ঘুম কখন কেন এবং কতটা জরুরী

ঘুম কখন কেন এবং কতটা জরুরী
5 (100%) 6 votes

ঘুম প্রতিটা প্রানীর জন্যেই খুবই গুরুত্বপূর্ন। ঘুম আল্লাহ তাআলার একটি মহা পবিত্র নেয়ামত। সুস্থভাবে জীবন যাপনের জন্য নিয়মিত ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ৷ আপনি ২ সপ্তাহ না খেয়ে থাকতে পারবেন কিন্তু ১০ দিন না ঘুমালে মারা যাবেন। তাই আল্লাহ তাআলা রাতকে ঘুমানোর উপযোগী করেই বানিয়েছেন। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আমি তোমাদের বিশ্রামের জন্য নিদ্রা দিয়েছি, তোমাদের জন্য রাত্রিকে করেছি আবরণ স্বরূপ, আর দিনকে বানিয়েছি তোমাদের কাজের জন্য। ’ (সুরা নাবা, আয়াত : ৯-১১)। এক গবেষণায় দেখা গেছে আজকের দিনে বেশিরভাগ মানুষ সাধারণ যেসব সমস্যায় ভোগে তার মধ্যে ঘুমজনিত সমস্যা অন্যতম। পর্যাপ্ত পরিমাণে না ঘুমালে একজন মানুষের শরীরে সবচেয়ে বড় আঘাতটা লাগে মস্তিষ্কে। কেবলমাত্র মস্তিষ্কে ছাড়াও শরীরে আরো অনেক সমস্যার জন্ম দেয় অপর্যাপ্ত ঘুম।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

ঘুম

সুস্বাস্থ্যের জন্য ঘুম কতটা জরুরী

সুস্বাস্থ্যের জন্য ঘুম খুবই জরুরী। কম ঘুমের কারণে শারীরিক ভাবে নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। পৃথিবী জুড়ে ১৫৩টি গবেষণা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কম ঘুমের কারণে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং মোটা হয়ে যাবার সম্পর্ক আছে। প্রায় ৫০ লাখ মানুষের উপর এসব গবেষণা চালানো হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, একটানা কয়েক রাত যদি অনিদ্রা হয় তাহলে সেটি ডায়াবেটিসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে পারে। এ ধরনের নিদ্রাহীনতা রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে শরীরের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। যারা রাতে ঘুমান না তাদের মধ্যে অনেককেই অতিরিক্ত বিষণ্ণতা এবং হ্যালুসিনেশনের সমস্যায় ভুগতে দেখা যায় তাছাড়া মন মেজাজ খিটমিটে হয়ে যায়। এছাড়া স্তন ক্যান্সার এবং প্রস্টেট ক্যান্সারের মতো ক্যান্সারের কোষ দেহে গঠন হয়ে থাকে অতিরিক্ত রাত জাগার কারণেই। আমরা যখন ঘুমাই তখন আমাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য দায়ী লিভিং অরগানিজম কাজ করে। কিন্তু আমরা না ঘুমালে এই অরগানিজম গুলো কাজ করতে পারে না এবং দিনে দিনে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমতে থাকে। আমরা যখন ঘুমাই তখন আমাদের হৃদপিণ্ড এবং রক্তনালী কিছুটা হলেও বিশ্রাম পায় এবং নিজেই নিজের ক্ষতি পুষিয়ে নেয়। কিন্তু অনিদ্রা হলে প্রতিনিয়ত কার্ডিওভ্যস্কুলার সমস্যা বাড়তে থাকে যার ফলে উচ্চ রক্তচাপে এবং স্ট্রোকের মতো সমস্যা দেখা দেয়। এছাড়া নিয়মিত ঘুম না হলে আপনার সুন্দর ত্বক আর আগের মত থাকবেনা,হবে নিষ্প্রাণ। ঘুমের সময় ত্বক থেকে মেলাটোনিন ঝড়ে পরে । যদি কম ঘুমনো হয় মেলাটোনিন ঝড়তে না পাড়ায় ত্বকে কালো কালো বলি রেখার মত বয়সের দাগ পড়ে। যদি নিয়মিত ভাবে না ঘুমানো হয় তাহলে আপনার ওজন বাড়তে থাকবে। গ্রেলিন নামক একটি হরমোন বেশি পরিমান ঝড়ে যদি ঘুমানো যথেষ্ট না হয়। তাই পর্যাপ্ত ঘুমানো উচিত। গবেষকেরা অন্তত এই ব্যাপারে একমত হয়েছেন যে, শরীর ও মনের শক্তি পুনঃসঞ্চয় করতে ঘুমের প্রয়োজন হয়। তা ছাড়া সব ধরনের শারীরবৃত্তীয় কাজের মধ্যে সমতারক্ষার জন্যও ঘুমানো দরকার। একেবারে সাম্প্রতিক গবেষণালব্ধ তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে, স্মৃতি ধরে রাখতে, আবেগকে ঠিকভাবে পরিচালিত করতে এবং সর্বোপরি মনঃসংযোগ বাড়াতে ঘুমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। সমস্ত স্তন্যপায়ী ও পাখি এবং বহু সরীসৃপ, উভচর ও মাছেদের জীবনচক্রে ঘুমানোর প্রক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। মানুষ ও অন্যান্য স্তন্যপায়ী এবং অন্য বেশ কিছু প্রানীর (যেমন, কিছু প্রজাতির মাছ, পাখি, পিঁপড়ে) অস্তিত্ব রক্ষার জন্যেও নিয়মিত ঘুম আবশ্যক।

কোন বয়সে কতটা ঘুম প্রয়োজন

শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ঠিকঠাক রাখতে পর্যাপ্ত ঘুমের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু কম ঘুমানোর মতোই বেশি ঘুমানোটাও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। আবার শৈশবে, কৈশোরে, তারুণ্যে, যৌবনে আর বার্ধক্যে ঘুমের চাহিদাও আলাদা আলাদা। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যবিষয়ক একটি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশনের ১৮ জন গবেষকের একটি দল বয়স ভিত্তিক এই ঘুমের নির্দেশনা তৈরি করেছে। বিগত বছর গুলোতে পরিচালিত ৩২০টি গবেষণা প্রতিবেদন পর্যালোচনার মাধ্যমে এই নির্দেশনা চূড়ান্ত করেছেন দেশটির ঘুম বিশেষজ্ঞরা। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশনের পরামর্শপত্র অনুযায়ী ৬ থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুদের রাতে অন্তত ৯-১১ ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন, তবে নিয়মিত ৭-৮ ঘণ্টা ঠিকঠাক ঘুমাতে পারলেও ওরা নিজেকে চালিয়ে নিতে পারে। ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের ৮-১০ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। তবে কারও কারও নিয়মিত ৭ ঘণ্টা ঘুমালেও চলতে পারে। আর বয়ঃসন্ধির সময়টাতে অনেকেরই প্রায় ১১ ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু ১১ ঘণ্টার চেয়ে বেশি ঘুমালে তা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হতে পারে। অনেকেরই রাতে একটু দেরিতে ঘুম পায় এবং যার কারনে দেরি করে ‘ঘুম’ থেকে উঠে। কিন্তু যখনই ঘুমাক আর যখনই উঠুক, নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুমানোটা খুবই জরুরি। ছুটির দিনে ঘুম পুষিয়ে নেওয়ার চিন্তা অনেকেই করে বটে কিন্তু আসলে ‘বকেয়া ঘুম কখনোই পুষিয়ে নেওয়া যায় না’।

ঘুম না হওয়ার কারণটা যেভাবে বের করবেন

প্রথমে নিজেকে প্রশ্ন করুন। কতদিন ধরে আপনার ঘুম নিয়ে সমস্যা চলছে? কবে আপনি শেষবার রাতে শান্তিমত ঘুমিয়েছেন? এই প্রশ্নগুলোর সাথে সাথে অন্যান্য অনেক প্রশ্নই চলে আসে। আপনি কি কোন বিষয় নিয়ে বেশ চিন্তিত? আপনার ঘরের আশেপাশে শব্দ দূষণ কেমন? কলকারখানার শব্দ, গাড়ির হর্ন, রিকশার বেল, ট্রেনের শব্দ, বিমানের শব্দ? আচ্ছা, আপনার ঘরে আলোর পরিমাণ কেমন? আপনি ঘুমানো অবস্থায় অন্য কেউ এসে বাতি জ্বালিয়ে কাজ করে? ঘুমাতে গেলেই কি ফেসবুক নোটিফিকেশনের কারণে আপনার ফোন বেজে ওঠে? এসব হল ঘুম না হওয়ার কারণ। আপনার পরদিন পরীক্ষা, কিংবা কোন পিকনিক বা অনুষ্ঠান আছে বলে বলে ঘুম আসছে না বলে মনে করছেন। কিন্তু এসব আসলে নিদ্রা না আসার কোনো যৌক্তিক কারণ নয়। মানুষ পরীক্ষা বা পিকনিকের কারণে না ঘুমিয়ে বসে থাকে না। ঘুম আসে না এসব নিয়ে দুশ্চিন্তা বা উত্তেজনার জন্যে।

ঘুম না আসার সমস্যা দূর করবেন যেভাবে

ধরুন, রাত বারোটায় আপনি ঘুমিয়ে পড়েছেন। অথচ সারা রাত পার হয়ে ফজরের আজান কানে আসলেও আপনার চোখে কোনো ঘুম নেই। প্রতিদিনই এরকমটা হওয়াটা নিশ্চই ভালোনা। ঘুমের জন্যে জন্য বিভিন্ন ঘুমের ঔষধও খাচ্ছেন। প্রথম কয়েকদিন কাজ হলেও কয়েকদিন পর ঘুমের ওষুধও ঠিকঠাক কাজ করা বন্ধ করে দেবে। ঘুমের সমস্যা বেড়ে যাবে আরো। ঘুমের সমস্যা দূর করতে কিছু নিয়ম মেনে চলুন।

মনস্থির করুন – প্রথমেই মনে মনে স্থির করুন যে ঘুমাবেন। কতোক্ষণ ঘুমাবেন সেটাও ঠিক করে নিন। চেষ্টা করবেন যাতে ঘুমাতে যাবার সময়টা রাত বারোটার আগে হয়।

ঘর পুরোপুরি অন্ধকার করে নিন – দিনের বেলা ঘুমাতে চাইলে ঘরে আলো আসলে পর্দা টেনে নিন কিংবা আই-মাস্ক ব্যবহার করতে পারেন। আই-মাস্ক ঘুমের ক্ষেত্রে বেশ সহায়ক। যদি একান্তই স্লিপিং মাস্ক হাতের কাছে না থাকে তাহলে আপনার যেকোনো টিশার্ট বা তোয়ালে ঘুমানোর সময় চোখের উপর রেখে দিতে পারেন।

বিকালের পর চা বা কফি খাবেন না – ঘুম নিয়ে সমস্যা থাকলে বিকাল ছয়টার পর চা, কফি বা স্নায়ূকে উত্তেজিত করে এমন কোনো প্রকার পানীয় বা ধুমপান করবেননা।

রাত জেগে মুভি দেখা – রাত জেগে টিভি সিরিজ বা মুভি দেখার প্রতি আসক্তি থাকলে তা বাদ দিন। কারণ পরের দিন আপনার ক্লাস বা কাজ আছে; যা রাত জেগে মুভি দেখার থেকে অনেক গুরুত্বপুর্ণ।

আপনার বিছানা পরিষ্কার রাখুন – অপরিচ্ছন্ন বিছানায় নিদ্রা আসতে যতটুকু সময় লাগে পরিষ্কার বিছানায় তার তিনগুণ আগে নিদ্রা আসে।

গরম পানিতে গোসল – ঘুম না আসার সমস্যা হলে রাতে বিছানায় যাওয়ার আগে উষ্ণ গরম পানি দিয়ে গোসল করুন। এই পদ্ধতি শরীরকে শিথিল করে ঘুম আসতে সাহায্য করবে।

ধ্যান – একটি চমৎকার মেডিটেশন বা ধ্যান ঘুম আসতে বেশ কার্যকর। ২০০৯ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়, ধ্যান  ঘুমের সমস্যার সঙ্গে লড়াই করে। ধ্যান মন ও শরীকে শিথিল করে। এ ছাড়া ধ্যানের সময় গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম ভালো ঘুমের জন্য সহায়ক।

শারীরিক পরিশ্রম – শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম ঘুম আসতে কার্যকর প্রাকৃতিক ওষুধ। বিশেষজ্ঞরা বলেন, যাঁরা শারীরিক পরিশ্রম করেন, তাঁদের ঘুম ভালো আসে। তাই ভালো ঘুম হতে নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম করুন।

উল্টা গণনা – ১০০ থেকে উল্টাদিকে গোণা শুরু করুন। ১০০, ৯৯, ৯৮, ৯৭, ৯৬…  প্রতিবার একটা করে সংখ্যা মনে করবেন আর আস্তে আস্তে নিঃশ্বাস ভারী করবেন। এভাবে ঘুম আসা পর্যন্ত গুণতে থাকুন।

ঘুম এনে দেবে যেসব খাবার

এমন অনেকেই আছেন যাদের রাতে ঘুম আসে না। আজকে রইলো কয়েকটা খাবারের নাম যা খেলে আপনার নিদ্রা পাবে। রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে এই খাবারগুলো খেলে খুব ভালো নিদ্রা হবে ঠিকই‚ কিন্তু একই সঙ্গে মনে রাখুন দিনের বেলা বা যখন আপনি ঘুমোতে চাইছেন না তখন কিন্তু এই খাবারগুলো এড়িয়ে চলাই ভালো।

মিষ্টি আলু: রাঙা আলুতে বেশি মাত্রায় পটাশিয়াম‚ ম্যাগনেসিয়াম আর ক্যালসিয়াম থাকে। এই তিনটেই শরীরকে রিল্যাক্স করতে সাহায্য করে। তাই রাতে যাদের সহজে ঘুমোতে অসুবিধা হয় শোয়ার আগে মিষ্টি আলু খেতে পারেন সিদ্ধ করে। দেখবেন তাড়াতাড়ি নিদ্রা আসবে।

পিনাট বাটার: পিনাট বাটার বা আমন্ড বাটার দুটোই খুব ভালো ঘুম পাড়ানোর জন্য। তবে ছোট এক চামচের বেশি খাবেন না।

আমন্ড: এক মুঠো আমন্ড বাদাম যথেষ্ট। খানিক্ষণের মধ্যেই ঘুম পাবে। এতে tryptophan এবং ম্যাগনেসিয়াম থাকে যা নার্ভ শান্ত করে একই সঙ্গে হার্ট বিটও ভালো রাখে।

পেস্তা বাদাম: পেস্তা বাদামে প্রোটিন থাকে এছাড়াও এতে ভিটামিন B-6 এবং ম্যাগনেসিয়াম আছে যা ঘুমিয়ে পড়তে সাহায্য করে। তবে মাথায় রাখতে হবে এতে প্রচুর ক্যালোরি থাকে তাই অতিরিক্ত পেস্তা বাদাম না খাওয়াই ভালো।

তরমুজ: অনেক সময় শরীরে জলের কমতি হলে ঘুমোতে অসুবিধা হয়। কিন্তু এই জাতীয় ফলের মধ্যে জলের পরিমাণ বেশি থাকে যা শরীরে জলের ঘাটতি মেটাতে পারে। অবশ্য শুধু তরমুজ নয় আপেল‚ কমলালেবু যে কোন একটা খেতে পারেন। যাতে আপনি একই ফল পাবেন।

156 total views, 1 views today

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে
  • 6
    Shares

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন