কাজী নজরুল ইসলাম এর জীবনে প্রেম

কাজী নজরুল ইসলাম এর জীবনে প্রেম
5 (100%) 3 votes

কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী কবি, প্রেম ও প্রকৃতির কবি। কাজী নজরুল ইসলাম এর জীবনে নারীর প্রতি প্রেম মূলত তিনবার এসেছিল প্রথম নার্গিস আসার খানম, দ্বিতীয় তার স্ত্রী প্রমিলা দেবী এবং তৃতীয় বেগম ফজিলাতুন্নেসা। প্রেম সম্পর্কে প্রত্যেক পুরুষেরই একটা স্বেচ্ছাচারি ধারণা থাকে, যেটা সে নিজে থেকেই আরোপ করে। যখনই তা বাস্তব চাওয়া-পাওয়ার হিসেবে খাপ খায় না, প্রেমিকের তাসের ঘর ভেঙ্গে পড়ে। পুরুষ সেটাকেই বাস্তব ধরে নিয়ে স্রোতের সাথে তার জীবন এলিয়ে দেয়, অথচ সারাজীবন না পাওয়ার আক্ষেপ বয়ে বেড়ায়। ব্যতিক্রম কাজী নজরুল ইসলাম, প্রেমের সাথে তার কোন আপোষ ছিল না। এর মাঝে ফজিলাতুন্নেসার প্রতি কবির অনুরাগ কিংবদন্তী তুল্য। প্রেমে মজে থেকে লেখা কবির কবিতা গুলো অনেকেই পড়েছি, কিন্তু এর পেছনের ঘটনাগুলো অজানা। অন্তর্জালের এই বিশাল জগতে নজরুলের প্রেমের ঘটনাগুলো তুলে ধরলাম।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

কাজী নজরুল ইসলাম

নার্গিস পর্ব

কাজী নজরুল ইসলাম এর প্রথম প্রেম সৈয়দা খানম (নজরুল তাকে নাম দেন নার্গিস, ফার্সি ভাষায় যার অর্থ গুল্ম)। তিনি কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর থানার দৌলতপুর গ্রামের মেয়ে ছিলেন। তার মামা আলী আকবর খানের সাথে নজরুলের পরিচয় কলকাতায় ৩২ নং কলেজ স্ট্রিটে। আলী আকবর খান সম্রাট বাবরের জীবনী নিয়ে একটা নাটক লিখেছিলেন এবং টুকটাক পুস্তিকা লিখে নিজেই ফেরি করে বিক্রি করতেন। সেই সব পুস্তিকায় আলী আকবর খান রচিত কিছু কবিতাও থাকত। তার সেসব হাস্যকর কবিতা দেখে কাজী নজরুল ইসলাম  নিজে “লিচু চোর” কবিতাটি আলী আকবর খানকে লিখে দেন। এতে খুশি হয়ে সে নজরুলকে তার গ্রামের বাড়ি তৎকালীন পূর্ববঙ্গের কুমিল্লাতে দাওয়াত দেন। এই আলী আকবরকে নজরুলের বন্ধুরা তেমন পছন্দ করতেন না এবং সর্বদাই তার থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিতেন। কিন্তু সরল মনা নজরুল কখনই বন্ধুদের উপদেশ গ্রহণ করেন নি। ১৯২১ সালের মার্চে নজরুল আলী আকবর খানের সাথে বন্ধুদের কিছু না জানিয়েই কুমিল্লার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। ময়মনসিংহের ত্রিশাল ছাড়ার পর এটাই ছিল কাজী নজরুল ইসলাম এর প্রথম পূর্ববঙ্গ যাত্রা। যাবার পথে তিনি “নিরুদ্দেশ যাত্রা” কবিতাটি লেখেন।

ট্রেনে কুমিল্লা পৌছে নজরুলকে নিয়ে আলী আকবর খান তার স্কুলের বন্ধু বীরেন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের বাসায় উঠেন। বীরেন্দ্রকুমারের মা ছিলেন বিরজা সুন্দরী দেবী। একই বাড়িতে তার বিধবা জেঠিমা গিরিবালা দেবীও থাকতেন তার মেয়ে প্রমীলা সেনগুপ্তা (দোলন) ও আশালতা সেনগুপ্তাকে নিয়ে। চারপাঁচ দিন সেখানে কাটিয়ে কবি রওয়ানা দেন দৌলতপুরের খাঁ বাড়ির উদ্দেশ্যে। তবে সেই চারপাচ দিনেই সেনবাড়ির সবাই বিশেষ করে বিরজাদেবীর সাথে নজরুলের সুসম্পর্ক গড়ে উঠে। নজরুল তাকে “মা” সম্বোধন করতেন।

দৌলতপুরে কাজী নজরুল ইসলাম এর জন্য আলী আকবর খানের নির্দেশে উষ্ণ অভ্যর্থনার ব্যবস্থা করা হয়। নির্মান করা হয় তোরন। বাড়ির জ্যেস্ট আত্মীয়-স্বজনদের সাথে নজরুল খুব দ্রুতই ঘনিষ্ট হয়ে উঠেন। তাদের কবিতা শুনিয়ে, অজস্র গান গেয়ে মুগ্ধ করে ফেলেন। দূরদুরান্ত থেকেও লোকেরা আসত কবিকে দেখতে, তার গান শুনতে। আলী আকবর খানের বোন আসমাতুন্নেসার বিয়ে হয়েছিল খাঁ বাড়ির পাশেই। অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ থাকায় আসমাতুন্নেসা তার ভাইয়ের বাড়িতে তেমন সমাদর পেতেন না। আসমাতুন্নেসার স্বামী মুন্‌শী আবদুল খালেক একটি মেয়ে রেখেই মৃত্যুবরণ করেন। সেই মেয়েটিই আমাদের আলোচ্য নার্গিস আক্তার খানম।

কাজী নজরুল ইসলাম এর গান, কবিতা, গল্প, বিদ্রোহ প্রভৃতি আমাদের কাছে বিখ্যাত। অথচ নার্গিসের সাথে কবির আলোচনার সূত্রপাত কবির বাঁশি বাজানো নিয়ে। এক রাতে কবি খাঁ বাড়ির দীঘির ঘাটে বসে বাঁশি বাজাচ্ছিলেন, সেই বাঁশি সুরে মুগ্ধ হন নার্গিস। একদিন নজরুলকে এসে শুধান, “গত রাত্রে আপনি কি বাঁশি বাজিয়েছিলেন? আমি শুনেছি”। এই পরিচয়ের পরই নজরুল সেই যুবতি মেয়ের প্রতি আকৃষ্ট হতে লাগলেন। তার আচার আচরণে নার্গিসের প্রতি অনুরাগ প্রকাশ পেতে থাকল।

আলী আকবর খানও ব্যাপারটা খেয়াল করলেন। মূলত নজরুলকে কুমিল্লা আনবার তার উদ্দেশ্য এই ছিল, নিজ পরিবারের কারো সাথে নজরুলের বিয়ে দেওয়া। তার পরামর্শে নার্গিসের খাঁ বাড়িতে আসা যাওয়া বাড়তে থাকে। নার্গিসে মাকে তিনি জানান, “এই ছেলে (নজরুল) একসময় জগৎ বিখ্যাত দার্শনিক কবি হবে। এই কাজীকে কোন রকমে আটকাতেই হবে। তাহলে ভবিষ্যতে অনেক সুবিধা পাওয়া যাবে”। পরবর্তীতে এই সব তথ্য নার্গিসের ভাইয়ের কাছ থেকে পাওয়া যায়। খাঁ বাড়ির মুরব্বীরা নজরুলকে নার্গিসের বর হিসেবে তেমন পছন্দ করতেনা । বাঁধন হারা নজরুলকে তারা ছিন্নমূল বাউডুলে হিসেবেই দেখেছিলেন। কিন্তু গ্রাজুয়েট আলী আকবর খানের চাপে তারা প্রতিবাদ করতেন না। এক পর্যায়ে আলী আকবর খানের কাছে খোদ নজরুল বিয়ের প্রস্তাব উত্থাপন করলেন, যার জন্য তিনি অপেক্ষা করছিলেন। ১৩২৮ খ্রিস্টাব্দের ৩ আষাঢ় বিয়ের দিন ধার্য করা হয়।
এরপর শুরু হয় স্বপ্ন ভঙ্গের খেলা। আলী আকবর খান তার গ্রাম্য ভগিনীকে বিখ্যাত কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর জন্য গড়তে নেমে পড়লেন। অশিক্ষিত নার্গিসকে খুব কম সময়ে শিক্ষিত করে তোলা সম্ভব ছিল না কিন্তু তিনি শরৎচন্দ্র ও অন্যান্য সাহিত্যিকের উপন্যাসের নারী চরিত্র গুলো থেকে নার্গিসকে জ্ঞান দিতে থাকলেন। নজরুলের এইসব ভনিতা একেবারেই পছন্দ ছিল না, তিনি আলী আকবর খানকে তা জানালেও তিনি নজরুলকে পাত্তা দেন না। সেই সাথে খুব দ্রুত বিয়ের প্রস্তুতি নিতে থাকেন, নিমন্ত্রন পত্রও অতিথিদের মাঝে বিলিয়ে ফেলেন। এসব ব্যাপার নজরুলকে পীড়া দেয়, আস্তে আস্তে তার মোহ ভাঙতে থাকে।

এর ফাঁকে আলী আকবর খান আরো একটি কাজ করে যাচ্ছিলেন যা সবারই অগোচরে ছিল। তিনি নজরুলের জন্য কলকাতা থেকে আসা বন্ধুদের সব চিঠিই সরিয়ে ফেলতেন, সেই সাথে নজরুলের বন্ধুদের উদ্দেশ্যে পাঠানো চিঠিও পোস্ট না করে নিজের কাছে রেখে দিতেন। তিনি ভালই জানতেন, নজরুলের বন্ধুরা কেউই কুমিল্লার আলী আকবর খানকে পছন্দ করেননা। সেই সাথে সন্দেহের চোখে দেখেন। এদিকে নজরুল বিয়েতে তার পক্ষের অতিথি হিসেবে বিরাজা সুন্দরী দেবী ও তার পরিবারকে মনোনিত করেন। বিয়ের আগের দিন সবাই দৌলতপুরে এসে উপস্থিত হন। কলকাতায় নজরুলের বন্ধুদের এমন সময় দাওয়াত দেওয়া হয় যেন কেউ আসতে না পারে। কবির অন্যতম ঘনিষ্ট বন্ধু কমরেড মোজাফফর আহমেদ নিমন্ত্রন পত্র পান বিয়ের পরে।

এরপর এল সেই বহু প্রতিক্ষিত ৩ আষাঢ়। যতদূর জানা যায় বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয় এবং আকদ্‌ও সম্পন্ন হয়। কিন্তু কাবিনের শর্ত উল্লেখ করবার সময়ই ঝামেলা বাঁধে। আলী আকবর খান শর্ত জুড়ে দিতে চান, নজরুলকে ঘর জামাই থাকতে হবে। বাঁধন হারা নজরুল এই শর্ত প্রত্যাক্ষান করেন। আকদ্‌ হয়ে যাবার পর আনুষ্ঠানিক অন্যান্য কাজে যখন সবাই ব্যস্ত তখন কাজী নজরুল ইসলাম অন্তর্দ্বন্দে বিক্ষুব্ধ। তিনি ছুটে যান বিরজা সুন্দরী দেবীর কাছে। তাকে বলেন, “মা, আমি এখনই চলে যাচ্ছি”। বিরজা সুন্দরী দেবী বুঝতে পারেন এই অবস্থায় নজরুলকে ফিরানো সম্ভব না। তিনি তার ছেলে বীরেন্দ্রকুমারকে নজরুলের সাথে দিয়ে দেন। সেই রাতে দৌলত পুর থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত কর্দমাক্ত (আষাঢ় মাস) রাস্তা পায়ে হেটে নজরুল ও বীরেন্দ্র কুমার কুমিল্লা পৌছেন। পরিশ্রমে ও মানসিক চাপে নজরুল অসুস্থ হয়ে পড়েন। নজরুলের জীবনে নার্গিস পর্ব সেখানেই শেষ।

১৯২১ এর সেপ্টেম্বর মাসে আলী আকবর খান কুমিল্লা হতে আবার কলকাতা পৌছে নজরুলের সাথে দেখা করেন। নজরুলকে তিনি টাকার লোভ দেখান, এতে কাজী নজরুল ইসলাম  আরো রেগে যান। এরপর দীর্ঘ ১৬ বছর নজরুলের সাথে নার্গিসের আর কোন যোগাযোগও হয় নি। ১৯৩৭ সালে নজরুলকে নার্গিস একটা চিঠি লেখেন। চিঠি প্রাপ্তির সময় সেখানে শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় উপস্থিত ছিলেন। নজরুল তাকেই চিঠি পড়তে বলেন। চিঠি পড়া শেষে শৈলজানন্দ নজরুলকে উত্তর লিখতে বলেন। নজরুল একটি গান লিখে দেন।

যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই
কেন মনে রাখ তারে
ভুলে যাও তারে ভুলে যাও একেবারে।
আমি গান গাহি আপনার দুখে,
তুমি কেন আসি দাড়াও সুমুখে,
আলেয়ার মত ডাকিও না আর
নিশীথ অন্ধকারে।

দয়া কর, মোরে দয়া কর, আর
আমারে লইয়া খেল না নিঠুর খেলা;
শত কাঁদিলেও ফিরিবে না সেই
শুভ লগনের বেলা।

আমি ফিরি পথে, তাহে কর ক্ষতি,
তব চোখে কেন সজল মিনতি,
আমি কি ভুলেও কোন দিন এসে দাঁড়িয়েছি তব দ্বারে।

ভুলে যাও মোরে ভুলে যাও একেবারে।

১৯৩৭ সালের ১ জুলাই নজরুল নার্গিসকে আর একটি চিঠি লেখেন। এর প্রায় বছর খানেক আগেই শিয়ালদহতে নার্গিস ও নজরুলের উপস্থিতিতে উভয়ের আনুষ্ঠানিক বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে।

বিচ্ছেদের সাত-আট মাসের মাথায় আলী আকবর খানে বই ব্যবসার ম্যানেজার আজিজুল হাকিমের সাথে নার্গিসের বিয়ে হয়। আজিজুল হাকিমও বাংলা সাহিত্যে কবি হিসেবে সমাদৃত। এক সময় তিনিই নার্গিসের কাছ থেকে পাওয়া সেই ১৯২১ সালে আলী আকবর খানের সরিয়ে ফেলা কাজী নজরুল ইসলাম এর বন্ধুদের ও বন্ধুদের কাছে লেখা চিঠি গুলো প্রকাশ করেন। আলী আকবর খানের মূল চরিত্র জনসম্মুক্ষে প্রকাশিত হয়।

প্রমীলা পর্ব

কাজী নজরুল ইসলাম এর জীবনে প্রমীলা পর্ব শুরু হয় নার্গিস পর্ব শেষ হওয়ার সাথে সাথেই। আগেই নার্গিস পর্বে বলা হয়েছে আলী আকবর খান নজরুলকে নিয়ে কুমিল্লায় তার বন্ধু বীরেন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের (বীরেন) বাসায় উঠেন। বীরেনের বড় চাচা বসন্তকুমার সেনগুপ্তের বিধবা স্ত্রী গিরিবালা সেনগুপ্ত তার একমাত্র মেয়ে প্রমীলা সেনগুপ্ত ওরফে দোলনসহ কুমিল্লায় বীরেনদের সাথে থাকতেন। তবে প্রথমেই কাজী নজরুল ইসলাম  ও প্রমীলার কোন অনুরাগ গড়ে উঠেনি।

বিয়ের রাতেই নার্গিসকে দৌলতপুরে ফেলে নজরুল বীরেনকে সাথে নিয়ে দীর্ঘপথ পায়ে হেটে কুমিল্লায় বীরেনদের ঘরে উঠেন। পরদিনই বীরেনের মা শ্রীমতি বিরজা সুন্দরী দেবী যিনি সপরিবারে (প্রমীলাসহ) দৌলতপুরে নার্গিস-নজরুল বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গেছিলেন, নৌকা যোগে ফিরে আসেন। দীর্ঘ পথ অতিক্রমের পরিশ্রম ও মানসিক কষ্টে নজরুল খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। সেন পরিবারের সবাই কবিকে সেবাযত্ন করে সারিয়ে তুলতে নেমে পড়েন। বাড়ির ছেলে মেয়েদের মধ্যে প্রমীলাই ছিলেন সবার বড় এবং নজরুলের সেবা যত্নের জন্য বিরজা সুন্দরী সব সময় তাকেই পাশে রাখতেন। কিশোরী দোলন ও তরূণ কবি নজরুলের প্রণয়ের সম্পর্ক তখনই গড়ে উঠে।

কাজী নজরুল ইসলাম দৌলতপুর হতে কুমিলার কান্দিরপাড়ে পৌছেন ১৮ জুন। ৬ জুন কমরেড মোজাফফর আহমেদ কুমিল্লা পৌছুলে নজরুল তাকে ২০/২২ টি কবিতা তুলে দেন। মজার ব্যাপার নার্গিসের সাথে দেখা হওয়া থেকে শুরু করে তাকে ফেলে চলে আসা পর্যন্ত সময়ে নজরুল কোন কবিতাই লেখেননি। মোজাফফর আহমেদের হাতে তুলে দেওয়া সবগুলো কবিতাই ১৮ জুন থেকে ৬ জুনের মাঝে লেখা। ৮ জুন মোজাফফর আহমেদ কবিকে নিয়ে কলকাতা ফিরে আসেন। একই বছর নভেম্বর মাসে কবি দ্বিতীয়বার ফিরে আসেন কুমিল্লাতে এবং প্রায় একমাস ছিলেন।

দ্বিতীয় বার কুমিল্লা থেকে কলকাতা ফিরে এসেই কবি তার বিখ্যাত দুটি কবিতা লেখেন, বিদ্রোহী ও ভাঙার গান। এই বিদ্রোহী কবিতাই কবি নজরুল ইসলামকে দেশ জোড়া খ্যাতি এনে দেয়। নজরুল গবেষক ড. আবুল আজাদ লেখেন, “দুই অসামান্য রচনা ‘বিদ্রোহী’ ও ‘ভাঙার গান” – নজরুল ইসলামের অন্তরের গভীর মর্মপীড়ার ফসল। কে এর প্রেরণার উৎস – নার্গিস না প্রমীলা? নজরুল ইসলামের তাবৎ সাহিত্য কর্মে এই দুই নারীর অপরিসীম প্রভাব মুল্যায়ন করতে গেলে দেখা যাবে প্রেমের জগতে অন্তরের গভীর প্রাধান্য পেয়েছিল নার্গিস………. পক্ষান্তরে প্রমীলাকে নিয়ে কবি জড়িয়েছেন জীবন জগতে বাস্তবে”।
১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কবি তৃতীয়বার কুমিল্লায় পৌছেন। এবারো তিনি বিরজা সুন্দরী দেবীর আশ্রয়ে উঠেন। তিনটি ভ্রমনেই, কুমিল্লার যুব সমাজ কবিকে কাছে পেয়ে আপন করে নেয়। এদের মাঝে অন্যতম ছিলেন সুলতান মাহমুদ মজুমদার। তৃতীয়বার কবি প্রায় পাঁচ মাস কুমিল্লা ছিলেন।

সুলতান মাহমুদ মজুমদার লিখেছেন, “নজরুল কুমিল্লা থাকাকালে সন্দেহাতীত ভাবে বুঝতে পারলাম যে নজরুলের সঙ্গে তার ভাবী পত্নী কুমারী প্রমীলা সেনগুপ্তের পূর্বরাগ চলছে। নজরুল আমাকে নিতান্ত ছেলে মানুষ মনে করতেন। একদিন মার্চ মাসের প্রথম ভাগে আমার হোস্টেলে এসে কবিতা লিখতে বসলেন। আর কোনদিন তিনি হোস্টেলে বসে কবিতা লিখেন নি। আমি নিকটে গেলে বললেন – প্রেমপত্র নয়, -কবিতা। প্রায় আধ ঘণ্টা পরে কবি আমাকে ডাকলেন ও কবিতাটি যে কাগজে লিখেছিলেন সে কাগজটা ভাঁজ করে আমার হাতে দিয়ে বললেন, আমি যেন সেটা তখনই দুলীর (প্রমীলা) হাতে পৌছে দিয়ে আসি। আমি বললাম, কবিতা পড়তে পারি? তিনি বললেন, ‘খুউব পড়তে পার’। ততক্ষণে চা এসে গেল। তিনি চায়ে চুমুক দিলেন, আমি মনে মনে কবিতাটি পড়লাম। কবিতাটির নাম ‘বিজয়িনী’ —–

হে মোর রানী ! তোমার কাছে হার মানি আজ শেষে।
আমার বিজয়-কেতন লুটায় তোমার চরণ-তলে এসে।
আমা সমর-জয়ী অমর তরবারী
দিনে দিনে ক্লান্তি আনে, হ’য়ে উঠে ভারী,
এখন এ ভার আমার তোমায় দিয়ে হারি
এই হার-মানা-হার পরাই তোমার কেশে।।

ওগো জীবন – দেবী!
আমায় দেখে কখন তুমি ফেল্‌লে চোখের জল,
আজ বিশ্ব –জয়ীর বিপুল দেউল তাইতে টলমল!

আজ বিদ্রোহীর এই রক্ত রথের চূড়ে,
বিজয়ীনি! নীলাম্বরীর আঁচল তোমার উড়ে,
যত তুণ আমার আজ তোমার মালায় পুরে,
আমি বিজয়ী আজ নয়ন জলে ভেসে’।

নার্গিসকে উদ্দেশ্য করে কবি লিখেছিলেন, ‘হার-মানা-হার’। অবশেষে সেই হার-মানা-হার পড়ালেন দুলীর কেশে।

তৃতীয় বার (১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে) কবির কুমিল্লা ত্যাগের পূর্বে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। প্রমীলা (দোলন) নজরুলের সম্পর্কের কথা কুমিল্লা শহরের তরুণ সমাজে বেশ হিংসাত্বক আলোড়ন সৃষ্টি করে। মুসলমান নজরুলের হিন্দু বাসায় থাকা, সেই সাথে হিন্দু মেয়ে প্রমীলার সাথে দহরম-মহরমের একটা বিষক্রিয়া সাম্প্রদায়িক রূপ নেয়। এক হিন্দু যুবকের নেতৃত্বে একদল হিন্দু ছাত্র নজরুল রথ দর্শনে গেলে তাকে অপমান ও লাঞ্ছিত করতে চেষ্টা করে। কুমিল্লার রক্ষণশীল হিন্দু মহলে এ ব্যাপারে তীব্র উত্তেজনা দেখা দেয়। এমনকি নজরুলকে আক্রমন করতে গুন্ডা লেলিয়ে দেওয়া হয়। শহরের কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তি কাজী নজরুল ইসলাম কে রক্ষা করেন এবং একরাতে আসাম-কলকাতা মেইল যোগে তাকে কলকাতা পাঠিয়ে দেন।

এদিকে ততদিনে নজরুল “ধুমকেতু” সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করে তাতে সরকার বিরোধী বক্তব্য রাখেন। বৃটিশ সরকার তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। সেই সময় গিরিবালা দেবী প্রমীলা সেনগুপ্তকে নিয়ে বিহারের সমস্তিপুরে অবস্থান করছিলেন। নজরুল বিহার হতে গিরিবালা দেবীকে প্রমীলা সহ কুমিল্লা পৌছে দেবার জন্য কুমিল্লার পথে রওয়ানা দেন। মোটামুটি, এই যাত্রাই নজরুল-প্রমীলার বিয়ের ব্যাপার পাকাপাকি হয়ে যায়। কুমিল্লায় ১৯২২ সালের ২৩ নভেম্বর কাজী নজরুল ইসলাম গ্রেফতার হন। ১৯২৩ সালের ৮ জানুয়ারি তার এক বছরের কারাদন্ডের আদেশ হয়।

কাজী নজরুল ইসলাম এর কারাদন্ড হওয়ায় দেশ ব্যাপি হৈ চৈ পড়ে যায়। এর আগে অবশ্য তিনি ‘ধুমকেতু’-এর স্বত্ত প্রমীলার চাচি বিরজা সুন্দরী দেবীর নামে হস্তান্তর করেন। নজরুলের গ্রেফতারের খবরে ব্যথিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘বসন্ত’ নাটকটি তাকে উৎসর্গ করেন। এদিকে নজরুল কারারক্ষীদের সাথে জেল কর্তৃপক্ষের খারাপ আচরণ ও কারা নির্যাতনের প্রতিবাদে হুগলি জেলে অনশন শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নজরুলকে অনশন ভঙ্গের জন্য অনুরোধ করে টেলিগ্রাম পাঠান Give up hunger strike, our literature claims you। অথচ কাজী নজরুল ইসলাম অনশন ভাঙলেন না। নজরুলের আপন মা জাহেদা খাতুনও চুরুলিয়া থেকে অনশন ভাঙতে জেলে আসেন, কিন্তু নজরুল জেল গেটে কারো সাথে দেখা করতে অস্বীকার করেন। অবশেষে বিরজা সুন্দরী দেবী নজরুলের অনশন ভাঙাতে সক্ষম হন।

১৯২৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর কবি বহরমপুর জেল হতে মুক্ত হন এবং সরাসরি চলে যান কুমিল্লায়। এর সম্পর্কে নজরুলের বন্ধু খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দিন লিখেছেন, “মুসলিম জগতে’র তৎকালীন সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দিনের সাথে এ আলোচনায় কত বিনিদ্র রজনী কাটিয়েছি। কিন্তু কোথায় নজরুল? বহরম পুর জেলে নজরুল আর নেই-সারা কলকাতায় নজরুল নেই। কোথায় তিনি? তাঁর অগনিত ভক্তবৃন্দক একে বারে পথে বসিয়ে তিনি সরে পড়েছেন কুমিল্লায় – এক নিভৃত পল্লীতে”।

অবশেষে ১৯২৪ সালের ২৫ এপ্রিল নজরুল প্রমীলার বিয়ের দিন ধার্য হয়। নজরুল প্রমীলার বিয়ে খুব ঢাকঢোল পিটিয়ে অনুষ্ঠিত হয় নি। ছেলে মুসলিম-মেয়ে হিন্দু হওয়ায় অনেক সামাজিক গুঞ্জন ও বাঁধার সৃষ্টি হতে পারে, তাই অনেকটা চুপচাপেই বিয়ে সম্পন্ন হয়। এই উদ্দেশ্যে গিরিবালা দেবীও কন্যা প্রমীলাকে নিয়ে কলকাতা পৌছেন। পরিবারের অনেকেই এর বিরুদ্ধে ছিলেন। খোদ বিরজা সুন্দরী দেবীর স্বামী ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্ত (প্রমীলার চাচা যার বাসায় কুমিল্লায় তারা থাকতেন) এই বিয়েতে মত ছিল না। এমনকি বিয়ের আগে বিরজাসুন্দরী দেবী স্বয়ং কলকাতা এসে গিরিবালা দেবী ও তার কন্যাকে ফিরিয়ে নিতে চান। কিন্তু তারা যান নি। বিরজা সুন্দরী দেবীর ছেলে বীরেন্দ্রকুমার পর্যন্ত এই বিয়ের বিরুদ্ধে ছিলেন।

কাজী নজরুল ইসলাম এবং প্রমিলার বিয়ের সব অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয় সাহিত্যিক মিসেস এম. রহমান (মুসাম্মৎ মাসুদা খাতুন) এর তত্ত্বাবধানে। কাজী নজরুল ইসলাম তাকেও মা সম্বোধন করতেন। মিসেস এম. রহমান বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পত্রিকায় লিখতেন। নজরুলের “বিষের বাঁশী” কাব্য গ্রন্থটি তাকেই উৎসর্গ করা হয়। নজরুলের অনেক হিন্দু – মুসলমান বন্ধুই বিয়ের কথা জানতেন, কিন্ত বিয়ে কখন, কোথা হচ্ছে তা জানতেন না। বিয়ের আসরে উপস্থিতদের মাঝ থেকে কাজী নিয়োগ করা হয় মৌলভী মঈন্‌উদ্‌দীন হোসায়েনকে। আর সাক্ষী ছিলেন মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী ও খান মুহম্মদ মঈনুদ্দীন। উকিল নিযুক্ত করা হয় মিসেস এম রহমানের পরিচিত জনৈক আবদুস সালামকে।

বিয়ের প্রথমেই যে সমস্যা বাঁধে তা হল: কোন ধর্মমতে বিয়ে হবে? হিন্দু মতে বিয়ে হতে পারে না। হতে পারে এক সিভিল ম্যারেজ অথবা ইসলাম ধর্মমতে। কিন্তু সিভিল ম্যারেজ আইন অনুযায়ী বর কনে উভয়কে এক স্বীকৃতি দিতে হয় তারা কোন ধর্ম মানেন না। কবি এতে প্রবল আপত্তি জানান। তিনি বলেন, ‘আমি মুসলমান-মুসলমানী রক্ত আমার শিরার শিরায় ধমনীতে ধমনীতে প্রবাহিত হচ্ছে, এ আমি অস্বীকার করতে পারব না’। অনেকেই প্রস্তাব দিলেন মেয়েকে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করতে বলতে। কবি এতেও আপত্তি তুললেন, ‘কারুর কোন ধর্মমত সম্বন্ধে আমার কোন জোড় নেই। ইচ্ছে করে তিনি মুসলমান ধর্ম গ্রহন করলে পরেও করতে পারবেন’। সেই সাথে কবি ইতিহাস হতে নানা যুক্তিও উপস্থাপন করেন।

এই বিষয়ে বিয়ের অন্যতম সাক্ষী খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন তার যুগস্রষ্টা নজরুল গ্রন্থে উল্লেখ করেন, “কবির মত মেনে নিয়ে আমাদের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হল যে, আহলে কেতাবিদিগের সংগে ক্ষেত্রে স্ব স্ব ধর্ম বজায় রেখে বিয়ে হওয়া ইসলাম আইন মনে অসিদ্ধ নয়। এখন কথা হচ্ছে হিন্দুগন ‘আহলে কিতাব’ কিনা? এক লক্ষ চব্বিশ হাজার পয়গম্বর পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছেন বলে মুসলমানেরা বিশ্বাস করেন। এই সকল পয়গম্বর যুগে যুগে বিভিন্ন দেশে জন্মগ্রহণ করেছেন। ভারতবর্ষেও পয়গম্বরের আবির্ভাব অসম্ভব নয়। অতএব, এ বিয়ে হওয়া সম্ভবত আইন মনে অন্যায় হবে না”। শেষে ইসলাম ধর্মমতেই ১০০০ টাকা দেনমোহর ঠিক করে নজরুল-প্রমীলার বিয়ে সম্পন্ন হয়।

নজরুল-প্রমীলার বিয়ের পরেই রক্ষণশীল হিন্দু-মুসলিম গোষ্টি এর পেছনে আদাজল খেয়ে নেমে পড়ে। প্রবাসী পত্রিকার ব্রাহ্মগোষ্টি এই উদ্দেশ্যে সাপ্তাহিক ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকাতে হিন্দু-মুসলিম বিয়ের ঘটনার বিরুদ্ধে লেখা শুরু করে। এমনকি প্রবাসী পত্রিকায় নজরুলের কবিতা ছাপাও বন্ধ করে দেয়। এক সময় সবই ঠান্ডা হয়ে যায়। বীরেন্দ্রকুমারও নজরুলের বাড়িতে যাতায়াত শুরু করেন বাকিরাও মেনে নেয়। বিয়ের পর হুগলীতেই বসবাস করতে থাকলেন কাজী নজরুল ইসলাম  ও নবপরিণীতা স্ত্রী প্রমীলা শাশুড়ি গিরিবালা দেবীসহ। ১৯৩৮ সালে পক্ষাঘাত গ্রস্ত হবার পূর্ব পর্যন্ত তাদের সংসার ভালই চলছিল। পক্ষাঘাত গ্রস্থ হবার ২/৩ বছরের মধ্যেই কবির শরীরেও রোগের লক্ষণ দেখা দেয়। ১৯৪২ সালের ১০ জুলাই কবি নজরুল ইসলাম চূড়ান্ত ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন।

অসুস্থ প্রমীলা-নজরুলের পরিবারকে আকঁড়ে ধরেন গিরিবালা দেবী। কিন্তু তখন কিছু অপবাদ ছড়িয়ে পড়ে। লোকে বলাবলি করতে থাকে, ‘নজরুলের অর্থ-সম্পদ গিরিবালা দেবী অসুস্থ নজরুলের সেবায় কাজে না লাগিয়ে, জমিয়ে রাখেন’। এই ক্ষোভে ১৯৪৬ সালের অগাস্ট/সেপ্টেম্বরের দিকে গিরিবালা দেবী কাউকে কিছু না জানিয়ে ঘর ছেড়ে চলে যান। পথে তিনি প্রমীলা দেবীকে চিঠি লিখে জানান তার জন্য কেউ যেন চিন্তা না করে। এরপর গিরিবালা দেবীর আর কোন খোজই পাওয়া যায়নি। নানা অভাব-অনটন, সংরাম-সঘাতের মাঝে প্রমীলা দেবী তার সংসার টিকিয়ে রাখেন। ১৯৬২ সালের ৩০ জুন কবিপত্নী প্রমীলাসেনগুপ্ত দীর্ঘ সময় পক্ষাঘাতগ্রস্থ থাকার পরে মৃত্যু বরণ করেন।

ফজিলতুন্নেসা পর্ব

নজরুলের প্রেমিক জীবনে ফজিলতুন্নেসা পর্ব একটু জটিল। কারন মাত্র তিনজন ব্যক্তি এই ঘটনার সাথে সম্পর্কিত প্রথম জন ফজিলতুন্নেসা, দ্বিতীয় জন অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন এবং তৃতীয় জন স্বয়ং কাজী নজরুল ইসলাম। অন্যকেউ নজরুল-ফজিলতুন্নেসা সম্পর্কে জানতেন না। তাছাড়া ১৯২৪ সালে নজরুল ইসলামের প্রমীলা দেবীর সাথে বিয়ে হয় আর ফজিলতুন্নেসার সাথে তার দেখা হয় ১৯২৮ সালে। স্থুল দৃষ্টিতে, নজরুল ফজিলতুন্নেসার সম্পর্কের ব্যাপারটা তেমন জটিল কিছু না। কাজী মোতাহার হোসেনের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তাদের যোগাযোগ হয়। নজরুল ফজিলতুন্নেসাকে প্রেম নিবেদন করে প্রত্যাখাত হন। দুই/তিন বছর নজরুলের অনুরাগ টিকেছিল। পরে ফজিলতুন্নেসা বিদেশে পড়তে গিয়ে খান বাহাদুর আহসানউল্লাহের ছেলে সলিসিটর জনাব শামসুজ্জোহাকে পছন্দ করেন, পরবর্তিতে তাদের বিয়ে হয়। এক পর্যায়ে নজরুলের জীবনে ফজিলতুন্নেসা পর্বের ইতি ঘটে,এতটুকুই। আবার ঘটনা এতটা সরলও নয়।
ফজিলতুন্নেসার প্রতি নজরুলের অনুরাগের কথা আমরা জানতে পারি অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেনের কাছ থেকে। এই বিষয়ে গভীরে যাবার আগে কাজী মোতাহার হোসেন এবং ফজিলতুন্নেসা সম্পর্কে কিছু বলে নেওয়া আবশ্যক। কারন আমরা অনেকেই এদের দুজনকেই তেমন চিনি না বিশেষ করে অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেনকে। ব্যাপারটা খুবই দুঃখজনক। আরো উল্লেখ করতে চাই, নজরুলের জীবনের এই অধ্যায়ের খবর পাওয়া যায় তার চিঠিপত্র, এবং মোতাহার হোসেনের নিজের লেখাগুলো থেকে। এই ঘটনা স্বয়ং কাজী নজরুল ইসলাম তার চিঠি পত্রে এবং কাজী মোতাহার হোসেন তার প্রবন্ধে এত মোহনীয় করে তুলে ধরেছেন যে, নিজের ভাষায় সেগুলো সম্পর্কে লিখে তার রস নষ্ট করবার সাহস করলাম না। ফজিলতুন্নেসা পর্বের বেশির ভাগ অংশই নজরুলের চিটিপত্র ও মোতাহার হোসেনের প্রবন্ধ হতে সরাসরি তুলে হবে।
আজকের বাংলাদেশ ও বিভাগপূর্ব তৎকালীন পূর্ব-বাংলার একশত বছরের ইতিহাসে বিজ্ঞান, সাহিত্য ও শিক্ষার জগতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধাপক কাজী মোতাহার হোসেন খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম। তিনি বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপক এবং এই অঞ্চলের প্রথম একাডেমিকালি শিক্ষিত পরিসংখ্যানবিদ। ১৯২৬ সালে কাজী আব্দুল ওদুদ, সৈয়দ আবুল হোসেন ও আবুল ফজলের সাথে তিনি “মুসলিম সাহিত্য সমাজ” গড়ে তোলেন। তিনি একজন শক্তিশালী প্রবন্ধকারও বটে, এসএসসিতে আমরা কাজী মোতাহার হোসেনের ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধটি পড়েছি।
কাজী নজরুল ইসলাম এর সাথে কাজী মোতাহার হোসেনের পরিচয় হয় ১৯২০-২১ সালের দিকে কলকাতায়। তারা প্রায় সমবয়সী, মোতাহার হোসেন কাজী নজরুল ইসলাম হতে দুই বছরের বড় ছিলেন। ১৯২৭ সালের আগে তাদের মধ্যে তেমন ঘনিষ্টতা গড়ে উঠে নি, সেইবার নজরুল মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রথম অধিবেশনে যোগ দিতে ঢাকা আসেন। এরপর ১৯২৮ সালে দ্বিতীয় অধিবেশনে যোগ দিতে এসে নজরুল কাজী মোতাহার হোসেনের বাসায় উঠেন। কাজী মোতাহার হোসেন তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বর্ধমান হাউসের (বর্তমান বাংলা একাডেমী ভবন) হাউস টিউটর হিসেবে সপরিবারে ঐ বাড়িতে থাকতেন। সেখানেই তাদের মধ্যে অত্যন্ত ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে উঠে।

বেগম ফজিলতুন্নেসা ১৯০৫ সালে তৎকালীন পূর্ববাংলার ময়মংসিংহের করটিয়াতে জন্ম গ্রহন করেন। সেই হিসেবে তিনি কাজী নজরুল ইসলাম হতে ছয় বছরের ছোট। অত্যন্ত ভাল ছাত্রী ফজিলতুন্নেসা কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে বি. এ পাশ করে ১৯২৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অঙ্কে এমএ পড়তে ভর্তি হন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়র প্রথম মুসলমান ছাত্রী। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী ছিলেন লিলা নাগ। সেই ১৯২৩ সালে ঢাকাতে ফজিলতুন্নেসা একা পুরান ঢাকার দেওয়ান বাজার রোডে (বর্তমানে খুব সম্ভবত নাজিমুদ্দিন রোড) একটি বাসায় থেকে লেখাপড়া করতেন।

এখন ফজিলতুন্নেসা ও কাজী মোতাহার হোসেনের সম্পর্কটাও পরিস্কার করা জরুরি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এ পড়বার সময় একই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক কাজী মোতাহার হোসেনের সাথে ফজিলতুন্নেসার পরিচয় হয়। বিকেল বেলা প্রায় প্রতিদিন ফজিলতুন্নেসা বর্ধমান হাউসে মোতাহার হোসের স্ত্রী ও শাশুড়ির সাথে আড্ডা দিতে আসতেন। আড্ডা দিতে দিতে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে পড়লে তিনি ফজিলতুন্নেসাকে বাড়ি পৌছে দিয়ে আসতেন। তিনি ফজিলতুন্নেসাকে সর্বদা নিজের ছোট বোনের মতই দেখতেন। এই ব্যাপারে আমি আর বেশি কিছু না বলে, কাজী মোতাহার হোসেনের ‘মরহুমা ফজিলতুন্নেসার সঙ্গে আমার পরিচয়’ (১৯৭৭ সালে ইত্তেফাকে প্রকাশিত, ১৯৭৬ সালে ফজিলতুন্নেসা মৃত্যুবরণ করেন) প্রবন্ধের কিছু অংশ তুলে ধরছি,
‘প্রতিদিন প্রত্যুষে উঠে ঘুম টুটে গেলেও ফজিলতের কপট ঘুমটা থেকেই যেত- তাই আমাকেই এসে তার দু’হাত ধরে টেনে তুলে বিছানায় বসিয়ে দিয় ঘুম ভাঙাতে হত। এবারও একবার গিয়ে দেওয়ানবাজারের ঘরগুলো দেখে এসেছি। তার স্মৃতি-জড়িত ঘরগুলো এখনও পূর্বস্মৃতি ধারণ করেই চুপ করে রয়েছে। দেখতে পেলাম কোন্‌ ঘরটায় তার অসুখের সময় তার রাতুল চরণ যুগল কোলে তুলে নিয়ে আমি গরম পানিতে ভিজানো তোয়ালেটা নিংড়িয়ে নিয়ে আলগোছে ওর পায়ে সেঁক দিয়ে দিতাম। তখন কি সুন্দর হাসিটাই না ফুটে উঠত ওর চোখে-মুখে। ও যে আমার চিরজীবনের আপন বোন……………………এই সব ব্যাপার লক্ষ্য করলে স্পষ্টই বোঝা যায় আমার ও আমার ফতুল ভগ্নীটার মধ্যে কেমন অসাধারণ সহজ সম্পর্ক ছিল। যইদ একে অন্যকে সম্যক বুঝতে পারে তবেই শুধু এরূপ হওয়া সম্ভব। মনে দ্বিধাদ্বন্দ, সন্দেহ বা কলুষ থাকলে এমন গভীর সৌহার্দ জন্মাতেই পারে না। ………………………. আমি ফজিলতকে চেয়েছি এবং পেয়েছি অতি পবিত্র বান্ধবিরূপে। ফজিলতও আমাকে পেয়েছে অনাবিল বান্ধব রূপে। আমরা আমাদের বান্ধব-বান্ধবী সম্পর্ক পূর্ণমাত্রায় বজায় রেখেছি। আমাদের দুজনের হৃদয়বৃত্তি সমতুল ছিল বলেই আমরা সযত্নে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যেই আমাদের পবিত্র সম্পর্ক সংযত ও সংহত রাখতে পেরেছি। …………………. অনেকেই হয়ত মনে মনে প্রশ্ন তুলবেন, “আচ্ছা কাজী সাহেব, সত্যি করে বলেনত আপনার মুখে পাতানো ভগ্নীর সঙ্গে এত মাখা মাখি (বা দহরম মহরম) আপনার ঘরণী (সাজেদা বিবি) কেমন করে বরদাশত করতেন?” আমি বলি, “আমার সাজুরানী আমাকে ভাল করেই চেনেন। তার পারিবারিক পরিবেশ সম্পূর্ণ আল্লাময়”।

১৯২৮ সাল। মুসলিম সাহিত্য-সমাজের দ্বিতীয় বার্ষিক অধিবেশনে যোগ দিতে কাজী নজরুল ইসলাম  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন এবং কাজী মোতাহার হোসেনের বর্ধমান হাউসের বাসায় উঠেন। বেগম ফজিলতুন্নেসা কাজী সাহেবের কাছ থেকে জানতে পারেন নজরুল একজন সৌখিন হস্তরেখাবিদ। তিনি কাজী সাহেবের কাছে কাজী নজরুল ইসলাম এর কাছে হাত দেখাবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

কাজী মোতাহার হোসেন একদিন কবিকে নিয়ে পুরান ঢাকার হাসিনা মঞ্জিলের কাছে দেওয়ান বাজার রাস্তার উল্টো দিকে ফজিলতুন্নেসার ঘরে উপস্থিত হন। নজরুল ও ফজিলতুন্নেসার খুব সম্ভবত এটাই প্রথম দেখা। কাজী নজরুল ইসলাম প্রায় আধ ঘন্টা ধরে গভীর মনোযোগের সাথে হাত দেখে বললেন, ‘এই মুহুর্তে কিছু বলা যাচ্ছে না’। তিনি জ্যোতিষীর মত হাতের নানা রেখার বিবরণ টুকে নিয়ে, এগুলো রাতে পরীক্ষা করবেন বলে কাজী সাহেবের সাথে বিদায় নিলেন। রাতের খাওয়া দাওয়ার পর কাজী সাহেব ও নজরুল শুতে যান। নজরুল ও কাজী মোহাতার হোসেন বর্ধমান হাউসের একই রুমে থাকতেন। ভোর হওয়ার আগে কাজী সাহেব জেগে দেখেন নজরুল পাশে নেই। পরদিন নাস্তার সময় ফিরে এসে কাজী নজরুল ইসলাম  তার গায়েব হবার যে কারন উল্লেখ করেন তা কাজী মোতাহার হোসেনের ‘আমার বন্ধু নজরুল : তাঁর গান’ প্রবন্ধ হতে সরাসরি তুলে দিলাম, “রাত্রে ঘুমিয়ে আমি স্বপ্নে দেখলাম একজন জ্যোতির্ময়ী নারী তাকে অনুসরণ করার জন্য আমাকে ঈঙ্গিত করছে। কিন্তু জেগে উঠে সেই দেবীর পরিবর্তে একটি অস্পষ্ট হলুদ আলোর রশ্মি দেখলাম। আলোটা আমাকে যেন ইঙ্গিতে অনুসরণ করতে বলে, আমার সামনে সামনে এগিয়ে চলছিল। আমি বিস্ময় ও কৌতূহল নিয়ে কিছুটা অভিভূত হয়ে সেই আলোকরেখার অনুসরণ করছিলাম। মিস ফজিলতুন্নেসার গৃহের কাছে না পৌছান পর্যন্ত আলোটা আমার সামনে চলছিল। তার বাড়ির কাছে পৌছতেই আলোটা অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি দেখলাম একটি ঘরের মধ্যে তখনও একটি মোমের বাতি জ্বলছে। রাস্তার ধারের জানালার কাছে সম্ভবতঃ পথিকের পায়ের শব্দ শুনে গৃহকত্রী এগিয়ে এসে ঘরের প্রবেশ-দরোজা খুল দিলেন এবং মিস ফজিলতুন্নেসার শয়ন-ঘরের দিকে আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন। কুমারী নেসা তার শয্যার উপর গিয়ে বসলেন আর আমি তার সামনে একটি চেয়ারে বসে তার কাছে প্রেম যাচনা করলাম; তিনি দৃঢ়ভাবে আমার প্রণয় নিবেদন অগ্রাহ্য করলেন”।
সূর্য উঠার পর কোথায় ছিলেন জিজ্ঞাসা করলে কাজী নজরুল ইসলাম উত্তর দেন, ‘ঐ ঘটনার পর নিরতিশয় ভগ্নোৎসাহ হয়ে পড়ি; তাই ভোর বেলা রমনা লেকের ধারে ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছিলাম।
কাজী মোতাহার হোসেন আরো লেখেন,
“নজরুল রমনার লেক ভালবাসতেন এবং লেকের ধারে সাপের আস্তানা আছে জেনেও সেখানে ভ্রমন করতে যাওয়া তাঁর পক্ষে আদৌ অসম্ভব ছিল না। কিন্তু আরো একটি বিস্ময়ের ব্যাপার তখনও আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। ঐদিন দুপুরে লক্ষ করলাম ফজিলতের গলার লম্বা মটর-মালার হারটা ছিঁড়ে দুখান হয়ে গিয়েছে। পরে সেটা সোনারুর দোকান থেকে সারিয়ে আনতে হয়েছিল। অত্যন্ত কাছে থেকে জোরাজুরি ছাড়া এমন কান্ড কেমন করে ঘটতে পারে তা আমার পক্ষে বুঝে ওঠা মুশকিল। কাজী নজরুল ইসলাম আমার কাছে ও ফজিলতুন্নেসার কাছ যেসব দীর্ঘ পত্র লিখেছিলেন তা দেখে স্পষ্ট বোঝা যায় এমন অঘটন কিছু ঘটেছিল যাতে ফজিলতের হৃদয় তিনি জয় করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন”।
এবার আমার কিছু কথা। এই পর্বের ঘটনা গুলো যে সব স্থানে ঘটে ছিল সেগুলো আমরা যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা ঢাকা মডিকেল কলেজের ছাত্র-ছাত্রী তাদের কাছে খুবই পরিচিত এবং অবশ্যই অন্য অনেকের কাছেও। প্রতিদিনই আমাদের আসা যাওয়া চলে এই এলাকা গুলোতে।
নজরুল যেই বর্ধমান হাউসে উঠেছিলেন কাজী মোতাহার হোসেনের বাসায় সেটি আজকের বাংলা একাডেমী ভবন। সেই রাতে নজরুল যে পথে তার ভাষায় ‘জ্যোতির্ময়ী নারীকে’ অনুসরণ করেছিলেন, সেই পথ বাংলা একাডেমী থেকে শুরু হয়ে, দোয়েল চত্তর, শহিদুল্লাহ হল অতিক্রম করে চানখার পুলের দিকে যায়। ‘নিরব হোটেল’ –যাবার পথে নাজিমউদ্দিন রোডের রাস্তার বাম দিকে আমরা একটা লাল ভবন দেখতে পাই। ভবনের মূল ফটকে শ্বেত পাথরে লেখা আছে ‘হাসিনা মঞ্জিল’, স্থাপিত ১৯২১। এরই আশে পাশে কোথাও আছে ফজিলতুন্নেসার সেই বাড়িটি। আর রমনা পার্কের কথা আলাদা বলার প্রয়োজন নেই। তবে, এই কাহিনী পড়বার পরে যখনই রমনা লেকে যাই, লেকের পাড়ের বড় বড় গাছ গুলো দেখে মনে হয় এরা সবাই সেই দিনের সাক্ষী। হয়ত খানিক্ষণ এদের কোনটির পাশেই প্রেম প্রত্যাখাত কাজী নজরুল ইসলাম বসেছিলেন, হয়ত নিজে নিজে গুন গুন করেছিলেন এমন কোন গান যার কলিগুলো আমাদের অজানাই রয়ে যাবে।

ফজিলতুন্নেসার হৃদয় জয় করতে ব্যর্থ কাজী নজরুল ইসলাম কলকাতা ফিরে আসেন কলকাতায় তার কৃষ্ণনগরের বাসায়, যেখানে তার পরিবার থাকত। পৌছে কাজী নজরুল ইসলাম কাজী মোতাহার হোসেনকে মোট ৭টি এবং ফজিলাতুন্নসাকে একটি চিঠি পাঠান। এই ৮ টি চিঠি ১৯২৮ এর ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মাঝে লেখা । চিঠিগুলো কাজী মোতাহার হোসেনের কাছে দীর্ঘদিন সংরক্ষিত ছিল পরে এগুলো সংগ্রহ করে সৈয়দ আলী আশরাফ তার ‘নজরুল জীবনে প্রেমের এক অধ্যায়’ গ্রন্থে সংকলন করেন।

প্রথম চিঠিটি ১৯২৮ এর ২৪ ফেব্রুয়ারি কলকাতা ফিরবার পথে স্টীমারে বসে লেখা। এই চিঠি কবি ফজিলতুন্নেসাকেও দেখাবার অনুরোধ করেন। কাজী নজরুল ইসলাম এর চিঠি গুলো মূলত কাজী মোতাহার হোসেনের মাধ্যমে ফজিলতুন্নেসার কাছেই লেখা ছিল। শেষ পর্যন্ত নজরুলের একটি চিঠির উত্তর দেন ফজিলতুন্নেসা। এই চিঠিতে ফজিলতুন্নেসা নজরুলকে আর চিঠি না লিখবার অনুরোধ করেন। উত্তরে কাজী নজরুল ইসলাম কাজী মোতাহার হোসেনকে জানান, তিনি আর চিঠি লিখবেন না। কিন্তু সেই কথা রাখা নজরুলের পক্ষে সম্ভব হয় নি। তিনি ফজিলতুন্নেসাকে তারপরও চিঠি লিখে গেছেন।

পরিশেষে – নার্গিস, প্রমীলা, ফজিলতুন্নেসা এই তিন নারীই কাজী নজরুল ইসলাম এর কাছ থেকে প্রেম বলতে আমরা যা বুঝি তা পেয়েছিলেন। এছাড়া নজরুলের জীবনকালে তার সাথে সংশ্লিষ্ট আরো কিছু নারীকে জড়িয়ে কিছু গুজব উঠেছিল বা তাদের প্রতি কাজী নজরুল ইসলাম এর গভীর আত্মীক আকর্ষণ অনুভবের প্রমান মেলে।

510 total views, 3 views today

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন