আলু খাওয়ার উপকারিতা গুলো জেনে নিন

আলু খাওয়ার উপকারিতা গুলো জেনে নিন
4.9 (98.46%) 13 votes

আলু সুষম ও পুষ্টিকর খাবার। এটি বিশ্বের সর্বাপেক্ষা প্রচলিত সবজিগুলো মধ্যে অন্যতম। আলুর (Potato) আদি উৎস ভারত,সেখান থেকে ১৬শ শতকে এটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এটি পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম খাদ্যশস্য। আলুর বৈজ্ঞানিক নাম Solanum tuberosum (সোলানাম টিউবারোসাম)। এতে একদিকে যেমন শর্করা আছে তেমনি সবজির মতো ফাইবার,খনিজ লবণ, ভিটামিন এবং প্রোটিন আছে। আলু আমাদের নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় খাবার। গরুর বিরিয়ানি রেসিপি কিংবা আলু দিয়ে খাসি বা গরুর মাংস রান্না খেতে ভীষণ সুস্বাদু। এটি শুধু সুস্বাদু খাবারই না অনেক পুষ্টিকর একটি খাবার। প্রতি ১০০ গ্রাম আলুতে শর্করা আছে ১৯ গ্রাম, খাবার আঁশ ২.২ গ্রাম, উদ্ভিদ প্রোটিন ২ গ্রাম, খনিজ লবণ ০.৫২ গ্রাম যার মধ্যে পটাশিয়াম লবণই ০.৪২ গ্রাম, এবং ভিটামিন ০.০২ গ্রাম। অপরদিকে ১০০ গ্রাম চালে ৮০ গ্রাম শর্করা, খাবার আঁশ ১.৩ গ্রাম, উদ্ভিজ্জ্জ প্রোটিন ৭.১৩ গ্রাম, খনিজ লবণ ০.২৮ গ্রাম এবং ভিটামিন আছে মাত্র ০.০০২ গ্রাম। তাই আলুর মধ্যে ভাতের তুলনায় শর্করা কম থাকলেও অন্যান্য উপাদান বেশি আছে। প্রয়োজনীয় খাদ্যপ্রাণ বেশি থাকায় এটি একটি সুষম খাবার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। আলুতে ভিটামিন ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ আছে। এছাড়াও আলুর খোসাতে আছে ভিটামিন ‘এ’, পটাশিয়াম, আয়রন, অ্যান্টি-অক্সাইড, ফাইবারসহ প্রচুর পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট। চলুন এবার দেখে নেওয়া যাক আলু খাওয়ার উপকারিতা।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

আলু

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে : ব্লাড প্রেসারকে ঠিক রাখতে ভীষণ ভাবে সাহায্য করে আলু। কারণ আলুতে আছে কুকোয়া-মাইনাস নামের এক ধরণের উপাদান। তবে অতিরিক্ত আলু খেলে রক্তে চিনির পরিমাণ বেড়ে যায়।

হজমে সহায়তা করে : হজমের পক্ষে আলু খুব ভাল। কারণ আলুতে ফাইবার আছে। এতে ম্যাগনেসিয়াম নামক খনিজ উপাদানটিও থাকে বলে আলু হজম সহায়ক একটি খাবার। এছাড়াও এতে স্টার্চ থাকে যা পাকস্থলী ও অন্ত্রকে শীতল করতে পারে।

ত্বকের পক্ষে উপকারী : আলু বেটে রস ত্বকে লাগালে বিভিন্ন দাগ ও অন্যান্য ত্বকের সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। আলুতে ভিটামিন সি, বি কমপ্লেক্স, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, জিঙ্ক ইত্যাদি রয়েছে যা ত্বকের জন্য জরুরি। এছাড়া রোদে পোড়া ভাবও দূর করতে সহায়তা করে আলুর রস।

মানসিক চাপ কমায় : আলুতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন বি-৬ রয়েছে ফলে, আলু মন ভালো রাখার জন্য কার্যকরী দুটি উপাদান সেরেটোনিন ও ডোপামিন নামক নিওট্রান্সমিটার গঠনে সহায়তা করে। নিওট্রান্সমিটার মস্তিষ্কে অনুভূতি আদান প্রদান করে থাকে এবং মানসিক চাপ কমিয়ে মন ভালো করতে সহায়তা করে।

মস্তিষ্ক সচল ও কর্মক্ষম রাখে: আলুতে গ্লুকোজ, অক্সিজেন,ভিটামিন বি কমপ্লেক্স, এমিনো এসিড, ওমেগা-৩ ও অন্যান্য ফ্যাটি এসিড পাওয়া যায়,যা মস্তিষ্ক সচল ও কর্মক্ষম রাখার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান গুলো সরবরাহ করতে সহায়তা করে।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে : আলুতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘সি’ আছে যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক। একটি মধ্যম আকৃতির আলু থেকে প্রায় ২৭ মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘সি’ পাওয়া যায়। এছাড়া আলুতে পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ভিটামিন বি, ও আয়রন আছে। আবার এক ধরনের প্রোটিনেস ইনহিবিটর থাকায় আলু ক্যানসারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। নিয়মিত আলু খেলে প্রস্রাবের জ্বালা-পোড়া থাকে না। এটি থেকে প্রাপ্ত শক্তি লাইকোজেন হিসেবে মাংসপেশি ও লিভারে সঞ্চিত থাকে। তাই শারীরিক ব্যয়ামের ক্ষেত্রে বিশেষ করে খেলোয়াড়দের জন্য আলু একটি উত্তম খাদ্য। আলুতে কম মাত্রায় সোডিয়াম থাকে, প্রায় ফ্যাটমুক্ত ও সহজে হজমযোগ্য । আলুকে বলা হয় স্কার্ভি ও রিউমেটিক প্রতিরোধক। আলুর প্রোটিন কিডনি রোগীদের জন্য উপকারী। আলু খুবই সহায়ক খাদ্য আলুতে অতিরিক্ত ক্যালরি থাকার কারণে ডায়রিয়া হলে সহজেই ঘাটতি পূরণ হয় ।

আলু রস খাওয়ার উপকারিতা

**ওজন কমানোর উপায়** হিসাবে অনেকেই আলু খেতে চান না। যারা আলু খেতে চান না তারা আলুর রস খেতে পারেন। আলুর রস রোজ খেলে যে তা ম্যাজিকের মতো কাজ দেয় তা আমরা অনেকেই জানি না। জয়েন্টে ব্যথায় কষ্ট পান অনেকেই। ব্যথা মাঝে মধ্যে এতটাই চরমে ওঠে যে রাতের ঘুম কেড়ে নেয়। এ অবস্থায় আলু রস করে খেয়ে দেখতে পারেন। শরীরে পর্যাপ্ত রক্ত চলাচলের সমস্যার কারণে কোষে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যায় ফলে এনার্জিও কমতে থাকে। সঙ্গে কমে রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা। হজম ক্ষমতাও কমে যায়। জাপানের আকিতা ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের অধ্যাপক ড. কাগামাইন কাঁচা আলুর রসের বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের ওপর গবেষণার লেখক। আলুর রসের একটি এমন উপাদানের কথা তিনি জানতে পেরেছেন, যা গবেষণায় ব্যবহৃত ইঁদুরের ক্যান্সারের কোষ মেরে ফেলেছে। অর্থাৎ ক্যান্সার জাতীয় টিউমার ছোট করে আনতে এবং ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অত্যন্ত কার্যকর এ উপাদানটি। গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত করেছে জার্মানিতে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস। কিডনি ও লিভারের সমস্যায়, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, কোমরের ব্যথা, বাতরোগের চিকিৎসায় কাঁচা আলুর রসের কার্যকারিতা আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে নিশ্চিত হওয়ায় এই পানীয়টি দিন দিন আরো বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এছাড়া আরো নানা রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি বিপাকক্রিয়া ভালো রাখতে চমৎকার কাজ করে আলুর রস। ওজন বেশি, কিংবা সহজেই ক্লান্ত হয়ে পড়েন? মাঝারি আকৃতির একটি আলু, কয়েকটি গাজর আর আপেলের রস একসঙ্গে মিশিয়ে প্রতিদিন সকালে এবং ঘুমাতে যাওয়ার আগে একবার খান। দু’ সপ্তাহে নিজের তারুণ্যকে এক অন্য মাত্রায় দেখতে পাবেন। এছাড়া শরীর থেকে নানারকম বিষাক্ত উপাদান বের করে দেওয়া, প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান দেহে সরবরাহ করা, নানারকম চর্মরোগের চিকিৎসায়-ত্বক সুস্থ রাখতে-সৌন্দর্য্য বর্ধন-ব্রন ও ব্ল্যাকহেডসমুক্ত ত্বকের জন্য, তারুণ্য ধরে রাখতে, অকালবার্ধক্য রোধে, রক্তে চিনির পরিমাণ কমাতে এবং কার্ডিওভাস্কুলার যেকোনো রোগে আলুর রস দারুণ কার্যকর।

আলু

আমাদের শরীরের পিএইচের ভারসাম্য প্রাকৃতিকভাবেই ঠিক থাকে। কিন্তু অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ঘুমের অভাব, অবসাদ, দুশ্চিন্তার জেরে পিএইচের ভারসাম্য নষ্ট হয়। যার জেরে শরীরের মেটাবলিজম ঠিকমতো হয় না। মেটাবলিজমের অভাবেই বেশিরভাগ রোগ দানা বাঁধে। আলুর রস পিএইচ ভারসাম্য ঠিক রাখে। অনেক সময় শরীরে ইউরিক এসিডের মাত্রা বেশি হলে হাঁটু, ঘাড়সহ বিভিন্ন জয়েন্টে ব্যথা হয়।প্রতিদিন সকালে খালি পেটে এক গ্লাস আলুর রস খেলে এই সমস্যা থেকে সহজেই রেহাই পাওয়া যায়। এসিডিটি, বুক জ্বালা, বদহজমের সমস্যা কমে যাবে আলুর রসে। প্রতিদিন দুই চামচ আলুর রস খেলে দারুণ ফল পাবেন। অতি মাত্রায় কোলেস্টেরলের সমস্যা দূর করে আলুর রস। রোজ খেতে পারলে শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা একেবারে ঠিক থাকে। আলুর রস বের করতে কাঁচা আলু কেটে নিন চিপসের মতো। তারপর অল্প পানি দিয়ে ব্লেন্ডার মেশিন চালিয়ে দিন। গন্ধটা খারাপ লাগলে, বিট, গাজরের রস বা আদার রস মেশাতে পারেন। সকালে উঠে খালি পেটে ছোট গ্লাসে এক গ্লাস ও রাতে শোয়ার আগে এক গ্লাস খেয়ে নিন। তবে আলুতে প্রচুর পরিমাণ পটাশিয়াম থাকে। তাই যদি আপনার শরীরে পটাশিয়ামের মাত্রা বেশি হয় তাহলে আলুর রস এড়িয়ে যান।

মিষ্টি আলু খাওয়ার উপকারিতা

মিষ্টি আলুতে ভিটামিন ও খনিজ উপাদান থাকে যা,দ্রুত শক্তি প্রদান করতে পারে। মিষ্টি আলু বেশি খাওয়া উচিৎ কারণ এটি ইমিউন সিস্টেমের জন্য উপকারী এবং বিভিন্ন ধরণের রোগ থেকে রক্ষা করতে পারে। গোল আলুর মত মিষ্টি আলুতেও প্রদাহরোধী উপাদান থাকে। যদিও এরা সাধারণ আলুর পরিবারের অন্তর্ভুক্ত নয়। বিটা ক্যারোটিন, ভিটামিন সি এবং ম্যাগনেসিয়ামের উপস্থিতির কারণেই প্রদাহ কমাতেই অত্যন্ত কার্যকরী মিষ্টি আলু। ফুসফুস, শ্বাসনালী এবং নাকের জমাটবদ্ধতা নিরাময়ে সাহায্য করে এটি ফলে অ্যাজমার উপশম হয়। মিষ্টি আলুতে বিটা ক্যারোটিন, জিংক, ম্যাগনেসিয়াম এবং ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স এর উপস্থিতির কারণে আরথ্রাইটিস মোকাবেলায় কার্যকরী ভূমিকা রাখে। মিষ্টি আলুর খোসাতে বিটা ক্যারোটিন থাকে। বিভিন্ন ধরণের ক্যান্সার নিরাময়ে বিটা ক্যারোটিন অত্যন্ত কার্যকরী যা মিষ্টি আলুতে থাকে। এছাড়া মিষ্টি আলুর আঁশ কোষ্ঠকাঠিন্য এবং এসিড তৈরি হওয়ার সমস্যা প্রতিরোধে সাহায্য করে। মিষ্টি আলুর প্রদাহরোধী এবং শীতলিকারক উপাদান পাকস্থলীর আলসারের ব্যথা ও প্রদাহ কমতে সাহায্য করে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে, মিষ্টি আলু ইনসুলিনের নিঃসরণ ঠিকমত হতে সাহায্য করার মাধ্যমে রক্তের চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে কার্যকরী ভূমিকা রাখে।ডায়াবেটিকে আক্রান্তরা ভাত অথবা অন্য শর্করা জাতীয় খাবারের পরিবর্তে মিষ্টি আলু খেতে পারেন। মিষ্টি আলুর আঁশ শরীরে পানি ধরে রাখতে সাহায্য করে। এটি শরীরের পানির ভারসাম্য রক্ষা করে, হাইড্রেটেড রাখে এবং কোষের দক্ষতা বৃদ্ধি করে। মিষ্টি আলুতে জটিল স্টার্চ, ভিটামিন, খনিজ এবং কিছু আমিষ ও থাকে যা শরীরে প্রচুর শক্তি প্রদান করতে পারে। যারা ওজন বৃদ্ধি করতে চান তারা নিশ্চিন্তে মিষ্টি আলু খেতে পারেন।

আলু কিভাবে খাবেন

আলু আমরা বারোমাস খাই। ডিমের রেসপি রান্না করতে হোটেল থেকে শুরু করে বাসাবাড়িতে আলুর ব্যবহার করা হয়। চটপটি এবং ফুচকা তৈরি করতে আলুর বিকল্প নেই। তবে এটি খাওয়ার সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর উপায় হল সেদ্ধ কিংবা বেইক করা। যারা আলুর ভর্তা খেতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য এটা নিঃসন্দেহে সুখবর! এছাড়া বেইক করতে চাইলে সামান্য তেল ছিটিয়ে, অল্প পরিমাণে লবণ এবং ধনে পাতা দিয়ে বেইক করে নিতে পারেন। তবে আপনি যদি স্বাস্থ্য সচেতন হন, তাহলে দৈনিক খাবারে মাঝারি আকারের একটি আলুর অর্ধেকের বেশি না খাওয়াই ভাল আর সঙ্গে রাখুন শাক জাতীয় সবজি। ব্যস, হয়ে গেল ঝটপট ব্যালেন্সড ডায়েট!

* মিষ্টি আলুতে প্রচুর ভিটামিন, তাই বিকেলে ভাজা পোড়া না খেয়ে একটি মিষ্টি আলু খান।

* আলু ডুবো তেলে ভেজে না খেয়ে, গ্রিল করে খেলে ভালো।

* নিরামিষ বা মিক্স সবজি রান্নায় অনান্য সবজির সঙ্গে অল্প আলু দিবেন। এর অনুপাত হবে ১০ : ১ অনুপাত।

344 total views, 3 views today

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে

About ইমন

আমি মহা মানব নই, আমি একজন সাধারণ মানুষ। তাই আমার এপিটাফ হবে আমার মতই সাধারণ, কালের গর্ভে এটিও হারিয়ে যাবে, যেমনটা হারায় একজন সাধারণ মানুষ।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন