ডিম সমাচার। ডিমের উপকারিতা এবং পুষ্টিগুন

ডিম সমাচার। ডিমের উপকারিতা এবং পুষ্টিগুন
4.7 (93.33%) 18 votes

ডিম সবার কাছে অতি পরিচিত খাদ্য। এটি পরিপূর্ণ পুষ্টিকর খাবার, যা শরীরের নানা উপকার করে এবং স্বাস্থ্যের জন্য অতি উত্তম। ডিমে প্রচুর প্রোটিন, চর্বি, ভিটামিন, খনিজ পদার্থ, কোলিন ও আট ধরনের অ্যামাইনো এসিড থাকে, যা সুস্থ দেহ গঠনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

ডিম

ডিম থেকে যে খাদ্য উপাদান পাওয়া যায়

ডিমে প্রচুর পরিমাণে ফ্যাটি এসিড আছে। একটি ডিমে সম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ ১.৮৬ গ্রাম, অসম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ ৩.১২ গ্রাম ও কোলেস্টেরলের পরিমাণ ২২৫ গ্রাম। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, একটি ডিমে যে খাদ্য উপাদান পাওয়া যায় তা – খাদ্যশক্তি ১৮১ কিলোক্যালরি, আমিষ ১৩.৫ গ্রাম, চর্বি ১৩.৭ গ্রাম, শর্করা ০.৮ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ৭০ মিলিগ্রাম, আয়রন ৩ গ্রাম, পানি ৩৫ গ্রাম, কোলেস্টেরল ২২৫ গ্রাম, সোডিয়াম ০.১২ গ্রাম, ক্লোরিন ০.১৮ গ্রাম, পটাশিয়াম .১২ গ্রাম, ভিটামিন বি-১ ০.৫ মিলিগ্রাম, বি-৬ ০.১৪ মিলিগ্রাম, নিয়োসিন ০.৭ মিলিগ্রাম, থায়ামিন ০.০৬ মিলিগ্রাম, ই-৭ ৪০ মিলিগ্রাম, বি-২ ৩১০ মিলিগ্রাম, বি-১২ ১ মিলিগ্রাম, এ- ৭৪০ মিলিগ্রাম, ফলাসিন ৪৬ মিলিগ্রাম কোলিন ১২৬ মিলিগ্রাম, ফসফরাস ৯৬ মিলিগ্রাম, সেলেনিয়াম ১৫.৮ মাাইক্রোগ্রাম। ডিমের সাদা অংশ বা অ্যালবুমিন ৩৪-৩৫ গ্রাম থাকে, যা ডিমের মোট ওজনের শতকরা ৫৭ ভাগ।

ডিম

ডিম খাওয়ার উপকারিতা

ডিম দিয়ে আমরা কত কিছুই না রান্না করি। ডিমের রেসপি আমাদের একটা প্রিয় খাবার কারণ ডিম একটি সহজলভ্য ও উন্নত মানের আমিষ জাতীয় খাদ্য। ডিমে রয়েছে প্রাকৃতিক ভিটামিন, যা দেহগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি ডিমে প্রোটিন আছে প্রায় ছয় গ্রাম, যাতে রয়েছে মানবদেহের জন্য অত্যাবশ্যকীয় নয়টি অ্যামিনো অ্যাসিড। ডিমে রয়েছে অতি মূল্যবান ওমেগা-৩, যা হৃৎপিণ্ডকে কার্যকর রাখতে সাহায্য করে। কোলিন ডিমের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা গর্ভবতী মায়ের মস্তিষ্কজনিত জটিলতা দূরীকরণে সহায়তা করে, গর্ভাবস্থায় শিশুর মেধা ও স্মৃতি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। ডিমে আছে ফলিক অ্যাসিড,যা ত্রুটিপূর্ণ সন্তান জন্মদানের ঝুঁকি কমায়। এ ছাড়া রয়েছে সেলেনিয়াম, যা মানুষের মানসিক চাপ কমাতে সহায়তা করে এবং ক্যানসার, বিশেষত প্রোস্টেট ক্যানসার রোধে সহায়তা করে। ডিমে রয়েছে লিউটিন ও জিয়াজ্যান্থিন, যা চোখের ছানি পড়া রোধে সহায়তা করে।
ডায়াবেটিসের রোগীরাও নিয়মিত ডিম খেতে পারেন। ডিমে থাকা অ্যালবুমিন, মিউকাস মেমব্রেনকে সুরক্ষা করে পাকস্থলীর প্রদাহ, আলসার ও ডায়রিয়া প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা রাখে। ডিমে রয়েছে ৫ গ্রাম কোলেস্টেরল, যার প্রায় ৩.৫ গ্রাম উপকারী ও ভালো কোলেস্টেরল, যা মানুষের দৈনন্দিন কার্যক্রমে প্রয়োজন, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়। মানব শরীরের জন্য কোলেস্টেরল খুবই প্রয়োজন। এই কোলেস্টেরলের ভয়ে কেউ কেউ ডিম খান না। অথচ কোলেস্টেরল মানব শরীরের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় একটি উপাদান। পুরুষের সেক্স হরমোন টেস্টোস্টেরন আর মহিলাদের সেক্স হরমোন ইস্ট্রোজেন দেহে তৈরির জন্য কোলেস্টেরল প্রয়োজন। ভিটামিন ডি এবং যকৃতের বাইল এসিডের প্রাথমিক উৎস কোলেস্টেরল। তা ছাড়া শরীরের বিপাকীয় কাজে কোলেস্টেরল গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে। ডিমে প্রচুর ওমেগা-৩ থাকে, যা শরীরের সাইকোটাইনিস নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। এ উপাদানটি রক্তে ট্রাইগ্লিসারিনের পরিমাণ কমিয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। তা ছাড়া এ উপাদানটি চোখের দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি করে। দেহের সালমোনেলা আক্রমণ রোধ করে, মাংসের ক্ষয় রোধ করে এবং স্তনক্যান্সার প্রতিরোধ করে। ডিমের এইচডিএল (হাই ডেনসিটি লাইপো প্রোটিন), অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড, ওমেগা-৩ রক্তের কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমায় এবং রক্তনালীতে এলডিএল (লো-ডেনসিটি লাইপো প্রোটিন) জমতে দেয় না। ফলে হৃদরোগ ও মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণ রোগ অনেকাংশে কমে যায়। ২০০৩ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় একটি সমীক্ষায় দেখিয়েছে মেয়েদের অ্যাডোলেশন পিরিয়ডে বা পরবর্তী কালে সপ্তাহে ৬টি করে ডিম নিয়মিত খেলে প্রায় ৪৪% ব্রেস্ট ক্যানসার প্রতিরোধ করা সম্ভব ৷ ডিমের জৈব ক্রোমিয়াম ইনসুলিন উৎপাদনের মাধ্যমে রক্তের শর্করা বা চিনির সমতা বজায় রাখে। ডিমে ফসফরাস থাকে, যা দেহের হাড় গঠনে সাহায্য করে। কুসুমে থাকে ফোলেট, যা রক্তকোষ তৈরিতে সাহায্য করে এবং কুসুমে জিংক থাকে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

ডিম

হাস নাকি মুরগি কোন ডিম বেশী উপকারি?

অনেকেই ধারণা করেন, হাঁসের ডিমের চেয়ে মুরগির ডিম ভালো। কথাটি কিন্তু ঠিক নয়। পুষ্টিমূল্যের বিবেচনায় হাঁস ও মুরগির ডিমের মান প্রায় একই বলা যায়। মুরগির ডিমই ভালো, মুরগির ডিম খেলে বেশি উপকার পাওয়া যাবে—এমন ধারণা করা ভুল। হাঁস ও মুরগির ডিমের তুলনামূলক কিছু তথ্য দিয়ে বিষয়টি আরো স্বচ্ছ করা যেতে পারে। প্রতি ১০০ গ্রাম খাদ্যোপযোগী হাঁসের ডিমে রয়েছে ১৮১ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি। আর মুরগির ডিমে আছে ১৭৩ কিলোক্যালরি। প্রতি ১০০ গ্রাম হাঁসের ডিমে আমিষ ১৩ দশমিক ৫ গ্রাম আর একই পরিমাণ মুরগির ডিমে ১৩ দশমিক ৩ গ্রাম এবং হাঁসের ডিমের চর্বি ১৩ দশমিক ৭ গ্রাম, মুরগির ডিমে চর্বি ১৩ দশমিক ৩ গ্রাম। ১০০ গ্রাম হাঁসের ডিমে ক্যালসিয়াম ৭০ মিলিগ্রাম, লৌহ ৩ মিলিগ্রাম, ভিটামিন এ ২৬৯ মাইক্রোগ্রাম। অন্যদিকে মুরগির ডিমে ক্যালসিয়াম ৬০ মিলিগ্রাম, লৌহ ২ দশমিক ১ মিলিগ্রাম, ভিটামিন এ ২৯৯ মাইক্রোগ্রাম। তুলনামূলক বিবেচনায় দেখা যাচ্ছে, হাঁসের ডিমে খাদ্যশক্তি, আমিষ, চর্বি, শর্করা, লৌহ ও ক্যালসিয়ামের মুরগির ডিমের তুলনায় সামান্য বেশি থাকে। আর মুরগির ডিমে হাঁসের ডিমের তুলনায় ভিটামিন এ এবং ভিটামিন বি২ সামান্য বেশি থাকে। চুলচেরা বিচারে হাঁসের ডিমকেই বেশি পুষ্টিমান বলা যেতে পারে। তবে সাধারণভাবে হাঁস ও মুরগির ডিম উভয়কেই সমান পুষ্টিসম্পন্ন বলা যেতে পারে।

বিশ্ব ডিম দিবস

১৯৯৬ সালে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় প্রথম ‘বিশ্ব ডিম দিবস’ (World Egg Day) পালনের আয়োজন করে, যা পরবর্তী সময়ে প্রতি বছর অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার পালিত হয়ে আসছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ভারত প্রভৃতি দেশসহ সারা বিশ্বের ৪০টি দেশে পালিত হয় এই দিবস। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ অ্যানিমেল অ্যাগ্রিকালচার সোসাইটি (বিএএএস) ইন্টারন্যাশনাল এগ কমিশনের বাংলাদেশ প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত হয়। একই বছরের ১১ অক্টোবর বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো পালন করা হয় ‘বিশ্ব ডিম দিবস’, যা ছিল ১৮তম। ২০১৩ সালে বাংলাদেশে প্রত্যেক মানুষের বছরে গড় ডিম গ্রহণ ছিল মাত্র ৩৫-৩৭টি। মাত্র কয়েক বছরে তা বেড়ে ৭৫টি তে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী বছরে প্রত্যেক মানুষের গড় ডিম গ্রহণ ন্যূনতম ১০৪টি হওয়া উচিত।

ডিম

ডিম সম্পর্কে কিছু ভুল ধারণা

অনেকের মধ্যেই ডিম সম্পর্কে ভুল ধারণা আছে। ডিমের মধ্যে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল ও চর্বি আছে ভেবে চল্লিশোর্ধ্ব অনেক ব্যক্তি ডিম গ্রহণে বিরত থাকেন। কিন্তু একজন পূর্ণবয়স্ক সুস্থ মানুষ প্রতিদিন ৩০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত কোলেস্টেরল গ্রহণ করতে পারে। ডিমে থাকে ২২৫ গ্রাম কোলেস্টেরল। সুতরাং ভয় করে ডিম খাওয়া বাতিল করা উচিত নয়, যদি আপনার দেহে কোলেস্টেরল আগে থেকে বেড়ে না থাকে । তবে মনে রাখবেন, আপনার শরীরের সমস্যা থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ মতো ডিম খাবেন।

অনেকেই শিশুর মোটা হয়ে যাওয়ার ভয়ে তাকে ডিম খাওয়া কমিয়ে দেওয়া হয়। অথচ ডিম ওজন কমাতে সাহায্য করে। ব্রেকফাস্টে রোজ একটি ডিমের কারণে সারাদিন আপনার ক্ষুধা কম হবে, খাওয়া হবে কম। গবেষণায় দেখা যায় শরীর থেকে দিনে প্রায় ৪০০ ক্যালোরি কমাতে পারে সকালে একটি ডিম খাওয়া ,তাছাড়া  ৬৫% বডি ওয়েট, ১৬% বডি ফ্যাট, ৩৪% কোমরে জমে থাকা মেদের পরিমাণ কমাতে পারে ! তবে কাঁচা ডিমে সালমোনেলা সিগেলা নামক জীবাণু সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে, তাই কাঁচা খাওয়া উচিত নয়।। গরমের সময় এ আশঙ্কা আরো বেশি থাকে।

অনেকে মনে করেন, ডিম খেলে বাত হয়। তা সঠিক হয়। বাতের অন্যতম কারণ হলো রক্তের ইউরিক এসিডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া। ডিমের সাদা অংশে যে ইউরিক এসিড থাকে তা খুবই সামান্য, যা আমাদের শরীরের কোনো ক্ষতি করে না।

305 total views, 1 views today

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে
  • 3
    Shares

About ইমন

আমি মহা মানব নই, আমি একজন সাধারণ মানুষ। তাই আমার এপিটাফ হবে আমার মতই সাধারণ, কালের গর্ভে এটিও হারিয়ে যাবে, যেমনটা হারায় একজন সাধারণ মানুষ।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন