কলা খাওয়ার স্বাস্হ্য উপকারিতা এবং কলার বিভিন্ন ব্যবহার

কলা খাওয়ার স্বাস্হ্য উপকারিতা এবং কলার বিভিন্ন ব্যবহার
5 (100%) 6 votes

কলা একটি সুপরিচিত সহজলভ্য এবং তৃপ্তিকর ফল। আমরা সবাই কমবেশী কলা খাই। কলা খুবই পুষ্টিকর একটি খাবার। খনার বচনে আছে, “কলা রুয়ে না কেটো পাত, তাতেই কাপড়, তাতেই ভাত”। সুস্বাদু এই ফলটি Musaceae পরিবারের একটি উদ্ভিদ। এই পরিবারে প্রায় ৫০টি ‘প্রজাতি’ অন্তর্ভুক্ত । এর অধিকাংশ প্রজাতির উৎপত্তি দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ায়। প্রায় সব ধরনের কলাই এই প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশে কলার প্রায় ১৯টি জাত রয়েছে । পার্বত্য এলাকায় কলার কিছু বুনো জাত দেখা যায়। ক্রমশ কলার জাতের সংখ্যা বাড়ছে। গাছের বৈশিষ্ট্য অনুসারে বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতের কলা গাছকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে যথা: লম্বা জাতের গাছ ও খাটো জাতের গাছ। পাকা অবস্থায় খাওয়ার জন্য কলার জাত ৪ প্রকার –

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

▪সম্পুর্ণ বীজমুক্ত কলাসমূহ: যেমন-সবরি, অমৃতসাগর, অগ্নিশ্বর, দুধসর, দুধসাগর প্রভৃতি ।

▪দু-একটি বীজযুক্ত কলাসমূহ: যেমন-চাম্পা, চিনিচাম্পা, কবরী, চন্দন কবরী, জাবকাঠালী ইত্যাদি।

▪বীজযুক্ত কলাসমূহ: যেমন-বতুর আইটা, গোমা, সাংগী আইটা ইত্যাদি।

▪আনাজী কলাসমূহ: যেমন-ভেড়ার ভোগ, চোয়াল পউশ, বর ভাগনে, বেহুলা, মন্দিরা, বিয়েরবাতি প্রভৃতি

কলা

কলা থেকে পাওয়া পুষ্টিগুন

প্রতি ১০০ গ্রাম কলা থেকে যে খাদ্যগুণ পাওয়া যায় তা হলো –

পানি ৭০.১%
প্রোটিন ১.২%
ফ্যাট ০.৩%
খনিজ লবণ ০.৮%
আঁশ ০.৪%
শর্করা ৭.২%
ক্যালসিয়াম ৮৫ মি.গ্রা.
ফসফরাস ৫০ মি.গ্রা.
আয়রন ০.৬ মি.গ্রা.
ভিটামিন সি অল্প পরিমাণে
ভিটামিন বি ৮ মি.গ্রা.

কলা দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়

কলা একটি প্রাকৃতিক ওষুধ, যা দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলে। আমাদের শরীরের শক্তি বর্ধনকারী সুকরোজ ফ্রুক্টোজ, গ্লুকোজ এবং ফাইবার আছে। সুস্বাদু এই ফলটি মাত্র দুইটি খেলে প্রায় ৯০ মিনিট পুরোদ্যমে কাজ করার মতো দেহে শক্তি তৈরি করে। সম্প্রতি মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল মেডিসিন বিভাগ কলা থেকে একটি প্রোটিন বের করেছেন। যার নাম ব্যানলেক। যা থেকে এইডস রোগের ওষুধ আবিষ্কার করেছেন। তাছাড়া কলার এই ব্যানলেক প্রোটিনটি ইবোলা ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করবে। সুস্বাদু এই ফলটি খাওয়ার অতি অল্প সময়ের মধ্যেই দেহে শক্তি উৎপন্ন হয়। কলাতে আছে পটাশিয়াম যা শরীরের এনজাইমকে সক্রিয় রাখে। সুস্বাদু এই ফলটি দেহের স্নায়ু কোষ গুলোকে সতেজ ও শক্তিশালী করে। তাই যারা লেখাপড়া করেন তাদের জন্য খুব উপকারী ফল। কলাতে আছে আয়রণ যা দেহে হিমোগ্লোবিন তৈরি করে। ফলে দেহে রক্তশূণ্যতা দূর হয়। কলায় ট্রিপ্টফ্যান নামক রাসায়নিক উপাদান থাকে যা সেরোটোনিনে রূপান্তরিত হয়ে মানুষের মন মেজাজ ভালো রাখে ও হতাশা কমে আসে। যারা নিয়মিত বুক জ্বালা পোড়ায় ভোগেন তারা নিয়মিত খাওয়ার পর ২/১টি কলা খান সমস্যা কমে আসবে। মেয়েদের দেহে পরিমাণ মত আয়রণ না থাকলে প্রতিমাসে মাসিকে সমস্যা দেখা দেয় বা নিয়মিত হয় না। এমন সমস্যা যাদের দেখা দেয় তারা নিয়মিত কলা খান আয়রণের অভাব পূরণ হবে এবং মাসিক নিয়মিত হবে। মানসিক দিকও ভালো থাকবে। কলাতে ভিটামিন বি১, বি২, বি৬ উপাদান থাকে যা নানা রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

কলা খাওয়ার স্বাস্হ্য উপকারিতা

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনে সহায়তা করে – উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদরোগ ও রক্তনালীর রোগীদের শরীরে সাধারণত সোডিয়াম বেশি এবং পটাসিয়াম কম থাকে। অন্যদিকে কলায় প্রচুর পটাসিয়াম রয়েছে। ফলে এ ধরনের রোগী কলা খেলে শরীরে সোডিয়াম ও পটাসিয়ামের ভারসাম্য বজায় থাকে।  এটা তাদেরকে সুস্থ থাকতে সাহায্য করবে।

গ্যাস্ট্রিক কমায় – কলায় একটি বিশেষ রাসায়নিক পদার্থ আছে, যা গ্যাস্ট্রিক আলসারের রোগীদের সাহায্য করতে পারে। কলার রাসায়নিক পদার্থ পাকস্থলীর রক্ষাকারী আবরণ সৃষ্টিতেও ভূমিকা রাখে।

দেহে প্রোবায়টিক এর যোগান দেয় – আমাদের দেহের অন্ত্রে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার নিয়ন্ত্রনের জন্য প্রোবায়টিক গ্রহন করা প্রয়োজন। আর অন্ত্রে ক্ষতিকর ব্যাক্টেরিয়া বৃদ্ধি হওয়া মানেই পুরো দেহেই এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়া। প্রোবায়টিক এর একটি অন্যতম প্রাকিৃতিক উৎস হলো কলা কেননা কলাতে রয়েছে ফ্রুক্টোওলিগোস্যাকারাইড (FOS) যা দেহে উপকারী ব্যাক্টেরিয়া বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

দৃষ্টিশক্তির উন্নতি ঘটায় – কলাতে ভিটামিন এ আছে, এটি আপনার স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি বজায় রাখতে সাহায্য করবে। ভিটামিন এ আপনার চোখের পার্শ্ববর্তী ঝিল্লি সংরক্ষণ করে এবং আপনার কর্নিয়া মধ্যে যৌগিক প্রবাহ বজায় রাখতে সাহায্য করে।

হাঁপানির ঝুকি কমায় – দৈনিক কলা খেলে হাঁপানি উপসর্গের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়। কলা হাঁপানির মত শ্বাসযন্ত্রের রোগ প্রাকৃতিকভাবে প্রতিকার করে ভিটামিন বি ৬ ও ফাইবার দিয়ে।

ওজন কমাতে সাহায্য করে – ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা খুবই জরুরি। হ্যাঁ, যদি আপনার ওজন বেশি হয়ে থাকে, তবে ওজন কমাতে পারেন। আর ওজন কমানোর উপায় হিসাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারে সুস্বাদু এই ফলটি । প্রতিদিন পরিমিত পরিমানে কলা খান, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন। কিন্তু বেশি খেলে কিন্তু মুটিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। কারণ, কলায় প্রচুর শর্করা জাতীয় উপাদান আছে।

ঘুমের জন্য সহায়ক – রাতে বিছানায় এপাশ ওপাশ করেন কিন্তু ঘুম আসে না? কলা হলো এই সমস্যার প্রাকৃতিক সমাধান। কলা ট্রিপটোফেন নামক এক প্রকার অ্যামিনো অ্যাসিড এর খুবই ভালো উৎস। এই ট্রিপটোফেন সেরোটিন নামক হরমোন তৈরিতে গুরুত্বপুর্ন ভুমিকা পালন করে। এই হরমোন মনে প্রশান্তি নিয়ে আসে, এমনকি মেজাজ খারাপ থাকলে তাও ভালো করে দিতে পারে। ঘুমানোর প্রায় এক ঘন্টা আগে সুস্বাদু এই ফলটি খেয়ে নিন যাতে আপনার শরীর তা হজম করে ট্রিপটোফেন তৈরি করতে পারে আর আপনাকে উপহার দিতে পারে একটি শান্তিময় ঘুম।

মাইগ্রেন দুর করে – মাথাব্যথা ও মাইগ্রেন এর ভয়ানক ব্যথা আপনার সারাটা দিন মাটি করে দিতে পারে। কিন্তু সুস্বাদু এই ফলটি পারে এই অবস্থা প্রতিরোধ করতে। কলায় প্রচুর পরিমানে ম্যাগনেসিয়াম থাকায় এটি মাথাব্যথার প্রকৃতিক নিরাময় হিসেবে কাজ করে। তাই এখন থেকে যে কোনো সময় আপনার মাথা ব্যাথা শুরু হতে চাইলেই চট করে একটি কলা খেয়ে ফেলুন।

কাশির চিকিৎসায় সহায়ক – কাশি হলে সুস্বাদু এই ফলটি আপনার কাজে লাগতে পারে। কলা ও চিনি মিশিয়ে পানিতে গরম করুন। তারপর খেয়ে ফেলুন। প্রতিদিন এক থেকে দু’বার এটি খেতে পারেন। আশা করা যায়, কয়েক দিনের মধ্যেই আপনার কাশি ভালো হয়ে যাবে।

বিষন্নতা প্রতিরোধে সাহায্য করে – কলা বিষন্নতা প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে। যারা বিষন্নতায় ভুগছেন, তারা নিয়মিত সুস্বাদু এই ফলটি খান।

রুক্ষ চুলের যত্নে কলা

ইদানীং অনেকেই চুলের সমস্যায় ভুগে থাকেন। চুল পড়া, রুক্ষতা, ভেঙ্গে যাওয়া সহ নানা সমস্যার কারণে চুল লম্বা করাও হয়ে ওঠে না। চুলের এইসব সমস্যার আছে খুব সহজ একটি সমাধান। আর তা হলো কলা। সুস্বাদু এই ফলটি শরীরের জন্য যেমন উপকারী, তেমনই চুলের যত্ন নিতেও দারুণ কার্যকরী। যাদের চুল রুক্ষ হয়ে গেছে তারা সুস্বাদু এই ফলটি এবং মধুর প্যাকটি ব্যবহার করতে পারেন। এতে চুলের হারানো উজ্জ্বলতা ফিরে আসবে। সেই সঙ্গে চুল হবে মোলায়েম। দুটি ভালো পাকা কলা এবং দুই টেবিল চামচ মধু ব্লেন্ডারে ভালো করে ব্লেন্ড করে নিন। এবার এই প্যাকটি পুরো চুলে ব্রাশের সাহায্যে লাগিয়ে নিন। শাওয়ার ক্যাপ দিয়ে মাথা ঢেকে রাখুন। একঘণ্টা পরে চুল ঠাণ্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে শ্যাম্পু করে ফেলুন। সপ্তাহে দুইবার ব্যবহার করলেই চুল থাকবে ঝলমলে। যাদের চুল ভঙ্গুর হয়ে গেছে কিংবা চুল পড়া বেড়ে গেছে তারা এই প্যাকটি ব্যবহার করলে উপকার পাবেন। এই প্যাক ব্যবহারে চুল মজবুত হবে এবং মোলায়েম থাকবে। একটি পাকা কলা এবং দুই টেবিল চামচ এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করে মসৃণ পেস্ট তৈরি করুন। এরপর পুরো মাথায় প্যাকটি লাগিয়ে রাখুন এবং শাওয়ার ক্যাপ পরে নিন। ২০ মিনিট পরে ঠাণ্ডা পানি দিয়ে চুল ধুয়ে শ্যাম্পু করে ফেলুন। অলিভ অয়েলের বদলে নারিকেল তেলও ব্যবহার করা যাবে।

ত্বকের যত্নে কলা

কলার স্বাস্থ্যগুণের কথা কমবেশি সবাই জানে। কিন্তু ত্বকের যত্নে কলার অসাধারণ উপকারিতার কথা জানা আছে এমন মানুষের সংখ্যা নেহাতই কম। সুস্বাদু এই ফলটি আমাদের ত্বকের ফ্রি রেডিকেলস এর সাথে লড়াই করে এবং ত্বকের এজিং প্রক্রিয়ার গতিকে কমিয়ে দেয়। আজ তাই ত্বকের যত্নে কলার কিছু অসাধারণ প্যাকের বর্ণনা দিলাম।

(১) মধু ,লেবু ও কলার প্যাক

উপকরণ

অর্ধেক পাকা কলা
১ চা চামচ মধু
১চা চামচ লেবুর রস
প্রথমে কলা নিয়ে খুব ভালো করে ম্যাশ করে নিতে হবে। এবার এর সাথে মধু ও লেবুর রস খুব ভালো করে মিশিয়ে নিতে হবে। এই প্যাকটি মুখে লাগিয়ে রাখুন ২০ মিনিট। এরপর ভালো করে মুখ ধুয়ে মুছে নিন। ত্বকের উজ্জ্বলতা আর কোমলতা দেখে নিজেই অবাক হয়ে যাবেন।

(২) বেকিং পাউডার ,হলুদের ও কলার প্যাক

উপকরণ

অর্ধেক পাকা কলা
এক চিমটি বেকিং পাউডার
১/২ চা চামচ হলুদ
কলা ম্যাশ করে এতে হলুদ ও বেকিং পাউডার মিশাতে হবে। এবার একটা ব্রাশের সাহায্যে মুখে সমানভাবে লাগাতে হবে। হাত দিয়ে প্যাকটি না লাগানোই ভালো। কারণ এতে করে নখে হলুদের দাগ লেগে থাকার সম্ভাবনা আছে। ২০ মিনিট পর উষ্ণ  গরম পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলুন। নিয়মিত ব্যবহারে ব্রণ অনেক কমে আসবে। বেকিং পাউডার থাকার কারণে এই প্যাকটি লাগালে ত্বক একটু জ্বলতে পারে। তবে বেশি জ্বললে তাড়াতাড়ি ধুয়ে ফেলুন।

(৩) টকদই ,কমলার রস ও কলার প্যাক

উপকরণ

অর্ধেক পাকা কলা
১ চা চামচ টকদই
১ চা চামচ কমলার রস
ম্যাশ করা পাকা কলা, টকদই ও কমলার রস ভালো করে মিশিয়ে নিয়ে মুখে দিয়ে রাখুন ২০ থেকে ২৫ মিনিট। প্যাকটি শুকিয়ে আসলে হালকা হাতে ম্যাসাজ করুন ২ থেকে ৩ মিনিট। এবার ভালো করে মুখ ধুয়ে ফেলুন। এটি খুবই কার্যকর একটি ত্বক ফর্সাকারী অ্যান্টি এজিং প্যাক।

(৪) টকদই  মধু ও কলার প্যাক

উপকরণ

দুই টেবিল চামচ ম্যাশড কলা
১ টেবিল চামচ টকদই
১ চা চামচ মধু
সব উপকরণ একসাথে মিশিয়ে নিতে হবে এবং মুখে লাগিয়ে রাখতে হবে ১৫ থেকে ২০ মিনিট। এরপর ভালোভাবে মুখ ধুয়ে তোয়ালে দিয়ে মুছে নিলেই দেখবেন মুখের ত্বক কেমন ঝকঝক করছে।

(৫) শুধু কলার প্যাক

যাদের হাতে রূপচর্চার জন্য একেবারেই সময় নেই তারা এই প্যাকটি ব্যবহার করতে পারেন ত্বকের পুষ্টির জন্য। মুখ ভালোভাবে পরিষ্কার করে এক টুকরো কলা নিয়ে হালকা হাতে মুখে ম্যাসাজ করে নিন। এটি নিয়মিত করলে ত্বকের পুষ্টির ঘাটতি দূর হবে এবং নির্জীব ত্বক নতুন প্রাণ ফিরে পাবে।

121 total views, 1 views today

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে
  • 25
    Shares

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন