গর্ভবতী নারীর যত্ন এবং সুস্থ গর্ভধারণের গুরত্বপূর্ণ টিপস

গর্ভবতী নারীর যত্ন এবং সুস্থ গর্ভধারণের গুরত্বপূর্ণ টিপস
5 (100%) 11 votes

গর্ভবতী নারীর অনেক জটিলতা হতে পারে তাই গর্ভবতী হলে সচেতন থাকাটা খুবই প্রয়োজনীয়। গর্ভবতী মায়ের স্বাস্থ্য শিশুর স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। যখনি আপনি জানতে পারবেন যে আপনি গর্ভবতী (Pregnancy) তখনি যত দ্রুত সম্ভব কোন গাইনী ডাক্তারের সাথে দেখা করুন। বেশীরভাগ ডাক্তারই আপনার প্রথম সাক্ষাতের দিন ঠিক করবেন আপনার গর্ভধারণের অষ্টম সপ্তাহে। গর্ভাবস্থায় মোট ১৪ বার যেতে হবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, নার্স বা অন্য কোনো অভিজ্ঞ স্বাস্থ্যকর্মীর কাছে। প্রথম সাত মাসে প্রতি মাসে একবার করে মোট সাতবার (প্রতি চার সপ্তাহে একবার), অষ্টম মাসে প্রতি দুই সপ্তাহে একবার করে মোট দু’বার এবং পরে সন্তান প্রসব হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহে একবার করে মোট পাঁচবার, সর্বমোট ১৪ বার যাওয়াটা আদর্শ। কিন্তু এটা অনেক সময়ই সম্ভব হয়ে ওঠে না। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে কমপক্ষে তিনবার যেতেই হবে। প্রথম ২০ সপ্তাহের মধ্যে একবার, ৩২ সপ্তাহের সময় একবার এবং ৩৬ সপ্তাহের সময় একবার। প্রথম সাক্ষাত অনেকটা দীর্ঘ হতে পারে। তাই লম্বা সময় থাকার প্রস্তুতি নিয়ে আসুন। সম্ভব হলে আপনার স্বামীকেও সাথে আনার চেষ্টা করবেন।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

গর্ভবতী

গর্ভবতী নারীর টিকা

গর্ভবতী মায়ের স্বাস্থ্য শিশুর স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। মায়ের অসুস্থতা শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। কিছু রোগ আছে, যা মায়ের গর্ভ থেকেই শিশুর শরীরে প্রবেশ করে। এইডস, হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-সি এমন কিছু রোগ। সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে টিকার ভূমিকা অনস্বীকার্য। অনেক সংক্রামক রোগই টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব। আমাদের দেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের টিকাদানের ব্যবস্থা আছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আমাদের দেশে সন্তান জন্মদানে সক্ষম নারী যাদের বয়স ১৫ থকে ৪৯ বছর, তাদের জন্য ধনুস্টকার ও রুবেলার বিরুদ্ধে টিটি ও এমআর টিকা দেওয়া হয়। টিটেনাসের ৫টি টিকার ডোজ সম্পন্ন থাকলে আর গর্ভাবস্থায় এই টিকা নেওয়ার প্রয়োজন নেই। আর কেউ যদি কোনো টিকা না নিয়ে থাকেন, সে ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থায় ৫ মাসের পর ১ মাসের ব্যবধানে পর পর দুটি টিটি টিকা দিয়ে নিতে হবে। মা ধনুস্টঙ্কারের টিকা নিলে নবজাতক ধনুস্টঙ্কার থেকে রক্ষা পায়। মায়ের হামের টিকা জন্মের ছয় মাস পর্যন্ত শিশুকে সুরক্ষিত রাখে। মায়ের রুবেলার টিকা নেওয়া থাকলে গর্ভস্থ শিশু রুবেলাজনিত জন্ম ত্রুটি থেকে রক্ষা পায়। যেসব নারী গর্ভধারণের পরিকল্পনা করছেন কিন্তু রুবেলার টিকা দেওয়া নেই, তারা গর্ভধারণের অন্তত এক মাস আগে টিকাটি দিয়ে নিলে সুরক্ষিত থাকবেন। তবে,কিছু টিকা রয়েছে, যা গর্ভকালীন সময়ে নেওয়া রীতিমতো বিপজ্জনক। মাম্পস, হাম, চিকেন পক্স, বিসিজি, হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস, টাইফয়েডের টিকা গর্ভাবস্থায় পরিহার করতে হবে।

গর্ভবতী মায়ের শরীরচর্চা

গর্ভাবস্থায় নিয়ম মেনে অল্প খানিকটা ব্যায়ামও বেশ উপকারী। গর্ভবতী মায়ের নিজের জন্য এবং অনাগত সন্তানের কথা ভেবে ব্যায়াম করা দরকার। তবে এসময় ব্যায়াম কিন্তু অন্যান্য সময়ের মতো হবে না। এসময় ব্যায়ামও করতে হবে বুঝে শুনে। গর্ভবতী মায়েরা প্রথম কয়েক মাস সব ধরনের ব্যায়ামই করতে পারেন। তবে এই সময় হাঁটাটাই সব থেকে ভালো ব্যায়াম। আর যেটাই করুন না কেন অবশ্যই কোনো ভালো ইন্সট্রাকটরের পরামর্শ মেনে চলা উচিত যেন কোনো সমস্যা না দেখা দেয়। ব্যায়াম শুরুর আগে নিশ্চিত হয়ে নিন যে আপনার গর্ভাবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ নয়। গর্ভবতী মায়ের শারীরিক অবস্থানুযায়ী প্রয়োজন, বয়স, পরিবেশগত সুবিধা, সময়ের সীমাবদ্ধতা ও মানসিক প্রবণতার কথা ভেবে ব্যায়াম বেছে নেয়া ভাল। তবে যে কোনো ব্যায়ামের আগে অবশ্যই অভিজ্ঞ ফিজিওথেরাপিস্ট বা প্রসূতিবিদ্যায় অভিজ্ঞ কারো পরামর্শ নিয়ে শুরু করা উচিত।

গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকা

সর্বোপরি সুস্থ শিশুলাভের জন্য গর্ভবতী মায়ের পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ ও স্বাস্থ্য পরিচর্যা প্রয়োজন। পরিবারের সবারই গর্ভবতী মাকে এ ব্যাপারে সাহায্য ও সহযোগিতা করা উচিত। গর্ভবতী মায়ের নিজের প্রয়োজনীয় খাবার খাওয়ার পাশাপাশি গর্ভস্থ শিশুর জন্য বাড়তি খাদ্যের প্রয়োজন হয়। তাই গর্ভবতী মা ও তার অনাগত শিশুর সুস্থ জীবনের জন্য গর্ভবতী মায়ের প্রতিদিন পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করা প্রয়োজন। অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও দারিদ্র্যের কারণে আমাদের দেশের অনেক গর্ভবতী মা প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করেন না। মায়ের অপুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ শুধু তার জন্যই ক্ষতিকর নয়, ভ্রুণ এবং নবজাত শিশুর জন্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিকর। গর্ভাবস্থায় মা পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ না করার কারণে শিশু ও গর্ভবতী মা উভয়ই অপুষ্টিতে ভোগেন। আর মা যদি গর্ভাবস্থায় অপুষ্টিতে ভোগেন তাহলে যে শিশু জন্মগ্রহণ করবে তার জন্ম-ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কম হবে, শিশু জন্মগতভাবেই অপুষ্টি নিয়ে জন্মগ্রহণ করবে। এ ধরনের শিশুর মৃত্যুঝুঁকিও বেশি থাকে। তবে খাবার যেমনই হোক না কেন, সেটা হতে হবে পুষ্টিকর। এ জন্য প্রতিদিনের খাবারে খাদ্যের সব কয়টি উপাদানের উপস্থিতি থাকতে হবে।

প্রোটিন বা আমিষ – গর্ভবতী মায়ের প্রোটিন বা আমিষ জাতীয় খাদ্য গ্রহণ করতে হবে দৈনিক ৯০-১০০ গ্রাম। অর্থাৎ অন্য ব্যক্তিদের চেয়ে বেশি। এই পরিমাণ প্রোটিন পাওয়া যায় মাঝারি আকারে তিন টুকরা মাংস থেকে। প্রোটিন আসতে পারে মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ডাল, বাদাম, শিমের বিচি থেকে। প্রোটিন শিশুর কোষ ও মস্তিষ্কের সঠিক গঠনে সহায়তা করে। মায়ের স্তনকোষ বাড়ায়।

ফ্যাট বা চর্বি – চর্বি জাতীয় খাবার শক্তির ভালো উৎস। এগুলো চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিনকে কাজে লাগায়। আর এসব ভিটামিন স্নায়ুতন্ত্রের সঠিক গঠন নিশ্চিত করে। চর্বি পাওয়া যায় ঘি, মাখন, তেল, মাংসের চর্বি থেকে।

কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা – শর্করা জাতীয় খাবারও শরীরে শক্তি জোগায়। শর্করা পাওয়া যায় ভাত, রুটি, চিঁড়া, মুড়ি, খই, আলু , চিনি, মিষ্টি ও গুড় থেকে। অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট এড়িয়ে চলতে হবে।

ক্যালসিয়াম – নবজাত শিশুর হাড় গঠনের জন্য গর্ভাবস্থার শেষ তিন মাসে খাবারে ক্যালসিয়াম বেশি আছে এমন খাদ্য বাড়াতে হবে। দুধ ও দুগ্ধজাত সামগ্রী ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস। তবে দুধ বেশি খেতে না পারলে ডাল, ছোট মাছ ইত্যাদি খেয়েও ক্যালসিয়ামের চাহিদা মেটানো যায়। গর্ভকালীন দৈনিক ১০০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম প্রয়োজন। খেজুর থেকে পাওয়া যায় প্রচুর পরিমাণে আয়রণ  ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম যা শিশুর হাড় ও মাংসপেশী গঠনে সহায়ক।গর্ভকালীন সময়ে মায়েদের বিভিন্ন ধরনের উপসর্গ যেমন কোষ্ঠকাঠিন্যতা, রুক্ষ্মতা এবং পানি শূন্যতা দুর করতে খেজুর খুবই কার্যকরি। গর্ভবতী মায়ের খাদ্য তালিকায় খেজুর রাখাটা গুরত্বপূর্ণ।

ভিটামিন – ভিটামিন ‘এ’ ও ভিটামিন ‘বি কমপ্লেক্স’ শিশুর দেহ গঠনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া গর্ভাবতী মায়ের রক্তপাতের আশঙ্কা থাকে বলে গর্ভের শেষদিকে ভিটামিন ‘কে’ খুবই প্রয়োজন। শিশুর হাড় গঠনের জন্য ক্যালসিয়ামের পাশাপাশি ভিটামিন ‘ডি’ প্রয়োজন। কারণ এই ভিটামিন খাদ্যের ক্যালসিয়ামকে শোষণ করতে সাহায্য করে। ভিটামিন ‘সি’ও গর্ভবতী মায়েদের জন্য খুবই প্রয়োজন তাঁর নিজের ত্বক ও নবজাতকের ত্বক এবং চুলের জন্য। যেসব খাবার থেকে এ ধরনের ভিটামিন পাওয়া যাবে সেগুলো হলো দুধ, মাখন, ডিম , ছানা, কডলিভার অয়েল, ইলিশ মাছ, টমেটো, গাজর, পালংশাক, বিট, লালশাক, মাংস, বিভিন্ন ধরনের ডাল, আলু ইত্যাদি। বিভিন্ন ধরনের ফল ও সবজি যেমন কমলালেবু, টমেটো, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, আমলকী, পেয়ারা, বরই ইত্যাদি থেকে। দৈনিক ৮০ থেকে ১০০ মিলিগ্রাম ভিটামিন গ্রহণ করা উচিত।

লৌহ ও ফলিক এসিড – গর্ভবতী মায়ের ফলিক এসিড ও লৌহসমৃদ্ধ খাবার বেশি খাওয়া উচিত। কারণ গর্ভকালীন এই দুটির ঘাটতি বেশি দেখা যায়। লৌহ ও ফলিক এসিড আছে দুধ, ডিম, মাছ, মাংস, চালতা, গুড়, কলিজা, পাকা কলা, খেজুর, আম, টমেটো, তরমুজ, সবুজ শাকসবজি, কালো কচুর শাক ইত্যাদিতে। গর্ভকালীন প্রথম তিন মাসে প্রতিদিন ৬০০ মাইক্রো গ্রাম ফলিক এসিড ও ২৭ মিলিগ্রাম লৌহ প্রয়োজন।

ক্যালরি – গর্ভবতী মায়েদের ক্যালরির প্রয়োজন অন্যদের চেয়ে বেশি। এ জন্য প্রথম তিন মাসে খেতে হবে গর্ভ ধারণের আগে প্রতিদিন যতটুকু ক্যালরিযুক্ত খাবার খেয়েছেন ততটুকুই। পরবর্তী তিন মাসে প্রয়োজন দৈনিক অতিরিক্ত ৩০০ ক্যালরি এবং শেষ তিন মাসে প্রয়োজন দৈনিক আরো ২০০ ক্যালরি। সুতরাং প্রথমে একজন গর্ভাবতী মা যদি ১৪০০ ক্যালরিযুক্ত খাবার খেতেন, তাহলে তাঁকে দিতে হবে দ্বিতীয় তিন মাসে ১৪০০+৩০০=১৭০০ ক্যালরি, পরবর্তী তিন মাসে দিতে হবে ১৭০০+২০০=১৯০০ ক্যালেরি সমৃদ্ধ খাবার। যদি গর্ভবতী মা প্রথম তিন মাসে ১৬০০ ক্যালরি পেয়ে থাকেন তাহলে তিনি শেষ তিন মাস পাবেন ২১০০ ক্যালরি। এই ক্যালরি বাড়ানো উচিত প্রোটিন বা আমিষ জাতীয় খাবার থেকে। কারণ প্রোটিনযুক্ত খাবার দিয়েই ভ্রূণের বৃদ্ধি ঘটে থাকে।

গর্ভবতী মায়ের গর্ভকালীন ৯ মাসে মোট ওজন বাড়া উচিত ১০ থেকে ১২ কেজি। এর চেয়ে বেশি বাড়লে সুস্থ সন্তান জন্মদানে যেমন প্রতিকূলতা দেখা দিতে পারে, তেমনি পরবর্তী সময়ে মায়ের ওজন স্বাভাবিকে ফিরিয়ে আনাও কঠিন হবে। তাই এ ব্যাপারে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। যাদের ওজন আগে থেকেই বেশি তাদের গর্ভকালীন ওজন পাঁচ থেকে আট কেজি পর্যন্ত বাড়তে পারে। যাদের ওজন আগে থেকে অনেক কম তাদের ওজন ১৫ কেজি পর্যন্ত বাড়লে ক্ষতি নেই।

গর্ভাবস্থায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মায়েদের হিমোগ্লোবিনের ঘাটতি দেখা যায়। ফলে দেখা দেয় রক্তস্বল্পতা। কারণ এ সময় গর্ভস্থ শিশুর দেহে লৌহের চাহিদা মেটানোর পর মায়ের রক্তে হিমোগ্লোবিন কমে যেতে দেখা যায়। বাংলাদেশে ৭৫ শতাংশ গর্ভবতী কোনো না কোনো মাত্রায় রক্তস্বল্পতায় ভুগে থাকেন। রক্তস্বল্পতার ফলে দুর্বলতা, মানসিক অবসাদ বা ক্লান্তি, বুক ধড়ফড় করা, মাথাঘোরা ইত্যাদি দেখা যায়। কলিজা, ডিমের কুসুম, মাংস, কালো ও সবুজ কচুর শাক, বিট, লেটুসপাতা, হলুদ ইত্যাদি খাওয়া উচিত। এ ছাড়া প্রতিদিনই একটি বা দুটি টক ফল খাওয়া ভালো।

গর্ভাবস্থার সময়কে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। প্রতিটি ভাগে খাবারের পরিমাণে কিছুটা তারতম্য করা উচিত। খাবার তালিকা ঠিক থাকলে সুস্থ ও সবল শিশুর জন্ম দেওয়া সম্ভব। নিচে এ বিষয়ে একটি সাধারণ ধারণা দেওয়া হলো।

প্রথম তিন মাস দৈনিক ১৬০০ ক্যালরি
সকালের নাশতা
রুটি/পাউরুটি-৬০ গ্রাম=২ পিস
ডিম-একটা/ডাল-১০ গ্রাম
সবজি ইচ্ছামতো।

সকাল ১০-১১টা
মুড়ি/বিস্কুট/কেক ইত্যাদি-৬০ গ্রাম+ফল

দুপুরের খাবার
ভাত-দুই কাপ=২৪০ গ্রাম
মাছ/মাংস-৬০ গ্রাম
ডাল-আধা কাপ, মাঝারি ঘন
সবজি-ইচ্ছামতো।

বিকেলের নাশতা
নুডলস/ছোলামুড়ি/সেমাই ইত্যাদি-
৩০ গ্রাম

রাতের খাবার
দুপুরের মতো।

শোয়ার আগে
দুধ-১ কাপ

দ্বিতীয় তিন মাস দৈনিক ১৯০০ ক্যালরি

সকালের নাশতা
রুটি/পাউরুটি-৯০ গ্রাম=৩ পিস
ডিম-১টা/মাংস-২ টুকরা
সবজি-ইচ্ছামতো।

সকাল ১০-১১টা
দুধ-১ কাপ
বিস্কুট/মুড়ি/নুডলস ইত্যাদি-৩০ গ্রাম+ফল

দুপুরের খাবার
ভাত-৩০০ গ্রাম=আড়াই কাপ
মাছ/মাংস-৮০ গ্রাম
ডাল-১ কাপ, সবজি-ইচ্ছামতো।

বিকেলের নাশতা
সেমাই/নুডলস/ছোলামুড়ি/কেক ইত্যাদি-৪০ গ্রাম

রাতের খাবার
দুপুরের মতো।

শোয়ার আগে
দুধ-১ গ্লাস

শেষ তিন মাস দৈনিক ২১০০ ক্যালরি

সকালের নাশতা
রুটি/পাউরুটি-১২০ গ্রাম=৪ পিস
ডিম-১টা
সবজি-ইচ্ছামতো।

সকাল ১০-১১টা
দুধ-১ কাপ
যেকোনো নাশতা-৬০ গ্রাম+ফল

দুপুরের খাবার
ভাত-৩৬০ গ্রাম=৩ কাপ
মাছ/মাংস-১০০ গ্রাম
ডাল-১ কাপ, ঘন
সবজি-ইচ্ছামতো।

বিকেলের নাশতা
দুধ অথবা দুধের তৈরি নাশতা ৬০
গ্রাম।

রাতের খাবার
দুপুরের মতো।

শোয়ার আগে
দুধ-১ গ্লাস।

গর্ভবতী

গর্ভবতী মায়ের মানসিক যত্ন

গর্ভবতী প্রতিটি নারীর শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি মানসিক পরিবর্তন দেখা দেয়। এইসময় নারীর যথার্থ যত্নের প্রতি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। এই সময়ে নারীদের শরীর দুর্বল থাকে যার প্রভাব পড়ে তার মনে। অনেক নারীর ক্ষেত্রে তার শারীরিক দুর্বলতা মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয়। অনেক গর্ভাবতী নারীর মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায় মন খারাপ থাকে, এর মূল কারণ হল হরমোনের পরিবর্তন। স্ত্রী যদি কোনো কারণে রাগারাগি করে বা মেজাজ খারাপ থাকে তাহলে তার সঙ্গে হেসে কথা বলুন ও ভালো ব্যবহার করুন ভালোবাসা দিন ভালোবাসার কথা বলুন । কোনো অবস্থাতেই তার প্রতি রুঢ় আচরণ করবেন না। আপনি যদি তার কথা পাল্টা জবাব না দেন তাহলে কিছক্ষণ পরে তার মেজাজ এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে। গর্ভবতী মা শ্বশুর বাড়িতে অনেক সময় একাকীত্ব বা অসহায় অনুভব করতে পারেন। এই সময় সম্ভব হলে তার কাছের কাউকে তার পাশে রাখলে মন ফুরফুরে থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীর বাবার বাড়ির লোক বা আত্মীয় স্বজনদের কাছে রাখা সম্ভব হয় না। এক্ষেত্রে শ্বশুর বাড়ির মানুষজনকে তার সঙ্গে বন্ধুর মতো আচরণ করতে হবে, তার দেখাশুনা করতে হবে। শ্বশুর-শাশুড়ী ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা যদি গর্ভবতী মায়ের সঙ্গে ভালো আচরণ করেন তাহলে তার মন ভালো থাকবে এবং আস্থার সৃষ্টি হবে। আর মায়ের মনে যদি শান্তি না থাকে অথবা গর্ভাবস্থায় মা যদি খুব বেশি খিটখিটে থাকে তাহলে সন্তানও জন্মের পর খিটমিটে মেজাজের অধিকারী হতে পারে।

গর্ভবতী নারীর যা খেতে মানা

গর্ভকালীন কিছু কিছু খাদ্য খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। এইসব খাদ্য যেমন মায়ের শরীরের ক্ষতি করে তেমনি গর্ভের শিশুটিরও ক্ষতি হয়। আসুন,জেনে নেয়া যাক কি ধরনের খাদ্য গ্রহন করা থেকে গর্ভবতী মাকে বিরত থাকতে হবে।

সামুদ্রিক মাছ- সামুদ্রিক মাছ খাওয়া শরীরের জন্য উপকারি,কিন্তু অধিক পরিমানে খেলে গর্ভের শিশুর স্নায়ু তন্ত্রের ক্ষতি হয় । কারন সামুদ্রিক মাছে পারদ জাতীয় পদার্থ থাকে। তাই সপ্তাহে ১২ আউন্স এর বেশি সামুদ্রিক মাছ গ্রহন করা উচিত নয়।

ক্যাফেইন- চা,কফি ইত্যাদি ক্যাফেইন জাতীয় পানীয় । দৈনিক ২০০ গ্রামের বেশি ক্যাফেইন গ্রহন করা ঠিক না। অতিরিক্ত ক্যাফেইন এর কারনে কম ওজনের শিশুর জন্ম হয়, এছাড়া অকাল গর্ভপাতেরও ঝুঁকি থাকে। এছাড়া মাকে ধূমপান ও অ্যালকোহল গ্রহন থেকেও বিরত থাকতে হবে। এইগুলো মা ও বাচ্চা উভয়য়ের শরীরেরই ভয়ংকর ক্ষতি সাধন করে।

কাঁচা ডিম ও দুধ- কাঁচা বা কম সিদ্ধ করা ডিম ও ফুটানো ছাড়া দুধ খাওয়া ঠিক না। এইগুলো থেকে জীবাণু সংক্রমণ হওয়ার আশংকা থাকে। তাই ডিম ভাল করে সিদ্ধ করে বা ভেজে খেতে হবে। আর দুধ ভাল মতো ফুটিয়ে পান করা উচিত। এছাড়া পনির খাওয়া উচিত নয়,কারন পনির তৈরিতে ব্যাকটেরিয়ার দরকার হয়,আর গর্ভাবস্থায় ব্যাকটেরিয়া শরীরের ক্ষতি সাধন করতে পারে। তাই ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে এসব খাদ্য গ্রহন করতে হবে। গর্ভাবস্থায় মাকে প্রতিদিন নিয়ম করে পুষ্টি সমৃদ্ধ খাদ্য খেতে হবে। রিচ ফুড যেমন, চিকেন ফ্রাই বা চিকেন বিরিয়ানি নিয়মিত খাওয়া ঠিক হবেনা। মনে রাখবেন – মায়ের সুস্থতাই শিশুর সুস্থতা।

গর্ভবতী মায়ের বমিভাব কীভাবে কমাবেন

গর্ভবতী মায়ের বমিভাব খুব সাধারণ সমস্যা। গর্ভকালীন প্রথম তিন মাস সাধারণত এ সমস্যায় নারীদের বেশি ভুগতে দেখা যায়। অনেকের আবার অতিরিক্ত বমি হয় এ সময়। খুব সমস্যা হলে ওষুধ তো খেতে হবে। তবে তার আগে কিছু ঘরোয়া পদ্ধতি পালন করতে পারেন।

(১) গর্ভাবস্থায় যদি বমির সমস্যা বেশি হয়, তাহলে প্রতি এক ঘণ্টা পরপর ** পানি** পান করুন। এটি বমির সমস্যা কিছুটা কমাতে সাহায্য করবে। এটি শরীরকে আর্দ্র রাখতেও কাজ করবে। এটি সন্তানসম্ভবা নারী এবং গর্ভস্থ শিশুর জন্য ভালো। বিছানার পাশে এক গ্লাস পানি রাখুন। ঘুম থেকে ওঠার পর ছোট ছোট চুমুকে পানি পান করুন। প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করুন। এটি মেজাজ ভালো রাখবে, হজম ভালো করবে।

(২) বমি দূর করার জন্য আদা একটি চমৎকার সমাধান। এটি হজমের জন্যও ভালো। বমি দূর করতে বমির সময় দ্রুত আদা চিবান। আদা খাওয়ার উপকারিতা অনেক তবে অবশ্যই আদা খাওয়ার নিয়ম জানতে হবে। পাঁচ ফোঁটা আদার রসের সাথে এক চামচ মধু মিশিয়ে নিন। দিন। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর ধীরে ধীরে এটি পান করুন। এ ছাড়া আদার চাও খেতে পারেন।

(৩) গর্ভবতী নারীর বমির সমস্যা কমাতে লেবুও বেশ কার্যকর। এর মধ্যে থাকা ভিটামিন-সি সন্তান সম্ভবা নারীর জন্য খুবই ভালো। এক গ্লাস পানির মধ্যে লেবুর রস নিন। এতে মধু যোগ করুন। সকাল বেলার দুর্বলতা কাটাতে এটি খেতে পারেন। লেবুর খোসার গন্ধ শুঁকতে পারেন। এতে বমি বমি ভাব এবং খারাপ লাগা কমবে।

গর্ভবতী নারীরা যে সব জটিলতার সম্মুখীন হতে পারেন

গর্ভবতী নারীরা বিভিন্ন ধরনের জটিলতার সম্মুখীন হতে পারেন। গর্ভাবস্থায় যেসব জটিলতা হতে পারে সেই সম্পর্কে সতর্ক থাকা প্রয়োজন, যাতে করে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে ঝুকিমুক্ত রাখা যায় গর্ভবতী মাকে।

ব্যাক্টেরিয়া কর্তৃক সংক্রমণঃ গর্ভাবস্থায় ব্যাক্টেরিয়া কর্তৃক সংক্রমণের হার বেশি। এর ফলে তলপেটে ব্যাথা, বমি, জ্বর আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়।

ছত্রাক সংক্রমণঃ গর্ভাবস্থায় সামান্য ছত্রাক সংক্রমণেও গর্ভপাত, বা শিশুর মারাত্মক অসুখ এমনকি মৃত্যু হতে পারে। ছত্রাক সংক্রমণ হয় মেয়েদের যৌনাঙ্গে, গর্ভবতী মায়েদের পরিষ্কার থাকা অত্যন্ত জরুরি।

উচ্চ রক্তচাপঃ গর্ভবতী মহিলাদের উচ্চ রক্তচাপ শিশুমৃত্যু এবং মায়ের মৃত্যুর বড় কারণ। উচ্চ রক্তচাপ হলে গর্ভবতী মায়ের কিডনি ফেইলোর, হার্ট ফেইলোর, স্ট্রোক হওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়।

অস্বাভাবিক জটিলতাঃ গর্ভাবস্থায় বিভিন্ন রকম অস্বাভাবিক জটিলতা দেখা যায়। সেইসব জটিলতার লক্ষণ টের পেলেই ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। জটিলতা সমূহ

যোনীপথ দিয়ে রক্ত বের হওয়া।
মুখ কিংবা আঙুল ফুলে যাওয়া।
দৃষ্টি শক্তি কমে যাওয়া কিংবা ঝাপসা দেখা।
পেটে ব্যথা।
অতিরিক্ত বমি ভাব।
জ্বর হওয়া।
প্রসাবের সময় প্রচুর জ্বালা পোড়া হওয়া।
যোনী দিয়ে এক প্রকার তরল পদার্থ বের হওয়া।
পা ফুলে যাওয়া।
জরায়ুর ভিতরে সন্তানে নড়াচড়া অনুভব করতে না পারা
উপরোক্ত এই সমস্যাগুলো কোন গর্ভবতী মায়ের মধ্যে দেখা দিলে কোনরকম চিন্তা না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি যাতে মা এবং সন্তান কোনরকম বিপদের সম্মুখীন না হয়।

389 total views, 1 views today

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন