চা পানের উপকারিতা এবং অপকারিতা

চা পানের উপকারিতা এবং অপকারিতা
5 (100%) 3 votes

চা পান করেন না এমন মানুষ খুব কমই আছেন। সারাদিনের কাজ, মিটিং, আড্ডা, মান-অভিমানের সঙ্গী হলো চা। চা মূলত ক্যামেলিয়া সিনেনসিন উদ্ভিদের পাতা, মুকুলের ও পর্বের কৃষিজ পণ্য যা বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় তৈরী করা হয়। চা বলতে সুগন্ধযুক্ত এবং স্বাদবিশিষ্ট পানীয়কেও বোঝানো হয়। চায়ের নামকরণ করা হয় গ্রীকদেবী ‘থিয়া’ এর নামানুসারে। এর জন্মস্থান চীনদেশে। চা এর বৈজ্ঞানিক নাম Thea Sinensis এবং Camellia Sinensis। দু’টি পাতা থেকে একটি কুঁড়ি হতে শুরু করে দুধ সাদা কাপে সোনালি লিকারের চায়েই পাওয়া যায় চনমনে চাঙ্গা ভাব। তবে অতিরিক্ত চা বা কফি পানে এর প্রতি এক ধরনের আসক্তি তৈরি হতে পারে। আজকের লেখায় জানবেন চা পানের উপকারিতা এবং অপকারিতা সম্পর্কে।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

চা

রঙ চা নাকি দুধ চা

স্বাস্থ্যের দিকে তাকিয়ে অনেকেই রঙ চা খান, অনেকেই আবার দুধ চা। তবে বেশির ভাগ মানুষই জানেন না, তার আসলে কোন ধরণের চা খাওয়া উচিত। আড্ডা কিংবা বাসায় সাধারণত তাৎক্ষণিক ইচ্ছার উপরই নির্ভর করে কোন ধরণের চা খাবেন। জার্মানির বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা ১৬ জন নারীকে একবার রঙ চা, আরেকবার দুধ চা এবং একবার শুধু গরম পানি পান করতে দেন। তারপর প্রতিবারই আল্ট্রাসাউন্ড পদ্ধতিতে তাদের রক্তনালীর প্রসারণ মাপা হয়। দেখা যায় যে, রঙ চা রক্তনালীর প্রসারণ ঘটায় যা উচ্চরক্তচাপ ও হৃদরোগ নিয়ন্ত্রনের জন্য অত্যন্ত জরুরী। চায়ের মধ্যে থাকা ক্যাটেচিন রক্তনালীর প্রসারণের জন্য দায়ী। দুধের মধ্যে থাকে ক্যাসেইন নামক একটি পদার্থ যা চায়ের মধ্যে থাকা ক্যাটেচিনকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে চায়ে দুধ মেশালে চায়ের রক্তনালী প্রসারণের ক্ষমতা একবারেই চলে যায়। US Department of Agriculture এর গবেষকরা ইদুরের কোষের ওপর পরীক্ষা করে দেখেন যে, চায়ের প্রভাবে কোষগুলো থেকে সাধারণের তুলনায় ১৫ গুণ বেশি ইনসুলিন নির্গত হয় যা ডায়াবেটিস রোগ নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত জরুরী। কিন্তু চায়ে দুধ মেশালে এই ইনসুলিন নির্গমনের হার কমতে থাকে। যদি ৫০ গ্রাম দুধ মেশানো হয়ে, তাহলে ইনসুলিন এর নির্গমন শতকরা ৯০% কমে যায়। যারা ওজন নিয়ন্ত্রন করতে চান তারা দেখে নিতে পারেন কোন চায়ে কত ক্যালরি।
▪দুধ চিনি ছাড়া রঙ চা = ২ ক্যালরি
▪১ চামচ চিনিসহ রঙ চা = ১৬ ক্যালরি
▪১ চামচ চিনি ও দুধসহ চা = ২৬ ক্যালরি

সুতরাং রঙ চা উচ্চরক্তচাপ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও ওজন নিয়ন্ত্রনে অত্যন্ত কার্যকরী।

সকালে চা পানের উপকারিতা

প্রতিদিন সকালে এক কাপ চা পান বেশ ভালো লাগে। এক কাপ গরম চা মনটাও ভালো করে দেয় এবং সেই সাথে বেশ সতেজও লাগে। এই এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা কি শুধুই অভ্যাসবশত কিংবা স্বাদের জন্য খাওয়া? নাকি এর স্বাস্থ্য উপকারিতাও আছে? সকালে চায়ের আছে বেশ কিছু স্বাস্থ্য উপকারিতা। তবে সেই চা হওয়া চাই কন্ডেন্সড মিল্ক কিংবা দুধ মুক্ত। অর্থাৎ সকাল বেলা এক কাপ রঙ চা, সবুজ চা কিংবা আদা চা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। যারা চিনি ছাড়া চা খেতে পারেননা তাঁরা চায়ে কৃত্রিম চিনি ব্যবহার করতে পারেন কিংবা খুব অল্প পরিমাণ চিনি দিয়ে চা খেতে পারেন। তবে কোনো ভাবেই খালি পেটে চা খাওয়া উচিত হবে না। সঠিক স্বাস্থ্য উপকারিতা পেতে নাস্তার আধা ঘন্টা পর এক কাপ চা পান করুন। আসুন জেনে নেয়া যাক সকাল বেলা চা খাওয়ার ৫টি স্বাস্থ্য উপকারিতা।

হার্ট এটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করে – কোলেস্টেরল ও প্লেটলেটের জন্য শরীরের রক্ত জমাট বেঁধে স্ট্রোক ও হার্ট এটাকের মত সমস্যাগুলোর সৃষ্টি হয়। নিয়মিত চা খেলে ধমনি পরিষ্কার থাকে এবং রক্ত সহজে চলাচল করতে পারে। প্রায় ৫-৬ বছর ধরে করা নেদারল্যান্ডের একটি গবেষনায় দেখা গিয়েছে যে যারা দিনে দুই থেকে তিন কাপ রঙ চা পান করে তাদের বড় ধরণের হার্ট এটাকের ঝুঁকি যারা চা খায়না তাদের তুলনায় ৭০% কম।

অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট – চায়ে আছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এছাড়াও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরকে বার্ধক্যজনিত সমস্যা এবং দূষনের ক্ষতি থেকে রক্ষা করে।

হাড় রক্ষা করে – যারা চা পান করেন এবং যারা করেন না তাদেরকে নিয়ে একটি গবেষনায় দেখা গিয়েছে যে, যেসব ব্যক্তি প্রায় ১০ বছরের বেশি সময় ধরে চা খেয়েছে তাদের হাড়, যারা খায়নি তাদের তুলনায় অনেক বেশি মজবুত আছে। হাড় মজবুত রাখার ক্ষেত্রে চায়ে দুধ দিয়ে খাওয়া ভালো। তবে কন্ডেন্সড মিল্ক না দিয়ে গরুর খাঁটি দুধ দিয়ে চা খেলে প্রচুর ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় – নিয়মিত চা খেলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এবং বিভিন্ন সংক্রমনের থেকে শরীর রক্ষা পায়। গবেষকরা ২১ জন সেচ্ছা সেবীর উপর গবেষনা চালিয়েছেন। গবেষনায় সেচ্ছা সেবকদের কে দিনে ৪ সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন ৫ কাপ করে দুধ চিনি ছাড়া চা খাওয়ানো হয়েছিলো। ৪ সপ্তাহ পড়ে গবেষকরা তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে দেখেন যে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায় – চায়ে প্রচুর পরিমাণে পলিফেনল ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট আছে। এই দুটি উপাদান শরীরকে ক্যান্সারের ঝুকি মুক্ত করতে সহায়তা করে। বেশ কয়েওটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে নিয়মিত রঙ চা খেলে স্তন ক্যান্সার, কোলোন ক্যান্সার ও অন্যান্য আরো কিছু ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে যায়। তাই ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে চাইলে প্রতিদিন অন্তত এক কাপ রঙ চা খাওয়া উচিত।

লেবু চা পানের উপকারিতা

প্রতিদিন সকাল-বিকেল লেবু চা খেতে হবে। তাজা লেবু দিয়ে চা তৈরি করতে হবে। চা হালকা লিকারের হতে হবে।
চা পানের আগে পানি পান করে নিতে হবে। খালি পেটে লেবু চা পান করা যাবে না। এবার দেখে নিন লেবু চা পানের উপকারিতা।

উচ্চ রক্তচাপ কমায় – লেবু সাইট্রাস পরিবারভুক্ত। লেবুতে আছে উচ্চমাত্রার ভিটামিন সি আর পটাশিয়াম। আছে আরও কিছু প্রয়োজনীয় উপাদান। তবে ভিটাসিন সি আর পটাশিয়াম মিলে শরীরের উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। উপরন্তু লেবুর পটাশিয়াম হৃৎপিণ্ডের কর্মক্ষমতাও বাড়ায়।

মানসিক চাপ কমায় – লেবুর রসের ভিটামিন সি দূর করে মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা। মানসিক বিষণ্নতায় শারীরবৃত্তীয় কারণেই ভিটামিন সির ঘাটতি দেখা দেয় দেহে। লেবু চা পানে সেটি পূরণ হয় নিমেষেই। ফলে চাঙ্গা হয়ে ওঠে মন।

সুস্থ দাঁতের জন্য – লেবু চা দাঁতের ব্যথা উপশমে সাহায্য করে। মাড়ি থেকে রক্ত পড়া বন্ধ করতে লেবু চা খুব কার্যকর। মুখের গন্ধ রোধেও লেবু চা কার্যকর। আর দাঁতে প্লাক জমার কারণে যে অনাকাঙ্ক্ষিত দাগ পড়ে, তা সরাতেও লেবু চা সাহায্য করে।

কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায় – রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে উল্লেখযোগ্য কাজ করে লেবু চা। এটি শরীরের উপকারী কোলেস্টেরলের মাত্রা যেমন বাড়িয়ে দেয়, তেমনি ক্ষতিকর কোলেস্টেরল রাখে নিয়ন্ত্রণে।

গলার সংক্রমণ রোধে – লেবুর রসে আছে ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধী এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। যার ফলে গলাব্যথা, মুখের ঘা আর টনসিলের সংক্রমণ রোধে সাহায্য করে লেবু চা।

ত্বক সুন্দর করতে – ত্বকের ক্ষত পূরণে লেবু চা কার্যকর। লেবু চা পান করলে ত্বকে কোলাজেনের মাত্রা বেড়ে যায়। ফলে ত্বক আরও উজ্জ্বল হয়। ত্বকের পোড়াভাব যেমন দূর করতে পারে লেবু, তেমনি চোখের চারপাশের কালো দাগও মিলিয়ে দিতে পারে।

অতিরিক্ত চা পানের অপকারিতা

কফি কিম্বা চায়ে চুমুক মানেই প্রফুল্লতা। তবে এই প্রফুল্লতার পিছনে আছে একটি রাসায়নিক উপাদান ক্যাফিন। যা শরীরকে চাঙা রাখতে সহায়তা করে। কাজ করতে করতে বা অন্য কোন কারণে যখন মনে ও শরীরে অবসাদ বা আলস্য নামিয়া আসে তখন আমরা এক কাপ চা বা কফি পানে আবার কর্মোদ্দীপনা ফিরিয়া পাই। দৈনন্দিন জীবনে মানুষ এই দুই ধরণের পানীয় বেশি পান করে থাকেন। তবে চায়ের যেমন হাজারো গুণ রয়েছে, তেমনি অতিরিক্ত চা পানে আছে বড় মাত্রার ঝুঁকিও। আসুন জেনে নিই অতিরিক্ত চা পান করার ফলে কি কি ক্ষতি হতে পারে।

▪কোনো জিনিস অভ্যাসে পরিণত হয় আসক্তির ফলে। অতিরিক্ত চা বা কফি পানে আপনার এটার প্রতি এক ধরনের আসক্তি তৈরি হতে পারে। আপনি এটি ছাড়া এক দন্ড কাজ করতে পারবেন না। আপনি ঝিমিয়ে পড়বেন যা স্বাস্থ্যের জন্য কখনই ভালো না।

▪অতিরিক্ত চা বা কফি পানে আপনার ঘুম নষ্ট করতে পারে। এগুলোতে থাকা ক্যাফেইন দেহের রক্ত সঞ্চালনকে বাড়িয়ে দেয়। ফলে ঘুম ঘুম ভাব চলে যায় কিন্তু একেবারেই ঘুম না আসলে অনেকে শারীরিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন।

▪অতিরিক্ত ক্যাফেইন আপনার ক্ষুধার অনুভবকে নষ্ট করে দেয়। ফলে আপনার আর ক্ষুধা লাগে না। আর অনেকক্ষণ না খেয়ে থাকলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। এভাবে চলতে থাকলে আপনি মৃত্যু ঝুঁকিতেও পড়তে পারেন।

▪চা বা কফিতে থাকা অতিরিক্ত ক্যাফেইন শরীরে এক ধরণের গ্যাস্ট্রিক রস নিঃসরণ ঘটায় যা পেপটিক আলসার বা গ্যাস্ট্রিকের সৃষ্টি করতে পারে। অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ করলে তা উচ্চ রক্তচাপের কারণ হতে পারে।

▪গর্ভাবস্থাতেও অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ করা উচিত নয়। চিকিৎসকদের মতে, গর্ভবতী মায়েদের প্রতিদিন ২০০ মিলিগ্রামের বেশী চা বা কফি পান করা উচিত নয় এবং সেটা যেন খুব হালকা লিকার হয়৷ কড়া চা ভ্রুণের ক্ষতি করতে পারে।

▪বেশির ভাগ চায়ের প্রিপারেশনে অক্সালেট এর মাত্রা বেশি থাকে যেটি অনেক বছর ধরে রেনাল ডাক্ট সিস্টেমে ডিপোজিট হতে হতে একটা সময় ক্যালসিয়ামের সাথে যৌগ (ক্যালসিয়াম
অক্সালেট) তৈরি করে সৃষ্টি হয় রেনাল স্টোন। যেটিকে রেনাল স্টোন ডিজিস বলা হয়ে থাকে। এই ডিজিসটি প্রধানত কিডনির ডাক্টসিস্টেমে পাথর হয়। এছাড়া স্বল্প সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ করলে মাথা ঘোরানোসহ বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দেয়।

তাই চা, কফি অতিরিক্ত নয়।

109 total views, 2 views today

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন