আমি কিংবদন্তির কথা বলছি – আমি কবিতার কথা বলছি

আমি কিংবদন্তির কথা বলছি – আমি কবিতার কথা বলছি
পোস্টে রেটিং দিন

আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি। আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি। আমি আমার ভালোবাসার কথা বলছি। উপরোক্ত লাইনগুলো আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ লেখা কবিতা অংশ বিশেষ। গ্রাম থেকে আগত এক তরুণের মৃত্যুবেদনাই এই কবিতার মূল বিষয়। সাদামাটা উপমা। কৃষি দফতরে কাজ করতে করতেই রচনা করেছেন কবি তার কালজয়ী কাব্যগ্রন্থ – আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি। এ কবিতায় কবির শেকড় সন্ধানী মনোভাব কাজ করেছে। এটি আত্মচেতনার, আত্মপরিচয়ের কবিতা। এদেশের মানুষ সভ্যতার আদি থেকেই অত্যাচার ও শত্রুর ভীরু আক্রমণের শিকার বলে আজও তাদের শরীরে আঘাতের চিহ্ন। তাই কবি ক্রীতদাসের মতো লড়াই করে টিকে থাকার যুদ্ধে লিপ্ত তাঁর পূর্বপুরুষ ও মানবমুক্তির আকাঙ্খায় সোচ্চার থেকেছেন। এই মুক্তির লক্ষ্যে যুদ্ধ নয় বরং সৌন্দর্যের সশস্র অভ্যুত্থান প্রয়োজন।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

আমি

আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ

আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
তাঁর করতলে পলিমাটির সৌরভ ছিল
তাঁর পিঠে রক্তজবার মতো ক্ষত ছিল।
তিনি অতিক্রান্ত পাহাড়ের কথা বলতেন
অরণ্য এবং শ্বাপদের কথা বলতেন
পতিত জমি আবাদের কথা বলতেন
তিনি কবি এবং কবিতার কথা বলতেন।
জিহ্বায় উচ্চারিত প্রতিটি সত্য শব্দ কবিতা।
কর্ষিত জমির প্রতিটি শস্যদানা কবিতা।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে ঝড়ের আর্তনাদ শুনবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে দিগন্তের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে আজন্ম ক্রীতদাস থেকে যাবে।
আমি উচ্চারিত সত্যের মতো
স্বপ্নের কথা বলছি।
উনোনের আগুনে আলোকিত
একটি উজ্জ্বল জানালার কথা বলছি।
আমি আমার মায়ের কথা বলছি,
তিনি বলতেন প্রবহমান নদী
যে সাঁতার জানে না তাকেও ভাসিয়ে রাখে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে নদীতে ভাসতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে মাছের সঙ্গে খেলা করতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে মায়ের কোলে শুয়ে গল্প শুনতে পারে না।
আমি কিংবদন্তির কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপরুষের কথা বলছি।
আমি বিচলিত স্নেহের কথা বলছি
গর্ভবতী বোনের মৃত্যুর কথা বলছি
আমি আমার ভালোবাসার কথা বলছি।
ভালোবাসা দিলে মা মরে যায়
যুদ্ধ আসে ভালোবেসে
মায়ের ছেলেরা চলে যায়,
আমি আমার ভাইয়ের কথা বলছি।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে সন্তানের জন্য মরতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে ভালোবেসে যুদ্ধে যেতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে সূর্যকে হৃদপিণ্ডে ধরে রাখতে পারে না।
আমি কিংবদন্তির কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
তাঁর পিঠে রক্তজবার মতো ক্ষত ছিল
কারণ তিনি ক্রীতদাস ছিলেন।
যে কর্ষণ করে
শস্যের সম্ভার তাকে সমৃদ্ধ করবে।
যে মৎস্য লালন করে
প্রবহমান নদী তাকে পুরস্কৃত করবে।
যে গাভীর পরিচর্যা করে
জননীর আশির্বাদ তাকে দীর্ঘায়ু করবে।
যে লৌহখন্ডকে প্রজ্জ্বলিত করে
ইস্পাতের তরবারি তাকে সশস্ত্র করবে।
দীর্ঘদেহ পুত্রগণ
আমি তোমাদের বলছি।
আমি আমার মায়ের কথা বলছি
বোনের মৃত্যুর কথা বলছি
ভাইয়ের যুদ্ধের কথা বলছি
আমি আমার ভালোবাসার কথা বলছি।
আমি কবি এবং কবিতার কথা বলছি।
সশস্ত্র সুন্দরের অনিবার্য অভ্যুথান কবিতা
সুপুরুষ ভালোবাসার সুকন্ঠ সংগীত কবিতা
জিহ্বায় উচ্চারিত প্রতিটি মুক্ত শব্দ কবিতা
রক্তজবার মতো প্রতিরোধের উচ্চারণ কবিতা।
আমরা কি তাঁর মতো কবিতার কথা বলতে পারবো
আমরা কি তাঁর মতো স্বাধীনতার কথা বলতে পারবো।

আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ তিরিশ বা চল্লিশের কোনো ঘরানায় গাণ্ডা না বেঁধে নিজের ভাবনাকে নিজের মতো করেই ব্যক্ত করেছেন। নিজের মতো করে নিজের কথা বলতে চেয়েছেন। স্বল্পপ্রজ কবি বলে হয়তো পূর্ববর্তীদের এড়াতে পেরেছেন। ‘কুমড়ো ফুল’, ‘সজনে ডাঁটা’ বা ‘ডালের বড়ির’ চিত্রকল্পের সঙ্গে যেকোনো কাব্য পাঠক জসীমউদ্দীনের একজন সফল উত্তরসূরিকে খুঁজতে চাইলে, পাঠক বিমুখ হবেন। এমনকি পরিণত ওবায়দুল্লাহ কবিতার ভুবনে যে বাংলাদেশ, সে বাংলাদেশের সঙ্গে সাযুজ্য নেই—’ছিন্নপত্র’ বা ‘গল্পগুচ্ছের’ চিত্রময়তার বা বিভূতিভূষণের অপু-দুর্গার বেদনার্ত হূদয়ের কথকতার, এমনকি ‘রূপসী বাংলার’ প্রকৃতির রহস্যময়তা বা আল মাহমুদের ‘সোনালী কাবিনে’র ‘সম্পদের সুষম বণ্টনের’ বঙ্গীয় অনুভূতির ব্যাকুলতায় তিনি আচ্ছন্ন হননি।

কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ মূলত রাজনৈতিক-সচেতন কবি। ‘সাতনরীর হার’ থেকে ‘কিংবদন্তীর কথা বলছি’ পর্যন্ত সময়টুকু ভাষা আন্দোলন থেকে বাংলাদেশের উদ্ভবের কাল। অনেকটা সংস্কৃত শ্লোকের মতো পঙিক্তগুলোর গঠন। কবি বন্দনা করেননি কোনো অদৃশ্য শক্তিকে, তাঁর আরাধ্য গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের জনগোষ্ঠী। অনিবার্য ভাবেই তারা কৃষক। কৃষকের কথা বলতে গিয়ে যে ইতিহাসকে ব্যবহার করেছেন, সেই ইতিহাস আমজনতার, সেই পিতৃপুরুষরা চর্যাপদের শ্রমণ, তিতুমীর অথবা বিদ্রোহী কৈবর্ত, অথবা মজনু শাহ, অথবা নূরুলদীন, অথবা তিতুমীর অথবা শরীয়তউল্লাহ অথবা স্থানীয় কোনো কৃষক নেতা হয়ে ফজলুল হক, ভাসানী হয়ে মুজিব এমনকি মুক্তিযুদ্ধের চোখ হারানো কমল পর্যন্ত। এই কবিতার সঙ্গে রাঢ় অথবা ভাগিরথীর তীরবর্তী জনপদের মানুষদের জীবনচর্যা মিলবে না। যে পিতৃপুরুষের কথা বলা হয়েছে সে যেন গিল গামেশ অথবা সেমিটিক মহাপ্লাবনের পরবর্তী কোনো পুরুষ। যে পুরুষের অধিষ্ঠান নদীমাতৃক পূর্ববঙ্গে। সে অবশ্যই অভিজাত বা ব্রাহ্মণ নয়। সে অনার্য, ব্রাত্য এবং অস্তিত্বের সংগ্রামে সতত ব্যাপৃত। ‘কিংবদন্তীর কথা বলছি’ যেন একান্ত ভাবেই বাঙালি মুসলমানের সংগ্রামশীলতার ইতিবৃত্ত। পিতৃপুরুসের ঋজু ভাবটি বা পলিমাটির সৌরভ বা রক্তজবার মতো ক্ষতের দাগ আমাদের জাতীয় সংগ্রামের এক একটি প্রতীক। পুরো কবিতায় আবহমান বাংলা আর বাঙালির কথা, তাদের জাতীয় রাষ্ট্র উদ্ভবের কথা কবি বলতে চেয়েছেন। সংগ্রামশীল মানুষের সমষ্টিগত চেতনাকে নানা বর্ণের ছবি দিয়ে সাজিয়ে তুলেছেন। সহজিয়া ভঙ্গীতে। তবে বাঁধনটা দৃঢ়। গদ্য ছন্দে। বাংলা গদ্যকবিতার অন্তর্নিহিত শক্তিকে কবি আবিষ্কার করেছেন নতুন মাত্রায়। সহজিয়া সুর শব্দ ব্যবহার বা উপমা নির্মাণে তত্সম শব্দকে দিয়েছেন সমাধিক গুরুত্ব। ক্রিয়া পদে চলতি ভাষার ধাতুরূপ দিয়ে নির্মাণ করেছেন তার কথকতাকে। এক পর্যায়ে ইতিহাস, নৃতত্ত্ব বা ভৌগোলিক উপাদান গৌণ হয়ে পাঠকের কাছ উদ্ভাসিত হয় কবিতার প্রাণপ্রতিমা। শেষ পর্যন্ত ‘কিংবদন্তীর কথা বলছি’ আর কথকতা থাকেনি। বাঙালি জাতিসত্তার একটা মহাকাব্যিক ভ্রণরেখায় রূপান্তরিত হয়ে উঠে। মাতৃ বেদনার স্মৃতি নিয়ে শুরু করেছিলেন কাব্যযাত্রা, শেষ অধ্যায়ে এসে নিজেকে উত্তীর্ণ করেছেন জাতীয় রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ার কাব্যকথক রূপে। রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়াকে কবি অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের আলোকে ব্যক্ত করেছেন।

121 total views, 1 views today

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে
  • 20
    Shares

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন