম। কুরআন ইসলামের মূল ধর্মগ্রন্থ। এই ধর্মে বিশ্বাসীদের মুসলমান বা মুসলিম বলা হয়। আরবের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা মুহাম্মদ (স.) এর উপর কুরআন নাযিল হয়। ধর্মগ্রন্থ কুরআন সৃষ্টকর্তা আল্লাহ তায়ালার বাণী। মুসলমানরা বিশ্বাস করেন মুহাম্মদ (স.) শেষ নবী এবং ইসলাম আব্রাহামীয় শেষ ধর্ম। তাঁর নির্দেশিত কাজ ও শিক্ষার ভিত্তি হাদিস নামে পরিচিত। ইহুদি ও খ্রিস্ট ধর্মের ন্যায় ইসলাম ধর্মও আব্রাহামীয়। জনসংখ্যার দিক দিয়ে (১৪০ কোটি) এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম। নবী মুহাম্মদ (স.) ও তাঁর উত্তরসূরীদের প্রচার ফলশ্রুতিতে ইসলাম বিশ্বের বিভিন্ন এলাকায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ধর্মীয় মতানৈক্যের ভিত্তিতে ইসলামের অনুসারিরা মূলত দুই ভাগে বিভক্ত: সুন্নি ইসলাম (১২৫ কোটি) ও শিয়া ইসলাম (১৭ কোটি)।

খ্রিস্ট ধর্ম – খ্রিস্ট ধর্ম একটি একেশ্বরবাদী ধর্ম। এর গোড়াপত্তন হয় প্যালেষ্টাইনে ৩৩ খ্রিস্টাব্দে। এই ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা যীশু। খ্রিস্টানরা যীশুকে মসীহ মনে করেন এবং তাঁকে যীশু খ্রীস্ট বলে ডাকেন।জনসংখ্যার দিক দিয়ে (২১০ কোটি) এটি বিশ্বের বৃহত্তম ধর্ম। খ্রিস্ট ধর্মের মূল গ্রন্থ নতুন টেস্টামেন্ট বা নতুন বাইবেল। এই ধর্মাবলম্বীরা খ্রিস্টান নামে পরিচিত। তারা বিশ্বাস করে যে যীশু খ্রীস্ট হচ্ছেন ঈশ্বরের পুত্র। গীর্জায় ‘ফাদার’ বা ধর্ম গুরুর তত্ত্বাবধানে ধর্মীয় প্রার্থনা করা হয়। ধর্মীয় মতবাদের কিছু পার্থক্যের ভিত্তিতে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীরা কয়েক ভাগে বিভক্ত। যেমন: রোমান ক্যাথলিক চার্চ, প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদ, অর্থোডক্স চার্চ, আসিরীয় চার্চ , মর্মন ও অন্যান্য খ্রিস্টীয় বিশ্বাস।

হিন্দু ধর্ম – হিন্দু ধর্ম বিশ্বের প্রাচীন ধর্মগুলোর মধ্যে একটি। এর গোড়াপত্তন আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৫ শতকে। ভারতীয় উপমহাদেশের একাধিক স্থানীয় ধর্মীয় ঐতিহ্য একত্রে হিন্দুধর্ম নামে পরিচিত। এই ধর্মের কোনো একক প্রতিষ্ঠাতা নেই। বিভিন্ন দেব-দেবীতে বিশ্বাস থাকলেও মূলত একেশ্বরবাদী (ব্রক্ষ্মা) ধর্ম। লৌহযুগীয় ভারতের ঐতিহাসিক বৈদিক ধর্মে এই ধর্মের শিকড় নিবদ্ধ। হিন্দুধর্মকে বিশ্বের “প্রাচীনতম জীবিত ধর্মবিশ্বাস” বলা হয়। ‘Indus’ বা সিন্ধু শব্দ থেকে ফারসি ‘হিন্দু’ শব্দের উৎপত্তি। জনসংখ্যার দিক দিয়ে (৯০ কোটি) এটি বিশ্বের ৩য় বৃহত্তম ধর্ম। মূল ধর্মগ্রন্থ বেদ, উপনিষদ, ভগবদ গীতা সংস্কৃত ভাষায় রচিত। ধর্মীয় প্রার্থনা হিসাবে মন্দিরে গুরু বা ঠাকুরের তত্ত্বাবধানে পুজা বিভিন্ন দেব-দেবীর পুজা করা হয়। ধর্মীয় আচার-আচরণের পার্থক্যে বৈষ্ণব – ৫৮ কোটি, শৈব – ২২ কোটি। শাক্ত/স্মার্ত/আর্য সমাজ ও অন্যান্য হিন্দু বিশ্বাস – ১৫ কোটি।

বৌদ্ধধর্ম – বৌদ্ধ ধর্ম গৌতম বুদ্ধ কর্তৃক প্রচারিত একটি ধর্ম বিশ্বাস এবং জীবন দর্শন। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দিতে গৌতম বুদ্ধের জন্ম। ভারতীয় উপমহাদেশ সহ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার হয়। বর্তমানে বৌদ্ধ ধর্ম দুটি প্রধান মতবাদে বিভক্ত। প্রধান অংশটি হচ্ছে হীনযান বা থেরবাদ (সংস্কৃত: স্থবিরবাদ)। দ্বিতীয়টি মহাযান নামে পরিচিত। বজ্রযান বা তান্ত্রিক মতবাদটি মহাযানের একটি অংশ। জনসংখ্যার দিক দিয়ে (৩৮ কোটি) এটি বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম ধর্ম।

কনফুসীয় ধর্ম – কনফুসীয় ধর্ম বিখ্যাত চৈনিক সাধু কনফুসিয়াসের শিক্ষার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। কনফুসিয়াস ৫৫১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে চীনের শানতুং প্রদেশে জন্মগ্রহন করেন। এটি মূলত একটি নৈতিক ও দার্শনিক বিশ্বাস ও ব্যবস্থা যা কনফুসিয়াসের দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠাতা। কনফুসিয় ধর্মের মূলকথা হচ্ছে মানবতাবাদ।

শিখধর্ম – শিখধর্ম একটি একেশ্বরবাদী ধর্ম। খ্রিষ্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীতে ভারতের পাঞ্জাব অঞ্চলে এই ধর্ম প্রবর্তিত হয়। এই ধর্মের মূল ভিত্তি গুরু নানক দেব ও তাঁর উত্তরসূরি দশ জন শিখ গুরুর ধর্মোপদেশ। শিখধর্ম বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম ধর্মীয় গোষ্ঠী। শিখ ধর্মমত ও দর্শন মূলত ইসলাম ও হিন্দু ধর্মের আংশিক সংমিশ্রণ। এদের উপসনালয়ের নাম গুরুদুয়ারা ও ধর্মগ্রন্থের নাম গ্রন্থ সাহিব।

ইহুদি ধর্ম – একেশ্বরবাদী ইহুদি ধর্ম বিশ্বের প্রাচীন ধর্মগুলোর মধ্যে একটি। একে সেমেটিক ধর্ম হিসেবেও অভিহিত করা হয়। এর গোড়াপত্তন আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৩ শতকে। এই ধর্মের মূল ধর্মগ্রন্থ হিসেবে ওল্ড টেস্টামেন্ট যাকে “তোরাহ”ও (Torah) বলা হয়ে থাকে। এই ধর্মের প্রবর্তক মোসেয হলেন ঈশ্বরের একজন বাণীবাহক। অনুসারির সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৪০ লক্ষ।

জৈন ধর্ম – জৈনধর্ম প্রাচীন ভারতে প্রবর্তিত একটি ধর্মমত বা ঈশ্বরহীন দর্শন। জৈন ধর্মে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব নেই। তারা আত্মাতত্ত্বে বিশ্বাসী। মানুষের আত্মা দেহের উপর ভর করে মুক্তির পথে পরিভ্রমণরত। সংখ্যায় কম হলেও বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই ধর্মমতাবলম্বীদের দেখা যায়। জৈনধর্মের মূল বক্তব্য হল সকল জীবের প্রতি শান্তি ও অহিংসার পথ গ্রহণ। এই ধর্ম মতে, নির্বাণ বা মোক্ষলাভ মানব জীবনের পরম লক্ষ্য। এর সাথে বৌদ্ধ ধর্মের কিছুটা মিল রয়েছে। যে ব্যক্তি বা আত্মা অন্তরের শত্রুকে জয় করে সর্বোচ্চ অবস্থা প্রাপ্ত হন তাঁকে জিন (জিতেন্দ্রিয়) আখ্যা দেওয়া হয়। এই ‘জিন’ শব্দ থেকে ‘জৈন’ শব্দের উৎপত্তি। বর্ধমান মহাবীরের মৃত্যুর বেশ কিছুকাল পর জৈনদের মধ্যে বিভাজন হয় এবং দুটি মতের সৃষ্টি হয়।
১. দিগম্বর- যারা সম্পূর্ণ নিরাভরন থাকায় বিশ্বাসী
২. শ্বেতাম্বর- যারা অল্প বস্ত্র পরিধানে বিশ্বাসী।
আচারগত ভাবে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও তারা জৈন দর্শনের মূল বিষয়ে (মহাব্রত) একমত। যেমন: অহিংসা, সুনৃত (সত্য), মূলত (অচৌর্য), ব্রহ্মচর্য, অপরিগ্রহ ইত্যাদি।

ধর্ম জীবন ও নৈতিকতা

যে কোনো মানুষের জন্যই আত্মশুদ্ধি, নৈতিক পরিশুদ্ধি এবং সদাচার অত্যন্ত জরুরি। আর এই সব কিছুর জন্য ধর্ম পালন অতীব জরুরী। ধর্ম ছাড়া প্রকৃত কল্যাণ অর্জন সম্ভব নয়। একজন ব্যক্তি যদি পৃথিবীর সব জ্ঞান অর্জনের পরও নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সে ব্যক্তিকে পরিপূর্ণ স্বার্থক বলা যাবে না। মানুষ অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। বৈজ্ঞানিক ও শিল্প ক্ষেত্রেও চোখ ধাঁধানো সাফল্য পাচ্ছে মানুষ। কিন্তু আত্মিক ও নৈতিক ক্ষেত্রে মানুষের সাফল্য কতটুকু? মানুষ কি ক্রমেই নীতিবান হচ্ছেন নাকি আরো নীতিহীন হয়ে পড়ছেন? বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতির দিকে নজর দিলে সে প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজে পাওয়া যাবে সহজেই। বিশ্বের অনেক রাষ্ট্রই এখন ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতাকে পরিহার করছে। তারা ধর্মীয় শিক্ষাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে চলছে। এর ফলে দেখা দিচ্ছে নানা সমস্যা। আত্মিক ও নৈতিক পরিশুদ্ধির গুরুত্ব উপলব্ধি করতে ব্যর্থতা ও নৈতিকতা সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি না থাকার কারণে পাশ্চাত্যে সমকামিতা সহ নানা ঘৃণ্য সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ছে। মার্কিন অধ্যাপক থমাস লিকোনা এ সম্পর্কে বলেছেন, ‘ আমরা আসলে কোথায় যাচ্ছি ? এখন সদ্যজাত শিশুদেরকে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়ার ঘটনা ঘটছে। প্রতি বছর আমেরিকায় ১৫ লাখ ভ্রুণ হত্যা করা হচ্ছে। শিশুদের ওপর শারীরিক ও যৌন নির্যাতনও ক্রমেই বাড়ছে। কে জানে ৫০ অথবা ১০০ বছর পরের প্রজন্ম এ পরিস্থিতিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে? জনমত জরিপগুলোর ফলাফলেও দেখা যাচ্ছে, আমেরিকার জনগণের একটা বড় অংশ এটা বুঝতে পাচ্ছেন যে, দেশটি আধ্যাত্মিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের কবলে পড়েছে। তারা এটাও বুঝতে পাচ্ছেন যে, মার্কিন শিশুদেরকে স্কুল ও পরিবারে নীতি-নৈতিকতার শিক্ষা দেয়া উচিত।’

পাশ্চাত্যের দেশগুলোর পাশাপাশি অনেক মুসলিম দেশেও ধর্মীয় শিক্ষা গুরুত্ব পাচ্ছে না। এর একটি কারণ হলো, ধর্ম ভিত্তিক নীতি-নৈতিকতা ও শিক্ষার গুরুত্ব এখনো অনেক মুসলমানই বুঝতে সক্ষম হননি। ইসলাম ধর্মকে পুরোপুরি বুঝতে না পারার কারণেই এ ধরনের সমাজে নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। মানুষ সৃষ্টি করতেই পৃথিবী সৃষ্টি করা হয়েছে। মানুষ হচ্ছে আল্লাহর এক মহান সৃষ্টি। মানুষ হচ্ছে দ্বিমাত্রিক জীব। মানুষের রয়েছে শরীর ও আত্মা। অন্য সব প্রাণীর সঙ্গে অনেক মিল থাকলেও মানুষই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ জীব। মানুষের এমন কিছু গুণাবলী রয়েছে,যা অন্য কোনো প্রাণীর নেই। পরম সত্ত্বা আল্লাহর সর্বোত্তম ও সৌন্দর্যতম প্রকাশ হচ্ছে মানুষ। প্রতিটি মানুষের মাঝে আল্লাহ তায়ালা এমন সব যোগ্যতা দিয়েছেন যে, মানুষ ইচ্ছে করলে নিজেকে সর্বোত্তম সৃষ্টি হিসেবে প্রকাশ করতে পারে। আবার এই মানুষই নিকৃষ্টতম সৃষ্টিতে পরিণত হতে পারে। মানুষকে আধ্যাত্মিক এবং বৈষয়িক উন্নতি সাধন ও পূর্ণতা লাভের জন্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়েছেন। একদিকে প্রজ্ঞা, আর অন্যদিকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নির্বাচন করার যোগ্যতা হলো মানুষের দু’টি বড় প্রাপ্তি। মানুষের জন্য সততার পথ উন্মুক্ত। নবী-রাসূলেরা হচ্ছেন মানুষের পথপ্রদর্শক ও প্রেরণাদাতা। তবে মানুষ কামনা-বাসনা, অজ্ঞতা ও উদাসীনতার কবলে পড়ে চরমভাবে বিভ্রান্ত হতে পারে এবং পূর্ণতা ও উৎকর্ষতা লাভের সুযোগ হাতছাড়া করতে পারে।

কাজেই মানুষের সামনে দু’টি পথই খোলা রয়েছে। মানুষ পূর্ণতার পথেও যাত্রা করতে পারে, আবার চরম পতনের দিকেও ধাবিত হতে পারে। পবিত্র কুরআনের সূরা শামসের ৭,৮,৯ ও ১০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে,
মানুষের নফসের ও সেই সত্ত্বার কসম, যিনি তাকে সঠিক ভাবে গঠন করেছেন। এবং [শপথ ] তার পাপ পুণ্যের জ্ঞানের। সেই-ই সফলকাম যে তার [ আত্মাকে ] পরিশুদ্ধ করে এবং সেই-ই ব্যর্থ হয়েছে যে তা দুর্নীতিগ্রস্ত করেছে। এসব আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, মানুষ উন্নতির মাধ্যমে ফেরেশতার চেয়েও উঁচু মর্যাদায় পৌঁছতে পারে। অপরদিকে মানুষ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট অবস্থানে নিজেকে নিয়ে যেতে পারে। কাজেই ব্যক্তির ওপরই নির্ভর করে তার পরম স্বার্থকতা ও চরম ব্যর্থতার বিষয়টি। আল্লাহ তায়ালা মানুষের সামনে ভালো ও মন্দ- এ উভয় পথই খোলা রেখেছেন। মানুষ তার আকল বা বিবেকের মাধ্যমে এবং নবী-রাসূলগণের পথ নির্দেশনায় ভালো ও মন্দকে আলাদা করতে পারে। যারা ঐশী শিক্ষার আলোকে আত্মগঠন করতে পারে, আত্মার উন্নতি সাধন করতে পারে এবং পাপ-পঙ্কিলতা থেকে দূরে থাকতে পারে, তারাই প্রকৃত সফলকাম, তারাই কেবল পরিত্রাণের আশা করতে পারে। রাসূল (সা.) কে পৃথিবীতে পাঠানোর একটি প্রধান উদ্দেশ্য হলো, পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা। সূরা জুমার ২ নম্বর আয়াতে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে: তিনিই মহান সত্তা যিনি উম্মীদের মধ্য থেকে তাদেরই একজনকে রসূল করে পাঠিয়েছেন যে তাদেরকে তাঁর আয়াত শোনায়, তাদের জীবনকে সজ্জিত ও সুন্দর করে এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দেয়। অথচ ইতিপূর্বে তারা স্পষ্ট গোমরাহীতে নিমজ্জিত ছিল। রাসূল (সা.) রেসালাতের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেছেন, উন্নত নৈতিক গুণাবলীকে পূর্ণতা দিতে আমাকে পাঠানো হয়েছে। কাজেই প্রচলিত শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি সবাইকে ধর্ম নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে, নইলে গোটা মানব জাতিই চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে।

মানুষের যাবতীয় কুপ্রবৃত্তি দূরীভূত করার জন্য ধর্মের জ্ঞান থাকা প্রয়োজন; যা সত্যবাদী ও সহমর্মী হতে শেখায় এবং ভালো কাজে প্রণোদিত করে। ধর্মের অনুশীলনের মাধ্যমে পরিবার হয় মার্জিত, ভদ্র ও ধার্মিক। এভাবে ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে। সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা সুরক্ষা ও মানব কল্যাণে ধর্মের প্রভাব সর্বাধিক। ধর্মীয় মূল্যবোধ ও বিধিনিষেধ সামাজিক বিশৃঙ্খলা রোধে যথেষ্ট অবদান রেখে চলেছে। সমাজ থেকে সকল প্রকার নৈতিকতা বিবর্জিত ও শরিয়ত গর্হিত পাপ কাজ ধর্মের দ্বারা দূর করা সম্ভব। ধর্ম জাতীয় ঐক্য, সংহতি ও স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা বিধান করতে পারে। ধর্ম দ্বন্দ্ব-বিক্ষুব্ধ অশান্ত পৃথিবীতে সামাজিক শান্তি ও নিরাপত্তা বিধান করতে পারে। মানুষের সেবা করাই ধর্মের কাজ। বিপদগ্রস্ত ও অভাবীর অভাব দূর করা, ঋণগ্রস্তকে ঋণ দিয়ে সহযোগিতা করা প্রভৃতি ধর্মের শিক্ষা। মানুষের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য ও ন্যায়পরায়ণতা সম্পর্কে সব ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিই অভিন্ন; যা মানুষকে কর্তব্যপরায়ণ ও দায়িত্বশীল হতে শেখায়। ধর্ম মানুষকে সৎকর্মের প্রেরণা জোগায়। কেননা বৈষয়িক উন্নতির মূলমন্ত্র হলো ভালো কাজ করা, তাই ধর্ম মানুষকে মহৎ কাজ করার জন্য উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিয়েছে। ধর্মীয় জ্ঞান মানুষকে পরিশীলিত করে। ইসলামে নর-নারীর বিদ্যার্জনকে ফরজ ঘোষণা করা হয়েছে। ইহকালে কীভাবে পথ চললে মানুষের সার্বিক কল্যাণ আসবে এবং পরকালের জন্য কী করলে মানুষ কঠিন শাস্তি থেকে মুক্তি পাবে, ধর্ম তার শিক্ষা দেয়। ধর্মের মাধ্যমে মানুষ মহান সৃষ্টিকর্তার পরিচয়, তাঁর নিদর্শন, আল্লাহর নৈকট্য লাভ করার উপায় জানতে পারে। এসব কিছু জেনে ধর্মীয় বিধিবিধান পালন ও অনুশীলনের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়। সুতরাং মানব জীবনে ধর্মের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। মানুষের ইহলৌকিক কল্যাণ, পরকালীন শান্তি ও মুক্তির জন্য ধর্মের যাবতীয় বিধিবিধান ও অনুশাসন মেনে চলাও অবশ্য কর্তব্য। ধর্ম কোনো বিভেদ নয়, বরং মানবতার ঐক্যের কথা বলে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সব মানুষকে মুক্তি ও শান্তির দিগদর্শন দেয়। এক কথায় বলা যায়, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, রীতিনীতি ও বিধিবিধান সমূহ ব্যক্তির সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে।

80 total views, 1 views today

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে
  • 12
    Shares

About আলোকিত আধারে

কেউ হয়ত জানতেই চাইবেনা কোথায় বাঁধা ছিল এ হৃদয়। শুধু রচিত হবে আমার এপিটাফ - মৃত্যু হবে আমার সকল আবেগের, ভালবাসার, যন্ত্রণার।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন