আই বি এস কি কেন হয় এবং প্রতিকারের উপায়

আই বি এস কি কেন হয় এবং প্রতিকারের উপায়
4.8 (95%) 12 votes

আই বি এস বা ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম হলে দীর্ঘ মেয়াদী আমাশয় সমস্যার সৃষ্টি হয়। আই বি এস এর রোগীদের দুই ধরনের সমস্যাই হতে পারে, পাতলা পায়খানা এবং কোষ্ঠকাঠিন্য। কারও আবার দুটোর মিশ্রণ হয়। পৃথিবীর মানুষ পরিপাকতন্ত্রের যে সমস্যাটির জন্য সবচেয়ে বেশী কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকে তা হলো আই বি এস। রিসার্চ অনুযায়ী একটি দেশের লোকসংখ্যার ২০ শতাংশ আইবিএসের (IBS) লক্ষণ বহন করে। পুরুষদের চেয়ে মহিলাদের প্রায় দুই থেকে তিনগুণ এই সমস্যায় আক্রান্ত হয়। যারা আই বি এস নামক দীর্ঘ মেয়াদী আমাশয় সমস্যায় ভুগে তাদের সাধারণত বদহজম, দীর্ঘ মেয়াদী ক্লান্তি, মাসিকের সময় ব্যথা এবং পুরো শরীর ব্যথাসহ এই জাতীয় সমস্যা থাকে।

আই বি এস

আই বি এস (IBS) কী

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রম সংক্ষেপে আই বি এস (IBS) হচ্ছে অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যকারিতার ত্রুটি জনিত সমস্যা।  বিভিন্ন গবেষণায় এর কারণ হিসেবে নানা থিওরি বা ব্যাখ্যা দেওয়া হলেও কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি বলেই একে বলা হয় ফাংশনাল গ্যাস্ট্রো ইনটেস্টাইনাল ডিজঅর্ডার (Functional Gastrointestinal Disorder)। সর্বশেষ  ‘Rome III Diagnostic Criteria’ অনুসারে আইবিএসকে বর্ণনা করা হয় এভাবে- বারবার পেট ব্যাথা বা অস্বস্তি যদি মাসে কমপক্ষে তিন দিন সর্বশেষ তিন মাসে দেখা যায় এবং সেই সাথে  আরো দুই বা ততোধিক লক্ষণ থাকে, যেমন- মলত্যাগের পর অবস্থার উন্নতি হওয়া, মলত্যাগের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া বা মলের ঘনত্ব ও অবস্থার পরিবর্তন হওয়া- তাহলে প্রাথমিক ভাবে ধরে নেওয়া যায় যে আপনি আই বি এস বা ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রমে ভুগছেন। শ্রেণিবিন্যাস করলে পাওয়া যায় –

▪আইবিএস-ডি (IBS-D) যেখানে ডায়ারিয়া বা পাতলা পায়খানা প্রধান  সমস্যা।
▪আইবিএস-সি (IBS-C) যেখানে কোষ্ঠকাঠিন্য প্রধান।
▪আইবিএস-এম (IBS-M) কখনো পায়খানা পাতলা হয় আবার কখনো কোষ্ঠকাঠিন্য থাকে।
▪আইবিএস-ইউ (IBS-U)  এটাকে কোনো বিশেষ শ্রেণিতে ফেলা যায় না।
▪আইবিএস-পিআই  (IBS-PI) এটা ইনফেকশনের পর শুরু হয়।

আই বি এস কাদের বেশি হয়

সারা বিশ্বে প্রায় ১১ ভাগ লোক এই আই বি এস সমস্যায় ভোগেন। যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি দক্ষিণ আমেরিকায়। সেখানে প্রায় ২১ ভাগ মানুষের মধ্যেই এই রোগ দেখা যায়। তবে দক্ষিণ এশিয়ায় এর সংখ্যা কিছুটা কম যা প্রায় ৭ ভাগ। গবেষণায় দেখা গেছে ২০-৪০ বছর বয়সী মানুষের বিশেষ করে নারীদের মধ্যে এ সমস্যাটি বেশি দেখা যায়।

আই বি এস রোগের লক্ষণ

আই বি এস রোগীদের সাধারণত তলপেটে কামড় দিয়ে ব্যথা হয় এবং পায়খানা হয়ে ব্যথা ভালো হয়ে যায়। পেটে বুট বুট আওয়াজ হতে থাকে। যাদের কোষ্ঠকাঠিন্য প্রধান,তাদের পেটে ব্যথার সাথে ছোট ছোট খণ্ডে পায়খানা হয়। আর যাদের আমাশয় প্রধান তাদের ঘন ঘন কিন্তু অল্প পায়খানা হয়। আই বি এস এর লক্ষণ গুলোকে এভাবে সাজানো যায় –

▪পেটে কামড় দিয়ে ব্যথা। পেট ব্যথা বা অস্বস্তি যা মলত্যাগের ফলে কমে যায়।
▪মলত্যাগের অভ্যাসে পরিবর্তন,এ ছাড়া পাতলা পায়খানা অথবা পায়খানা শক্ত হয়ে যাওয়া। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুটি এক সাথেও থাকতে পারে।
▪পেট ভরা ভরা লাগা।
▪পায়খানার বেগ বা চাপ বেড়ে যাওয়া।
▪পায়খানার সাথে স্লেমা জাতীয় পদার্থ বের হওয়া।
▪পেট ফুলে যাওয়া।
▪মলের সাথে আম যাওয়া।
▪মলত্যাগ করার পর ঠিক ভাবে ত্যাগ হয়নি মনে হওয়া।

এই সমস্যাগুলো ৬ মাসের বেশী থাকলে এবং মানসিক চাপের সময় এ ধরনের সমস্যা বেশী হলে ডাক্তাররা আই বি এস হয়েছে বলে সন্দেহ করেন। এছাড়াও যাদের এই সমস্যা আছে তারা পোলাও,চিকেন বিরিয়ানি, চিকেন ফ্রাই , কোর্মা, তেহারী ইত্যাদি তেলযুক্ত খাবার এবং দই, দুধ-চা, পায়েস, সেমাই ইত্যাদি দুধ নির্মিত খাবার খেলে সাথে সাথেই দেখা যায় তাদের পেট খারাপ হয়ে পড়ে।

আই বি এস রোগের কারণ

যদিও আই বি এস রোগের মূল কারণ জানা যায়নি তবুও এর কারণ হিসেবে নানাবিধ থিওরি বা ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, যেমন-

▪মস্তিষ্ক অন্ত্রের স্নায়ুতন্ত্রকে প্রভাবিত করে, আবার অন্ত্র মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে।  এভাবে মস্তিষ্ক ও অন্ত্রের মধ্যে যে চক্র বা অক্ষ গড়ে ওঠে, সেই চক্রে বা অক্ষে ত্রুটির জন্য এটি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
▪অন্ত্রের সক্রিয়তার পরিবর্তনও এ রোগের অন্যতম একটি কারণ। যেমন- অন্ত্রের অধিক সংযোজনশীলতা, অন্ত্রের প্রদাহ, শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থার অতিরিক্ত কার্যকারিতা, ক্ষুদ্রান্তে ব্যাকটেরিয়ার অতিরিক্ত বৃদ্ধি, আইলিয়াম  (Ilium)  এ সেরটনিন (Serotonin) পরিবহনকারীর (transporter) অতিরিক্ত বৃদ্ধি।
▪মাইক্রোবায়াল এবং ইমিউনোলজিক ফ্যাক্টর।
▪ননস্টেরয়ডাল অ্যান্টি-ইনফ্লামেটরী মেডিকেশন যেমন- ইবিউপ্রোফেন, ন্যাপ্রোক্সেন, ডাইক্লোফেনাক জাতীয় ঔষধের কারনে এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
▪পরিবেশগত কারন ও খাদ্যাভাসের কারণেও এই রোগ হতে পারে।
▪একই পরিবারের কোনো সদস্য ক্রন’স ডিজিজ আক্রান্ত হলে অন্যান্য সদস্যদের এই রোগ হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
▪ধুমপান।
▪মানসিক টেনশন।
▪মস্তিষ্কের গ্রে মেটারের মধ্যে পরিবর্তন বিশেষ করে নারীদের।

আই বি এস রোগ কখন দেখা দেয়

আই বি এস রোগের সুনির্দিষ্ট কারণ না থাকলেও যেসব ক্ষেত্রে দেখা দিতে পারে- ১০ ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় অন্ত্রের জীবাণু সংক্রমণের পর আইবিএস শুরু হতে পারে। কোনো কোনো প্রোটোজোয়া যেমন- Blastocystis hominis, Dientamoeba Fragilis এর সংক্রমণের পর আই বি এস শুরু হতে পারে। এছাড়া দীর্ঘদিন জ্বরে ভোগার পর কিংবা দুঃশ্চিন্তা বা বিষন্নতায় ভোগার ফলে। আবার এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলেও এই রোগ দেখা দিতে পারে।

আই বি এস রোগের পরীক্ষা নীরিক্ষা

আই বি এস রোগ নির্ণয়ে কোনো বিশেষ পরীক্ষা-নীরিক্ষা নেই।  মূলত রোগের লক্ষণ দেখেই রোগ নির্ণয় করা হয়। তবে এই লক্ষণ গুলো অন্য কোনো রোগের লক্ষণ হিসেবে দেখা দিয়েছে কিনা যেমন-জিয়ারডিয়াসিস (Giardiasis), সিলিয়াক ডিজিস (Coeliac Disease), পিত্তথলীল পাথর (Gall Stone), বিলিয়ারি ডিজিস (Billiary Disease) তা দেখার জন্য কিছু পরীক্ষা-নীরিক্ষার প্রয়োজন হয়। যেমন-

▪মল পরীক্ষা (Stool R/M/E)
▪অ্যান্ডোসকপি (Endoscopy)
▪রক্ত পরীক্ষা (CBC)
▪লিভার বা যকৃত পরীক্ষা (LFT)
▪আলট্রাসনোগ্রাম (USG)
▪হাইড্রোজেন ব্রেদ টেস্ট ইত্যাদি।

আই বি এস রোগের চিকিৎসা

আই বি এস একটি দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা। কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। তবে রোগের লক্ষণ অনুসারে কিছু কিছু ওষুধ, সাইকোথেরাপি ও খাদ্যাভাসের পরিবর্তন এর চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে চলে আসছে। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি সাইকোথেরাপিও নিতে পারেন। **আইবিএস রোগের চিকিৎসা** হিসাবে সবচেয়ে ভালো উপায় খাদ্যভাসের পরিবর্তন। খাদ্যাভাসের পরিবর্তন করেও আই বি এস রোগ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যেতে পারে। যেসব খাবারে এই সমস্যা বাড়ে এসব খাবার পরিহার করতে হবে। যেমন- দুধ বা দুধ জাতীয় খাবার, কিছু কিছু শাক, ভাজা-পোড়া ও তৈলাক্ত খাবার, কৃত্রিম ভাবে তৈরি চিনি, ক্যাফেইন জাতীয় খাবার, মদ জাতীয় পানীয়। এ ছাড়া নিয়ম মেনে খাদ্য গ্রহণ উপকার পাওয়া যেতে পারে। যেমন- অল্প অল্প করে বার বার খাওয়া। এছাড়া মানসিক চাপ কমাতে হবে। এমনকি মানসিক চাপ থেকে মুক্ত থাকতে হবে। ব্যায়াম করতে পারেন অথবা মনকে আনন্দ আর প্রশান্তি দিতে পারে এমন কিছু করতে পারেন। ধূমপান বন্ধ করতে হবে। আর আই বি এস রোগের ব্যাপারে অবহেলা করার ন্যূনতম সুযোগ নেই। অবশ্যই ভালো ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

1,802 total views, 7 views today

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন